Home » রাজনীতি » টেলি-ভীষণ :: ক্ষমতাসীনদের বন্দনার বাক্স

টেলি-ভীষণ :: ক্ষমতাসীনদের বন্দনার বাক্স

ফ্লোরা সরকার

democracyচার্লস ডিকেন্সের “হার্ড টাইমস” উপন্যাসের মি.গ্র্যাডগ্রিন্ড স্কুলঘরের একটা ফাঁকা, সাদামাটা, একঘেয়ে জায়গায় তার চৌকো আঙুল দিয়ে মাস্টারমশাইয়ের আস্তিনে দাগ কেটে কেটে বললেন – “—জীবনে আমরা তথ্য ছাড়া আর কিছুই চাই না,স্যার, তথ্য ছাড়া আর কিছুই চাইনা।” প্রশ্ন হলো তথ্যের প্রতি কেনো এই বিবমিষা? যেখানে তথ্য অধিকার আইনের জন্যে সারা পৃথিবীময় মানুষ লড়ে যাচ্ছে, তথ্য যেখানে বৃহৎ শক্তি বা ক্ষমতা হিসেবে বিরাজ করছে, হাইটেক যুগের এই সময়ে উন্মুক্ত দ্বার দিয়ে তথ্যের অবাধ চলাফেরার গতি যেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত,সেখানে তথ্যের প্রতি এই ব্যঙ্গ আমাদের বিচলিত করে বটে। তাহলে কি মানুষ আজ তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত? সিসিফাসের সেই পাথরের মতো মানুষ কি ভারবাহী তথ্যের এই পাথরটাকে তার গন্তব্যস্থলে নিয়ে যেতে পারছেনা বলে? তথ্যের এই ভার এবং একঘেয়েমিতা আমাদের সৃষ্টিশীলতাকেও একই সঙ্গে ধ্বংস করছে। কারণ ভারবাহী এতোসব তথ্য পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘যে টেলিফোন আসার কথা’ কবিতার মতো “যে তথ্যটি পাবার কথা ছিলো, সে তথ্যটি সে পায়নি বা পাচ্ছেনা বলে”। না পেতে পেতে মানুষ আজ বড় ক্লান্ত।

তবে মাঝে মাঝে যে তথ্যটি পাবার কথা ছিলো বা থাকে, হঠাৎ কোন উকিলিক্সের আলোর ঝলকানির মতো সে পেয়ে যায়। আর এমনি একটি তথ্য বা খবর প্রকাশিত হয়েছে গত ৮ ডিসেম্বর, ২০১৩, আন্তর্জাতিক এনজিও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, মিডিয়া মনিটারিং সেলের গবেষণা থেকে। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব এবং সংস্কার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে থাকে। এনজিওটি গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বিশেষত রাষ্টায়ত্ব বিটিভি এবং পাঁচটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত সব সংবাদ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছে। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বিটিভিতে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে যত সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে, সেসবের বক্তব্য এবং বিবৃতির বেশিরভাগাই নেতিবাচক অথবা বিদ্বেষপূর্ণ, অন্যদিকে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সম্পর্কে যত খবর প্রচার কার হয়েছে, সেসবের বক্তব্য এবং বিবৃতির বেশিরভাগ ইতিবাচক এবং স্তূতিমূলক। পাঁচটি বেসরকারি চ্যানেল সম্পর্কেও একই গবেষণালব্ধ ফলাফল পাওয়া যায়। পাঁচটি টিভি চ্যানেলগুলো হলো .টি.এন. বাংলা, চ্যানেল আই, একাত্তর, সময় টিভি এবং এন.টি.ভি.। এভাবে একপেশে সাধুবাদ এবং নিন্দবাদ প্রচার, জনমনে মিডিয়া সম্পর্কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ওই গবেষণায় তথ্যউপাত্ত ধরে ধরে বিভিন্ন বিশেষত বেসরকারি চ্যানেলগুলোর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ডাটা সহযোগে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সে সম্পর্কে যাবার আগে মিডিয়ার বিশেষত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার আপত্তিকর আচরণ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাক।

