Home » রাজনীতি » জনগণের নয় প্রজার নির্বাচন

জনগণের নয় প্রজার নির্বাচন

আবীর হাসান

police-3রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সম্মানহানি করে নিজের সম্মান রক্ষা করতে চাওয়া কেবল অন্যায়েরই জন্ম দিতে পারে। আর সেটাই হতে চলেছে। ৫ জানুয়ারি ২০১৪’র নির্বাচনটা হতে যাচ্ছে এক মহা অন্যায়, আওয়ামী লীগের জন্য এক কলঙ্ক তিলক। কারণ এ নির্বাচন স্বাভাবিক নিয়মে হচ্ছে না আওয়ামী লীগ করাচ্ছে। কেবল তো দেশের জনগণ নয় সারা দুনিয়াও এখন এ অন্যায়ের ঘোর বিরোধী। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা কিন্তু অন্যায়টা স্বীকার করছে না। তবে বলেছেন, এ নির্বাচনটা হওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচনের জন্য সমঝোতায় যেতে চান তারা। এর আগে হরতালঅবরোধের মধ্যেও ক’জন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের ওপরের দিকের নেতা যারা ধানমন্ডির কার্যালয়ে বসেন, তারা বিরোধী দলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলে আসছিলেন, দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের জন্য সমঝোতার আর সুযোগ নেই, সমঝোতা হতে পারে একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য। এসব বাঘার প্রত্যুত্তর প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই দিয়েছেন আত্মগোপনে এবং প্রকাশ্যে থাকা বিএনপি নেতারা। তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের এই নবউদ্ভাবিত ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য সমঝোতার চেষ্টা’ ফর্মুলাটি জনগণ স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। প্রতিক্রিয়া হয়েছে উল্টো। হরতাল অবরোধে পাগল প্রায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীরা যখন লাগাতার কর্মসূচি দেয়ার জন্য বিরোধী দলেরও সমালোচনা করা শুরু করেছিলেন ঠিক তখন আওয়ামী লীগের অবিবেচক অবস্থান নেয়াটা তাদেরকে নতুন করে বিএনপির কর্মসূচির প্রতি সহমর্মী করে তুলেছে এবং আওয়ামী লীগ নামের দলটি যে অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় থাকতে চায় সেটা আরও পরিস্কারভাবে বুঝে গেছেন। ১৯ ডিসেম্বর সরকার প্রধান এবং আওয়ামী লীগেরও প্রধান নেতা যখন বললেন, ‘বিএনপি যদি হত্যা বন্ধ করে সমঝোতায় আসে তবে দশম সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেয়া হবে’ তখন আর বুঝতে কারোর বাকি রইলো না যে দামি¢কতা বজায় রাখতেই তিনি এ নির্বাচনটা করছেন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না জেনেও। নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক রীতিনীতিও তিনি মানছেন না এবং নির্বাচনকেও একটা ছেলে খেলা বানিয়ে ফেলেছেন। নির্বাচনের পর আবার নির্বাচন মারাত্মক এক রসিকতাই বটে। যে বৈঠকে সরকার প্রধান এসব কথা বলেছেন সেটি ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির সভা। সেখানে তিনি আরও বলেছেন, নির্বাচনের পর আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হলে আবার নির্বাচন হবে। ‘আলোচনা চলছে’ এখন একটি অসত্য তথ্যও দিয়েছেন তিনি। এর আগে অন্য নেতারাও এমন দাবি করেছিলেন কিন্তু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব যে দাবি আগেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার, বর্তমান সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে সমঝোতার চেষ্টা জাতিসংঘ বিশেষ দূত অস্কার তারানকো করছিলেন, সে সময় এবং এর আগেও প্রধানমন্ত্রী ঠিক একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বিরোধী দলের কাছে। সেই পুরনো প্রস্তাবটিই নতুন করে আবার দেয়া হয়েছে। এ দফার যে প্রস্তাব তাতে কোনো নতুনত্ব নেই। সে একই প্রস্তাব আবার নতুন করে দিয়ে নতুন একটি সঙ্কটের সৃষ্টি হতে পারে, এমন একটি ইঙ্গিত অবশ্য পাওয়া যায়।

বস্তুত প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের মধ্যে আছে অনেক কৌশলী পরিকল্পনার অসংখ্য ইঙ্গিত। প্রথমত তিনি নির্বাচনটা করাবেন কারণ তাকে ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত নির্বাচনটাকে নির্বিঘ্ন করতে হবে, এ জন্য বিরোধী দল যাতে আন্দোলন না করে সে জন্য একটা টোপ ফেললেন তিনি। অথচ তিনি বুঝলেন না তার শর্ত মোতাবেক নির্বাচনে বিরোধী দল যাবে না, এ কথা তারা আগেই বলে দিয়েছে। কারণ যে শর্ত দিয়ে নির্বাচনে তাদের টানতে চেয়েছেন তা অসম্মানজনক। আর তার নিজের সম্মানের বিষয়টাকে তিনি নিজেই ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে গেছেন সংবিধান সংশোধন করিয়ে, নির্ধারিত সময়ের পরেও ক্ষমতা ধরে রেখে, তথাকথিত সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করে এবং তফসিল ঘোষণা করিয়ে। তালিকাটা আরও দীর্ঘ করা যায় যদি সংলাপ ভন্ডুল করা কেরি তারানকো বান কি মুনদের নয় ছয় বুঝিয়ে অথবা এড়িয়ে চলার ঘটনাগুলোকে যোগ করা হয়। এবারও আলোচনা চলছে এমন মিথ্যাটা বলা হয়েছে বিদেশীদের জন্যই। কারণ প্রধানমন্ত্রী ভালো করেই জানেন তার প্রতিদিনের বক্তব্যই কোনো না কোনোভাবে সারা বিশ্বে পৌঁছাচ্ছে।

