Home » রাজনীতি » একদলীয় শাসন কায়েম

একদলীয় শাসন কায়েম

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoons-27এক. দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার পরে গণভবনের সবুজ লনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাস্যোজ্বল, তৃপ্ত প্রধানমন্ত্রীকে দেখে যে কারো মনে হতে পারে সেই মূহুর্তে তাঁর চেয়ে সুখী মানুষ এই ভূবনে বোধকরি আর কেউ নেই। এটা এমনই একটি মূহুর্ত যখন শত শত পরিবার খোলা আকাশের নিচে পৌষের প্রবল শীত আর ভোটযুদ্ধের প্রচন্ড আতঙ্কে ধরধর কাঁপছে। চারদিকে রক্ত, লাশ ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। বসতবাড়ি, স্কুলকলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যানবাহন পুড়ে খাঁক হয়ে যাচ্ছে। ভোটকেন্দ্রে মানুষ নেই, ব্যালট বাক্স প্রায় ফাঁকা, প্রচন্ড কুয়াশার মাঝে উকিঝুকি মারা অপার্থিব একটি দিনে একক, প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে জয়ী হওয়া দলের প্রধান এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে উল্লাসিত তা দেখে মনে হতেই পারেকোনকিছুই আর তাঁকে স্পর্শ করতে পারছে না। ক্ষমতার নেশা ও মদমত্ততায় তিনি অবশেষে নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রকে একটি প্রহসনে পরিনত করতে সক্ষম হয়েছেন।

একটি বিষয়ে সকলেই একমত হবেন যে, সহিংসতা, বিরোধিতা, বলপ্রয়োগ, পর্যবেক্ষক শূন্য এ নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সবচেয়ে নিুমানের অরুচিকর নির্বাচনে পর্যবসিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক যাত্রা আঁতুড়েই রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল বাকশাল নামক একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। সেই একই দলের হাতে ৩৮ বছর পরে নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রের ধারাটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে চূড়ান্ত প্রহসনে পরিনত হল। ৫ জানুয়ারী নির্বাচন হতে হবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারনে, এ কথাটি কি পুরোপুরি ঠিক? সবদলের অংশগ্রহন নিশ্চিত করার জন্য সুপ্রীম কোর্টের সবশেষ নির্দেশনা বিবেচনায় রেখে নির্বাচনী তফসিল পুন:বিন্যাস করতে পারত অথবা জরুরী ভিত্তিতে সংসদ অধিবেশন ডেকে সংশোধনীর ব্যবস্থা করতে পারত। এসব কিছুই করেনি আওয়ামী লীগ। কারন, প্রথম থেকেই তারা চেয়েছে প্রধান বিরোধী দলবিহীন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে।

২০০৯ সালে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে যে সরকার গঠন করেছিলেন শেখ হাসিনা, তার শক্তি ছিল ভোটের জয়। আর সেই ভোটকেই ভয় পেতে শুরু করেছিলেন তিনি তার ক্ষমতার শেষ মেয়াদে। নিরঙ্কুশ জয় পাঁচ বছর মেয়াদ শেষে এনেছে ভয়কে। ভয় দিয়েই সরকার জয় করেছে আরেকটি নির্বাচন। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভয় আরো বাড়বে। শেখ হাসিনা’র ভয়ের ভোট দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপাতত: জয় এনে দিয়েছে। প্রায় ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে কত সংখ্যক ভোটার অংশ নিয়েছে তার সঠিক হিসেব এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন জানাতে পারেনি। তবে এনজিওদের নিয়ে গঠিত ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে জানিয়েছে এর হার কমবেশি ৩০ শতাংশ। কিন্তু তাতে কি! এক্ষেত্রেও সংবিধানের ধোহাই দিয়ে উতরানো যাবে। কারন আমাদের সংবিধানের কোথাও বলা নেই, কত শতাংশ ভোটার উপস্থিত হলে নির্বাচন বৈধ বা অবৈধ হবে। কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে, এরকম একটি ভোট থেকে সরকার কি অর্জন করতে চাইছে? এই ভোট শেখ হাসিনাকে জয় এনে দিলেও পরাজিত হয়েছে দেশজনগন আর নির্বাচনমুখী গনতন্ত্রের ধারাবাহিকতা।