রেডিও বিশেষত টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইংরেজি Gimme Society ev Gimme Generation”শব্দটির বহুল ব্যবহার শুরু হতে দেখা যায়। শব্দটির ব্যবহার আগে ছিলোনা, তা নয়, কিন্তু ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শব্দটি ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ইংরেজি give me’র অপভ্রংশ রূপ gimme’। পুঁজিবাদী তথা ভোগবাদী সমাজে ‘আরো চাই’ ‘আরো দাও’ এর অন্তহীন চাহিদার যেন কোন সীমারেখা টানা নেই। আমাদের এখানে কিছু কিছু রেস্তোরার নাম দেখা যায় – “হাংরি আই”, “খাই খাই রেস্তোরা”(দ্বিতীয়টি বর্তমানে উঠে গেছে যদিও) ইত্যাদি। এই গিম্মি সমাজকে আধুনিক প্লেগ রোগের সঙ্গে তুলনা করা হয়। মিডিয়া কীভাবে এই ‘গিম্মি সমাজ বা গিম্মি প্রজন্ম (বাংলায় যার অনুবাদ করা হয়েছে ‘আমাকে দাওপ্রজন্ম’) তৈরী করছে তা অনুরাগ যাদব ‘দ্যা স্টেসম্যান’ পত্রিকায় গত ৩০ ডিসেম্বর, ২০০০ সালে চমৎকার ভাবে তুলে ধরেন – “কোলা, বার্গার, ফ্যান্সি গাড়ি, মোবাইক, মোবাইল ফোন ছোট পর্দায় আসছে যাচ্ছে, আর শিশুরা সেই পরিবেশে ‘ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর’ মন্ত্র উচ্চারণ করে বড় হচ্ছে। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারে সামাজিকতা মাথায় উঠেছে। যা কিছু যোগাযোগের বিষয় সবই করতে হবে ‘ কৌন বনেগা ক্রোড়পতির আগে বা পরে’। আজ গোটা জাতি হঠাৎ “এক ঘন্টায় ধনী হবার বাতিকে ভুগছে”।” অর্থাৎ মিডিয়া আমাদেরই অচেতনে আমাদের ভোগবাসনা আর লালসার উন্মমত্তোতা শিখিয়ে পড়িয়ে বড় করছে। টিভি যা বলে, টিভি যা করে সব ঠিক বলে, ঠিক করে এই ধরণের একটা মনোভাব আমাদের অগোচরে তৈরী হয়ে যাচ্ছে।

একইভাবে রাষ্ট্র মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে এক বিশেষ ধাঁচের “পছন্দসই” (ওপরে বর্ণিত সাধুবাদনিন্দবাদ প্রচারের মতো) অর্থ, ব্যাখ্যা, প্রতিকল্প, কল্পচিত্র ইত্যাদির ভিত্তিতে ইতিহাস ও জাতীয় লক্ষ্যের একান্ত “নিজস্ব ব্যাখ্যা” দিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখিত চ্যানেলগুলোর কয়েকটিতে আওয়ামী লীগ কর্তৃক একটি বিজ্ঞাপন বা প্রপাগান্ডা দেখানো হচ্ছে যেখানে শুধু দলীয় স্তুতি করেই ক্ষান্ত হয়নি, কয়েকটি সংলাপ এই রকম

লোক: বার বার সরকার পাল্টায়লে দেশের জন্য ভালো হয় না, সরকাররে থাকতে দিতে হয়।

যুবক: আপনে কি সরকারের নামে ব্যাটিং করতাছেন?

লোক: না। সরকারের পক্ষে কিছু কইতাছিনা, দেশের পক্ষে বলতাছি।”