দেখতে দেখতে রাজনীতি কিন্তু তিনি বহুদিনই করছেন এবং প্রধানমন্ত্রীত্বও বছর দশেক করে ফেলেছেন। কিন্তু জনগণ এবং বিরোধী দলকে সম্মান করতে শেখেননি এটাই দুঃখজনক। সুযোগ পেলেই তিনি সবার সঙ্গে ছেলে খেলা করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর যে মন্ত্রীসভা গঠন করেছিলেন সেটা ছিল এক বিকট বীভৎস প্রতারণা। এই জাতিটাকে তিনি খুব ক্ষুদ্র মনে করেছিলেন এবং এখনো করেন। ব্রুট মেজরিটির জোরে যতোগুলো ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ আছে সবগুলোই তিনি নিয়েছেন এবং বাড়তি কিছু সুযোগও তিনি অভিনব উপায়ে তৈরি করে নিয়েছেন। কিন্তু এখন যে তার সেই মেজরিটি নেই তা তিনি স্বীকার করছেন না। অনেকে বলে বুঝছেন না কিন্তু আসল ব্যাপার হচ্ছে বুঝছেন ঠিকই কিন্তু ক্ষমতার মোহ আর অস্বাভাবিক গণতন্ত্রহীন দাম্ভিক মানসিকতার কারণে সবকিছুকে উপেক্ষা করছেন। বিএনপিবিহীন দশম জাতীয় নির্বাচন যে অগ্রহণযোগ্য ও প্রহসনমাত্র হচ্ছে এটাও তিনি বুঝছেন। কিন্তু ওই উপলব্ধিটার মধ্যেও ঔদ্ধত্য আছে। ভূমি মালিকের মতো এ ঔদ্ধত্য। যার ফলে ‘দশম সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেবো’ কথাটাও দম্ভের সঙ্গেই বলেছেন এবং যেন আদেশও দিয়েছেন সবাইকে তাকে এবং তার অসঙ্গত কাজকে গ্রহণযোগ্যতা দেয়ার। কিন্তু দেশের মানুষ বা বিরোধী দল এখন কী করে তাকে গ্রহণযোগ্যতা দেবে? সমঝোতা না হতেই নির্বাচনকালীন বিকলাঙ্গ সরকার গঠন করলেন, অথচ নির্বাচন কমিশন দিয়ে তফসিল ঘোষণা করালেন। পুনঃ তফসিলের সুযোগ থাকলেও তা না করে ৫ জানুয়ারিই নির্বাচন করাতে অনঢ় থাকলেন। আর তার ফল হলো এই যে, নির্বাচন হওয়ার আগেই সেটা হয়ে গেল অগ্রহণযোগ্য। কারণ ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ আসনে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে না। অর্ধেক ভোটার থাকবে নিষ্ক্রিয়। বাকি আসনগুলোয় যেখানে সেখানে নির্বাচন হবে সেখানকার ভোটাররাও খুব সক্রিয় থাকবে এমনটা বলা যাচ্ছে না। আর ওই দিনের আগ পর্যন্ত বিএনপি লাগাতার কর্মসূচি দিয়ে চলে যদি ৫ জানুয়ারি মহা কর্মসূচি দেয় তাহলে ভোটারবিহীন নির্বাচনের আর একটি রেকর্ড যে হবে এটা অবধারিত। জোর করে তো জনগণকে ভোটকেন্দ্রে নেয়া যাবে না। ৫১ ভাগ ভোটার উপস্থিতির আশাও পূরণ হবে না। এসব তথ্যের আলামত তিনি পাচ্ছেন না বলা ভুল হবে। পাচ্ছেন বলেই এখন বিরোধী দলকে বলছেন আন্দোলন বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে দিতে এবং পরবর্তী নির্বাচনের জন্য সমঝোতায় আলোচনায় বসতে। কী বিচিত্র প্রস্তাব।

এখানে গণতন্ত্র কোথায়? সরকার প্রধানের চিন্তায় তো এটাও থাকা উচিত যে একদিন না একদিন তাকে সমতাভিত্তিক নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে আর সেই দিনটাকে দূরবর্তী করে তুললে তিনি আরও অসম্মানিত হবেন। কাউকে মুচলেকা দিয়ে কিছু করতে বললে তো সে গণতান্ত্রিক অধিকার বলেই তা করবে না। বিএনপির কাছে সেটাই কেন বার বার চাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী? সবাইকে প্রজা ভেবে শাসন করতে চাইলে তো গণতন্ত্র বাঁচবে না, জনগণও মানবে না তারা বিরোধী দলের প্রতিই সহমর্মী হয়ে উঠবে শত গালাগালি সত্ত্বেও। এ জাতি কোন দাম্ভিকের নির্দেশ পছন্দ করে না এটা কি তিনি এতদিনেও বোঝেননি।।