Home » আন্তর্জাতিক » সিকিমের পরাধীনতা এবং দালাল নেতৃত্ব

সিকিমের পরাধীনতা এবং দালাল নেতৃত্ব

ইকতেদার আহমেদ

map-of-sikkimহিমালয়ের দক্ষিণ কোলঘেঁষে পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত পাশাপাশি অবস্থিত তিনটি দেশ বংশানুক্রমিকভাবে কয়েক শতক ধরে রাজা দ্বারা শাসিত ছিল। এ তিনটি দেশের দু’টি দেশ নেপাল ও ভূটান বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্র। এর মাঝখানে সিকিমের পায়ে আবদ্ধ হয়েছে পরাধীনতার শিকল।

পৌরানিক কাহিনী অনুযায়ী বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভবা অষ্টম শতাব্দীতে সিকিম সফর করেন এবং সেখানকার অধিবাসীদের বোদ্ধ ধর্মে দীক্ষা দানপূর্বক রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ বাণী করেন। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সিকিমে নামগিয়েল রাজবংশ রাজ্য শাসনের কর্তৃত্ব লাভ করে এবং সে কর্তৃত্ব তিন শতকেরও অধিক সময় ধরে ভারত দ্বারা স্বাধীনতা হরণ পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকে। নামগিয়েল বংশের শাসন অব্যাহত থাকাকালীন প্রথম ষার্ধশতকে সিকিম পুনঃ পুনঃ নেপালী আক্রমণকারীদের আগ্রাসী অভিযানে রাজ্যের ভূমি হারানোসহ ওই দেশটি লুণ্ঠনের কবলে পরে। পরবর্তীতে উপমহাদেশটিতে বৃটিশদের শাসনকালে সিকিম বৃটিশদের সঙ্গে মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ হলে নেপাল সর্বাত্বক শক্তি দিয়ে সিকিমের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে সিকিমের অধিকাংশ অঞ্চল নেপালের কাছে হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী অষ্টাদশ শতকের প্রারম্ভে নেপাল আক্রমণ করলে গুর্খা যুদ্ধের শুরু হয় এবং এ যুদ্ধ পরবর্তী সিকিম নেপালের সঙ্গে সুগাউলি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে দখলকৃত ভূমি ফেরত পায়। ভারতের পশ্চিম বাংলার দার্জিলিং জেলা একসময় সিকিমের অংশ ছিল। অষ্টাদেশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সিকিম সামান্য অর্থের বিনিময়ে দার্জিলিং শহরের মালিকানা বৃটিশদের নিকট হস্তান্তরে বাধ্য হয় এবং এর কিছুকাল পর সম্পূর্ণ দার্জিলিং জেলা ও মোরাং অঞ্চল বৃটিশদের হস্তগত হয়। উপমহাদেশটিতে বৃটিশ শাসনকালে বৃটিশরা সিকিমের রাজাকে স্বাধীন সত্তা বজায় রেখে দেশ পরিচালনার নিশ্চয়তা দেয়।

সিকিম স্থলবেষ্টিত হিমালয় পাদদেশের একটি রাজ্য। এর পশ্চিমে নেপাল, উত্তরে চীনের তিব্বত, পূর্বে ভূটান এবং দক্ষিণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। সর্বশেষ ২০১১ এ অনুষ্ঠিত আদমশুমারী অনুযায়ী সিকিমের লোকসংখ্যা ৬ লক্ষ ১১ হাজারের কাছাকাছি। সিকিম গোয়া এর পর ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্গা সিকিম নেপাল সীমানায় অবস্থিত। সিকিমের আয়তন ৭ হাজার ৯৬ কিঃমিঃ বা ২ হাজার ৭শ ৪০ বর্গমাইল। এটি ভারতের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ রাজ্য।

বৃটিশদের কাছ থেকে উপমহাদেশের স্বাধীনতা লাভ পরবর্তী জহরলাল নেহরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন গণভোটের মাধ্যমে সিকিমকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। কিন্তু নেহরুরর শাসনামল থেকেই সিকিম ভারতের বিশেষ আশ্রিত রাজ্য হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে এবং এর প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ ভারত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ভারতের সঙ্গে চীনের সিকিমস্থ নাথুলা পাশ দিয়ে একমাত্র স্থল যোগাযোগ ছিল। ১৯৬২ সালের ভারত চীন যুদ্ধের পর এ পাশটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল যা পরবর্তীতে ২০০৬ সালে খুলে দেয়া হয়।

