Home » রাজনীতি » নির্বাচনের আসল ফলাফল :: দমন-পীড়ন নির্যাতনের পথে সরকার

নির্বাচনের আসল ফলাফল :: দমন-পীড়ন নির্যাতনের পথে সরকার

আবীর হাসান

political-cartoons-45৫ জানুয়ারি নির্বাচন হল। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন হয়নি হয়েছে প্রহসন। কারণ ভোটার ছিল না। তবে ঘটনার যা ফল তাহচ্ছে, নতুন এক ভয়ঙ্কর উপজাতির উদ্ভব ঘটেছে বাংলাদেশে, যার নাম আওয়ামী লীগ। কোন বড় জাতির ভেতর থেকে উপজাতির জন্ম বা উদ্ভব ঘটার প্রধান লক্ষণ হচ্ছে পিছিয়ে পড়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জেদের ফসল ৫ জানুয়ারির নির্বাচন মারাত্মকভাবে আওয়ামী লীগকে বুঝিয়ে দিয়েছে জনসাধারণের বড় অংশটাই তাদের সঙ্গে নেই। কারণ পিছিয়ে পড়া দঙ্গলের সঙ্গে মানুষ থাকে না। মানুষ থাকে না কথা বরখেলাপকারী এবং প্রতারকদের সঙ্গেও। নির্বাচনের আগের কথাগুলোর তালিকা লম্বা বলে বাদ দিলেও নির্বাচনের দিনে এবং পরে বলা কথাগুলোর যদি একটা তালিকা করা যায় তাহলে দেখা যাবে একজনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য আওয়ামী লীগের ভেতরের একটা গোষ্ঠী জনসাধারণের সঙ্গে লাগাতার প্রতারণা করে গেছেন এবং খুবই সঙ্গত কারণে মনে হয় ওই সব নেতা নিজেদের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। কারণ তারা জানতেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই রাজনৈতিক বিভেদের মীমাংসা করা যেতো, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন না করে ২৪ জানুয়ারি মধ্যে যে কোনো দিন করা যেতো। ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা। জনগণ ভোট দিয়েছে গণতন্ত্রের ধারা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য।

প্রথমত. নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, জনগণ নির্বিঘেœ ভোট দিয়েছে। দ্বিতীয়ত. ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করতে না পারলে ২৪ জানুয়ারির পর কী হতো বলা যায় না। তৃতীয়ত. জনসাধারণ বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এই কথাগুলো যে সঠিক নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আওয়ামী লীগের বা শেখ হাসিনার ভোট দেয়ার আহ্বান না মেনে জনগণ বর্জন করেছে একনায়কত্ববাদী, স্বৈরাচারী সরকারকে। ক্ষমতাসীনরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন সেটা হলো যে আন্দোলনে গণসম্পৃক্ততা নেই সে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থান হয় না। এর উল্টো পিঠে কিন্তু বলা যায়, যে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিত হয় না সে নির্বাচনকে বৈধ বা গ্রহণযোগ্য বলা যায় না।

ভোটের দিনে ক্ষমতাসীনরা আরো বলেছে, শীতের জন্য নাকি মানুষ ভোট দিতে যেতে পারছে না বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাবে। কিন্তু বেলা তো বাড়ল, ভোটাররা গেল না। যারা টেলিভিশনে লাইভ টেলিকাস্ট দেখেছিলেন তারা জানেন, ভোটাররা যে এতো কম সংখ্যায় ভোট কেন্দ্রে গেছে সে তথ্য দিতে রিটার্নিং অফিসাররা বিব্রতবোধ করেছেন টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে। ভোটের মাঝপথে অর্থাৎ দুপুরের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার সত্যি কথাটা বলেছিলেন, বিরোধী দল না থাকায় ভোটার উপস্থিতি কম হয়েছে।

