Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ‘নির্বাচন’ নিয়ে চলচ্চিত্র – ‘সিক্রেট ব্যালট’

‘নির্বাচন’ নিয়ে চলচ্চিত্র – ‘সিক্রেট ব্যালট’

ফ্লোরা সরকার

secret-ballotএকদিনের গল্প। নির্বাচনের দিন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভোট গ্রহণ। ভোট গ্রহণ শেষ, ছবিও শেষ। কিন্তু ২০০১ সালে ইরানের চলচ্চিত্রকার বাবাক পায়ামি নির্মিত “সিক্রেট ব্যালট” ছবিটি দর্শককে তিনটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় . গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত বা ২. গণন্ত্রের পথে সংগ্রামরত বা ৩. আমজনতার কাছে গণতন্ত্র তাৎপর্যহীন একটি বিষয়। ছবিটি দেখার সময় এই তিনটি প্রত্যয়ের কোনটিতেই দর্শক কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেননা। অথচ একদিনের ভোট গ্রহণের মধ্যে দিয়ে পরিচালক বাবাক পায়ামি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নির্বাচন অর্থাৎ প্রতিনিধিত্বশীতার এই আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সাম্য অর্জন কতদূর পর্যন্ত প্রসারিত করা যায় বা আদৌ যায় কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শুধু তাই নয়, সাধারণ জনগণের কাছে এই গণতন্ত্র কতটুকু অর্থ বহন করে তারও নজির রেখে দেন ছবিটিতে। গণতন্ত্র যেহেতু একটি সুদূর প্রসারিত পথ, অধিকার আদায়ের একটি অনন্ত পথরেখা ছবিটি তাই শেষ হয়েও যেন শেষ হয়না। ছবি শেষ হয়ে যায় দর্শক স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন। বসে থাকেন আর ভাবেন। ভাবনার এই নানা দিক নিয়ে তাই ছবির আলোচনাও হয়ে ওঠে বর্তমান বাংলাদেশের এই সংকটপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।

ইরানের যেকোন ছবির সঙ্গে তথাকথিত ইউরোপ এবং হলিউডি ছবির প্রধান ব্যবধান হলো তার গতিময়তায়। কোন দৃশ্যের ওপর বা কোন শটের ওপর অন্য কোন দৃশ্য বা শট হুমড়ি খেয়ে পড়ে ছবির গতির দ্রুততা বৃদ্ধির কোনো ধরণের কোনো তাড়া এসব ছবিতে দেখা যায় না। ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যায় গল্পের বুনোট। অতি অভিনয়ের কোনো ছায়াবাজির খেলা খেলেননা অভিনয় শিল্পীরা। গণিতের মতো যেন মাপা অভিনয়। তাছাড়া এসব ছবিতে তথাকথিত মনুষ্য গ্ল্যামারের পরিবর্তে বেছে নেয়া হয় প্রাকৃতিক গ্ল্যামার। প্রকৃতি বা ভূদৃশ্যও যে কতটা আকর্ষণীয় হতে পারে তা ইরানের ছবিগুলো না দেখলে বোঝা যায়না। ছবির শুরুতে তাই দেখা যায় পর্দায় প্রতিফলিত বিশাল ভূদৃশ্যের এক কোণ থেকে একটি প্লেন উড়ে আসে। প্লেনের এই আগমন এতোটাই নৈশব্দপূর্ণ যে খুব নিপুণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য না করলে দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়।

