Home » প্রচ্ছদ কথা » বছরের আলোচিত চরিত্র

বছরের আলোচিত চরিত্র

আতঙ্কিত অসহায় মানুষ

আমীর খসরু

tortured-peopleঅসহ্য যন্ত্রণায় পোড়া শরীরে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা গীতা সেন প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন – ‘আমরা আপনাদের বানিয়েছি। আপনারা আমাদের বানান নাই।আমরা ভালো নাই। এভাবে দেশ চলতে পারে না।’ এ প্রতিবাদী উচ্চারণের জন্য গীতা সেন হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ জানানোর মূর্ত প্রতীকে। যে বছরটি আমরা অযুতনিযুত সাধারণ মানুষ সবে পার করে এসেছি গীতা সেন তারই মুখপাত্র, কণ্ঠস্বর। ওই কথার মধ্যদিয়েই উচ্চারিত হয়েছে সাধারণ মানুষের কথা, আর বোঝা গেল কেমন গেছে ২০১৩ সাধারণ মানুষের জন্য।

২০১৩ ছিল সাধারণ মানুষের জন্য চরম আতঙ্কের, উদ্বেগের, অনিশ্চয়তার আর ভয়াবহ শঙ্কার। এ ভূখণ্ডের মানুষ কখনই ভালো ছিল, পরম সুখ ও শান্তিতে ছিল এমনটা বলা যাবে না। সাধারণ মানুষ বরাবরই কমবেশি নির্যাতিত। তারা ক্রমাগত এই নির্যাতননিপীড়নের শিকার। কিন্তু ২০১৩তে তাদের উপরে নানা দিক থেকে ব্যাপক মাত্রায় নির্যাতননিপীড়নের কারণে মানুষ আরও বেশি, আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে। এই আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব বর্তমান নিয়ে, ভবিষ্যৎ চিন্তা করে। এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি যে সাধারণ মানুষের নয়, বরং এ রাষ্ট্র যন্ত্র যে নিপীড়নের তা আবারও টের পাওয়া গেছে ২০১৩তে বড্ড বেশি মাত্রায়, বড় বেশি মূল্য দিয়ে।

মানুষের চরম ও ভয়াবহ আতঙ্ক আর সীমাহীন অসহায়ত্ব নানা কারণে, নানা দিক থেকে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইনশৃঙ্খলা, আপনআপন নিরাপত্তা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় দুঃশাসন, দুর্নীতি সব দিক দিয়েই।

২০১৩ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষের বছরও। এ সময়কালে মানুষ বিপন্ন হয়েছে, বিপর্যস্ত হয়েছে, এমন মাত্রায়, যা স্বাধীনতার পর থেকে আর কখনই তাদের হতে হয়নি। এমনকি একদলীয় শাসনকালে কিংবা অগণতান্ত্রিক আমলেও এমনটি দেখেনি কেউ, এমন ভোগান্তিতে ফেলানো হয়নি কাউকেই। একটি নির্বাচিত সরকার যে এমন স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে তা কারো জানা ছিল না।

২০০৯ সালে এসে আওয়ামী লীগ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি হ্রাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিদ্যুৎজ্বালানি সম্পদের উন্নয়নসহ যাবতীয় সব সুললিত বাণী উচ্চারণ করেছিল যার একটিও তারা সরকার গঠনের পরে বাস্তবায়ন তো করেইনি, বরং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে, অপশাসন এবং দুঃশাসনে, মানুষের নিরাপত্তাহীনতায়, দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্বের কি হবে এ চিন্তায় অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে প্রতিটি মানুষের জীবনজীবিকা, ব্যক্তি পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে সামষ্টিক নিরাপত্তা ব্যাহত হয়েছে, বিপন্ন হয়েছে, হয়েছে বিপর্যস্ত। কতোটুকু বিপন্ন, বিপর্যস্ত, পর্যুদস্ত হয়েছে মানুষ তার খুটিনাটি হিসাব দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না কারণ প্রতিটি নারীপুরুষ, আবালবৃদ্ধ বণিতা, এ দেশের মাঠঘাট, আকাশ থেকে প্রান্তর সবাই স্বাক্ষী। সবাই স্বাক্ষী এই দুঃশাসনের, দুর্বৃত্তপনার, নির্যাতনের, নিপীড়নের। মানুষ এ সব কারণে অসহায়ত্বের শেষ সীমানায় পৌঁছেছে ২০১৩তে এসে। সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে, দিকবিদ্বিক শূন্য হয়ে এখন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে যা শুধু দিন যাপনের, যা শুধু প্রাণ ধারনের। গভীর অতল ভয়ঙ্কর খাদের একেবারেই কিনারায় এসে গেছে মানুষ। বিশ্বজিৎ থেকে শুরু করে হাজারও মানুষ জীবন দিয়েছে এবং দিচ্ছে। রানা প্লাজা ধস, তাজরীন ফ্যাশনসএ আগুন লেগে নিহত হওয়া শত শত নারীপুরুষকে হত্যা করা হলেও এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি কারোর। অসংখ্য কন্যা, বোন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে, আড়িয়াল বিলের নিজ জমি রক্ষায় যে কৃষক হাতে নিয়েছিল লাঠি, বিদ্যুতের দাবিতে, বাসের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে যে প্রান্তিক মানুষ হয়েছিল কিছুটা সোচ্চার সবাই নিগৃহীত লাঞ্ছিত। কিশোরী ফেলানী ঝুলেছিল সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অথচ সরকার টুশব্দটি করেনি। ফেলানীর মৃতদেহ আজ বাংলার জমিন, বিশ্বজিৎ আর ফেলানীদের রক্তাক্ত কাপড় আজ আমাদের জাতীয় পতাকা, এদের হৃদয় আজ সবার ঠিকানা। একজন নয়, দুজন নয় অসংখ্যঅসংখ্য…. অযুতনিযুত। যে নিরন্ন মানুষ কাজের সন্ধানে গিয়ে গুলি খেয়ে জীবন দিয়েছে, ব্যাংকের যে মহিলা কর্মী বোমার আঘাতে নিহত হয়েছে তারা আমাদের ভাই, আমাদের বোন, আমাদের মা তারা আমরা সবাই। আমরা সবাই। কিন্তু ওরা জানে না ওরা কাকে হত্যা করেছে, কাকে করেছে মাতৃহারাপিতৃহারা, ভাইবোন স্বজনহারানো বিপন্ন মানুষ।