সংলাপ কয়টি একটু গভীরে যেয়ে দেখা যাক। এখানে যে তথ্যটা এখানে দেয়া হচ্ছে – ‘সরকার বার বার পাল্টালে দেশের জন্যে মঙ্গল হয়না’, এই সংলাপের মধ্যে দিয়ে কি এটাই বোঝানো হচ্ছে না যে বার বার সরকার পরিবর্তন নয়, একটি নির্দিষ্ট সরকারকে দীর্ঘদিন থাকতে দেয়া উচিত অর্থাৎ প্রকারান্তরে রাজতন্ত্রের জয়গান কি গাওয়া হচ্ছেনা? আরো বিস্মিত হতে হয় প্রপাগান্ডাটি এখানেই থেমে থাকেনি, এরপর আরো বলা হয় কোন সরকারের পক্ষে নয়, দেশের পক্ষে অর্থৎ রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলা হচ্ছে! ভাবতে বিস্ময় লাগে, সরকার আর রাষ্ট্রকে কতটা দুঃসাহস নিয়ে এক করে ফেলা হলো, কতটা সুক্ষভাবে, কতটাই অবলীলায়!এখানেই মনে পড়ে যায় নোম্ চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যানের Manufacturing of Consent”বইটির কথা যেখানে আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্র কীভাবে ‘সম্মতি নির্মাণের’ যন্ত্র (মিডিয়ার মাধ্যমে) হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলছে। যেখানে বলা হয়েছে সম্মতি নির্মাণ অনেক “উঁচু মার্গের এক শিল্প”। সরাসরি বলপ্রয়োগ না করে সম্প্রচার ব্যবস্থাকে সরকার তার নিজ স্বার্থপূরণে কাজে লাগায় জনসম্মতি নির্মাণের এই প্রক্রিয়া সুচারু অথচ অনমনীয়। এই সুচারু প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনলের গবেষণায় দেখা যায়, চ্যানেল আই বিরোধীদলীয় নেতা সম্পর্কে ৫৭টি নেতিবাচক মন্তব্য প্রচার করে। ইতিবাচক মন্তব্য মাত্র ৩ টি (২০:১ অনুপাতে)। একাত্তর ৪৫টি নেতিবাচকের বিপরীতে মাত্র ১টি মন্তব্য প্রচার করা হয় (১৫:১ অনুপাতে)। বিপরীতে, চ্যানেল আই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে ২৪টি নেতিবাচক খবরের বিপরীতে ১৬টি ইতিবাচক মন্তব্য প্রচার করে ( .:১ অনুপাতে)। একাত্তর ৩৯টি নেতিবাচকের বিপরীতে ১৫টি ইতিবাচক মন্তব্য (.:১ অনুপাতে)। সময় টিভি শেখ হাসিনা সম্পর্কে ২০টি নেতিবাচকের বিপরীতে ১৬টি ইতিবাচক মন্তব্য প্রচার করে। বিএনপির নেতাদের সম্পর্কে এটিএন বাংলা ৯৪টি নেতিবাচক মন্তব্যের বিপরীতে মাত্র ৯টি ইতিবাচক মন্তব্য প্রচার করে, এনটিভি ৭৯টি নেতিবাচকের বিপরীতে ৭টি ইতিবাচক, চ্যানেল আই ৯৬টির বিপরীতে ৪টি, সময় টিভি ৮৮টির বিপরীতে ৬টি এবং একাত্তর ৬৭টি নেতিবাচক মন্তব্যের বিপরীতে মাত্র ৩টি ইতিবাচক মন্তব্য প্রচার করে। বিটিভির কথা বলে এই লেখা দীর্ঘায়িত না করলেও চলবে, কেননা বিটিভি যে ইতিমধ্যেই সরকারি প্রযুক্তির দাসে অনেক আগেই পরিণত হয়ে গেছে তা সকলেই অবগত। সাম্প্রতিক সময়ে টক শো’র উপস্থাপকদের সরকারের প্রশাসন ও অন্যান্য বিভাগের মতো রদবদল ঘটানো হয়েছে। দলীয় উপস্থাপক, দলীয় প্রশ্ন এবং পরিণতিতে দলীয় উত্তর।

জনমত গঠনই যদি মিডিয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, সেখানে জনমত গঠিত না হয়ে মিডিয়া ‘কুইনাইন না সারাবার’ মতো নিজেই যদি জনমত হয়ে ওঠে, তাহলে চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে বইকি। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক সি.রাইট মিলস্ (১৯১৬১৯৬১) একদা বলেছিলেন – “জনমত আর “ঘটনা” নয়, তা “আদর্শ” হয়ে উঠছে (The Power of Elite, 1956)।” অর্থাৎ জনগণের মতামত ‘গণ’র মত না হয়ে যখন নির্দিষ্ট কোন চ্যানেলের নিজেদের মতামত হয়ে ওঠে তখন শ্রোতা বা দর্শককে সেই মতামত বা মতাদর্শের ছাঁচে গড়ে তোলার শুধু প্রবণতাই থাকেনা, সেইসঙ্গে সেই আদর্শ চাপিয়ে দেয়ার লক্ষ্যও পূরণ করা হয়। এতে করে মানুষকে শুধু বিভ্রান্তই করা হয়না, তার চিন্তা করার স্বাধীনতা পর্যন্ত হরণ করে নেয়া হয়। আমরা মুখে অনেক গালভরা বুলি আওড়াই – “স্বাধীন মতামত”, “স্বাধীন চিন্তা”, “পরিবর্তন” “প্রগতি”,“জনস্বার্থ”, “গণমুখী” ইত্যাদি শব্দের ভারে, কিন্তু প্রকৃত বাস্তবে তার ধারে কাছে যাইনা। এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা এমনই একটি প্রক্রিয়া এবং চক্র যার মাধ্যমে একটি অসত্য তথ্যকে বার বার সত্য বলার মধ্যদিয়ে জনগণের মনোজগতে এমন একটা ধারণার তৈরি করা হয় যেন ওই বাক্স যা বলছে তাই সত্য। কিন্তু এটা যারা করেন তারা জানেন না, সত্য সংবাদ ও তথ্য অত্যন্ত পবিত্র এবং এটি কোনো না কোনোভাবে জনগণের কাছে পৌছাবেই। তবে যারা এটা করে তারা এটা জানে না যে জনগণের শক্তিই হচ্ছে আসল। জনগণই হচ্ছে মূল শক্তি।।