Home » রাজনীতি » বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সঙ্কট

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সঙ্কট

. আকবর আলি খান

political-cartoon-32দ্বন্দ্ব ছাড়া রাজনীতি সম্ভব নয়। সমস্যাটি দ্বন্দ্বের নয়, রাজনীতির। রাজনীতিতে প্রতিযোগীতা থাকতেই হবে। তবে সেটি সংঘর্ষে রূপ নেবে না; প্রতিযোগীতার ধ্বংসাত্মক প্রভাব হবে সীমিত। রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। তাই কোনো কোনো তাত্ত্বিক সাংঘর্ষিক রাজনীতির ডামাডোলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকার ব্যাপারে সন্দেহের কারণ থাকতে পারে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে অনেক সময় বিপরীত নজিরও দেখা যায়। এথেন্সে পেরিকেলিসের গণতন্ত্রের আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে পেলোপনিশিয়ান যুদ্ধে আত্মহত্যা করল। আবার যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক শতাব্দী ধরে গণতন্ত্র অব্যাহতভাবে কার্যকর রয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে বার বার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সফল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সব ধরনের গণতন্ত্র টেকসই হয় না। শুধু উদারনৈতিক গণতন্ত্রই টিকে থাকতে পারে; অনুদার গণতন্ত্রের (ইললিবারেল ডেমোক্রাসি) মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা সবচেয়ে তীব্র। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো, নিজে বাঁচো, অন্যকে বাঁচতে দাও। এ রাজনীতি তাই আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এ রাজনীতি সংঘর্ষ এড়িয়ে সমঝোতার চেষ্টা করে। এ ধরনের গণতন্ত্রে প্রয়োজন আত্মনিয়ন্ত্রণের।

বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্রের যে সংকট চলছে, তা মূলত অনুদার গণতন্ত্রের। এখানকার মূল সমস্যা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতা ও শ্রদ্ধাহীনতা। ফলে এখানকার রাজনৈতিক সংকট প্রতিদিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে এবং এ থেকে উত্তরণের জন্য অতীতে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, সেগুলোও ভেঙ্গে পড়েছে। এর কারণ বিশ্লেষণ করতে হলে ইতিহাসের অনেক গভীরে যেতে হবে।

বাংলাদেশের এ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গেলে অন্তত চারটি ঐতিহাসিক উপাদান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ১. ঐতিহাসিক উপাদান ২. সমাজতাত্ত্বিক উপাদান ৩. সংখ্যাতাত্ত্বিক উপাদান ও ৪. নিবিড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ বা অর্থনীতিতে ক্রীড়াতত্ত্বের যেসব বিশেষত্ব রয়েছে সেগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণে প্রয়োগের সম্ভাবনা।

প্রথম কারণটির দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখব, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এর কারণ অনেক গভীরে প্রোথিত। এখানকার সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। ফলে এখানে কখনো বড় ধরনের এবং সফল সরকার স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হতে পারেনি। এর যে প্রভাব, সেটিই দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে চলে আসছে।

দ্বিতীয় কারণটি হলো, সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সমাজে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। অনেকে দাবি করেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুরুব্বীমক্কেল সম্পর্ক রয়েছে। এটিই এখানকার সমাজের প্রধানতম দুর্বলতা। এ ধরনের সম্পর্কে কারণে এখানে সামাজিক পুঁজি গড়ে উঠতে পারেনি। এর অনুপস্থিতির ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হওয়ার কথা, তা হয়নি।

তৃতীয় সমস্যা সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো। এটি এমন এক পরিবেশে রচিত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষত শাসনতন্ত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমাদের এখানে ভোটাধিাকারের নিয়ম রয়েছে সে অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্বাচন করা বেশ শক্ত। কেননা এ দেশে বর্তমানে যে নির্বাচন পদ্ধতি রয়েছে, সে অনুযায়ী অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় অন্তত এক ভোট বেশি পেলেই জয়লাভ করা সম্ভব। নির্বাচনে এ পদ্ধতির বিভিন্নভাবে অপব্যবহার করা হয়ে থাকে। সেজন্য এ পদ্ধতির নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট গ্রহণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আনুপাতিক হারে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিরূপণের পদ্ধতি প্রচলিত। এতে সুফলও পাওয়া গেছে।

এছাড়া আরো কিছু উপাদান আমাদের রাজনৈতিক পদ্ধতিকে বিঘ্নিত করছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো দুই পক্ষের মধ্যে যে ধরনের প্রতিযোগীতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে, আসলে সেগুলো মানুষের মত প্রতিফলনের জন্য যথেষ্ট নয়।

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালে যে গণতন্ত্র নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, তার সূচনাও আমরা সঠিকভাবে করতে পারিনি। কারণ আমাদের মতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতির প্রয়োজন, তা আমাদের ছিল না। ফলে দেখা যায়, দেশে শাসনতন্ত্র রচিত হওয়ার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই বহুদলীয় গণতন্ত্র একদলীয় গণতন্ত্রের রূপ ধারণ করে। পরে অবশ্য সেটি পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। কিন্তু এই যে, বহুদলীয় থেকে একদলীয় কিংবা একদলীয় থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র, এমন নিরন্তর পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশে এ ধারার সরকার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন থেকে যায়।

সামগ্রিকভাবে এখন যে অবস্থা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা বিশেষ কোনো দলের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নয়। আসলে এ সমস্যাকে দেখতে হবে ঐতিহাসিক ভাবে, গভীরে দৃষ্টি দিয়ে। সে অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে বলব, মূল সমস্যার দিকে আমরা এখনো তাকাইনি; আমরা কতগুলো গৌণ সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। নির্বাচন হবে এবং তাতে সব দল অংশ নেবে। কিন্তু এ ধরনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের আশাআকাক্সক্ষার প্রতিফলন যে সব সময় ঘটানো যাচ্ছে না, তা আমরা বিবেচনায় নিচ্ছি না।

সুতরাং এখন যখন ভোটাধিকার এবং আন্দোলনের ব্যাপারে নতুন করে কথা হচ্ছে, তখন আমরা আশা করব, সব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিই শুধু আলোচনায় আসবে না; এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যাতে একে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। দুর্ভাগ্য, সে ধরনের উদ্যোগ আমরা এখন পর্যন্ত কোনো দলের পক্ষ থেকেই দেখতে পাইনি। দেশের মানুষের জন্য আমরা কী চাই, তা নির্ধারণ করে আন্দোলন করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে।।

লেখক: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা