Home » রাজনীতি » এখন কি করবে বিএনপি?

এখন কি করবে বিএনপি?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

khaleda-zia-23প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ভয়ের ভোট অবশেষে এমন এক জয় এনে দিয়েছে, যা তাঁকে আরো সাহসী করে তুলেছে বিরোধী দলবিহীন একটি একক সরকার গঠনে। যাকে তারা ইতিমধ্যেই আখ্যায়িত করেছেন ঐক্যমতের সরকার হিসেবে। সেখানে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, মহাজোটের শরিকরা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, বাড়তি উপাদান হিসেবে যোগ হয়েছেন জেপি’র আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তারাই সরকারী দল আবার তারাই বিরোধী দল। যদিও তারা নিরন্তর বলে আসছেন, এটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। প্রধান বিরোধী দল না আসলে তাদের কি করার আছে! তো নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। বিপক্ষে প্রার্থী না থাকায় ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেই বা কি করার আছে। সুতরাং এখন একাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধান বিরোধী দলের সাথে আলোচনায় বসা যেতে পারে। ক্ষমতাসীন দল, নবগঠিত সরকারকে এখন জপতে হচ্ছে, জপতে হবে আরো অনেককাল ধরে। চাপ আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, আছে জাতিসংঘ এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নেরও। তাদের সিনেটে নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের প্রধান দুই নেতাকে চিঠি দিয়েছে আলোচনায় বসে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজন করতে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাতিসংঘ সমঝোতা চায়, সহসাই এই নির্বাচন অনুষ্ঠান দেখতে চায়। এমতাবস্থায় ক্ষমতাসীন ঐক্যমতের সরকারের প্রায় সকলের মুখে আগামীতে অনবরত শোনা যাবে আলোচনা, আলোচনা…….। গত সময়ে এভাবেই মুখে আলোচনা এবং অন্তরে ভিন্ন কিছু নিয়ে বিরোধী দলকে ফাঁদে ফেলে আগামীতে কতটা কালক্ষেপন করতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

জনমনে এখন সবচেয়ে বড় কৌতুহল এবং প্রশ্ন হচ্ছে, প্রায় ৪০ শতাংশ সমর্থন রয়েছে যে দলের, সেই বিএনপি সাংগঠনিক, রাজনৈতিক এবং রাজপথে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে কি কৌশল গ্রহন করবে? তাদের মূল লক্ষ্য কি হবে আগামীতে যত দ্রুত সম্ভব সরকারকে আলোচনার টেবিলে এনে একটি অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য করা নাকি জামায়াতের চাপে সহিংস ও গণবিচ্ছিন্ন আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। তবে ইতিমধ্যেই খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্যে জনগন আশ্বস্ত হতে চাইলেও ধোঁয়াশা কাটছে না– “জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি জোট সম্পূর্ণরূপে কৌশলগত, এটি স্থায়ী কোন জোট নয়” (এই জোটের বয়স প্রায় ১৫ বছর)। এই বক্তব্য কৌশলগত কিনা, যা জামায়াত মনে করছেসে প্রসঙ্গটি বিএনপি নেত্রীকে পরিষ্কার করে দিতে হবে। এর মূল কারনটি হচ্ছে, বিএনপি’র আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্যএ অভিযোগ থেকে খালেদা জিয়াকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। এটি বিশ্লেষকরা মোটামুটি নিশ্চিত যে, বর্তমান ঐক্যমতের সরকার বিএনপিকে দুর্বল কিংবা ছিন্নভিন্ন করে দেবার জন্য সবরকম নোংরা রাজনৈতিক খেলায় অবতীর্ণ হবে এবং রাজপথে দাঁড়াতে দেবে না, যেমনটি দেয়নি গত ৫ বছরে। এক্ষেত্রে জনগন এবং জনমতকে সংগঠিত করতে না পারলে, সামনে থেকে নেতৃত্ব না দিতে পারলে দল হিসেবে আগামীতে বিএনপির পরিনতি কি হবে ইতিহাসের পাঠক মাত্রই তা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন।

এই মূহুর্তে পরিস্থিতি কি? জনগন নির্বাচনে বিএনপিকে দেখতে চেয়েছে। বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্বেও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। উল্টো জামায়াতকে সঙ্গী করে তাদের দায় ঘাড়ে নিয়ে আওয়ামী লীগের পাতানো ফাঁদে বিএনপি হেটেছে। জামায়াতের চাপ, প্রবাসী পুত্রের ইচ্ছে এবং দলীয় অনমনীয় জেদের কারনে দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় বিএনপি হেরে গেছে কিনা সে বিচারের ভার পরবর্তী ইতিহাসের। তবে বিএনপি যে রাজনৈতিক দল হিসেবে গভীর সংকটে পড়ে গেছে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। প্রধান বিরোধী দলের এরকম সংকটের সাথে দেশের সংকটও গভীরভাবে সম্পর্কিত থাকে। কারন এটি নিশ্চিত যে, বিরোধী দলবিহীন বর্তমান সংসদীয় সরকার নিকট ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের কোন জায়গায় নিজেদেরকে প্রতিস্থাপিত করবে সেটি দেখার জন্য জনগনের অপেক্ষা করা ছাড়া এখন কোন গত্যন্তর নেই যদি না বিএনপি এর বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিয়ে জনগনের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, জনরায়ের ভয়ে ক্ষমতাসীনরা এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে যে, যাতে সেখানে বিরোধী দলের অংশ নেয়ার কোন উপায় না থাকে। এর বিপক্ষে কৌশল হিসেবে জনরায়কে পক্ষে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ক্ষমাহীন ব্যর্থতার কারনে কার্যত: বিএনপি অসহায় একটি দলে পরিনত হয়েছে।