দুই. নির্বাচনের পরে, এই মূহুর্তে আমাদের আশংকাটি ভিন্ন জায়গায়। গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে নতুন সরকার গঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যটি এই আশংকাটি তৈরী করেছে। টেলিভিশনে শোনা বক্তব্যটি ছিল মোটামুটি এরকমঃ আমরা সকলকে নিয়ে সরকার গঠন করতে চাই। এখানে সকলেই অংশগ্রহন করতে পারবেন। আমরা সকলে মিলে দেশের উন্নয়ন করতে চাই। অবশ্য বিরোধী দলও তো থাকতে হবে। আমাদের গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী অবশ্য শব্দটি জুড়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন, তার সরকারকে বিরোধিতা করার জন্য একটি বিরোধী দল থাকতে পাকতে পারে। কারন, তার রয়েছে মহামহাজোট। ফলে একটি গৃহপালিত বিরোধী দল তার হাতের কাছেই রয়েছে। জাতীয় পার্টি নামে এই দলটির সাথে আসন ভাগাভাগি করে তিনি পূর্বাহ্নে এ ধারনাটি তৈরী করে দিয়েছেন যে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে একটি বিরোধী দল থাকলেও থাকতে পারে। তার আভাসও ইতিমধ্যে মিলেছে জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ, যিনি নাকি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত, তিনিই হচ্ছেন বিরোধী দলের নেতা।

সুতরাং যে আশংকাটির কথা বলছিলাম, সেটি হচ্ছে দেশের একটি একক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে নাম কা ওয়াস্তে একটি বিরোধী দলের অস্তিত্ব থাকবে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা হয়তো বাকশালের মত একদলীয় সরকার গঠন করছেন না কিন্তু সেই আদলেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে একদলীয় শাসন কায়েম করতে যাচ্ছেন মনে করে আশংকাটি জাগছে। আজকে এটি মনে করার যথেষ্ট কারন রয়েছে যে, মহাজোটের শরিক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, এমনকি সংসদীয় কমিটির সুপারিশকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছে শেখ হাসিনা পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করিয়েছিলেন এরকম একটি একক নির্বাচন করার জন্য। তিনি স্পষ্টত: জানতেন, এরকম নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না এবং নির্বাচন ঠেকানোর ক্ষমতাও বিএনপি’র নেই। সুতরাং যত সহিংসতা, প্রানহানি ঘটুক না কেন নির্বাচন তিনি করেই ছাড়বেন এবং করেছেনও। এ কাজে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা বশংবদ এবং প্রায় অর্থব একটি নির্বাচন কমিশন।

তিন. ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত বিরোধী দল হিসেবে জনআকাঙ্খার প্রতিফলন হিসেবে সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারার ক্ষমাহীন ব্যর্থতা একটি দুর্নীতিবাজ ও জনবিচ্ছিন্ন সরকারকে এ ধরনের একটি নির্বাচন করার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে, একথা বললে মোটেই ভুল হবে না। বিএনপিার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে তত্বাবধায়ক সরকারের জনআকাঙ্খিত দাবির প্রতি জনগনকে সংগঠিত না করে একটি সংগঠিত অপরাধী দলকে সাথে নিয়ে চরম হিসাংত্মক ও সন্ত্রাসী আন্দোলন গড়ে তুলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে তারা হয় গ্রেফতার হয়ে নয়তো আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়ে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে দেশজুড়ে। অন্যদিকে, পঞ্চদশ সংশোধনী পাশের পরে আগামী তত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কি হবে, এটিও তারা পরিস্কার করতে সক্ষম হননি। যেমনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান জাতির কাছে কখনই পরিস্কার করতে পারেনি। ফলে আওয়ামী লীগ এই সুযোগটি নিয়েছে, তারা প্রচার করেছে বিএনপি মূলত: নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না, তাদের আন্দোলন হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করার জন্য। এ কারনে নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন নাকি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর আন্দোলনআওয়ামী লীগ এটি গুলিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

এরকম একটি পরিস্থিতির দায় দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিকে অনিবার্যভাবেই বহন করতে হবে। নির্বাচনের পরপরই এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, খালেদা জিয়ার বিবৃতি এবং তদীয় পুত্র তারেক রহমানের ভিডিও বার্তার মধ্য দিয়ে। খালেদা জিয়া জানাচ্ছেন, তিনি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত তবে এ নির্বাচন অবশ্যই বাতিল করতে হবে। অন্যদিকে, তারেক জিয়া লন্ডনে সংবাদ সম্মেলনে জানাচ্ছেন এই সরকারের সাথে আর কোন আলোচনা নয়। আন্দোলনের মাধ্যমেই এই সরকারের পতন ঘটাতে হবে। বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং তাঁর মহাক্ষমতাধর পুত্রের পরস্পরবিরোধী এরকম বক্তব্য এবং নেপথ্যে থেকে দলের নীতি নির্ধারনের ক্ষেত্রে তার অপরিসীম প্রভাবের ব্যাপারে জনগনকে পরিস্কার করতে হবে। অন্যথায়, আশংকা রয়েছে যে দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এ বিয়য়টি মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে।

