Home » রাজনীতি » গ্রামে-গঞ্জে নির্বাচন নেই, আছে জনমনে আতঙ্ক

গ্রামে-গঞ্জে নির্বাচন নেই, আছে জনমনে আতঙ্ক

উত্তরবঙ্গের মাঠ পর্যায়ের চিত্র

এসএম আতিক, রাজশাহী থেকে

people-12নওগাঁর মহাদেবপুরের কালুশহর গ্রামে চায়েরস্টলে চলছিলো সাধারণ মানুষের আড্ডা। আলোচনা হচ্ছিলো আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ষাটোর্ধ ফয়েজ উদ্দিন বলে উঠলেন, ‘এ রকম নির্বাচন এ জীবনে দেখিনি।’ কথা কেড়ে নিয়ে কৃষক জসিম উদ্দিন বললেন, ‘জাতীয় নির্বাচন মানেই বুঝতাম ধানের শীষ আর নৌকার লড়াই। কিন্তু এবার দেখছি পরিস্থিতি একেবারেই বিপরীত।’ স্কুল শিক্ষক রমজান আলী অবশ্য বললেন ভিন্ন কথা। যেহেতু প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না ওই কারণে নির্বাচনের দিন কিংবা আগেপড়ে সহিংসতা বাড়তে পারে। এ নিয়ে তিনি অনেক আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানালেন।

নির্বাচনকে ঘিরে গত কয়েকমাসে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও নির্বাচনকে ঘিরে এসব এলাকায় সহিংসতা ঘটলেও এবারের সহিংসতার মাত্রা ও ক্ষতির পরিমাণ সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রাজশাহীতে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সংসদ সদস্যের বাড়িতে হামলা, বিভিন্ন রাজনৈতিক অফিসে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষে তিন জন নিহত হয়েছে। বগুড়ায় গত ১০ মাসে ২৫ জন নিহত হয়েছে। এসময় বগুড়ায় পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। একই সময়ে চাঁপাইনবাগঞ্জে ১৫ জনের মতো নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে চার জন আওয়ামী লীগের কর্মীসমর্থক এবং বাকিরা জামায়াতশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। নীলফামারিতে সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূরের গাড়িবহরে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসময় সরকারি দলের পাঁচ জন নিহত হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের মানুষেরা বলছেন, এর আগে নির্বাচনকালীন সহিংসতা হতো কেবল শহরে। কিন্তু এবারে সহিংসতা কেবল জেলা বা উপজেলা সদর নয় তা ছড়িয়ে পড়েছে ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যায়ে। গ্রামের ছোটোখাটো রাস্তাঘাটগুলোও গাছের গুড়ি ফেলে অবরোধ করা হচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে বাঁধছে সংঘর্ষ। মরছে মানুষ। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেয় সহিংসতায় ৮ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে। এখানে চারজন পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ সদরের পাশাপাশি উল্লাপাড়া ও বেলকুচির কিছু গ্রাম রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে নির্বাচন কেন্দ্র করে চলমান সহিংসতায়। এ সবকিছু মিলিয়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের সব এলাকায় নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা মোটামুটি একই রকম। অনেকেই বলছেন, তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। কেননা এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ আসনে বৈধ প্রার্থী একজনই রয়েছেন। ফলে নির্বাচন হচ্ছে না। আবার যেগুলোতে নির্বাচন হচ্ছে সেখানেও নেই কোনো নির্বাচনী আবহ উত্তাপ। মানুষের তেমন আগ্রহই নেই নির্বাচন নিয়ে। অনেকে আবার এ নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের ‘তামাশা’ বলেও উল্লেখ্য করেছেন। সেই সঙ্গে নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ভোটাররা। বিএনপি জামায়াত নির্বাচনকে প্রতিহত করতে পারে এবং আওয়ামী লীগের মধ্যেও সহিংসতা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

