Home » রাজনীতি » ‘রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না’

‘রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না’

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

biswajeet-murder-1এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না/এই বিস্তীর্ন শ্মশান আমার দেশ না/এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না ……(এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না কবি নবারুন ভট্টাচার্য)

মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ পার করলো ৩৬৪ দিনের একটি বছর। একাত্তরের নয় মাসের পরে গত বিয়াল্লিশ বছরে বাংলাদেশ আর কখনই এমন মৃত্যুর উপত্যকা হয়ে ওঠেনি। আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাচ্ছে শরীর, হাজার টন কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ছে মানুষ, বুলেটে বিদীর্ন হয়ে যাচ্ছে বুক, ধারালো অস্ত্রে গলা ফাঁক হয়ে জবাই হয়ে যাচ্ছেএরা সবাই মানুষ, অতি সাধারন খেটে খাওয়া শ্রমজীবি মানুষ। এসব মানুষের দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর অন্তিম শবযাত্রা কাঁধে নিয়ে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে গেছে স্থানুবৎ, নিশ্চলস্থবির। চিৎকার করে, গলা ফাটিয়ে নবারুন ভট্টাচার্য’র কবিতায় বলতে ইচ্ছে করছেঃ যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়/আমি তাকে ঘৃনা করি/যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে/আমি তাকে ঘৃনা করি/যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবি কবি ও কেরানী/প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায় না/আমি তাকে ঘৃনা করি………. আমি উন্মাদ হয়ে যাব/আত্মহত্যা করব/যা ইচ্ছে হয় করব।……..

২০১৩ সালের পুরোটা জুড়ে রয়েছে চরমতম হিংসাহানাহানিখুনোখুনি আর প্রতিশোধের রাজনীতি। প্রয়াত: নির্মল সেন, আপনার আত্মার কাছে ক্ষমা চাই, বেঁচে থাকলে কি বলতেন আপনি, স্বাভাবিক মৃত্যুর কোন গ্যারান্টি এখন, এই বাংলাদেশের কোথাও কি আছে? মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে প্রতিদিন অজস্র নামপরিচয়ঠিকানাবিহীন লাশ। ওরা কেউ রাজনীতিক নয়, আমলা কিংবা কোন বাহিনীর কর্তা ব্যক্তি নয় অথবা নয় কোন সুশীল সমাজের কেউ। সাধারনঅতি সাধারন নারীপুরুষশিশুরপ্রৌঢ়বৃদ্ধ, বাদ পড়ছে না কেউই। যে হিসেব জানা যাচ্ছে তাতে গেল বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা আর কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে ২ হাজার ৪৬৬ জনের।

সহিংস রাজনীতি, বিপন্ন জীবনদেশের রাজনীতি দিনে দিনে সকল মানবিক চেহারা অপসৃত করে নির্দয় আর হিংস্র চেহারা নিয়েছে। শুধু কাগজেকলমে মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে এই হিংস্রতা বোঝানো যাবে না। বরং কিভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে তার একটি খতিয়ান বের করলে এই হিংস্রতার খানিকটা বোঝা যাবে। পিটিয়েকুপিয়েগুলি করে খুনের সাথে এখন যোগ হয়েছে জ্যান্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা। পোড়া শরীর নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর চেয়েও অধিক যন্ত্রনা ভোগ করছেন চিকিৎসাধীন মানুষগুলো। ক্ষমতালিপ্সু হত্যার দায়ে অভিযুক্ত রাজনীতিকদের অভিসম্পাত করা ছাড়া আর কিছুই তাদের করার নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন ৪৯২ জন। ৮১৯ টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তাতে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২২ হাজার মানুষ। আর এর মধ্যে আগুনে পুড়ে যাওয়া ৯৪ জনের মধ্যে মারা গেছেন ২১ জন। রাজনৈতিক সংঘাতে সবশেষ প্রানহানির ঘটনা ঘটেছিল ২০০১ সালে। সে বছর মারা গিয়েছিল ৫’শ জন, আর গত গণতান্ত্রিক ২২ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছে অন্তত: আড়াই হাজার।

রানা প্লাজা ধ্বসে একদিনে মানব মৃত্যুর সব পরিসংখ্যানই ছাপিয়ে দিয়েছে। গত ২৪ এপ্রিল সাভারে ৯ তলা নড়বড়ে এই ভবনটি ধ্বসে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে ১ হাজার ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। ঐ ভবনে ৫ টি পোষাক কারখানার প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিল। এখনও দুই শতাধিক শ্রমিকের ভাগ্যে কি ঘটেছে, তাদের আত্মীয়স্বজনরা তা জানতে পারেনি। মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ ইন্সষ্টিটিউট অব লেবার ষ্ট্রাডিজের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, রানা প্লাজা’র দুর্ঘটনা বাদ দিলে বছরের প্রথম ৬ মাসেই সহিংসতা ও দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৫০২ জন।

