Home » আন্তর্জাতিক » দেবযানী এবং ভারতের ‘মাথা উঁচু’ রাখা

দেবযানী এবং ভারতের ‘মাথা উঁচু’ রাখা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ইকোনমিস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে

debjani-2তার মাথা উঁচু ছিল’ ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগোড়ে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার সময় তার আইনজীবী এমন মন্তব্যই করেছেন। ওই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার গৃহকর্মীকে ঠকিয়েছেন এবং তার জন্য ভিসা সংগ্রহের সময় প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনা হয়। তবে ভারত এর আগেই দেবযানীর চাকরি জাতিসংঘে স্থানান্তরিত করার কারণে তিনি পূর্ণ কূটনীতিক দায়মুক্তি সুবিধা পেয়ে যান। এই দায়মুক্তি সুবিধা প্রত্যাহার করতে যুক্তরাষ্ট্র অনুরোধ করেছিল। কিন্তু ভারত তা মানতে রাজি হয়নি। এমন এক পরিস্থিতি তাকে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে বলে ওয়াশিংটন। ভারত তাকে জাতিসংঘে না রেখে নয়া দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে বলে। আর তিনিও ‘মাথা উঁচু’ করে দেশের পথ ধরেন। ভারতের ‘সার্বভৌমত্ব’ রক্ষা পেল গৃহকর্মীকে প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক কম বেতন দিয়ে কিংবা তাকে অতিরিক্ত খাটিয়ে তিনি কোনো অন্যায় করেছিলেন কি না সে প্রশ্ন না করেই।

দেবযানীর বাবা উত্তম খোবরাগোড়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তার মেয়েকে সাক্ষাতকার না দিতে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি সম্ভবত গৃহকর্মী সঙ্গীতা রিচার্ড, তার স্বামী এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি তার বিদ্বেষ চেপে রাখতে পারেননি।

শুক্রবার সকালে দেবযানীর বাবা সাংবাদিকদের বলেন, “মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক কর্মকর্তা দেবযানীকে বিদায় জানাতে এসে তাকে বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম, আমি দুঃখিত, ভুল হয়েছিল।’ জবাবে দেবযানী বলেন, ‘আপনারা এক ভালো বন্ধু হারালেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। বিনিময়ে আপনারা পেলেন এক গৃহকর্মী আর এক মাতাল গাড়িচালক। তারা আসছে, আমরা যাচ্ছি।’”

ডিসেম্বরে যখন দেবযানীকে গ্রেফতার করা হয়, তখন ভারত সরকার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাকে হাতকড়া পরানো, বিবস্ত্র করা এবং সাধারণ অপরাধী ও মাদকাসক্তদের সাথে আটকিয়ে রাখার ঘটনায় ভারতজুড়ে এত উত্তাপের সৃষ্টি হয় যে ভারতযুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শীতল হয়ে পড়ে।

ভারতে নিয়োজিত আমেরিকান কূটনীতিকদের প্রতিও ভারত সরকার প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রাথমিকভাবে এর অন্যতম ছিল দিল্লিতে দূতাবাসের বাইরের নিরাপত্তামূলক সড়ক প্রতিবন্ধকতাগুলো সরিয়ে নেওয়া। এছাড়া দূতাবাসের খাবার ও অ্যালকোহল আমদানির বিশেষ সুবিধা বাতিল করা হয়, আমেরিকান কনস্যুলার কর্মী এবং তাদের পরিবারের জন্য নতুন পরিচয়পত্র ইস্যু করে বলে দেওয়া হয় যে তারা গুরুতর কোনো অপরাধ করলে গ্রেফতার করা হবে। আমেরিকান কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদল দিল্লিতে বিরূপ অবস্থার মুখে পড়ে। চলতি মাসে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী আরনেস্ট মনিজের ভারত সফরও বাতিল করা হয়েছে।

