Home » আন্তর্জাতিক » এক ডলারে কতটুকু নিরাপত্তা কেনা যায়?

এক ডলারে কতটুকু নিরাপত্তা কেনা যায়?

গ্যারি মিলান্তে

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

dollarএক ডলারে কতটুকু খাবার বা জ্বালানি কেনা যায়, তা পরিমাপ করা সম্ভব। কিন্তু এক ডলারে কতটুকু নিরাপত্তা কেনা যায়? জবাবটা কি খুব কঠিন? অন্তত সহজ নয়। সবচেয়ে উন্নত দেশও এই সাদামাটা প্রশ্নটার উত্তর দিতে হিমশিম খায়….

এক ডলার দিয়ে কতটুকু নিরাপত্তা কেনা যায়, সেই হিসাব শুরু করতে হলেও প্রথমে জানতে হবে বর্তমানে কতটুকু নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে বলে জানা যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কতটুকু ব্যয় সম্পৃক্ত। এরপর হিসাব করতে হবে কতটুকু অজ্ঞাত হুমকি আছে বলে মনে হচ্ছে এবং তা সম্ভাব্য ব্যয় কত। এখানেই শেষ নয়, আপনাকে সম্ভাব্য প্রতিষেধকগুলোর মূল্যায়ন করতে হবে, এগুলোর জন্য ব্যয় কত হবে এবং প্রতিটি হুমকির মোকাবিলায় এগুলোর কার্যকারিতাও কতটুকু সেটাও মাথায় রাখতে হবে। কার্যকারিতার মতো হিসাবগুলো ছাড়াও সম্ভাব্য হুমকিগুলোর কতটি নিশ্চিতভাবেই আঘাত হানবে এবং সেগুলো মোকাবিলা করতে হলে কী কী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা সফলভাবে প্রয়োগ করতে হবে, তা চিহ্নিত করতে হবে।

খুব জটিল মনে হচ্ছে? হ্যাঁ তাই। সাধারণভাবে প্রত্যাশা করা হয়ে থাকে, বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকেরা অভিন্ন কল্যাণের ব্যবস্থা করার জন্য অত্যন্ত মহার্ঘ গণসম্পদ ব্যয় করার সময় প্রতিনিয়ত তথ্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন। এসব নীতিনির্ধারকেরা কি প্রতিটি হুমকি এবং সম্ভাব্য প্রতিষেধকমূলক পদক্ষেপ শনাক্ত এবং সেগুলোর সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতার ব্যাপারে ‘সম্ভাবনাতত্ত্ব’ প্রয়োগ করেন? সম্ভবত করেন না, যদিও অর্থনীতিবিদেরা ধরে নেন যে তারা সেটা করেন। নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে ভয়াবহ ধরনের শিথিলতা রয়েছে। নীতিনির্ধারকেরা এবং তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে অত্যন্ত ধীরগতিতে। সমস্যাটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামাজিকযাই হোক না কেন তারা চলতি বছরে বহমান বাতাস মোকাবিলায় গত বছরের গৃহীত ব্যবস্থা অনুসরণ করেন।

অধিকন্তু এসব হুমকির অনেকগুলোই অজ্ঞাত কিংবা অলীক এবং ক্ষতির ব্যয় অনিরূপনীয়। ঝুঁকি না থাকায় এসব ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়, তা কোনো পর্যায়েই সমর্থনীয় নয়। পরিশেষে, এসব তথ্যের সব পাওয়া গেলেও নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় তারা বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা প্রশ্নে কিভাবে সীমিত সম্পদ ব্যয় করবেন, সম্ভাব্য সব হুমকি মোকাবিলায় সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কী কী গ্রহণ করা হবে সে ব্যাপারেও তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

জাতীয় সামরিক ব্যয়ে বিপুল পার্থক্য

প্রতিটি নিরাপত্তা কর্মকাণ্ডে ব্যয়িত শেষ ডলারটি নিরাপত্তার প্রান্তিক ‘ইউনিট’ প্রদান করে থাকে। ওই শেষ ডলারটিই এক ডলারে কতটুকু নিরাপত্তা কেনা যায়, তার হিসাব করার সূচনা বিন্দু বিবেচিত হয়। আরো ব্যাপকভাবে বললে বলা যায়, সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যয়সম্পর্কিত তথ্য আমাদেরকে নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার নির্দেশ করে থাকে। বার্ষিক বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ই ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণের সঙ্গে পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় নিরাপত্তা এবং অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র ব্যক্তি বা সংস্থাগুলোর ব্যয় এবং প্রাইভেট নিরাপত্তার খরচ যোগ হয়নি।