ইরান থেকে বেশ দূরে একটি দ্বীপে নির্বাচনের দিনের শুরুটা এভাবেই আমরা হতে দেখি। সমুদ্রের ধারে সেনাবাহিনীর একজন সেনা (সাইরাস আবিদি) আর শহর থেকে ভোট গ্রহণ করতে আসা একজন নারী প্রিসাইডিং অফিসারকে (নাসিম আবিদি) কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত। ছবির কোথাও আমরা সেই সেনা বা নারীর কোন নাম আমরা দেখতে পাইনা। প্রয়োজনও পড়ে না। কেননা ছবির বিষয়বস্তুটাই এখানে মুখ্য। প্রথমেই দর্শক নড়ে ওঠে যখন সেই নারী সেনা কর্তাকে জানায় ভোট গ্রহণের জন্যে তাকে এখানে পাঠানো হয়েছে আর সেনা কর্তাটি বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কেননা তার ধারণা এসব কাজ শুধু পুরুষের। গণতন্ত্রের প্রথম হোঁচটটা পরিচালক যেন এর মধ্যে দিয়েই দেখিয়ে দিলেন। যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে এই ভোটের আয়োজন নারীপুরুষের ব্যবধানে সেটাই যেন প্রথম চোটে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে যেহেতু সেনাবাহিনী নিয়মনিষ্ঠার প্রতি শ্রদ্ধান্বিত সেনা কর্তাটিও তাই নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাই অবশেষে ব্যালট বাক্স এবং নারী অফিসারকে সঙ্গে করে গাড়ি নিয়ে বের হয় দ্বীপটির বাড়ি বাড়ি যেয়ে ভোট গ্রহণের উদ্দেশ্যে। সেনা কর্তাটিকে এখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল দ্বীপের চোরাচালানের ওপর নজরদারী করার লক্ষ্যে। পথে যেতে যেতে সেনাটি যখন জানতে চায় কোনো চোরাকারবারীর ভোট গ্রহণ হবে কিনা, উত্তরে নারীটি জানায় ভোট দেয়া সবার সমানাধিকার। বুঝতে অসুবিধা হয়না বেশ প্রহসনমূলক একটি বিষয়ের অবতারণা এখানে করা হয়েছে। নিরীহ সেনাটি সেটাই মেনে নেয়। তাই ছবির আরো একটু পরে যখন স্বামী পরিত্যক্তা আরেক নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে, সেনাটি মনে করে তার স্বামী সংক্রান্ত জটিলতা নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে সমাধানযোগ্য। কিন্তু নারী অফিসারটি জানায় – “জীবনের সব সমস্যার সমাধান শুধু ভোট দিয়ে হয়না।” ছোট এই বাক্যে আমরা বুঝে নেই নির্বাচনই শুধু গণতন্ত্র না। তার পরিসর বিশাল। এভাবেই শুরু হয় তাদের গণতন্ত্রের পথে যাত্রা।

