Home » বিশেষ নিবন্ধ » ‘অনুদার’ গণতন্ত্রের বিদায়?

‘অনুদার’ গণতন্ত্রের বিদায়?

. মীজানূর রহমান শেলী

awami-attack-on-high-court-3অনুদার’ গণতন্ত্র কথাটি পরস্পর বিরোধী বললে ভুল হবেনা। গণতন্ত্র মানেই উদার পরস্পর সহনশীল এবং শান্তিময় এক সরকার ও সমাজ ব্যবস্থা। গণতন্ত্রে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী নির্বিশেষে সকল মানুষের, সকল নাগরিকের সমান অধিকার সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত। মৌলিক মানবাধিকার, মানবিক সমতা ও আইনের শাসন এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবিভাজ্য অংশ। এই সকল বৈশিষ্ট যে ব্যবস্থায় উপস্থিত তাতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় মাথা গুনতির ভিত্তিতে, মাথা ভাঙ্গার নয় By counting heads, not by breaking them, তাই তলোয়ার বা বুলেট নয় জনসমর্থন ও ব্যালটই এই ব্যবস্থার আওতায় ক্ষমতায় যাওয়ার পথ করে দেয়। এ পথ দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সংঘর্ষের নয়, বরং আলাপআলোচনা, দেওয়ানেওয়ার ও সমঝোতার। তাই গণতন্ত্রকে বলা যায় এমন একটি ব্যবস্থা যাতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতা থেকে বেরিয়ে আশা সম্ভব।

গণতন্ত্র ছাড়া একনায়কধর্মী বা স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় তা সম্ভব হয় না। সেখানে ক্ষমতার হাত বদল সচরাচর সহিংস এবং রক্তাক্ত উপায়েই হয়ে যাকে, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। অনুদারতা এই ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবিভাজ্য বৈশিষ্ট। একনায়কত্ববাদী, স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে ভিন্নমত অনুমত নয়। ছলে ও কৌশলে এবং সবশেষে ও সর্বপরি বল প্রয়োগে সকলকে একই মত বা তথাকথিত আদর্শের অনুসারী হতে বাধ্য করাই এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ও প্রবণতা। প্রায়:সই এর আসল উদ্দেশ্য হলো, একনায়ক বা স্বৈর শাসকের ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি অক্ষুন্ন রাখা ও তা দীর্ঘস্থায়ী করা। এই উদ্দেশ্যে ঐ শাসকের অনুগত চাটুকার ও স্তাবকরা তাদের স্বার্থসিদ্ধি করে এবং সমবেতভাবে প্রয়াস চালিয়ে তাদের স্বৈরাচারী নেতানেত্রীর ক্ষমতা মজবুত করে। তাই এই ব্যবস্থায় পরমত সহিষ্ণুতা, উদারতা বা সহনশীলতার বিন্দুমাত্র স্থান নেই। প্রাচীনকালের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র এবং আধুনিককালের একনায়কতন্ত্র বা সমূহবাদী (totalitarian) রাষ্ট্র ব্যবস্থা এই ধরনের শাসনে উদাহরণ।