এই সত্যটাই আওয়ামী লীগ নেতারা মানেননি। কারণ তারাও জানেন তাদের নেতা শেখ হাসিনার জেদ বজায় রাখতে গিয়েই আজ তাদের এই হাল। শেখ হাসিনা মনে করেছিলেন নির্বাচন দিলে বিরোধী দলও ঠিকই আসবে এবং জনগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেবে। তার কাছে হয়তো মনে হয়েছিল স্থানীয় সরকার পর্যায়ের এবং উপনির্বাচনগুলোর জন্য খালেদা জিয়া তাকে বিশ্বাস না করুন জনগণ অন্তত বিশ্বাস করবে। ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোটাররা তার মান রাখবে, কমপক্ষে আওয়ামী লীগের ভোটাররা দলে দলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আওয়ামী লীগ নিজেদের ভোটারদের মধ্যেও উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারেনি, শেখ হাসিনার মিথ্যা আশ্বাসকে আমলেই আনেনি। শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই এখন বুঝেছেন, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লা, সিলেট, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের যে উপচে পড়া ভিড় ছিল সেই ভিড় ছিল আওয়ামী লীগ বিরোধীদের। অন্যদিকে অন্যায় নির্বাচনকে যে বেহাল করে ফেলা যায় সেটাও প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের জনগণ। বিএনপির ১৫ ফেব্র“য়ারি নির্বাচনের রেকর্ডও এবার ভেঙেছে। এই নির্বাচনকে বাধ্যবাধকতা নির্বাচন বলে এখনো যা বলা হচ্ছে সেটাও যে আসল কথা নয়, ভাওতা তার প্রমাণ নির্বাচনের পরের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে। শেখ হাসিনা ওই সংবাদ সম্মেলনে আবারও উল্লেখ করলেন, খালেদা জিয়া এখন একূলওই কূল দুই কূল হারিয়েছেন। তিনি তো আর বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকতে পারবেন না।

তবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি কথা প্রমাণিত হয়েছে, শেখ হাসিনা এখন অধিকাংশ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং তিনি খুবই নগন্য সংখ্যক মানুষের নেত্রী। তিনি এখন একটি সংখ্যালঘু হিংস্র জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ঠান্ডা মাথায় তিনি বিনাশ করেছেন গণতন্ত্র। আর এই গণতন্ত্র বিনাশ করার নির্বাচন সফল করতে গিয়ে ২৪ ঘন্টায়ই হরণ করা হয়েছে ২৪টি প্রাণ। নির্বাচন চলতে চলতেই বিদেশী গণমাধ্যমগুলোতে প্রধান শিরোনাম হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ।

এই নির্বাচনটি একদিকে যেমন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচিত হওয়ার এবং কম ভোটার টানার রেকর্ড গড়লো তেমনি নয়া স্বৈরতন্ত্র উত্থানের মাইল ফলকও হয়ে থাকলো। বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করার যে মিশন চলছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব পার হলো। বিরোধী দলকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলা করতে ভয় পেয়েই তিনি জনগণের ওপর চড়াও হয়েছেন যৌথ বাহিনী নিয়ে। হঠাৎ করে নয়, ক্রমাগতই তিনি এগিয়েছেন ওই পথে। হাতে সময় ছিল, সুযোগ ছিল কিন্তু ক্ষমতাবিলাস সংখ্যাগরিষ্ঠতার জবরদস্তি আর পারিবারিক ও আগেরবারের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহমিকা তাকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলে। বিরোধী দলকে নয়, ২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতে মেয়াদের শুরুতেই মন্ত্রীসভা গঠন করে প্রথম অপমানও করেছিলেন তিনি জনগণকে আর মেয়াদ শেষে প্রহসনের নির্বাচন দিয়েও অপমাণ করতে চেয়েছিলেন জনগণকে। কিন্তু এবার জনগণ তাকে সে সুযোগ দেয়নি। বরং হয়েছে তার উল্টো। তার মুখে নির্বাচনের নাম শুনেই তারা হুজুগে মাতেনি। ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার শেখ হাসিনার প্রত্যাশা পড়েছে মুখ থুবড়ে। এখন নিয়তি তাকে ঠেলে নিয়ে যাবে আরও ভয়ঙ্কর এক পথে, আচরণের দিকে। তার বিরোধীরা তাকে আরও ভয় দেখাবে আর তিনিও ভয় পেতে থাকবেন।

সরকার প্রধান যে ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন এটা তিনি উপলব্ধি করতে পারছেন। আর এ কারণেই তার জনগণের উপরে অবিশ্বাস। আর এ অবিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় অত্যাচারনিপীড়ন এবং নির্যাতনের। কারণ ওই দমনপীড়নের মধ্যদিয়ে টিকে থাকতে হবে শাসকরা এটাই মনে করে এবং যুগে যুগে করেছে। শেখ হাসিনা এবং তার সরকারটিও এর বাইরে নয়। এ কারণে আরো দমনপীড়ন, নির্যাতনের পথে সরকার এগিয়ে চলবে এটাই স্বাভাবিক।।