রাজশাহী জেলায় ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতেই একক প্রার্থী। তিনটিতে আওয়ামী লীগের আর সদর আসনে ওয়াকার্স পার্টির প্রার্থী ভোট ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। ফলে নির্বাচন হতে যাচ্ছে মাত্র দু’টি আসনে। দুইটি আসনেই আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ। আর এ কারণেই নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের মানুষের তেমন আগ্রহ নেই। তারা বলছেন, নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা বুঝাই যাচ্ছে। তবে যেহেতু বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট এ নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ উল্লেখ করে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে সে কারণে ভোটের দিন সহিংসতা ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা এ জেলার মানুষের।

সম্প্রতি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সিনেমা হল মোড়ে দেখা গেলো ছোটোখাটো জটলা। সিনেমা হলটি দর্শক হারিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। পরিত্যক্ত এ হলের সামনেই রয়েছে দু’তিনটি দোকান। সন্ধ্যায় এলাকার মানুষের আড্ডাস্থল এ দোকানটি। কথা হলো আখচাষী আবু বাক্কারের সঙ্গে। বললেন, পূর্বের নির্বাচনগুলোতে এলাকা গম গম করতো। দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি সরগরম হয়ে উঠতো পুরো এলাকা। পোস্টার ব্যানারে ছেয়ে যেতো পথঘাটবাজার। কিন্তু এবারের চিত্র একেবারেই আলাদা। কোনো আমেজ নেই নির্বাচনের। দোকানে আড্ডারত অন্যদেরও একই মন্তব্য।

বাঘা উপজেলা সদরের বাসস্ট্যান্ডে দড়িতে ঝুলছিলো কিছু সাদাকালো নির্বাচনী পোস্টার। নেই কোনো মাইকিং। দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো কোনো প্রার্থীই গণসংযোগে যাননি তাদের এলাকায়। নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে যতেষ্ট সন্দিহান এখানকার মানুষ। এই বাজারের কোথাও শোনা গেলো না নির্বাচনী আলোচনা। একই দলের দু’জন প্রার্থীর মধ্যে হচ্ছে প্রতিযোগিতা। ফলে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ মানুষের না থাকারই কথা।

তবে কিছুটা ভিন্ন চিত্র রাজশাহীর পবামোহনপুর আসনে। গতবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে এবার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। দলীয় টিকিট দেয়া হয়েছে ছাত্রলীগের এক নেতাকে। রাজনীতে নবীন এ নেতা ছাত্রলীগকে সঙ্গে নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ফলে কিছুটা প্রচারপ্রচারণা চোখে পড়ছে এই এলাকায়। তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসমর্থকদের বাইরে পবামোহনপুরের সাধারণ মানুষদের মধ্যে পড়েনি নির্বাচনের সাড়া। ভোটকেন্দ্রে যাবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন অনেকে। এখানকার ভোটাররা নির্বাচনের দিন সহিংসতার আশংকা করছেন।

তবে বিএনপি বা জামায়াতকে তারা ভয় করছেন না। তাদের ভয়, আওয়ামী লীগের দুই পক্ষকে নিয়ে। কেননা বর্তমান সংসদ সংদস্য আওয়ামী লীগ নেতা মেরাজ মোল্লার যথেষ্ট জনসমর্থন রয়েছে তার এলাকায়। কিন্তু দলীয় টিকিট ‘ম্যানেজ’ করতে সক্ষম হয়েছেন ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আয়েন উদ্দিন। বেশ কয়েকবার সংঘর্ষ ইতিমধ্যেই হয়েছে আওয়ামী লীগের এই দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে। নির্বাচনের দিনেও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয় ভোটারদের। মোহনপুর উপজেলার কেশর হাট পৌর এলাকার বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন জানান, কিছু দিন আগে আয়েন উদ্দিনের সমর্থকরা পিটিয়ে জখম করে মেরাজ মোল্লার সমর্থক ও উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুরঞ্জিত সরকারকে। এরই ধারাবাহিকতায় বলা যায়, নির্বাচনের দিনে এমন সহিংসতা ঘটতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন পশ্চিমের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ। জামায়াত অধ্যুষিত এই এলাকায় প্রায়ই সহিংসতা ঘটে। শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট বাজারে কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, নির্বাচন নিয়ে তাদের আতঙ্কের কথা। একতরফা নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন এবং সহিংসতার কারণে আতঙ্কে রয়েছেন সবাই এমন কথা বললেন অনেকেই। সোনামজসিদ স্থলবন্দরের শ্রমিক রাফি আহমেদ বললেন, ‘আমার ছেলের স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনেও ভোট হয়েছিলো, তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অথচ এমপি নির্বাচনে কোনো প্রতিযোগিতাই হচ্ছে না। ফলে এ নির্বাচন প্রতিহত করাই উচিত।’ নির্বাচনের দিন বড় ধরনের সহিংসতা এই এলাকায় ঘটতে পারে এমন আশংকার কথাও জানালেন এ শ্রমিক নেতা।