ফেলানীর মৃতদেহ আজ বাংলার জমিন, বিশ্বজিৎ আর ফেলানীদের রক্তাক্ত কাপড় আজ আমাদের জাতীয় পতাকা, এদের হৃদয় আজ সবার ঠিকানা। একজন নয়, দুজন নয় অসংখ্যঅসংখ্য…. অযুতনিযুত। যে নিরন্ন মানুষ কাজের সন্ধানে গিয়ে গুলি খেয়ে জীবন দিয়েছে, ব্যাংকের যে মহিলা কর্মী বোমার আঘাতে নিহত হয়েছে তারা আমাদের ভাই, আমাদের বোন, আমাদের মা তারা আমরা সবাই।

যে রাজপথ ২০১৩ সালে সাধারণ মানুষ, ভিন্নমতাবলম্বী থেকে বিরোধী পক্ষ আর বিরোধী দলের জন্য ছিল নিষিদ্ধ, যে কণ্ঠ নিষিদ্ধ হয়েছে ২০১৩ সালে, যে চিন্তা নিষিদ্ধ হয়েছে ওই বছরে এমনটি, এমন মাত্রায় আর কখনই হয়নি। কয়েক দফায় রাজধানীকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার এমন অপকৌশল তো আর দেখা যায়নি। মানুষ প্রত্যক্ষ করেনি ক্ষমতাকে আকড়ে থাকার কিংবা ক্ষমতার লোভে এমন হিংস্রভয়াল আচরণ।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, তেলগ্যাসের দাম বৃদ্ধিসহ মানুষের নিত্যদিনের ব্যয় এমন ভাবে তো আর কখনো বাড়েনি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মতো এমন আন্তর্জাতিক কলঙ্কের তিলক তো আর আমাদের কপালে কোনোদিন পড়েনি, হলমার্কবিসমিল্লাহডেসটিনি থেকে শুরু করে এমন বিশাল বিশাল দুর্নীতি তো দেশবাসী কখনই প্রত্যক্ষ করেনি। শেয়ারবাজারের লাখো মানুষের অর্থ দিনেদুপুরে সকলকে জানান দিয়ে লুটে নেয়ার এমন ঘটনা তো আর কখনই হয়নি এভাবে অসংখ্যঅসংখ্য ঘটনা ঘটেছে ২০১৩ সালে।

করিডোর, বন্দর ব্যবহারসহ নানা সুযোগসুবিধা দেয়ার নামে নিজ ভূখণ্ডকে অন্যর হাতে তুলে দেয়ারও এমন কোনো নজির এ দেশে নেই, কখনো দেখাও যায়নি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নামে সুন্দরবন ধ্বংসের এমন মহাউদ্যোগও এই অসহায় মানুষগুলো কোনোদিন ভাবতেও পারেনি।

গণতন্ত্রকে বিদায় জানানোর জন্য এমন উল্লাসনৃত্য বছরের শেষ দিকে এসে শেষ পর্যন্ত দেশবাসীকে অত্যন্ত বেদনাক্লিষ্ট বির্দীণ হৃদয়ে আর কখনো দেখতে হয়নি। মানুষের গণতন্ত্রের একটি মাত্র খোলা পথ ভোটাধিকার, তা কেড়ে নেয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, ভোটারবিহীন অবস্থায় অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার এমন আয়োজনও অতীতে আর কখনই প্রত্যক্ষ করা যায়নি। গণতন্ত্রের নামে মানুষের ভোটাধিকারের দোহাই দিয়ে নানা সব স্বৈরাচারী, একনায়কত্ববাদী প্রবণতা বিশ্বে কোথাও দেখা না গেলেও, এ দুর্ভাগা দেশের অসহায় আতঙ্কিত বিপন্ন মানুষ শেষ পর্যন্ত তাইই দেখেছে, দেখতে হয়েছে, দেখতে বাধ্য হয়েছে।

দেশ আজ অবরুদ্ধ, মানুষ অবরুদ্ধ, কণ্ঠ রহিত, চিন্তা নিষিদ্ধ, সব স্বাধীনতা অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ব্যক্তির এবং সামষ্টিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে শুরু করে দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব সব আজ অসহায়, বিপন্ন, বিপর্যস্ত। আতঙ্কিত, অসহায় মানুষগুলোর সবার মুখেই আজ তাই ওই একই উচ্চারণ সমন্বিত ধ্বনি, একই কথার প্রতিধ্বনি দূর হও দুঃশাসন।।

১টি মন্তব্য

  1. Constructive and important writing. The condition of the country is worsening day by day. We cant stand this. Thanx for a good writing.