সাধারণ মানুষ নির্বাচনের প্রশ্নে কতটা অজ্ঞ ছোট একটা দৃশ্যে আমরা লক্ষ্য করি। একটি জায়গায় একজন লোক ট্রাকে করে বেশকিছু নারীদের নিয়ে আসে ভোট দেয়ার জন্যে। ব্যালট পেপার বের করলে লোকটি জানায় সবার ভোট সে একাই দেবে। কেননা প্রার্থীদের ওই নারীরা চেনেননা। নারী অফিসার তাকে বুঝিয়ে বলে তা সম্ভব নয়। একটি ভোট কেবল একজনের। নারীরা যার যার ভোট দেন। অচেনা প্রার্থী বেছে নেয়ার গণতান্ত্রিক এই রীতি আমাদের আবার গণতন্ত্রের প্রতি প্রশ্নবিদ্ধ করে। শুধু তাই না, আরেকটি জায়গায় দেখা যায়, একজন বয়োজেষ্ঠ গ্র্যানি বাগহু তার স্ত্রীকে ঘরের বাইরে এসে ভোট দিতে অপারগতা জানায়। স্ত্রীটি শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে পারেনা। এই বিষয়টি নিয়ে পরে সেনা কর্তাটি নারী অফিসারকে প্রশ্ন তোলে – ‘সারাদিন তুমি ভোট ভোট বলে এতো আগ্রহ দেখালে আর গ্র্যানির বউয়ের ভোটটা নিলে না?’ উত্তরে নারীটি বলে – ‘সেই বউয়ের দেখভাল করার জন্যে গ্র্যানি আছে। তার কোনো প্রতিনিধির দরকার নেই।’ সোলার এনার্জির এক কর্মীকে দেখা যায় ভোটের প্রতি নিদারুণ অনীহা। তাকে যখন বোঝানো হয় নির্বাচন অত্যন্ত উপকারি একটা ব্যবস্থা, ভোটের পর নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সে তার সোলার এনার্জির প্রকল্পের আরো উন্নয়ন ঘটাতে পারবে উত্তরে বৃদ্ধটি বলেন – “ওই যে সূর্যটা দেখেছো? আল্লাহর এই দানের কোনো পরিবর্তন কখনো হয়না। আল্লাহই আমার প্রতিনিধি, ভোট দিলে তাকেই দেবো।” যাক, শেষ পর্যন্ত তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ভোট গ্রহণের সব থেকে উল্লেখযোগ্য জায়গা ছিলো কবরস্থান। যখন খবর আসে কিছুক্ষণ আগে একজন নারী বিধবা হয়েছে এবং দ্বীপের অনেকে কবরস্থানে আছেন, একসঙ্গে অনেক ভোট নেয়ার জন্যে নারী অফিসার সেখানে ছুটে যায়। ভোট দিতে অনিচ্ছুক সদ্য বিধবা মেয়েটিকে অনুনয়বিনয় করে বলা হয় – “তোমার একটা ব্যালট তোমার জন্যেই কতটা গুরুত্বপূর্ণ তুমি জানোনা। তুমি কি চাও না তোমার অধিকারের কথা সবাই শুনুক?” উত্তরে বিধবা বলে ওঠে – “আমার তো কবরস্থানেই যাবার অধিকার নেই।” সেই নারী অফিসার যেমন এই কথার কোনো উত্তর দিতে পারেনা, উত্তর খুঁজে পাননা দর্শকও। নির্বাচন নামক এই প্রহসনের জন্যেই বোধকরি সেই সেনাকর্তা ভোট শেষে ফেরার পথে জিজ্ঞেস করে – “আচ্ছা এরপর কবে আবার নির্বাচন হবে?” উত্তরে নারী বলে – “চার বছর পর।” সেনাকর্তা – “কেনো? বছরে চার বা পাঁচবার নির্বাচন হতে পারেনা?। অসাধারণ এই প্রশ্নটি শুধু ইরানী দর্শকদের নয় সব দর্শককে হতভম্ব করে, লজ্জিত করে। স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দেয়া, নির্বাচন মানেই অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়। গণতন্ত্রের সংকটাকীর্ণ পথের মতোই নির্বাচনের পথ। ছবির একেবারে শেষে পরিচালক তাই ভোট গ্রহণের মর্মার্থ বুঝিয়ে দেন সেই সেনা কর্তার ভোট গ্রহণের মধ্যে দিয়ে। ভোট গ্রহণ শেষে (যদিও ছবিতে দেখা যায় বেশির ভোটই থাকে ভোটবিহীন) নারী অফিসার যখন সেনা কর্তাকে ব্যালট পেপার দিয়ে বলে, দশজন প্রার্থীর মধ্যে দুজনের নাম লিখে দিতে এবং সেনাকর্তা শুধু সেই অফিসারের নাম লিখে দেয় তখন বিস্মিত নারী প্রশ্ন করে সে তো প্রার্থী নয়, তাহলে কেনো তাকে ভোট দেয়া হলো? উত্তরে সেনা বলে – “সারাদিন তোমাকে দেখেছি, আমি তো শুধু তোমাকেই চিনি, আর কাউকে না।” সেনা কর্তার এই সহজ সরল উত্তর আমাদের বুঝিয়ে দেয়, নির্বাচিত প্রতিনিধি বেছে নেয়ার জন্যে রাজনীতিতে অর্থবিত্ত, ছলচাতুরি কোনকিছুর প্রয়োজন পড়েনা। প্রয়োজন পড়ে শুধু একজন ‘মানুষ’ নামক প্রাণীর, যা সেই সেনা কর্তা সেই নারীর ভেতর খুঁজে পেয়েছিলো।

