Home » প্রচ্ছদ কথা » স্বাধীনতা বিরোধী সাড়ে ৭ কোটি ভোটার!

স্বাধীনতা বিরোধী সাড়ে ৭ কোটি ভোটার!

আমীর খসরু

political-cartoons-62আধুনিক প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় যতো বেশি সংখ্যক মানুষকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করানো যায় তার একটা প্রচেষ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে থাকে। আর গণতন্ত্রের পুরো বিষয়টিই যেহেতু আমাদের মতো দেশে শুধুমাত্র নির্বাচনকেন্দ্রীক বা নির্বাচনী গণতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, সে কারণে গণতন্ত্রের মৌল ধারণাটির মধ্যেই চরম গলদ ঢুকে পড়েছে, ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ওই ব্যবস্থাটি। এ কারণে প্রতিনিধিত্বশীল শাসনে পুরো মাত্রায় জনগণের প্রতিনিধিত্ব না করলেও এ ব্যবস্থাটি নিয়েই নানা পরীক্ষানিরীক্ষা এখনো চলছে। পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে কতো বেশি সংখ্যক মানুষকে ওই শাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রীক গণতন্ত্রটিও এখন পুরোপুরি অকার্যকর, ভঙ্গুর এবং এর পুরো শরীরই পক্ষাঘাতগ্রস্থ। প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় অধিকাংশ মানুষকেই এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করানোর মাধ্যমে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য কোনো কোনো দেশে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার অত্যবশ্যকীয় শর্ত। আবার কোনো কোনো দেশ রয়েছে যেখানে ভোটাধিকারও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব ঘটনাবলী তাদের জন্য প্রযোজ্য, যাদের দেশে গণতন্ত্র চালু আছে।

বাংলাদেশেও এতো সব বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, কোনো কিছু অত্যবশ্যকীয় করা না হলেও এতোকাল ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের একটি বিধান চালু ছিল। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তার সবকিছুই বিদায় দেয়া হয়েছে, বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার কবে চালু হবে তা কারোরই জানা নেই। উদ্ভটঅদ্ভূত এক নির্বাচনী ব্যবস্থার সূচনা করা হয়েছে যা কিনা নির্বাচনহীনতারই নামান্তর। এমন নজির দুনিয়া জুড়ে কোথাও নেই।

ভোট কেমন হয়েছে তার বর্ণনা দেয়া অবান্তর। কারণ সর্বস্তরের নারীপুরুষ সবাই এর সাক্ষী। ১৫৩টি নির্বাচনী আসনে ভোট গ্রহণ হয়ইনি অর্থাৎ ৯ কোটি ১৯ লাখ ভোটারের মধ্যে ৪ কোটি ৮১ লাখ ভোটারকে ভোট প্রয়োগের অধিকার দেয়া হয়নি। আর বাকী ১৪৭টি নির্বাচনী আসনের ৪ কোটি ৩৮ লাখ ভোটারের মধ্যে কতোজন ভোট দিতে গেছেন তা সবারই জানা। সার্বিক হিসেবে বাধাবিঘ্নবিহীন জাল ভোটের পরেও শতকরা ৫ থেকে ৬ ভাগ ভোট পড়েনি। আর ভোটার উপস্থিতি কতো তা বোঝা যায় প্রায় ৪০টি কেন্দ্রে একটি ভোটও না পড়ার মধ্যদিয়ে। কিন্তু পরে অবশ্য নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রকাশ্যে সিল পিটিয়ে যে ভোট এসেছে নির্বাচন কমিশন অনেক অপেক্ষা করে তা ৪০ দশমিক ৫৬ শতাংশ বলে ঘোষণা দেয়। যদিও এর আগের দিন রাতেই ৩৯ দশমিক ৮১ শতাংশ ভোট প্রদানের হিসাব দেয়া হয়েছিল। দলদাস নির্বাচনী কমিশনের তথ্য যদি সত্য বলেও ধরে নেয়া হয় তাহলেও কমপক্ষে ১৪৭টি আসনে পৌনে দুই কোটির মতো ভোটার ভোট দিতে পেরেছে, বাকীরা এর বাইরে। তাহলে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি ৭ কোটি ৪৪ লাখ মানুষ। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের হিসেবেই সারাদেশের ৫ ভাগ ভোটারের মাত্র ১ ভাগেরও কম ভোটার ভোট দিতে এসেছে। বাকী ৪ ভাগের বেশি ভোট দিতে আসেননি। আর যদি শতকরা ৬ ভাগ ভোট দিয়েছেন এ হিসাবটি ধরা হয় তাহলে ভোট দিয়েছেন মাত্র ৫৫ লাখ মানুষ। দেখা যাচ্ছে, ৮ কোটি ৬৪ লাখ ভোটার ভোট দেননি। তাহলে সরকার মাত্র ৫৫ লাখ ভোটারের প্রতিনিধি।