কিন্তু, গণতন্ত্র ও একনায়কবাদী ব্যবস্থার বাইরে হাল আমলে যে সমস্ত গণতন্ত্রের লেবাসে স্বৈরাচারী শাসনের উপস্থিতি দেখা যায়, তাকে ‘অনুদার’ গণতন্ত্র বা অনিশ্চিত গণতন্ত্র বলে অবিহিত করা যায়। এই সকল ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক বিধান অনুযায়ী চার বা পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচনের বিধান থাকে। কিন্তু, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা বা বিকৃতির কারনে নির্বাচিত সরকার অনেক সময়েই ‘নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্র’ চালু করে। এখানে গণতন্ত্রের অন্যান্য অবশ্য প্রয়োজনীয় উপাদানের অভাব বা ঘাটতি দেখা দেয়। এক্ষেত্রে আইনের শাসন থাকেনা, থাকলেও তা নাম মাত্র। জাতীয় আইন সভা বা সংসদ কার্যকর অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারেনা, জন প্রশাসন তার নিরপেক্ষতা ও স্বশাসন সুরক্ষিত রাখতে পারেনা এবং অনেক সময়ই প্রধান নির্বাহীর আজ্ঞাবহে পরিণত হয়। কৌশলে ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়। প্রবল প্রতাপ কেন্দ্রীয় নির্বাহী শাখার দাপটে স্বায়ত্বশাসিত স্থানীয় সরকার হয়ে পড়ে দুর্বল ও নির্জীব। অন্যদিকে রাজনৈতিক স্তরে দলগুলো তাদের শক্তি ও সংহতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। শীর্ষ নেতাদের প্রবল প্রভাব ও প্রতিপত্তি দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা করা অসম্ভব করে তোলে। নির্বাচনে জয়লাভ করলে পর দলীয় প্রধান হয়ে ওঠেন সরকারের প্রধান নির্বাহী এবং সংসদের নেতা। দলের গণন্ত্রের অভাবে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থার দুর্বলতার কারনে এধরনের নেতা কার্যত একনায়কে পরিণত হন। তার নিরঙ্কুস ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করার সাধ্য দল বা সরকারের মধ্যে কারোই থাকেনা বললেই চলে। এই অবস্থায় গণতন্ত্র পরিণত হয় অনুদার বা অপূর্ণ গণতন্ত্রে।

বাংলাদেশে ১৯৯১ সনে সংসদীয় গণতন্ত্র সর্বসম্মতিক্রমে পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পুনর্বহালের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির একনায়কবাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিক্রিয়ার ফলে সংশোধিত সংবিধানে প্রধান নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীকে করা হয় বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। একই কারনে সংসদীয় গণতন্ত্রে সাধারনত নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতির যেটুকু ক্ষমতা থাকে তাও বাংলাদেশে অবশিষ্ট রাখা হয়নি। এরই ফলে পরবর্তীকালে ভাবাদর্শগত তফাৎ এবং ব্যক্তিগত অপছন্দের সূত্র ধরে বিরোধীদলকে তার সাংবিধানিক মর্যাদা না দেওয়ার এক রেওয়াজ গড়ে ওঠে ও ক্রমেই তা শক্তিশালী হয়। এই ধারাক্রমেই ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এ বেগম খালোদ জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলকে উপেক্ষা করে এবং প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন বিএনপি এই প্রবণতাকে আরো প্রবল করে। ২০০৭২০০৮ এর প্রলম্বিত ও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবসান ঘটার পর নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয়ে শেষ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একই ধারা আরো প্রখর ও তীব্র করে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর সর্বময় ক্ষমতা তাঁকে মধ্যযুগের সম্রাটবাদশাদের মত পরাক্রমশালী করে তোলে। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন শাখা ও বিচার বিভাগ তুলনামূলকভাবে ক্রমেই শক্তিহীন ও দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রক্রিয়াটি আগের ধারাক্রমেরই ফল। সবমিলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র অনুদার ঘরনার সদস্য হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রেখে চলছিল। কিন্তু, সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলী এই জরাজীর্ন গণতন্ত্রকে বুঝি বিপন্ন করে তুলেছে। বিএনপির দুই সংসদীয় আমলের সরকারের সময়েও দেখা গেছে যে, বিরোধী দলকে সহজে সভাসমাবেশ ও মিছিল করতে দেওয়া হয়নি। অনেক সময়েই পুলিশ আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষার নামে বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় বা শাখা অফিস ঘিরে রেখেছে, এমনকি ‘আক্রমন’ চালিয়েছে। আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকার সেই ট্রাডিশন শুধু সমানে চালিয়েই যাচ্ছেনা তাকে আরো খরস্রতা করে ফেলেছে।

দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনের সংস্কৃতির ‘একনায়কঅনুসারী’ সাংস্কৃতিক ধারার তোয়াক্কা না করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেছে। দলটি অবশ্য উচ্চতম আদালতের একরায়ের আলোকে এমনটি করা হয়েছে বলে দাবী করেছে। তবে এই পদক্ষেপের প্রবল বিরোধীতা করে বিরোধী দল বিএনপি ঐ রায়ে যে আরো দুটি সংসদীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তদারকীতে হতে পারে সে কথার উল্লেখ করে। নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে তাই নিয়ে যখন দেশব্যাপী বিরোধীদলের দীর্ঘ ও ব্যাপক আন্দোলন, লাগাতার হরতাল ও অবরোধ চলছে, তখন নিজেকে আন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনী সরকার ঘোষনা করে আওয়ামী লীগ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছে এবং নির্বাচনের তারিখ ৫ই জানুয়ারি ২০১৪ এর আগেই ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তার মিত্রদেরসহ নির্বাচিত হয়ে গেছে!

