Home » রাজনীতি » মূমুর্ষ গণতন্ত্রের অন্তিম যাত্রা

মূমুর্ষ গণতন্ত্রের অন্তিম যাত্রা

আবীর হাসান

political-carton-14বেসামরিক শাসকও যে বন্দুকের নল ছাড়া গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে ওই গণতন্ত্রকেই হত্যা করতে পারে তা দেখিয়ে দিল আওয়ামী লীগ। তবে এবারই প্রথম নয়। আরেকবার করেছিল একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে। এবার নির্বাচনের সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তন করে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার ধারা অব্যাহত রাখার নামে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে যা করছে শেখ হাসিনার সরকার তাতে করে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ভিন্নভাবে লিখতে হবে শেখ হাসিনার দেশী ও বিদেশী সহযোগীদের। কারণ গণতন্ত্রও থাকবে আবার বিরোধী দল বা ভিন্নমতাবলম্বীদের মিছিলসমাবেশ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার থাকবে না এটা কি হতে পারে? গণতন্ত্র থাকবে কিন্তু নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে না তা কেমন করে হয়। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে না এলেও সে নির্বাচনকে বৈধ বলতে বাধ্য করা হবে এ তো এক অভিনব স্বৈরতন্ত্র। এমন এক অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক নির্বাচন করতে চলেছে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনে সাড়ে আট কোটি ভোটারের মধ্যে অধিকাংশ ভোটারই ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন না।

গণতন্ত্র হত্যার পৈশাচিকতা নতুন করে ২৯ ডিসেম্বরেই দেখেছে দেশবাসী এবং যা চলছে ৩০ ডিসেম্বরেও। ২৯ ডিসেম্বর লাঠিধারীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে দুটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কোর্ট এবং জাতীয় প্রেস ক্লাব। তারপরেও বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে, এটা জোর করেই স্বীকার করতে বলা হচ্ছে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং সাধারণ জনগণকে। ২৯ ডিসেম্বরই বুঝিয়ে এবং দেখিয়ে দেয়া হয়েছে স্বীকার করতে না চাইলে কি করা হবে এবং পরিণতিইবা কি হবে।

আসলে ২০ দিনের বেশি হরতাল অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি চালানোর পর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ নাম দিয়ে খাানিকটা হালকা এবং সভ্যভব্য কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল বিএনপি। আর এটাকেই দুর্বলতা ভেবে চড়াও হয়ে বসে শেখ হাসিনার তথাকথিত নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার। নির্বাচনকালীন সরকারের যদি এই স্বৈরাচারী রূপ হয় তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর কী রূপ হবে এই দলটির। দলটিরও নয় আরও সঠিকভাবে বলতে হয় প্রধানমন্ত্রীর। দিন দিন তার যে রূপ প্রকট হয় উঠেছে তা কোন গণতন্ত্রীর নয় হিঃস্র স্বৈরাচারীর।

আসলে ২৯ ডিসেম্বর অনেকটা ভদ্রস্থনির্বিষ কর্মসূচির দুদিন আগে থেকেই সারাদেশকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল শেখ হাসিনার সরকার। সে সময় পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় সন্ত্রাসীরাও অবদান রেখেছিল এই অবরোধ কার্যক্রমে। আর নির্দেশটাও ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর। রেলপথনৌপথ সড়ক কোনটাই সচল রাখা হয়নি। মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার প্রবণতার মতোই বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের রাজধানীতে আসা ঠেকাতে পুরো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই অচল করে দেয়া হয়েছে। আর ২৯ ডিসেম্বর তো রাজধানী জুড়ে ছিল লাঠিধারী ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য। গণপরিবহন তো ছিল বন্ধই, রিকশা আরোহী কিংবা হেটে চলা মানুষদেরও চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। জরুরি অবস্থা নয়, কারফিউ বা ১৪৪ ধারা নয়, তবু মাানুষের চলাচলে বাধা দেয়া কোন গণতান্ত্রিক নিয়ম, তা অনেকেরই বোধগম্য হচ্ছে না।

বোধগম্য হচ্ছে না কেন দিনের পর দিন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, কেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, বাড়ি থেকেও বের হতে দেয়া হয়নি? এই রকম আচরণ তো বাংলাদেশের মানুষ দেখেছিল? এরশাদ ঘরানার বিরোধী আন্দোলনের সময়। নব্বইয়ের গণআন্দোলন চূড়ান্ত রূপলাভের আগের দু’বছর ধরে স্বৈরাচারী এরশাদ নানা কৌশলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতো। কিন্তু এখন গণতান্ত্রিক বলে দাবিদার সরকার সেই স্বৈরাচারী কৌশল আরো কঠোরভাবে প্রয়োগ করছে কেন, এ প্রশ্ন অনেকেরই।

অনেকেরই বিশ্বাস ছিল সীমিতভাবে হলেও সমাবেশটি করতে দেবে সরকার। যানবাহন চলাচলে বিঘœ ঘটানো যে এতটা চরম পর্যায়ে চলে যাবে সেটাও চিন্তা করেননি কেউই। কোন গণতান্ত্রিক সরকার কি রাজধানীকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে? বৈধ রাজনৈতিক দলের নেতা এবং যিনি এখনো সংসদ সদস্য (নতুন সংশোধিত সংবিধান মোতাবেক) ও বিরোধী দলীয় নেতা, তার চলাচলে কেন বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে কোন গণতান্ত্রিক নিয়মে সে প্রশ্নও রাখছেন অনেক আওয়ামীপন্থী বা সমর্থক নাগরিকও। মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন কে কোন নিয়মে গ্রেফতার করা হয়েছে সে প্রশ্নও উঠেছে।

নির্বাচনকালীন নিয়ম যা সংশোধিত সংবিধানে রয়েছে সেটাও যে মানছেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার প্রতিহিংসা পরায়ণ ইচ্ছাতেই যে চলছে সব কিছু, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে পদে পদে। সবার এমনকি আওয়ামী লীগের প্রতি দুর্বল সাধারণ মানুষেরও যে আশাআস্থা এবং বিশ্বাস ছিল সেটাও ভেঙে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। সমস্ত সভ্যতা এবং গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার নিয়ম ভেঙেছেন। যেখানে যা কিছু পুলিশি অনিয়ম হচ্ছে তাকে বলা হচ্ছে উপরের নির্দেশে হওয়ার কথা। এই উপরের অবস্থানটা যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারই সেটাও এখন বুঝতে পারছেন অনেকেই। তিনি গণতন্ত্রের নিয়মে চলছেন না, সেটা বুঝিয়ে দিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না। তিনি চলছেন স্বৈরাচারের নিয়মে। বন্দুকের নল ছাড়াই উত্থান ঘটেছে এই স্বৈরাচারের এবং অন্যান্য স্বৈরাচারের মতোই ভয়াবহ এক সিন্ড্রমে ভুগছে এই শাসক। ক্ষমতায় থাকার মেয়াদকে দীর্ঘতর করার সব অপচেষ্টাই চলছে। যারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, দশম সংসদ নির্বাচনের পর পরই একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনা নমনীয় অবস্থানে যাবেন তারা আছেন বোকার স্বর্গে।।