গত নির্বাচনে অর্থাৎ ২০০৮এর নির্বাচনে ৮৭ ভাগ ভোটার ভোট কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যার মধ্যে আওয়ামী লীগসহ মহাজোট পেয়েছিল ৩৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাস্তব পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের সহমর্মী বা সমর্থক ভোটার তো দূরের কথা, এ নির্বাচনে তাদের নেতাকর্মীরাও ভোট দেয়নি। যদি ভোট দিতো তাহলে পরিস্থিতি এমন হতে পারতো না। যদিও প্রধানমন্ত্রী এখন বলছেন, জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছে, জাল ভোটের কথা যারা বলে তারা গণবিরোধী। তিনি এও বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতাসার্বভৌমত্বের শক্তি এবং গণতন্ত্র যারা রক্ষা করতে চেয়েছে তারাই নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। তিনি মোটাদাগে এবং বিপজ্জন প্রক্রিয়ায় দেশের বিভাজন রেখাটা টেনেছেন এভাবে যে, যারা আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের সমর্থন করেন না তারা স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে এবং গণবিরোধী। এভাবে স্বাধীনতা শত্রুমিত্র এবং গণতন্ত্রের পক্ষবিপক্ষের বিভাজন করাটা কতোটা ভয়ঙ্কর তা তিনি হয়তো বুঝতে পারেননি। আর যদি বুঝেই থাকেন তাহলে বলতেই হবে তিনি দেশের চরম সর্বনাশ করছেন এবং ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে আরো বড় সর্বনাশ হবে। তাহলে দলদাস নির্বাচন কমিশনের হিসেবেই সারাদেশের প্রায় সাড়ে ৭ কোটি ভোটার স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে, গণবিরোধী। এই সাড়ে ৭ কোটি মানুষ দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্বকে বিশ্বাস করে না। অর্থাৎ তারা দেশপ্রেমিক নন। স্বাধীনতার স্বপক্ষে, গণতন্ত্র রক্ষক এবং দেশপ্রেমিক শুধুমাত্র তারাই যারা এ নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। এভাবে আওয়ামী লীগ নিজেরা নিজেদের অধিকাংশ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। দেশকে বিভাজনের এমন নজির আর নেই। একমাত্র ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থাই এমন নজির মেলে।

আসলে শেখ হাসিনা এবং তার মহাজোট যে হিসাব করে নির্বাচনের মাঠে নেমেছিল তাহলো . নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এবং এর এক বিশাল অংশ নির্বাচনে অংশ নেবে, বাকী ১৭ দলসহ অপরাপর দলগুলোর অধিকাংশ নির্বাচনে যোগ দেবে। ২. জামায়াতের সঙ্গে আপোষরফা করে কৌশলে তাদের নির্বাচনী মাঠে নামানো যাবে। ৩. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ নানা ফ্যাক্টর কাজে লাগিয়ে ওই ঘরানার সব দল এবং মানুষকে একত্রিত করা যাবে নির্বাচনের পক্ষে। ৪. এরই অংশ হিসেবে তরুণদের, যারা গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল, তারাও দলে দলে ভোট কেন্দ্রে যাবে। ৫. আওয়ামী লীগের যে স্থায়ী ভোট রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করে তারা সবাই ভোট দেবে। ৬. ভোটের কথা শুনলেই মানুষ এতে ঝাপিয়ে পড়ে। এ ফ্যাক্টরটিও কাজে লাগানো যাবে। এ সব কারণেই ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছিল, যতো বাধাবিঘ্ন আসুক না কেন, কমপক্ষে ৫০ শতাংশের বেশি ভোটার এমনি এমনিই ভোট কেন্দ্রে যাবেন। বাকী চেষ্টায় এ সংখ্যা আরও বাড়ানো যাবে। কিন্তু জনগণের বিপক্ষে কাজ করা, গণবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ নানা কারণে আওয়ামী লীগ যে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এ কারণে এসব হিসাবনিকাশের একটিও কাজ করেনি এটা নিশ্চিত প্রধানমন্ত্রী তা এখনো বুঝতে পারেননি। সংঘাতসহিংসতা না থাকলেও যে ভোটারের উপস্থিতিতে খুব একটা হেরফের হতো তা নয়।

তবে নির্বাচনের মধ্যদিয়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত না হলে আওয়ামী লীগ বা তাদের অন্ধ সমর্থকরা বুঝতেও পারতো না যে, তারা কতোটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ উপলব্ধিটা যদি আসে তাও হবে তাদের জন্য একটি ভালো দিক। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে সরকারের ধারণা ছিল, ভারত দুনিয়ার তাবৎ দেশকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পক্ষে নিয়ে আসতে পারবে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যদিয়ে। কিন্তু ওটি না হয়ে ভারত এখন নিজেই বাংলাদেশ প্রশ্নে বৃহৎ শক্তিসমূহের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে তা যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতোমধ্যেই বৈধতাহীন হয়ে গেছে, তা তাদের প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট। ভবিষ্যতে এ নির্বাচনটিকে কেন্দ্র করে আরও অনেক ঝামেলা এবং প্রতিবন্ধকতা নতুন সরকারটিকে করতে হবে তা এক প্রকার নিশ্চিত হয়ে গেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেদিয়েছেন তিনি এতে তোয়াক্কা করেন না। তিনি তোয়াক্কা না করলেও দেশের যে চরম এবং সীমাহীন ক্ষতি হয়ে গেল, তা সামাল দেয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।।