বিরোধী দল বাকী ১৪৬টি আসনের নির্বাচন প্রতিরোধ করার সংকল্প ব্যক্ত করেছে ও সেই লক্ষ্যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এই আন্দোলনের সূত্র ধরেই ২০১৩ সনের ২৯শে ডিসেম্বর তারা ঢাকায় এক বিশাল জনসমাবেশের আহবান জানায়। কথাছিল এই সমাবেশ হবে ‘বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাষায় ‘ঢাকা অভিমুখে গণতন্ত্রের অভিযাত্রার ফল’। কিন্তু বিরোধী দলের সংবিধান অনুমত গণতান্ত্রিক অধিকার অর্থাৎ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করার অধিকার টুকুও সরকার ‘ছলে বলে কৌশলে’ ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। সাড়াদেশ থেকে যাতে কেউ ঢাকায় না আসতে পারে সেই জন্য ২৭শে ডিসেম্বর রাত থেকেই সকল মহাসড়ক রেলপথ ও নৌপথে সরকার পরোক্ষ কায়দায় কার্যকর অবরোধ গড়ে তোলে। শুধু তাই নয় ২৭শে ও ২৯শে ডিসেম্বর মহানগরী ঢাকায়ও গণপরিবহন দুর্লভ করে তোলে। বেগম খালেদা জিয়া যাতে সমাবেশে না যেতে পারেন সে জন্য তার বাসভবনের বাইরে নিরাপত্তার নামে বিরাট পুলিশ বাহিনী নিয়োগ করে তাকে কার্যত: অবরুদ্ধ রাখা হয়। পরিণতিতে সুপ্রিম কোর্ট এলাকায়, প্রেস ক্লাবে এবং মালিবাগ ও মগবাজারে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ছাড়া আর কিছু ঘটেনি। সহিংস সংঘর্ষে ঢাকায় নিহত হয়েছে তিন জন। সরকার ও সরকারি দলের ছলে, কৌশলে ও বলে বিরোধী দলের পরিকল্পিত মহা সমাবেশ ভন্ডুল হয়ে গেছে।

শুধু মহা সমাবেশই নয়, দৃশ্যত: মনে হয় যে, দক্ষ চাল চেলে ক্ষমতাসীন দল অনুষ্ঠিতব্য এক তরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচনও পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন করে ফেলবে। কিন্তু তাতে কী লাভ হবে, কারই বা লাভ হবে? ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনকে কার্যত: অস্বীকৃতি জানিয়ে পর্যবেক্ষক পাঠাতে অসম্মতি জানিয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনে ও সহিংসতায় জাতীয় অর্থনীতি খেয়েছে দারুন মার। সামাজিক শান্তি, স্থিতি ও শৃঙ্খলা পড়েছে হুমকির মুখে। এই অবস্থায় নির্বাচনে বিজয় শুধু অনুদার গণতন্ত্রের বিদায় বলেই পরিগনিত হবেনা, দেশ, জাতি, রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও বয়ে আনবে অশুভ এবং অমঙ্গল। যে নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি সংখ্যক ভোটার ভোট দেবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং যে নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল অংশ নেয় না বলে এমনটি হয়, তাতো গণতান্ত্রিক নির্বাচন হতে পারেনা। আর নির্বাচনই যদি গণতান্ত্রিক না হয়, তা হলে শুধু নাম ছাড়া গণতন্ত্রের আর কী বা বাকী থাকে?

(চিন্তাবিদ, সমাজ বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মীজানূর রহমান শেলী সেন্টার ফর ডেভেল্পমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিডিআরবি)’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং আর্থসামাজিক ত্রৈমাসিক ‘এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সের’ সম্পাদক।।)