Home » আন্তর্জাতিক » নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জিতবে আর হারবে বাংলাদেশ – ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জিতবে আর হারবে বাংলাদেশ – ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

the-economist-logoপ্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের ২১ ডিসেম্বরের প্রিন্ট সংস্করণে ‘দ্য ক্যাম্পেইন ট্রেইল : দ্য রুলিং পার্টি উইল উইন বাংলাদেশ’স ইলেকশন। দ্য কান্ট্রি উইল লুজ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। ওয়েবসাইট থেকে প্রতিবেদনটি এখানে অনুবাদ করে দেয়া হলো।

পর্যায়ভিত্তিক একটি অভ্যুত্থান’ইউরোপিয়ান এক কূটনীতিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার উদ্যোগকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন। প্রধান বিরোধী দল ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন বয়কট করছে। ফলে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ জয়ের নিশ্চয়তা পেয়ে গেছে। অবশ্য বৈধতা একটা আলাদা বিষয়।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সহিংসতায় শতাধিক লোক মারা গেছে। সর্বশেষ দফার প্রাণহানি ঘটেছে ১২ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পর। ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে যুদ্ধপারাধের অভিযোগে তাকে ট্রাইব্যুনাল দণ্ডিত করে। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ যুদ্ধের সমাপ্তিসূচক বিজয় দিবস উদযাপন করে। কিন্তু বাংলাদেশ তার রক্তাক্ত জন্মের পর আর রক্তক্ষরণ ঘটাবে না এমন আশার আলো এখন বিলীন হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনার অজনপ্রিয় সরকার দেশের বিশাল অংশ থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। শেখ হাসিনার ঘোর প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাজপথে তার রাজনীতি চালাচ্ছে। দলটি একের পর এক ধর্মঘট ডাকায় পরিবহনব্যবস্থা এবং অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ছে। দলটির মিত্র জামায়াত তার অস্তিত্বের জন্য লড়ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের রগ কাটার জন্য পরিচিত এই দলটির দুর্বৃত্তরা এখন খোলাখুলিভাবে খুনে মত্ত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী জবাব দিচ্ছে তাজা গুলি চালিয়ে। ১৬ ডিসেম্বর তারা ভারত সীমান্তসংলগ্ন জামায়াতের অন্যতম ঘাঁটি সাতক্ষীরায় পাঁচ জামায়াত সমর্থককে হত্যা করে। উত্তর দিকে, জামায়াতের তরুণ শাখা হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের মালিকানাধীন বাড়িঘর ও দোকানপাট ভস্মীভূত করে। গ্রাম এলাকার (আওয়ামী) লীগ ক্যাডাররা পালিয়ে রাজধানী ঢাকায় চলে গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ লোকজন বলছেন, তিনি (শেখ হাসিনা) জামায়াতের পুরো নেতৃত্বের মৃত্যু দেখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কিমুন এবং আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিসহ বিদেশের প্রখ্যাত ব্যক্তিরা ফাঁসি বন্ধ করতে শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু সমঝোতা তার স্টাইল নয়।

তিনি পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করেছিলেন। বড় দুই দল এবং তাদের নেতাদের মধ্যে অব্যাহত ও ক্রমাগত অবিশ্বাসের কারণে ১৯৯৬ সালে নির্বাচন তদারকির জন্য যে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তা থেকে মুক্তি পেতে ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করা হয়। শেখ হাসিনা পরিকল্পিতভাবে নিরঙ্কুশ শাসকে পরিণত হওয়ার উদ্যোগ নেননি। তবে ওই সংশোধনীর সম্ভাব্য পরিণাম সেটাই। তারপর থেকে সরকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নিতে থাকে।

সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো নির্বাচনটি হবে স্পষ্টভাবে ভাওতাবাজি। ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৪টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে জিতে গেছেন হাসিনার সমর্থিত ব্যক্তিরা। বিএনপি এবং তার ছোট ছোট ১৭ মিত্র নির্বাচন বয়কটে যোগ দিয়েছে। বয়কটের জন্য সরকার সাবেক স্বৈরশাসক ও জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম এরশাদকে হাসপাতালে আটকে রেখেছে এবং মনে হচ্ছে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হবে। এর পরের বৃহত্তম দল জামায়াতকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই অজুহাতে যে এটির ধর্মবিষয়ক গঠনতান্ত্রিক ধারা বাংলাদেশের সেক্যুলার সংবিধানের পরিপন্থী।

অন্তত (আওয়ামী) লীগ জয়ী হবে। ৫ জানুয়ারি যাই ঘটুক না কেন, শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পরানোর জন্য পার্লামেন্টে পর্যাপ্ত সংখ্যক এমপি থাকবে। ফলাফল হয়তো দেশে ও বিদেশে বৈধতা পাবে না। অবশ্য বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশি ভারত ,এই দেশটিই একমাত্র বিদেশি শক্তি যে ভোটাভুটির ব্যাপারে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারে, হস্তক্ষেপ করা পছন্দ করবে না।

তবে, পূর্বনির্ধারিত ফলাফলপূর্ণ (১৯৮০এর দশকে এরশাদ যে ধারণাটির প্রবর্তন করেছিলেন) নির্বাচনের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন দেয়ার ভারতের সিদ্ধান্তটি হয়তো অদূরদর্শী প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ভারতবিরোধী ভাবাবেগ তুঙ্গে পৌঁছেছে। আর সংঘাতময় পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ভারতের মিত্র (আওয়ামী) লীগ ইসলামবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। শেখ হাসিনার ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রতি সমর্থন দেয়ার ফলে ভারত যা চায়, তার বিপরীতটাই পেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ আরো চরমপন্থী ও কম সেক্যুলারে পরিণত হতে পারে।

সেনাবাহিনী সম্ভবত ২০০৭ সালের মতো হস্তক্ষেপ করতে চায় না। ওই সময়ে খালেদা জিয়া নির্বাচন হাইজ্যাক করার চেষ্টা করলে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তারা দুই বছরের জন্য অনির্বাচিত ‘টেকনোক্রেটিক’ প্রশাসন পরিচালনা করে। বিদেশি শক্তিগুলোও ওই সময়ের মতো এবার কৌশলে অভ্যুত্থান সমর্থন করবে না। এর ফলে লড়াই মাসের পর মাস চলবে। তবে আওয়ামী লীগের অনেক রাজনীতিবিদও স্বীকার করেছেন যে, তারপর অবশ্য যথাযথ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জনমত জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩০ ভাগ লোক জেনারেলদের ক্ষমতা গ্রহণ সমর্থন করে। আরো লক্ষণীয় যে তারা যদি সেটা করে এবং আরেকটি নির্বাচন আটকে দেয়, তবুও মাত্র এক তৃতীয়াংশ লোক চায় যে ‘যুদ্ধমান বেগমদের’ রাজনীতি থেকে বিরত রাখা হোক। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও তারা যেহেতু তাদের দেশের সেবা করছে, তাদের ছাড়া সম্ভবত তা হবে না।।