Home » রাজনীতি » প্রতিটি ভোট ১০৫৩ টাকা ॥ ক্ষতি ২ লাখ কোটি টাকা

প্রতিটি ভোট ১০৫৩ টাকা ॥ ক্ষতি ২ লাখ কোটি টাকা

এম. জাকির হোসেন খান

political-cartoons-63একটি প্রহসন মাত্র” এ সংক্ষিপ্ত শিরোনামটি বাংলাদেশের দশম সংসদ নির্বাচন সম্বন্ধে জার্মানভিত্তিক টাসেজাইটুং পত্রিকার। “ভোটার নেই, পর্যবেক্ষকেরও দেখা নেই”এ শিরোনামটি ছিলো বিবিসি’র। রয়টার, আল জাজিরা, এপি, পিটিআই সহ সব আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিরোধী দলের বয়কটে এবং আমেরিকা, বৃটেন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কমনওয়েলথ সহ আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার পর্যবেক্ষক না থাকলেও শুধুমাত্র ভারত ও ভুটানের পর্যবেক্ষকের (?) উপস্থিতিতে প্রাণঘাতী এ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ভোটারের উপস্থিতির কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করে। সর্বশেষ এশিয়ান হিউমেন রাইটস কমিশন এ নির্বাচনকে প্রহসন হিসাবে উল্লেখ করে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ দ্রুত আরেকটি নির্বাচনের জন্য সংলাপ শুরুর আহবান জানিয়েছে।

গণতন্ত্র এবং সংবিধান রক্ষার নামে গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে অনুষ্ঠিত হাস্যকর এবং প্রহসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংবিধান প্রদত্ত ভোটাধিকার থেকে প্রায় ৯০% নাগরিককে বঞ্চিত করে বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে লিখিত সর্ব নিম্ন ভোটের হার প্রধানমন্ত্রী বা তার দলের জন্য সন্তোষজনক হলেও তা জাতির জন্য চরম লজ্জাজনক। দলদাস নির্বাচন কমিশন প্রমাণ করলো এদের দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে নয়, বরং জনগণের প্রদত্ত করের টাকায় এরা ভোটের নামে রক্তের হোলিখেলায় মেতেছিল। নির্বাচনের নামে এ প্রহসন গণতন্ত্রকেই শুধু ক্ষতবিক্ষত করে নি, প্রতিটি ভোটই হয়েছে রক্তাক্ত। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় ২০০ নাগরিককে প্রাণ দিতে হয়েছে এবং অসংখ্য নাগরিক আহত হয়েছে এবং সম্পদ হারাচ্ছে।

প্রহসনের এ নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘ইকনোমিষ্ট’ পত্রিকা গত ২১ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিরোনাম করেছিলো, “বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল জয়ী হবে, রাষ্ট্র পরাজিত হবে”। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ দুতৃতীয়াংশ আসনে জয়ী (?) হলেও প্রকৃতই রাষ্ট্র হারিয়েছে সম্মান এবং রাষ্ট্রের সংবিধান হয়েছে পরাজিত। যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে একতরফা এ নির্বাচন হলো, সে সংবিধানের ৬৫() অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, “একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী তিনশত সদস্য লইয়া সংসদ গঠিত হইবে”। অথচ সবাই জানে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়ে নির্বাচনের বাইরে রেখে অনুগত নামসর্বস্ব দলসমূহ নিয়ে ‘গোপন সমঝোতার’ মাধ্যমে ১৫৩টি সংসদীয় এলাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হয়ে এতোগুলো নির্বাচনী এলাকার ভোটারকে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করে ‘সংবিধান রক্ষা’র প্রহসন করা হলো।