যে মনুষ্যত্বের অভাবের কারণে আমাদের দেশে এখন গণতন্ত্র দূরে থাক নির্বাচন ব্যবস্থা পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। ‘নিরপেক্ষ’ ‘নিদর্লীয়’ ‘সর্বদলীয়’ এসব আজ শুধু শব্দ ছাড়া আর কিছু নয়। আইরিশ মারডক ছবির সেই ‘শিক্ষা” শব্দের মতো তা হয়ে উঠেছে, ‘ক্ষমতাক্ষমতাক্ষমতা’ এবং ক্ষমতাই একমাত্র আর শেষতম শব্দ ও বাস্তবতা। দলের সুবিধা, নেতার সুবিধাই আজ বাস্তবতা। নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে অধিকার আদায় নয় অধিকার আত্মসাতের এক যজ্ঞ যেন শুরু করা হয়েছে। সুবিধাবাদীর এই রাজনীতি শুরু হয়েছিলো আমাদেরই ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটিশের হাত ধরে। গত ১১ ডিসেম্বর, ২০১৩, ‘আমাদের বুধবার’ এ অধ্যাপক কে.এন.পানিক্করের একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। সেখানে পানিক্কর বার্নাড শ’র একটি চমৎকার উদ্ধৃতি তুলে ধরেন – “এর মতে ব্রিটিশরা নিয়মনীতির প্রতি মোহাবিষ্ট। এমনকি নীতিহীনতার মধ্যেও তারা কোনো না কোনো একটা নীতি আবিষ্কার করে ফেলে। নিজেদের দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাতি অর্জনকারী স্বৈরশাসক একজন রাজার পক্ষেও যেমন দাঁড়াতে পারে। একইভাবে, পরিস্থিতি দাবি করলে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে থেকে সেই রাজার জন্যে অনুমোদন আদায় করতেও দ্বিধা করেনা তারা। সেই রাজাকেই আবার হত্যা করার প্রয়োজন দেখা দিলে গণতন্ত্রের নীতি নামক নতুন নীতির দ্বারস্থ হয়ে আগেকার সেই দেশপ্রেমের নীতিকে তারা বিসর্জন দিতে পারে অবলীলায়। ব্রিটিশের নীতি বলতে বার্নাড শ আসলে যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো সুবিধাবাদীর নীতি।” বর্তমান বাংলাদেশে আমরা কি ঠিক একই রকম সুবিধাবাদীর নীতি অনুসরণ করছি না? আর করবোই বা না কেনো? আমরা তো তাদেরই উত্তরসূরী। ব্রিটিশ যা শিখিয়ে গেছে, পড়িয়ে গেছে কায়মনোবাক্যে আজও তার সাধনা করে যাচ্ছি। অনেককে আজকাল কথায় কথায় ‘ওয়েস্টমিনিস্টার’ আদলের পার্লামেন্টের ভুয়সী প্রশংসা বাণী ছুড়তে দেখি। আবার অন্যদিকে যখন যেভাবে খুশি সংবিধান প্রণয়ন করি আবার নিজের তৈরি সংবিধান নিজেই লঙ্ঘন করি। এ যেন বিপিন চন্দ্র পাল কথিত বারান্দায় ঝুলানো বিদেশী টবে গঠিত অর্কিডের ব্যক্তিত্বের মতো, না মাটি স্পর্শ করতে পারে, না আকাশ ছুঁয়ে যেতে পারে। চোখের সামনে কত অবলীলায় এক তরফা নির্বাচন হতে দেখেও না দেখার ভান করছি এখন আমরা। রাত জেগে জেগে “বাক স্বাধীনতার” নামে টিভির টক’শোগুলোতে ব্যর্থ আস্ফালন করে যাচ্ছি। এই আস্ফালন আমাদের ‘সিক্রেট ব্যালট’ ছবির শুধু একটি অনুভূতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, যে বোধ ছবি শেষ হবার পর তা দর্শকের মনে অনুরণিত হয়ে চলে – “নারী অফিসারটি ব্যালট বাক্স নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যতই ছুটে চলে ‘গণতন্ত্র’ নামক সোনার হরিণটি যেন ততই অধরা হতে থাকে”। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তথাকথিত ইলেকশনেও যখন এই ব্যালট বাক্সের ছুটোছুটি চলবে তখনও কি একই বোধ কাজ করবে না আমাদের ভেতর?