Home » রাজনীতি » এক কোটির বেশি ভোটার গায়েব

এক কোটির বেশি ভোটার গায়েব

এম. জাকির হোসেন খান

ec-logo-1আমলা সমৃদ্ধ নির্বাচন কমিশন সঠিক কাজটিই করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নিযুক্তির পর পরই কথা নয় কাজের মাধ্যমে নিরপেক্ষতা এবং যোগ্যতা প্রমাণের কথা বলেছিলেন। সত্যিই অসাধারণ নিরপেক্ষতার সাক্ষর রেখেছে নির্বাচন কমিশন। দলবাজ নির্বাচন কমিশন ভোটারবিহীন ১০ম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতির ললাটে আরেকটি স্থায়ী কালিমা একে দিলো। সংবিধানের ১২২() অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত “প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকারভিত্তিতে সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে” হলেও সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিহীন নির্বাচনে নগণ্য ভোটারের উপস্থিতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয়ে পরিচিত করলো। শুধু তাই নয় সংবিধানের ১১৯() অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি নির্ভূল ভোটার তালিতা প্রস্তুতের সাংবিধানিক দায়িত্বও পালন করেনি এ নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের প্রদত্ত তথ্য মতে, ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৮ বছর পূর্ণ বয়স্ক ৭০ লক্ষ নতুন ভোটাধিকার অর্জনকারী নাগরিকসহ সর্বমোট ৯ কোটি ২৮ লাখ ৫৩ হাজার ৪০০ জন ভোটারতে তালিকাভূক্ত করার লক্ষ্য স্থির করা হয়। সে অনুযায়ী ২০১২ সালের ১০ মার্চ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নুতন ভোটার রেজিষ্ট্রেশন রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, এবং ৩১ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদের পরও নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী নির্বাচনের পূর্ব সময় পর্যন্ত ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে এমন সকল নাগরিক ভোটার হতে পারেন। সংরক্ষিত নারী আসন বাদে প্রত্যক্ষ ভোটে ৩০০ সংসদীয় আসনে ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি নির্ধারিত ১০ম সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন ৮ সেপেটম্বর ২০১৩ তারিখ পর্যন্ত ৬৯ লক্ষ ৫৭ হাজার ৯৪৬ জন নতুন ভোটারসহ সর্বমোট ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ২৯০ জন ভোটারের তালিকা প্রকাশ করে। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪ কোটি ৬১ লাখ ১১ হাজার ৮৮০ জন নারী ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮১ জন। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ সংখ্যা কতটা সঠিক?

পাঠকের নিশ্চয় মনে থাকার কথা, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের ততকালীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে ৯ম সংসদ নির্বাচনে না যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসাবে অতিরিক্ত ভোটার থাকার কথা জানানোর প্রেক্ষিতেই তত্ত্ববধায়ক সরকারের আমলে ভোটার আইডি কার্ডের মাধ্যমে নতুন তালিকা প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে সে পদ্ধতি বহাল থাকলেও ১০ম সংসদ নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এটা পরিস্কার যে, চরম বিতর্কিত এ নির্বাচন কমিশন একটি নির্ভূল, কমপক্ষে মানানসই, ভোটার তালিকা প্রণয়নের সাংবিধানিক দায়িত্ব লংঘন করে যোগ্য ভোটারদেরও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করে সংধিান লংঘন করেছে। সাধারণত বিরোধী বলে কথিত ভোটারদের বাদ দেয়ার মাধ্যমে কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে জেতার জন্যই এ অবৈধ কাজটি করা হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনসংখ্যা জরিপে ২০১১ সালের ১১ মার্চ পর্যন্ত সর্বমোট জনসংখ্যা ছিলো ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ জন, যার ভিত্তিতে প্রাক্কলন করলে ২০১২ সালের জুলাই মাসে জনসংখ্যার পরিমাণ দাড়ায় প্রায় ১৫ কোটি ৮৬ লাখে। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে জনসংখ্যার পরিমাণ বেড়ে তা ১৬ কোটি ৩৭ লাখে দাড়ায়। বয়সের ভিত্তিতে জনসংখ্যার শ্রেণী বিন্যাস করলে প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটাধিকার অর্জনকারী মোট জনসংখ্যার পরিমাণ হয় প্রায় ১০ কোটি ৩০ লাখ; অথচ ১০ম সংসদের জন্য জানুয়ারি ২০১৩ পর্যন্ত সর্বমোট ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ২৯০ জন ভোটারকে ভোট প্রদানের জন্য নির্বাচিত করা হয়। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ভোটারকে ভোটাধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়েছে। সর্বশেষ সেপেটম্বর ২০১৩ পর্যন্ত ভোটাধিকার হতে বঞ্চিতের সংখ্যা হিসাব করলে প্রকৃত পরিমাণ আরো অনেক বেশি হবে।

ভোটারবিহীন ১০ম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শুধুমাত্র তালিকাভুক্ত ভোটার নয়, প্রকৃত ভোটারদেরকে ভোটাধিকারের ন্যায্য সাংবিধানিক অধিকার হতেও বঞ্চিত করা হয়। ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে ১০ম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংবিধান লংঘনের দায় দলদাস নির্বাচন কমিশন এবং সর্বোপরি নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকারের। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ১৪৭ টি নির্বাচনী এলাকায় ভোট প্রদানের হার ৪০.৫৬ শতাংশ উল্লেখ করলেও ফেমা এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন ভোট প্রদানের হার ১০ শতাংশের নিচে বলে উল্লেখ করা হলেও গায়েবকৃত ভোটারের হিসাব করলে, ভোট প্রদানের প্রকৃত হার যে, ৫ শতাংশের নিচে হবে তা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। এ প্রহসনের শেষ কোথায়?