Home » রাজনীতি » জনগণকেই কঠোর হুমকি

জনগণকেই কঠোর হুমকি

আবীর হাসান

police-12প্রতিপক্ষকে হুমকিধামকি দেয়া হয় তখনই যখন নিজের বিবেকের কাছে মনে হয় অনুচিত। পাপবোধ যখন তারা করে ফেরে। বাংলাদেশে গত ১০ মাস ধরে সবাই সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে। আর জনগণের দুর্ভাগ্য হলো পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো নৈতিকতার পথ ছেড়ে অনৈতিকতার পথকেই সুবিধাজনক মনে করেছে। সভ্যতার নিয়মের বদলে ফিরে এসেছে জঙ্গলের নিয়ম। গণতন্ত্রকে জ্বালানো পোড়ানো হয়ে গেছে। তাই সৎকারেরও আর প্রয়োজন দেখছে না কেউ। নবম সংসদের পচা লাশ পুঁড়ে বা জ্বালিয়ে না ফেলেই মুন্ডুহীন দশম সংসদ যাত্রা শুরু করলো বলে। নির্বাচনের পর সংবিধানের বাইরে বেরিয়ে যাওয়াটা যে খুব সহজেই করা যায় তার প্রমাণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। এত বড় জয় তবু সুখ উপভোগ করতে পারছেন না। কারণ স্বস্তি নেই, ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ইউরোপআমেরিকা। ভারতও অভিনন্দনহীন, তবু যা হোক রাশিয়া খানিকটা কৌশলী প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, এ সরকারের সঙ্গে কাজ করবে তারা।

বেশ বেশ। ওতেই আপাতত চলতে পারে কারণ আরও অনেক দেশে চলছে, সিরিয়ার উদাহরণ সর্বোৎকৃষ্ট। সেদেশে সংখ্যালঘুর শাসন, গণতন্ত্রের নামে বিরোধীদের দমন, বোমা মেরে নারীশিশু হত্যা কিছুই না জায়েজ নয়। তাই হুমকি দেয়াই যায় কঠোর থেকে কঠোর হওয়ার। আর এই তো প্রথম নয় যে দল স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই নিজের জনগণের ওপর ‘লাল ঘোড়া দাবড়ে’ দিতে পেরেছিল তারা কঠোর তো হবেই প্রতিপক্ষের ওপর। জেলখানাগুলো ভরে উপচে পড়েছে তাতে কি? বন্দীরা শীতের কম্বল পাচ্ছে না, খাবারের মান আরও নামানো হয়েছে। তাতেও এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর কোন ভ্রƒক্ষেপ নেই। জনগণ তার কাছে একটা বিমূর্ত বিষয়। প্রাণ সর্বস্ব মূক ও বধির সত্তা। ওদেরকে চাপের মধ্যে রাখতে পারলেই ক্ষমতা ধরে রাখা যায়। কারণ সচেতন বিরোধীরা সুযোগ পেলেই ওদের প্রলোভন দেখাবে উস্কানি দেবে। বিরোধীদের জন্য কঠোরতা সিরিয়ার এই নীতিই এখন পালনীয়। ওরা হঠাৎ করে এমন হয়নি। বেশ নিয়ম মেনেই ওটা করেছিলেন বাশার আল আসাদের বাবা হাফিজ আল আসাদ। আর তাকে বুদ্ধিটা দিয়েছিলেন ইরাক ও সিরিয়ার বাথ পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মইকেল আফলাক গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে। বলেছিলেন গণতন্ত্রের সঙ্গে দাঁত ও নখ সংযোজন করতে। সে সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়ন ওই নীতিকে সমর্থন করে গিয়েছিল দু’দেশেই এমনকি ব্যাপক কমিউনিস্ট নিধন সত্ত্বেও। এখনকার রাশিয়া তো পুতিনতন্ত্রী তাদের সমর্থ পেলে তো আর কিছুই লাগে না। অতএব চুপ করিয়ে রাখাটাই সর্বোত্তম পন্থা এখন।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী ওই কথাটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নির্বাচনে যা ভোট পেয়েছেন তাতেই তিনি সন্তুষ্ট, যারা নির্বাচনে অংশ নেয়নি এবং যারা ভোট দিতে যায়নি তাদের বলার কিছু নেই। একদিন পরেই বিএনপি নেত্রীকে সোজা বলে দিয়েছিলেন চুপ থাকতে। আর ১০ জানুয়ারি বললেন, কঠোর থেকে আরও কঠোর হবেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কার ওর কাদের ওপর আরও কঠোর হবেন তিনি। বিএনপিজামায়াত এবং ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যাপারে কঠোরতা তো দেখিয়ে ফেলেছেনই। এবার কি তাহলে বাকি রয়েছে ৬০ শতাংশের মতো ভোটার (তাদের হিসাবেই) যারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিতে যায়নি তারা।

অনেকেই মনে করছেন খালেদা জিয়া আর জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, ওই কঠোরতার কথা। কিন্তু খালেদার প্রতি কঠোরতা তো তিনি দেখিয়ে ফেলেছেন। এখন আর কি দেখাবেন? জনশ্রুতি আছে, ‘খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ রাখা আরও চলতো যদি না কেউ বলে বসতো অং সান সুচি হয়ে যেতে পারেন, খালেদা এমন কি নোবেল পুরস্কারও জুটে যেতে পারে তার।’ এই আশঙ্কাতেই নাকি বালির ট্রাকসহ অবরোধের সশস্ত্র পাহারা সরিয়ে নেয়া হয়েছে। রটনা থেকে সাবধান থেকেই কিন্তু কঠোরতার হুমকির বিষয়টাকে আরও বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে সিভিল সোসাইটির আশাবাদীদের ওপর এবার নামবে চাপাতির কোপ। এখনও যারা আশা করেন অচিরেই গণতন্ত্রকে সুস্থ ধারায় ফিরাবেন শেখ হাসিনা, তাদের জন্য করুণা করা ছাড়া কোন উপায় নেই। এই আশাটা হচ্ছে নপুং সকের আশা, অক্ষম নির্যাতিতের শেষ ভরসা। কারণ খায়রুল, রকিবুদ্দিনদের মতো বাধ্যের বাধ্য আরও অনেকেই। আছে এদেশে এবং তারাও এই সিভিল সোসাইটির মধ্যে থেকেই বেরিয়েছে। লক্ষ্য করেছেন একটাও কবিতা বা নাটকে নব্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধবাদীতা নেই।

আশা এখন তাই কুহক। গণতন্ত্র সহসাই ফিরছে না। ক্ষমতার মোহবিষ্টরা তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করেছে। সেই সঙ্গে গেছে আইনের শাসন, মানবতা আর সুস্থতার বাচার সুযোগও। ভীত স্বৈরাচার এখন কায়েম করেছে পুলিশর‌্যাবতন্ত্র। নিজেদের জন্যও তারা তৈরি করেছে জিন্দানখানা। অন্যরা বাইরে স্বাধীন সত্তা নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, উদ্যমউচ্চাশার কথা বলবে তাও তারা হতে দেবে না। হুমকিটা মাত্র দেয়া হলো এমন মনে করারও কারণ নেই হুমকির ঘোষনার আগেই ওটা শুরু করে দেয়া হয়েছে। ওরা হত্যা করেছে ওদের বিবেককে এবং জেনে শুনেই। যারা বলেন না বুঝে করে ফেলার কথা, তারা ভুল করছেন খুব ভুল করছেন।।