চার. বাংলাদেশে যে কোন নির্বাচন বা বড় কোন ঘটনার পরে সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্ঠি আক্রান্ত হয়ে পড়ে। গত কয়েক মাসে সহিংসতায় বিচ্ছিন্নভাবে আক্রান্ত হওয়ার পরে সংখ্যালঘুদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদেরকে ঘরছাড়া করা হচ্ছে। এরকম সচিত্র টেলি প্রতিবেদন আমরা দেখতে পাচ্ছি। দিনাজপুর, যশোরের মনিরামপুর ও অভয়নগরে শতশত হিন্দু পরিবার এখন আক্রান্ত। বলা হচ্ছে, জামায়াতশিবির ও বিএনপির ক্যাডাররা এসব হামলার জন্য দায়ী। এটি ধরেই নেয়া হয়েছিল যে, ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন ১৮ দলীয় জোটের প্রতিরোধের মুখে হবে সহিংস এবং রক্তাক্ত। এটি বিষ্ময়ের ব্যাপার যে, ভোটদানে আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন কমিশন বা সরকার নাগরিকদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা বা তাদের রক্ষার জন্য ব্যাবস্থা নেয়নি, কিংবা আক্রান্ত হওয়ার পরেও ব্যাবস্থা নিতে দেরী করছেন।

এটি এমনই একটি সময়ে ঘটছে, যখন নাকি আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক সহকারী মাহবুবুল আলম হানিফ এবং সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য জামায়াতশিবিরকে ভাল করার দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন জামায়াতের রোকনের দিকে, তার ভাষায় ঐ রোকন ভুল বুঝতে পেরে ভাল হয়ে গেছে। তাকে তুলনা করতে শুনেছি, ১৯৯৬ মেয়াদকালে আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে চরমপন্থীসন্ত্রাসীদের আত্মসমর্পন করিয়ে ভাল বানিয়ে দিয়েছিল, সেভাবেই জামায়াতের যারা ভুল বুঝতে পারবে তাদেরকে গ্রহন করা হবে। অন্যদিকে, সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতকে ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহনে আলোচনায় বসার আহ্বান জানাচ্ছেন বিরোধী দলীয় নেত্রীকে। স্ববিরোধিতার এই নমুনা দেখে জনগন একসময় সত্যিটা জেনে যাবে যে বিএনপি থেকে জামায়াতকে ছুটিয়ে আনার জন্য আওয়ামী লীগের প্রানান্তকর চেষ্টাই ছিল অপরাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। সে কারনে অচিরেই এই বিভ্রান্তি দুর করতে দলীয়ভাবে শেখ হাসিনা কি ব্যবস্থা নেন তা দেখার জন্য জনগনের কৌতুহল থাকবে।

পাঁচ. বাংলাদেশ এখন যে পথে আছে, সেটি রক্তাক্ত ও সহিংস। সে পথ ধ্বংসাত্মক। এর ফলে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ক্রোধ, জিঘাংসা, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধ পরায়নতা ছড়িয়ে পড়ছে। দেশের একটি জনগোষ্ঠি এরসাথে জড়িয়ে পড়ছে এবং মূল শিকার হচ্ছে দেশের সাধারন জনগন। এর বিপরীতে রাষ্ট্র সর্বশক্তি দিয়ে বল প্রয়োগের নীতি গ্রহন করেছে। ফলে ন্যায়অন্যায়বোধ ভেসে যাচ্ছে ক্ষমতার দম্ভে। অন্যদিকে বিপরীত পক্ষ সহিংসতার মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। দলভাবাপন্ন এবং দলীয় নির্দেশে ব্যবহৃত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগনের প্রয়োজনে সাড়া দিতে না পারলেও দলীয় প্রয়োজনে একের পর এক অঘটন ঘটাচ্ছে। সত্তর দশকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের একদলীয় শাসনকে মডেল ধরে নিলে ভবিষ্যত বিবেচনায় একটি জিনিষ পরিস্কার হয়ে যাবে যে, কি বিপদজনক পথেই না হাঁটছে বাংলাদেশ!