Home » অর্থনীতি » মুলা ১৫ পয়সা শিম ৩ টাকা বেগুন ৭ টাকা…

মুলা ১৫ পয়সা শিম ৩ টাকা বেগুন ৭ টাকা…

অবরোধহরতালে বিপন্ন কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি, যশোর থেকে

farmers-1দেশে চলমান হরতাল অবরোধসহ নানাবিধ সঙ্কট দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে কৃষির উপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় উৎপাদিত কৃষি পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারছে না। দর পতনে চাষি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বোরো চাষ শুরু হয়ে গেছে। এ সময় প্রয়োজন সার ও ডিজেলের। সার ও ডিজেলের গাড়ি মুভমেন্ট করতে পারছে না।

দেশের অন্যতম প্রধান সবজি উৎপাদনকারি জেলা হচ্ছে যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর। প্রতিদিন এ অঞ্চল থেকে শ’খানেকের মতো ট্রাক সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান যায়। হরতাল অবরোধের কারনে ব্যাপারিরা সবজি কিনতে পাইকারি সবজির বাজার গুলোতে আসছে না। দরপতনে চাষি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। দেশের অন্যতম প্রধান সবজি হাট হচ্ছে যশোরের বারিনগর। এ হাট থেকে প্রতিদিন ৩০ ৩৫ ট্রাক সবজি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, মাদারিপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান যায়। এ সবজি যেতে পারছে না। শনিবার বারিনগরে ফুলকপি প্রতি কেজি ৭/৮ টাকা, শিম প্রতি কেজি ৩/৪ টাকা, বাঁধাকপি প্রতি পিস ৪/৫ টাকা, বেগুন প্রতি কেজি ৭/৮টাকা, মূলা ৭/৮ মনের এক ভ্যান ১০০/ ১৫০ টাকা দরে হয় অর্থাৎ মোটামুটি ১৫ পয়সা কেজি। যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর গ্রামের বড় সবজি চাষি ইজাজুল ইসলাম জানান, ক্ষেত থেকে কামলা খরচ করে সবজি তুলে ভ্যান ভাড়া দিয়ে হাটে এনে বিক্রি করে কোন লাভ থাকছে না। এ কারনে চাষি ক্ষেত থেকে সবজি তুলছে না। ক্ষেতে নষ্ঠ হচ্ছে। তিনি জানান, দু এক ট্রাক সবজি ব্যাপারিরা খুব রিক্স নিয়ে চালান নিয়ে যাচ্ছে। তবে ট্রাক ভাড়া আকাশ ছোঁয়া বলে তিনি জানান। ঢাকা যেতে ৮০ হাজার টাকা ভাড়া হাকছে। অথচ অন্য সময়ে এ ভাড়া ছিল কয়েক গুণে কম।

এদিকে বোরো চাষ শুরু হয়ে গেছে। ফিলিং স্টেশন গুলো অবরোধের দিন গুলোতে খুলনা ডিপো থেকে ট্যাংক লরি করে ডিজেল পেট্রোল আনতে পারছে না। জ্বালানী তেলের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। গ্রামের ডিজেলের খুচরা দোকানদাররা লিটার প্রতি ৩ টাকা করে বেশি নিচ্ছে বলে ইজাজুল ইসলাম জানান। দাম বেড়ে গেছে সারের। ২৭ টাকা কেজির ড্যাপ সার ৩৫ ৩৬ টাকা, ১৬ টাকার কেজির ইউরিয়া ১৮ টাকা, ২৩ টাকা কেজির টিএসপি সার ২৬ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ইজাজুল ইসলাম প্রতি বছর ৫ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেন। প্রতিকুল পরিস্থিতির জন্য এবার ২ বিঘাতে চাষ করবেন বলে মনস্থ করেছেন। মেহেরপুর সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের চাষি বাবলু মিয়া জানান, তাদের এলাকাতে প্রচুর পরিমানে সবজি চাষ হয়ে থাকে। সবজি তাদের অন্যতম অর্থকরি ফসল। এবার হরতাল অবরোধে সংকটে পড়েছে কৃষক। ক্রেতা মিলছে না। ক্ষেতে ফুলকপিতে এবং বাঁধাকপি ফেটে যাচ্ছে। ফুলকপি ৮/৯ টাকা কেজি এবং বাঁধাকপি প্রতিশ’ ৬/৭শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অনেক চাষি ক্ষেত থেকে সবজি তুলছে না, নষ্ঠ হচ্ছে। তিনি জানান, কয়েক জন চাষি মিলে ট্রাক যোগে সবজি নিয়ে ঢাকা যাচ্ছিল। পথিমধ্যে দেয়া হয় ট্রাকে আগুন। এরপর বন্ধ হয়ে গেছে।