নামগিয়েল রাজবংশের শেষ রাজা চগিয়াল পান্ডেল থন্ডুপ নামগিয়েল ১৯৬৫ সালে সিংহাসন আরোহন করেন। রাজার আমেরিকান স্ত্রী হুপ কুক সিকিমের সাবেক সম্পদের প্রত্যাবর্তন বিষয়ক নিবন্ধ লিখলে ভারত চরমভাবে অসন্তুষ্ট হয়। ১৯৭৪এ সিকিমে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে ৩২ আসনের পার্লামেন্টে লেন্দুপ দর্জির নেতৃত্বাধীন সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস (এসএনসি) ৩১টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠন করে। সরকার গঠন পরবর্তী সিকিমকে ভারতভুক্ত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ২৭ মার্চ লেন্দুপ দর্জির মন্ত্রীসভা সিকিমের রাজতন্ত্র বিলোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অতঃপর সিদ্ধান্তটি পার্লামেন্টে অনুমোদন পরবর্তী ৪ দিনের মাথায় সাজানো ও পাতানো গণ ভোটের আয়োজন করে বলপ্রয়োগে সিকিমকে ভারতভুক্ত করা হয়।

গণ ভোট বিষয়ে সিকিমের সচেতন জনগোষ্ঠীর অভিমত গণ ভোটটি ছিল নেহায়াত একটি আনুষ্ঠানিকতা। মূলতঃ গণ ভোট অনুষ্ঠানের পূর্বেই সিকিমের সর্বত্র ছদ্মবেশে ভারতীয় পুলিশ ও সৈন্যদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যারা বন্দুকের ভয় দেখিয়ে সিকিমের নাগরিকদের গণ ভোটের স্বপক্ষে ভোটদানে বাধ্য করেছিল। সিকিমের নামগিয়েল রাজবংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও রাজ্যের অর্ধেকেরও বেশী নেপালী বংশোদ্ভুত হিন্দু জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ রাজার শাসনকে কখনও তাদের স্বার্থের অনুকূলে ভাবেনি।

১৯৭৩৭৫ সালে বৌদ্ধ রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালীন দেখা গেছে সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রতি ভারতের সমর্থন এতটাই প্রকাশ্য ছিল যে, রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী স্থানীয় সিকিমিদের অংশগ্রহণ নগণ্য হওয়ায় বিক্ষোভকে ব্যাপকতর করার প্রয়াসে দার্জিলিংসহ ভারতের আশপাশের এলাকা হতে লোক এনে বিক্ষোভ সংগঠিত করা হতো এবং সকলকে অবাক করার মতো ভারতীয় সেনা বাহিনীর সদস্যরা সাদা পোশাকে সিকিমে ঢুকে এসব বিক্ষোভে অংশ নিতো। ক্ষমতাচ্যুত রাজা চগিয়ালের এডিসি হিসেবে কর্মরত ক্যাপ্টেন সোনাম ইয়াংদা’র ভাষ্য থেকে ওই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়।

সিকিমে রাজতন্ত্র বিরোধী বিক্ষোভ ভারতের মদদে যখন বৃদ্ধি পায় তখন ভারতের পক্ষ হতে ভয় ছিল সিকিমের অস্থিতিশীলতার সুযোগে চীন এটিকে তিব্বতের অংশ দাবি করে চীনের অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা চালাবে। কিন্তু রাজা চগিয়াল রাজতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে ভারত সবসময় সচেষ্ট থাকবে এ বিশ্বাসে কখনও চীনকে তার নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ গোলযোগে জড়িত করতে চাননি।

সিকিমের ক্ষেত্রে ভারতকে বরাবরই দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। ভারত সবসময় রাজা চগিয়াল লামডেনকে বলে এসেছে যে কোন মূল্যে সিকিমের রাজতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। আর অন্যদিকে লেন্দুপ দর্জিকে বলে আসছিল যে কোন কিছুর বিনিময়ে হলেও রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করতে হবে। ভারতের মিথ্যা আশ্বাসে সরল রাজা পরবর্তীতে বোকা বনলেও সে আশ্বাস ক্ষণকালের জন্য হলেও লেন্দুপ দর্জির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আশা পূরণ করেছিল।