সংবিধানের ৩৯()() অনুচ্ছেদে প্রদত্ত প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারকে অস্বীকার করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি, সংবিধানের ১২২() অনুচ্ছেদে উল্লিখিত “প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকারভিত্তিতে সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে” বলে নির্দেশনা থাকলেও তা ৩০০ সংসদীয় আসনের মোট ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ২৯০ জন ভোটারের মধ্যে মাত্র ১৪৭টি আসনে নির্বাচন কমিশনের হিসাবে মাত্র ১৮.৫ শতাংশ (১৭০২৮৫০৭ জন) নাগরিক ভোট দেয়ার সুযোগ পায়, যা সুস্পষ্টভাবে সংবিধানের লংঘন এবং গণতন্ত্রের নামে প্রহসন ছাড়া কিছু নয়। এমনকি সর্বশেষ জনমত জরিপের হিসাব অনুযায়ী আওয়ামী লীগসহ অংশগ্রহণকারী দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমর্থকবৃন্দও ভোট প্রদানে বিরত থাকে। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ১৪৭ টি নির্বাচনী এলাকায় ভোট প্রদানের হার ৪০.৫৬ শতাংশ উল্লেখ করলেও বাস্তবে ভোটের হার ১০ শতাংশের নিচে বলে দাবি করেছে। নির্বাচনের দিন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও ’৭০ এর নির্বাচনসহ অতীতের সব নির্বাচনের চেয়ে আনুপাতিক হারে ১০ম সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম বলে স্বীকার করে।

শুধু তাই নয়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ফলে ১৭টি জেলার প্রায় ৫৪১টি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়ে যায় এবং ব্যাপক জাল ভোটের প্রতিবাদে প্রায় ২৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করে। বিবিসি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, খোদ রাজধানীতে আজিমপুর ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে বিকাল পৌনে ৩টা পর্যন্ত ১৯৭৪ জন ভোটারের মধ্যে মাত্র ২৫০ জন ভোট প্রদান করে। শুধু তাই নয় রংপুর এর পীরগঞ্জের ধুলগাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল ২ হাজার ৩শ এবং দুপুর ১টা পর্যন্ত মোট ৮৫টি ভোট পড়লেও দুপুর ১টার পরপরই স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা সবাইকে জিম্মি করে নিজেরাই ব্যালট পেপারে সীল মেরে মুহুর্তেই ভোট প্রদানের হার ৭৭ শতাংশে নিয়ে যায়। প্রিজাইডিং অফিসার ফলাফলে সই করতে না চাইলে ইউএনও চাকরি যাওয়ার ভয় দেখিয়ে তার সই নেয়। একই চিত্র ছিল পীরগঞ্জের প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে। এ কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শর্তাধীন আলোচনা সাপেক্ষে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানিয়েছেন, কিন্তু উনার মন্ত্রীরা ইতিমধ্যে এ নির্বাচনের মাধ্যমে আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রশ্ন হলো এ নির্বাচন কী অবধারিত ছিলো বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতার ফলাফল সম্বন্ধে নীতি নির্ধারকরা অবগত ছিলেন না, এটা কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

equation-1

সংবিধান এবং গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক এ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের করের টাকা অপচয় এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের অর্থনীতিবিনষ্টের এ নির্বাচনের দায় অবশ্যই প্রথমে নির্বাচন কমিশন এবং সার্বিকভাবে ক্ষমতাসীন সরকারের। ভোটারবিহীন সংসদ নির্বাচনে রক্তমাখা প্রতিটি ভোট বাবদ খরচের পরিমাণ দাড়ায় প্রায় গড়ে ১০৫৩ টাকা (নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন বাবদ বাজেট বরাদ্দ হলো ২৯১ কোটি টাকা) যা ভোটের হিসাবে ১৯৯১ সন থেকে অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি। তাছাড়াও, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওই বাজেটের বাইরে যৌথ বাহিনীর সদস্যসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তাদের ব্যয়িত সময় এবং ভাতা সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের প্রকৃত হিসাব করলে শুধুমাত্র ভোট গ্রহণ বাবদ তার পরিমাণ প্রায় ১৫ শত কোটি টাকা। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক এ অস্থিতিশীলতার ফলে অর্থনীতির সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ অকল্পনীয়। প্রশ্ন হলো, জনগণের জন্য তৈরি পরিবর্তনশীল সংবিধানকে ‘অপরিবর্তিত ধর্ম গ্রন্থ’ বানিয়ে প্রহসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতির অর্থ এবং সম্পদের এ ক্ষয়ক্ষতির দায় কার?