পাঠকের মনে পড়বে, ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে রাজনীতিতে বিএনপির এরকম অসহায় হতচ্ছাড়া চেহারা দেখা গিয়েছিল। ডা: মতিন, শাসসুল হুদা, মওদুদ গংরা সামরিক সরকারের সাথে হাত মিলিয়েছিল। ওবায়দুর রহমানের নেতৃত্বে দল ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তারপরেও এই সময়কালেই ক্ষমতার দল বিএনপি একটি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে সত্যিকার রাজনৈতিক বিকাশ ঘটিয়েছিল সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানে অনমনীয় ভূমিকার কারনে। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে দলটি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল। মাত্র দুই দশক পরে সেই দলটির ভুল কৌশল এবং অতিমাত্রায় তারেক নির্ভরতা, সর্বোপরি জামায়াতের একাত্তরে গণহত্যার সাথে যুক্ততার দায় ঘাড়ে নিয়ে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এমনকি দলীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও। কারন ১৯৮৩৯০ পর্যন্ত দল হিসেবে বিকশিত হলেও গত দুই দশকে বিএনপি তার সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী চরিত্র হারিয়ে ক্ষমতার দলে পর্যবেসিত হয়েছে। যে কারনে তাকে জামায়াত ও জাতীয় পার্টির মত দলের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়।

আগেই বলা হয়েছে, জনসমর্থন পক্ষে থাকায় ক্ষমতাসীনরা শুরু থেকেই বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার যে মিশন হাতে নিয়েছিল, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত সেই ফাঁদেই পা দেয়। এক্ষেত্রে তাদের ভরসা ছিল জামায়াত ও হেফাজত। অন্যদিকে, ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ঘোষিত লাগাতার অবরোধহরতাল কর্মসূচিকে ভয়াবহ সহিংসতায় বাস্তবায়নের যে পথ জামায়াত নেয়, তা অচিরেই আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। সরকারের দমনপীড়নের মুখে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আত্মগোপনে চলে গেলে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রনই হারিয়ে ফেলে বিএনপি। এর ফলে ডান দিকে ঝুঁকে পড়া মধ্যপন্থী হিসেবে বিএনপির অবস্থানও হারিয়ে যেতে থাকে। আর এই অবস্থানগত কারনেই জনগন এখন বিএনপিকে জামায়াত, হেফাজতের সহযোগী মনে করছেন।

একটি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে যে অর্জন বিএনপি ৮০ ৯০ দশকে অর্জন করেছিল জনসমর্থন পেয়েছিল, চলতি শতকে ক্ষমতাসীন হয়ে এবং বিরোধী দল হিসেবে ক্ষমাহীন ব্যর্থতা তাদেরকে অসংখ্য জিজ্ঞাসার মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া এ সকল বিষয় কতটুকু অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন জনগন এখনও তা জানে না, তবে তদীয় লন্ডন প্রবাসী পুত্র যে এটি বুঝতে পারেননি, তার প্রমান মেলে লন্ডনে সংবাদ সম্মেলনে এবং সেটির ভিডিও বার্তা থেকে। এছাড়াও দলের ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর সাথে কথোপকথন থেকে জানা যাচ্ছে, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের প্রতি তারেকের অবিশ্বাস ও অনাস্থা। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক, বিশেষ করে বিএনপির জন্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গ্রহনযোগ্য এবং ভাল নেতা হিসেবে ফখরুল ইসলাম আলমগীর সুপরিচিত। ৫ জানুয়ারীর আগে ও পরে মাতাপুত্রের বক্তব্য এবং বিবৃতির মধ্যে পার্থক্যের কারনে জনমনে নানারকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে, যা এই মূহুর্তে বিএনপির জন্য আরো বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।

আপাতত: মনে হচ্ছে, আন্দোলন এবং কৌশল নির্ধারনে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। এর মূল কারন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের দেখানো পথে তারা হাটতে গেছে। আওয়ামী লীগের বাইরে রাজনীতির মাঠে মধ্যপন্থী ও গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠির সমর্থন জড়ো করার বদলে জামায়াত এবং হেফাজতের ওপর ভর করে সফল আন্দোলন তারা গড়ে তুলতে চেয়েছে। বিএনপি’র প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ভুল প্রমানিত হয়েছে যে, ব্যর্থ ও গণবিরোধী একটি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্দ জনগন রাস্তায় নেমে এসে সরকারের পতন ঘটিয়ে দেবে। সেটি তারা করতে পারতেন, যদি গত ৫ বছর জনগনের স্বার্থে সংসদে এবং রাজপথে জনইস্যু নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারতেন। একটি একক সরকার, বিরোধী দলবিহীন সংসদ এবং ক্রমাগত স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে জনগনকে কিভাবে সংগঠিত করবে বিএনপি, নাকি অস্তিত্ববিহীন একটি দলে পরিনত হবে, সেটি নির্ধারন করার সময় তাদের জন্য এখনই। নতুবা আর কখনই নয়!