Home » বিশেষ নিবন্ধ » ‘দেশের অবস্থা ভাল না’ – আতঙ্কিত মানুষের অসহায় উচ্চারণ

‘দেশের অবস্থা ভাল না’ – আতঙ্কিত মানুষের অসহায় উচ্চারণ

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের চিত্র

বিশেষ প্রতিনিধি, যশোর থেকে

political-cartoon-12২৯ ডিসেম্বর, সারাদিন ছিল শান্তি প্রিয় সাধারন মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা। দেশের খবর জানতে মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে বসে দিন কাটায়। গ্রামের মানুষ চাষাবাদের পাশাপাশি খোঁজ খবর নিতে থাকেন।

দেশে চলছে সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। মানুষের সে দিকে কোন ভ্রক্ষেপ ছিল না সাধারন মানুষের। গ্রাম গঞ্জ থেকে শুরু করে সর্বত্রই মানুষের মাঝে এ অজানা আতঙ্ক ছিল। এক সময় এ অঞ্চলের মানুষ চরমপন্থিদের আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতো, এখন সারা দেশের সঙ্গে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ রাজনৈতিক আতঙ্কের মাঝে দিন কাটাচ্ছে। যাদের সন্তান বা আত্মীয় পরিজন ঢাকা বা দেশের অন্য কোন জায়গাতে কর্মরত আছেন তাদের মাঝে আতঙ্ক বেশি। কখন দুঃসংবাদ শুনতে হয়। অবরোধের মধ্যে আসলে চলছে সরকারি অবরোধ আর পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা নির্যাতন এবং অত্যাচার। এর উপরে এ আতঙ্ক বেশি সৃষ্টি করেছে বোমা হামলা চালিয়ে বাস আগুন ধরার ঘটনা গুলোতে। গ্রামের মানুষ রাজনীতির অতশত বোঝে না। তারা চায় শান্তিতে বাস করতে। কৃষি উপকরণ সার, কীট নাশক ও বীজ সুলভ মূল্যে পেতে। উৎপাদিত কৃষি পণ্য উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করতে। দেশে বিশৃংখলা হলেই প্রথমে সংকটে পরে তারা। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষক। তাদের নিয়ে কেউ ভাবেন না। এ সময় তাদের প্রযোজন পড়বে সার ও সেচ যন্ত্র চালনার জন্য ডিজেলের। দেশে অশান্তি হরতাল ব অবরোধ হলে সব কৃষি উপকরণের পরিবহণ বাঁধা প্রপ্ত হবে। ঘাটতি পড়বে উপকরণের। সমস্যায় পড়বে কৃষক। এ নিয়েও তাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। সবার মুখে এক কথা দেশের অবস্থা ভাল না। একজন সাধারন ভ্যান চালকও ভাবছেন দেশের কথা। এমন একজন ভ্যান চালক জালাল উদ্দিন। ঝিনাইদহের গাড়াগঞ্জ শৈলকুপা সড়কে ভ্যান চালান। কথা প্রসঙ্গে সরাসরি বলে বসেন,’দেশের অবস্থা ভাল না’। গোলমাল হলে মানুষ ঘরের বের হয় না। তার মত অন্য ভ্যান চালকের ভাড়া হয় না। তার আতঙ্ক জীবিকা নিয়ে।

রোববার যশোর কুষ্টিয়া মহাসড়কে এক বাসের যাত্রীদের মধ্যে প্রধান আলোচনা ছিল ঢাকার রাজনৈতিক ঘটনাবলি। তারা টেলিভিশনে দেখেছেন হাইকোর্ট প্রাঙ্গনের চিত্র। উকিলদের উপর পুলিশের জল কামান থেকে রঙ্গীন পানি ছিটানোর দৃশ্য। তা নিয়েও পক্ষে বিপক্ষে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। কেউ কেউ এ ঘটানার নিন্দাও করেন। বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে অবরোধ করে রাখা নিয়েও যাত্রীরা একে অপরের সঙ্গে মত বিনিময় করেন। তাদের প্রতিক্রিয়া এমন আচরণ করে ঠিক করেনি সরকার। আবার আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয় যাত্রীদের মধ্যে। তাদের কথা গ্রামের মানুষের মাঝে নির্বাচন নিয়ে কোন উৎসাহ নেই। প্রার্থীদের জোরেসোরে প্রচার প্রচারণা নেই। গ্রামের মানুষের কথা নির্বাচন তো হয়েইে গেছে। ১৫৪ আসনে সরকার ও তাদের সহযোগি দলের প্রার্থীরা জিতে বসে আছেন। এখন নির্বাচন নিয়ে খেলা চলছে। সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে যারা দাড়িয়েছেন তাদের অনেকেই মাঠ জমাতে পারছেন না। তাদের অলোচনায় আসে সাধারণ মানুষ এবার ভোট দিতে যাবে না।

কুষ্টিয়া জেলায় ৪টি আসনের মধ্যে কুস্টিয়া ২ আসনে (ভেড়ামার ও মিরপুর উপজেলা) জাসদ সভাপতি তখ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় নির্বাচিত হয়েছেন। কুস্টিয়া ৪ আসনে (কুমারখালী ও খোকসা উপজেলা) আওযামী লীগের প্রার্থী আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে নেমেছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সদর উদ্দিন খান। তিনি খোকসা উপজেলা চেয়ারম্যান। সতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছেন তিনি। যশোরের ৬টি আসনের মধ্যে দুটিতে আওযামী লীগ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকী ৪টির মধ্যে যশোর ২ আসনে (ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলা) আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে দাড়িয়েছেন। মানুষের মাঝে এ সব নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুরের বড় চাষি ইজাজুল ইসলাম বলেন, সাধারন মানুষের মাঝে আতঙ্ক হচ্ছে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা আরো বাড়বে কিনা। তিনি বলেন, বাড়ি থেকে শহরে বা অন্য স্থানে যেতে ভয় পাচ্ছে মানুষ। কখন বাসে বা টেম্পোতে বোমা হামলা হয়। আবার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি নিয়েও তাদের আতঙ্কের শেষ নেই।

মেহেপুর সদর উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক জরাফত আলি, মনোহরপুর গ্রামের ডাক্তার শফিউল ইসলাম ও কুলবাড়ে গ্রামের মাধ্যমিক স্কুল শ্ক্ষিক সুলতান আলি বলেন, দেশে অশান্তি থাকলে মানুষের কোন কাজে মন বসে না। আতংকে দিন কাটাচ্ছে মানুষ। এর চেয়েও আগামীতে বেশি কিছু ঘটে কিনা এমন শংকাও আছে তাদের মাঝে বলেন জানান তারা।

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে আলোচিত ও আতঙ্কের জনপদ সাতক্ষীরা জেলা। চলমান আন্দোলন কালে সরকার ও বিরোধী পক্ষের এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। আলাপ হয় সাতক্ষীরায় কর্মরত এক সাংবাদিকের সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি জানান, তারা স্বাধীন ভাবে কলম চালাতে ভয় পাচ্ছেন। সংবাদের গভীরে যেয়ে অনসন্ধানমূলক প্রতিবেদন করতে সাহস পাচ্ছেন না। একটু এদিক ওদিক হলেই আক্রান্তের আতঙ্ক সাংবাদিকদের মাঝে। কোন ভাবে গা বাঁচিয়ে কাজ করছেন সাংবাদিকরা। বাড়িঘরে আগুন, লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত ৭০ ৮০টি বাড়িঘরে আগুন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। জেলায় আনেক মানুষ আতংকে বাড়ি ছাড়া বলে জানান ওই সাংবাদিক।