অপর সবজি উৎপাদনকারি এলাকা হচ্ছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা। এ উপজেলার ভাড়ইমারি গ্রামের জাহিদুল ইসলাম ওরফে গাঁজর জাহিদ এবার একশ’ ২০ বিঘা জমিতে গাঁজর চাষ করেছেন। প্রতি বিঘাতে গড়ে ৪২ হাজার টাকা হিসাবে ৫০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এখন তার মাথায় হাত। কোন ভাবেই উৎপাদিত গাঁজর বিক্রি করতে পারছেন না। অথচ গাঁজর চাষ করে তিনি ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। ৩ মনের প্রতি বস্তা গাঁজর ৬ হাজার টাকা করে বিক্রি করেছেন। এখন ২ হাজার টাকা বস্তা বিক্রি হচ্ছে। মাঠে গাঁজর নষ্ঠ হচ্ছে। শুধু তার নয়, অন্য গাঁজর চাষিরাও এবার পথে বসবেন বলে তিনি জানান। ফুলকপি ও বাঁধাকপি মাঠে নষ্ঠ হচ্ছে বলে তিনি আরো জানান।

কুষ্টিয়ার খাজানগর মিনিকেট চালের জন্য বিখ্যাত। এখানে ১২টি অটো রাইস মিল ও ৩শ’ চালকল ও হাজার খানেক চাতাল আছে। এ সব চাতালে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কর্মরত আছে। তারা বেকার হয়ে পড়েছে। উৎপাদিত চাল মজুত পড়ে আছে। এ চাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাকযোগে চালান পাঠানো হতো। খাজানগর চালকল মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক আব্দুল মজিদ বাবলু জানান, খাজানগর থেকে প্রতিদিন দুশো ট্রাক চাল দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান যেতো কিন্তু অবরোধের কারনে চাল পাঠানো যাচ্ছে না। ব্যাংক ঋণের সুদ টানতে হচ্ছে। খাজানগর ছাড়াও যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় আরো কয়েক হাজার ছোট বড় ধানের চাতাল আছে। এসব চাতালে আরো প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করে থাকে। এদের বেশির ভাই মহিলা। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর এলকাতেও বহু চাতাল আছে। এখানেও বিপুল পরিমান চাল তৈরি হয়ে থাকে। হরতাল অবরোধে পড়ে এখানকার প্রায় ২০ হাজার চাতাল শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। এ সবের মধ্যে ধানের দামও বেড়ে চলেছে। সবে আমন ধান উঠেছে। এ সময় ধানের দাম বৃদ্ধির কথা নয়। এর প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। চালের দামও উর্ধ্বমুখী। মোটা ধান প্রতি মন সাড়ে ৮শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চিকন ধানের দাম আরো বেশি।

যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় প্রচুর ফুলের চাষ হয়। একমাত্র যশোর জেলার ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলাতে ফুল চাষ হয় দেড় হাজার হেক্টরে, ঝিনাইদহ জেলায় ১৭৫ হেক্টরে ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় একশ’ হেক্টরে। ফুলের বড় বাজার বসে ঝিকারগাছা উপজেলার গদখালীতে। সকাল হতেই চাষিরা ফুল নিয়ে বাজারে আসে। ব্যাপারি ফুল কিনে প্যাকিং করে বাসের ছাদে করে বা ট্রাকে করে ঢাকা, চ্টগ্রাম, সিলেট সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান নিয়ে যায়। হরতাল অবরোধের দিনে ব্যাপারিরা ফুল কিনে না। ফুল পচনশীল বলেই ব্যাপক দর পতন হয়। ফুল ক্ষেতে রাখা যায় না, প্রতিদিন তুলতে হয় নয়ত ক্ষেতেই নষ্ঠ হয়। চাষিরা ফুল তুলে ফেলে দিচ্ছে। প্রতিদিন এ অঞ্চলের চাষিদের কম করে ১৫ লাখ টাকার ফুল নষ্ঠ হচ্ছে বলে গদখালী বাজারের ফুল চাষি সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বড় ঘিঘাটি গ্রামের ফুল চাষি আব্দুর রাজ্জাক জানান, গাদা ফুল প্রতি ঝোপা ২৫০ / ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছেন। হরতাল অবরোধ শুরু পর ব্যাপক দর পতন হয়েছে। এক ঝোপা ( ৮০০ থেকে ১০০০টি ) ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষি ক্ষেত থেকে ফুল তুলে ফেলে দিচ্ছে। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, তাদের কথা কেউ ভাবছে না।।