আমাাদের প্রধানমন্ত্রী অথবা বিরোধী দলীয় নেতা এই মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে গোটা দেশকে অবরুদ্ধ করে রাখবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছেন। গত ২৫ নভেম্বর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে ৩০ দিনের মধ্যে সারাদেশে অবরোধ কর্মসূচি চলেছে ২৪ দিন। এই দিনগুলোতে অন্তত:পক্ষে ১২০ জন সাধারন মানুষ সহিংসতায় প্রান হারিয়েছেন। রাজপথরেলপথে বিনষ্ট হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। শত শত বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন।

এরপরে বিরোধী দলীয় নেতা ঢাকা অভিমুখে মার্চ টু ডেমোক্রেসির ঘোষণা দেন, তখন সরকারই পুনরায় অবরুদ্ধ করে ফেলে গোটা দেশকে। কোন স্বাধীন দেশে ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতিকরা সাধারন মানুষকে এরকম অবরুদ্ধ করে ফেলে, এরকম নজির পৃথিবীর অন্য কোন দেশে পাওয়া যাবে না। বিরোধী দলীয় নেতাকে বাড়ির সামনে অজস্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং বালির ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলো ক্ষমতাসীনরা। প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দল এর মধ্য দিয়ে কোথায় পৌঁছাতে চাচ্ছেন এই প্রশ্নটি করার অধিকার নিশ্চয়ই জনগনের আছে। তারা কি এভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচনসবকিছুই কি বদলে দেবেন?

আমাদের রাজনীতি থেকে উদার, বহুমুখী গণতান্ত্রিক চেহারা বিদায় করে দেয়া হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল এখন চরম ক্রুদ্ধ এবং ক্ষুব্দ চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছে তাদের প্রতিপক্ষ দমনে। ফলে শান্তির আশা সূদুর পরাহত হয়ে যাচ্ছে। যেটুকু এগিয়ে ছিল আমাদের অর্থনীতি তা পাল্লা দিয়ে পিছিয়ে পড়ছে। সমাজে বিভাজন এখন চরমে। ক্ষমতাসীনদের চরিত্রে উদার নৈতিকতার বদলে ভর করেছে কঠোরতা, চরম পন্থা ও একদর্শিতা। দলের সামগ্রিক ভার পড়েছে একক ব্যক্তির হাতে। ফলে তার ইচ্ছায় এখন গোটা দলের ইচ্ছে হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই অবস্থা বিরোধী দলের ক্ষেত্রেও। ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথ অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে।

একটি একক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য এতোটাই বেপরোয়া যে, কোন যুক্তি, পরামর্শ, ভালমন্দ, কোনকিছুই বিবেচনায় নিতে রাজি হচ্ছে না। স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসটি তারা বদলে দিতে চাইছে। ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়াটি চালু ছিল তা একেবারেই ভেঙ্গেচুরে পড়ছে। এরকম একটি একক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার ক্ষমতাসীন থাকতে চাইলে, স্বল্পমেয়াদী সরকার গঠন করলেআশংকা রয়েছে সেই সরকার হয়ে উঠবে একেবারেই স্বৈরতান্ত্রিক। এটি মনে করার কোন কারন নেই যে, এর ফলে রাজনীতি থেকে সহিংসতা বিদায় নেবে। আরো আশংকা রয়েছে, জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি গোষ্ঠিগুলির হিংস্র আক্রমনের। সরকারের দমন নীতির মুখে জঙ্গিবাদের জোশ বেড়ে যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। পৃথিবীতে এরকম নজির নেই যে, নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় আক্রমনের মুখে জঙ্গি তৎপরতা কমে গেছে। একমাত্র সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক চর্চা জঙ্গিবাদকে প্রতিহত করতে পেরেছে।

আমাদের রাজনীতিবিদরা ভুলেই গেছেন, গণতান্ত্রিক সমাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, হোক না সেটি নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রঐক্য হচ্ছে সেখানে সবচেয়ে বড় সূচক। বিভিন্ন মত, পথ, চিন্তাধারার মানুষের ঐক্য। বাংলাদেশে বিগত বছরগুলিতে রাজনীতি ও সমাজ বিভেদের বিষে নীল হয়ে আছে। সে কারনে ক্ষমতাসীনদের জন্য সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জটি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তাদের দন্ড কার্যকর করা, সেটি বিভেদের কারনে জাতীয় জীবনে ভয়াবহ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এর জন্য যে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির মধ্যে ঐক্যমত্য প্রয়োজন ছিল, শুরু থেকে ক্ষমতাসীনরা সে বিষয়ে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। গত বিয়াল্লিশ বছরে দেশেবিদেশে শক্তিমান জামায়াত এই বিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পরে বোঝা গেছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রস্তুতি মোটেই ছিল না। বিরোধী দলকে আস্থায় না এনে চরম শত্রু হবার সুযোগ উস্কে দিয়েছে সরকার। ফলে যে অনিশ্চিত ভবিষ্যত যাত্রায় ৫ জানুয়ারির একক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার সামিল হলো, কিংবা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে কর্তৃত্ববাদী যে শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, তার কি পরিনাম ঘটবে আগামী ইতিহাস সেটি নির্ধারন করে দেবে।।