নিরাপত্তা, নিরাপত্তা ব্যয় এবং নিরাপত্তা খাতে সংস্কার নিয়ে উদ্দীপ্ত সাহিত্যের খোঁজ পাওয়া গেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব জ্ঞানের প্রয়োগ সম্পর্কে প্রায়শই তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না, আবার পাওয়া গেলেও সেগুলো থাকে অপরিপক্ক। অনেক সময় এসব তথ্য হয় ত্রুটিপূর্ণ, ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা কিংবা উদ্দেশ্যমূলক।

নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলোর এসআইপিআরই উপাত্তের দিকে নজর বুলালে সামরিক ব্যয়ের বিপুল পার্থক্য দেখা যাবে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সামরিক ব্যয় সাধারণত তাদের জিডিপির এক থেকে তিন শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকলেও কোনো কোনো দেশের (দক্ষিণ সুদান, ইরিত্রিয়া, আলজেরিয়া, সিরিয়া) সামরিক ব্যয় তাদের জিডিপির চার শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি। সামরিক খাতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর গড় ব্যয় মাথাপিছু প্রায় ২২ ডলার। আর এসব দেশের বার্ষিক গড় জাতীয় আয় (জিএনআই) মাথাপিছু ৮৮৮ ডলার।

দুই অঙ্কের সামরিক ব্যয়

ভঙ্গুর ও সংঘর্ষআক্রান্ত দেশগুলোর ব্যয় বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করে। সুশাসনের ব্যবস্থা করার সামর্থ্য তেমন না থাকায় এসব দেশ প্রায়ই অস্থিতিশীলতার মুখে পড়ে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) হিসাব মতে ভঙ্গুর দেশগুলোতে মাথাপিছু জাতীয় আয় তুলনামূলক কম, কিন্তু জিডিপির আলোকে তাদের সামরিক ব্যয় অনেক বেশি। এতে বোঝা যায়, এহেন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকেরা নিরাপত্তা ও সামরিক খাতে অনেক বেশি গণসম্পদ ব্যবহার করে থাকে।

এটা সম্ভবত প্রয়োজনীয় ও দরকারি, ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়েই বেশি অগ্রাধিকার দিতে হয়। তবে একথাও মাথায় রাখতে হবে, অত্যন্ত মূল্যবান ও দুর্লভ এসব সম্পদ উন্নয়ন খাতে ব্যবহার করাটাই যৌক্তিক ছিল। অথচ ব্যবহৃত হচ্ছে প্রতিরক্ষা খাতে। এসব দেশের সমস্যাও অনেক। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এই গ্রুপে থাকা দেশগুলোতেই সব বৈশ্বিক দারিদ্র্যের অর্ধেকের বেশি বাসা বাধবে।

অধিকন্তু, অনেক ভঙ্গুর দেশেই সামরিক ব্যয় বেড়েই চলেছে। আফগানিস্তানে ২০০৩ সাল থেকে সামরিক ব্যয় প্রায় চারগুণ বেড়েছে। একই সময়ে, জিম্বাবুয়ে ও সুদানের সামরিক ব্যয় বার্ষিক ৩০ শতাংশেরও বেশি করে বাড়ছে, আর তিমুরলেস্টল ও লাইবেরিয়ার বৃদ্ধি পাচ্ছে বছরে ১৫ শতাংশের বেশি করে। এই বাড়ার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। কেন এমনটি হচ্ছে, বিশেষ করে ভঙ্গুর দেশগুলোতে যেখানে সবকিছুই অগ্রাধিকার পেতে পারে, সেখানে সামরিক ব্যয় বাড়ার কারণটি আমাদের একটু যত্ন করে উপলব্ধি করতে হবে।।

(গ্যারি মিলান্তে, প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা স্টকহোম পিস রিসার্স ইনস্টিটিউটএর পরিচালক)