সিকিমের পার্শ্ববর্তী ভূটান ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ভূটানের পথ ধরে সিকিম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করলে তা যে সিকিমের ভারতভুক্তির ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দিবে সে বিষয়টি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সঠিকভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাছাড়া কৌশলগত কারণে হিমালয়ের কোলে নেপাল ভূটানের ন্যায় ভারত চীন সীমান্তে তৃতীয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটুক তা ভারত কখনও চায়নি।

১৯৭৫ সালে সিকিম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে লেন্দুপ দর্জি ভারতের ২২তম রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ‘গৌরব’ অর্জন করেন। কিন্তু তার সে ‘গৌরব’ চার বছরের মাথায় ভুলুন্ঠিত হয়। ১৯৭৯ এর নির্বাচনে দেখা গেল পূর্ববর্তী নির্বাচনে একটি আসন বাদে অবশিষ্ট সকল আসনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী দল এসএনসি একটি আসন লাভেও সমর্থ হয়নি। এক সময়ের পরাক্রমশালী মুখ্যমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জি নির্বাচনে তার মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে দেখেন ভোটার তালিকায় তার নামটি পর্যন্ত নেই। যদিও এর দ্বারা তিনি বুঝতে পারেন নেপথ্যে শক্তি ভারত তার রাজনৈতিক জীবনের ইতি টেনে দিয়েছে কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। নামগিয়েল রাজবংশের অবসান ঘটাতে গিয়ে লেন্দুপ দর্জি ইতিহাস সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী একটি স্বাধীন রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ভারতের হাতে তুলে দেন। তার এ কাজের জন্য তাকে এক অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। রাজনীতি থেকে বিদায় পরবর্তী নিজ মাতৃভূমি সিকিমে বাস করার মতো তার জন্য সহায়ক পরিবেশ ছিল না। শেষ জীবনে তাকে অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংস্থ কালিমপং শহরে ভীতসন্তস্ত্রভাবে একাকী, নিঃসঙ্গ ও নিন্দিত জীবনযাপন করতে হয়েছে।

সপ্তদশ শতকের মীর জাফরের মতো উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের লেন্দুপ দর্জি ইতিহাসের একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত। মীর জাফরের নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে যেমন বাঙ্গালির মুখ দিয়ে ঘৃণা ভরে থুথু নির্গত হয় ঠিক তেমন সিকিমবাসীদের লেন্দুপ দর্জির ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু হয় না। মীর জাফর নামটি বিশ্বাসঘাতকের প্রতিশব্দ বা সমার্থক শব্দ হিসেব ঠাঁই করে নিয়েছে। বিশ্বাসঘাতকতা পরবর্তী মীর জাফর স্বল্প সময়ের জন্য বাংলার মসনদে আরোহন করে আত্মতৃপ্তি লাভ করলেও অচিরেই তার ও তার পুত্রের করুণভাবে জীবনের যবনিকাপাত ঘটলে সে আত্মতৃপ্তি চিরদিনের জন্য তার পরিবারের সদস্য ও অনুরাগীদের কাছে আত্মজ্বালা হিসেবে দেখা দেয়।

যে কোন জাতি ও দেশের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার জন্য মীর জাফর ও লেন্দুপ দর্জির মতো ঘৃণিত মানুষের জন্ম। দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব এবং জনগণের স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে যে কোন দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব বিদেশী যে কোন শক্তির সহায়তায় ক্ষমতায় টিকে থাকা প্রলম্বিত করতে পারলেও, তা যে শেষ পর্যন্ত ফলদায়ক হয় না তা এদের অভিশপ্ত জীবন ও করুণ পরিণতি থেকে এ শিক্ষাটি লাভ করতে পারলে, ভবিষ্যতে আর কোন শীর্ষ নেতা ভুল পথে পা বাড়াবেন না। আর ভুল পথে পা না বাড়ালেই বোধকরি আমাদের মীর জাফর বা লেন্দুপ দর্জির প্রতিচ্ছবি দেখতে হবে না।।

(সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক)

ইমেইল: iktederahmed@yahoo.com