আমার ছেলের স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনেও ভোট হয়েছিলো, তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অথচ এমপি নির্বাচনে কোনো প্রতিযোগিতাই হচ্ছে না। ফলে এ নির্বাচন প্রতিহত করাই উচিত।’

নাটোরের চারটি আসনের মধ্যে ভোট হতে যাচ্ছে কেবল সিংড়া আসনে। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সংসদ সদস্য জোনায়েদ আহমেদ পলকের প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা মিজানুর রহমান মিজান। সিংড়ার স্থানীয়দের দাবি, ওয়ার্কার্স পার্টির ভোট নেই বললেই চলে। ফলে অনায়াসে জয়লাভ করবেন পলক। যেহেতু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই সেকারণে ভোটাররা অনাগ্রহী এ নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা। ভোটাররা বলছেন, তাদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া না যাওয়ায় কিছু যায় আসে না। যিনি নির্বাচিত হওয়ার তিনি হবেনই। যে নির্বাচনের ফলাফল আগেই টের পাওয়া যায় সেই নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে বাধ সাধতে পারে জামায়াতবিএনপি। ঝুঁকি নিয়ে তাই ভোট দিতে যেতে চান না অনেকেই। সিংড়া বাজারের মাছ ব্যবসায়ী ওমর আলী জানালেন, বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় এ নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত ছিলো। তাহলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো। বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করতে পারে। ফলে ঘটতে পারে বড় ধরনের সহিংসতা।

নির্বাচনকে ঘিরে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তপ্ত বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত বগুড়া। এখানকার মানষেরা চরম আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন। গত ১০ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় বগুড়ায় নিহত হয়েছেন ২৫ জন। বিএনপির ছত্রছায়ায় জামায়াত এ সহিংসতা ঘটাচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে জামায়াত দাবি করেছে, নিহতের মধ্যে ১৯ জনই তাদের নিজেদের কর্মীসমর্থক। বগুড়া পৌরসভার প্যানেল মেয়র আমিনুল ফরিদ জানান, এ বছরের মার্চ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জামায়াতশিবিরের কাছে জিম্মি বগুড়াবাসী। মানুষ এখন ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়। নির্বাচনের দিন সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না বলেও দাবি করেন এ জনপ্রতিনিধি। বগুড়ার সব উপজেলাগুলোতেই একই চিত্র। নির্বাচনের হাওয়া লাগেনি কোথাও। জেলার সাতটি সংসদীয় আসনের মধ্যে ভোট হচ্ছে মাত্র দু’টিতে। এ কারণেই ভোট নয় বরং এখানকার আলোচনার মুল বিষয় ভোটকে ঘিরে সহিংসতা।

উত্তরাঞ্চলের নির্বাচন পরিস্থিতি সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের রাজশাহী অঞ্চলের কোঅর্ডিনেটর সুব্রত পাল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট যে নির্বাচন করতে যাচ্ছে তা কোনোভাবোই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এ নির্বাচন জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। নির্বাচনের দিন থেকে সহিংসতার আশঙ্কা করা যাচ্ছে। আর আগামী ২০ বছর ধরে সেই সহিংসতার মূল্য দিতে হবে জনগণকে।’