২০১৩১৪ অর্থ বছরের বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৭.২ শতাংশ ধরা হলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এডিবি’র হিসাবে তা ৫.৭ শতাংশে দাড়াতে পারে; তবে সার্বিক হিসাবে ২০১৩১৪ অর্থ বছরে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার কোনো অবস্থাতেই ৫.% এর ওপরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে, ২০১২১৩ অর্থ বছরের জিডিপি’র স্থির মূল্য হিসাবে ২০১৩১৪ অর্থ বছরে জাতীয় উৎপাদন হারানোর আর্থিক মূল্য দাড়াবে প্রায় ৭,৩৭৩ কোটি টাকায়।

চলমান হরতাল এবং অবরোধের কারণে নভেম্বর ২০১৩ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কর্মদিবস হারানোর ফলে ক্ষতির পরিমাণ দাড়াবে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। আর রফতানি এবং প্রকৃত আমদানি কমে যাওয়ার ফলে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, গার্মেন্ট এবং আবাসন খাত সহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক সহায়তা হ্রাস, হরতাল অবরোধের কারণে শুধুমাত্র পরিবহন খাতের প্রায় ১০০০ গাড়ি এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত গাড়ি আগুনে ভস্মীভূত হওয়া (শুধুমাত্র ১ দিন বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকায় ক্ষতি হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা); সহিংসতার ফলে কর্মক্ষমতা হারানো, বাড়ি ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, লুটপাট এবং সার্বিকভাবে মানুষের হারানো কর্মঘন্টা হিসাব করলে বর্তমান পর্যন্ত অর্থনীতির সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ দাড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, বাংলাদেশের এক বছরের জাতীয় বাজেটের পরিমাণ। সংবিধানের পনেরদশ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ের আলোকে তত্ত্ববধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল না করে জাতীয় সমঝোতার মাধ্যমে এ নির্বাচন করলে অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের বিশাল এ ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হতো। অথচ পদ্মা সেতু বা উচ্চ ক্ষমতার বিদ্যুত কেন্দ্র বসানো বা সমুদ্র বক্ষ থেকে তেলগ্যাস উত্তোলনের জন্য উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ এবং কঠিন শর্তে ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্রের ক্ষতি করে বিদেশিদের নিকট থেকে সহায়তা নিতে আমরা কুন্ঠাবোধ করি না। অথচ জাতীয় সমঝোতা করার ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারকবৃন্দ নিজ নিজ অবস্থানে অটল থেকে রাষ্ট্রকে অবধারিত বিপর্যয়ের দিতে ধাবিত করা হলো।

জনগণের নামে সকল রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করলেও নাগরিকদের জীবন আজ বিপর্যস্ত। লাখ লাখ শ্রমিক বিশেষকরে ৬৮ হাজার পরিবহন শ্রমিকের আয় অনেকদিন ধরে প্রায় শূণ্যের কোঠায়। আর অবরোধের ফলে উৎপাদন সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়ে গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ গত ডিসেম্বরে মুল্যস্ফীতির হার বিশেষকরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে বেড়ে গেছে, শহরাঞ্চলে এ হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশে। হরতাল, অবরোধ আর চলমান অস্থিরতার এ ধারা অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি পুনরায় দুই অংকের সংখ্যায় রূপ নেয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ প্রেক্ষিতে, মধ্যবিত্তরা সঞ্চয় ভেঙে জীবন ধারন ব্যয় মেটাচ্ছে; ফলে সঞ্চয় হচ্ছে ক্ষতিগস্ত হওয়ায় ব্যাংক পুঁজি হারাচ্ছে। অন্যদিকে, দারিদ্রের হার আশংকাজনক হারে বেড়ে শহরমুখী জনস্রোত তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় চলমান রাজনৈতিক হানাহানির প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এ মুহুর্তে পরিমাণ যে ওপরের হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হবে তা অনুমেয়।

প্রকৃতই এক দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হওয়ায় হানাহানি আরো বেড়ে যাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ সুস্পষ্ট। প্রহসনের এই সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার জিতলেও রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ ও এর অর্থনীতি এবং সার্বিকভাবে এর জনগণ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ভবিষ্যতেও এর প্রতিক্রিয়া থাকবে।।