দেবযানীর গৃহকর্মী সঙ্গীতা রিচার্ড প্রসিকিউটরদের জানিয়েছিলেন, তাকে সপ্তাহে ৯৪ থেকে ১০৯ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হতো। গত গ্রীস্মেও তিনি দেবযানীকে বলেছিলেন, এই হাড়ভাঙা খাটুনি তার সহ্য হচ্ছে না, তিনি দেশে চলে যেতে চান। কিন্তু দেবযানী তাতে সাড়া দেননি, এমনকি তার পাসপোর্টও ফিরিয়ে দেননি। ফলে তিনি আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

ভারত কিংবা দেবযানীকেউই কিন্তু আইনের মাধ্যমে আইনের আশ্রয় নেওয়াকে সম্মানজনক বিবেচনা করেনি। যদিও এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রায় ২০টি মামলা হয়েছে। ভারত, কুয়েত, ফিলিপাইন, তানজানিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এতে জড়িত ছিলেন। নির্যাতনের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বড় অঙ্কের বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে এনে অমানবিক পরিশ্রম করানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে জরিমানা দিয়ে তাদের রেহাই পেতে হয়েছে। ভারতীয় কূটনীতিকদের বিরুদ্ধেও এ ধরনের অভিযোগ আগেও এসেছিল। ২০০৯ সালে ওই সময়ের কনস্যাল জেনারেল প্রভু দয়ালের বিরুদ্ধেও দেবযানী ধরনের মামলা হয়েছিল। অবশ্য নিষ্পত্তি হয়েছিল আদালতের বাইরে। তবে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ জানা যায়নি।

এই ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র সঙ্গীতা রিচার্ডও চাইছিলেন, দেবযানী যেন আদালতের মাধ্যমে ফয়সালার উদ্যোগ নেন। নিউ ইয়র্কের ভিক্টিম সার্ভিস এজেন্সি সেফ হোরাইজনের মাধ্যমে সঙ্গীতা একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তাতে তিনি দেবযানীর যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের বিষয়টি জানতে পেরে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি শ্রমিক হিসেবে আমার অধিকারের জন্য দাঁড়িয়েছি। আমার একমাত্র ইচ্ছা ছিল, দেবযানীও আদালতে দাঁড়িয়ে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মোকাবিলা করবেন।’

গৃহকর্মীকে ঠকানোর বিষয়টি নিয়ে এমন হৈচৈ আমেরিকানরাও হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ম্যানহাটনের মার্কিন অ্যাটর্নি প্রিট ভারারা এমনই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ভারতীয় পত্রপত্রিকাগুলোতে প্রতিনিয়ত তাদের দেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর প্রকাশ করে, সেখানে তো গৃহকর্মীদের প্রতিই সহানুভূতি দেখানো হয়।

কৌশলগত অংশীদার’ আমেরিকা ও ভারত উভয়ের জন্যই এই অশোভন টানাপোড়েন কেবল অস্বস্তিদায়কই নয়, আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ একটি ঘটনা বাস্তবে অত্যন্ত সঙ্কটজনক হয়ে দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিষয়টি পরিণত হয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ, আর ভারত মনে করতে থাকে উদ্ধত এক পরাশক্তি তার সার্বভৌমত্বে আঘাত হেনেছে।

বিরোধ মীমাংসার চেষ্টায় মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেশ বড় ছাড় দেয়। তারা এমনকি একথাও মৌনভাবে স্বীকার করে নেয় যে গ্রেফতারের সময় দেবযানী দায়মুক্তি অবস্থায় থাকুন আর নাই থাকুন, তার সাথে বাজে আচরণ করা হয়েছিল। তবে নয়া দিল্লি থেকে দেবযানীর সমমানের মার্কিন কূটনীতিককে বহিষ্কারের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র অনিচ্ছুকভাবে মেনে নেওয়ায় মনে হচ্ছে যে, দুই দেশের মধ্যকার এই বৈরিতার এখানেই অবসান ঘটছে।

ভারতীয় নাগরিকদের মর্যাদা রক্ষার দৃঢ় অবস্থানের জন্যই নয়, সেইসঙ্গে এই ঘটনা যাতে ভোটের বাজার নষ্ট না করে, সেদিকে লক্ষ রাখার জন্যও দিল্লিকে শক্ত অবস্থান নিতে হয়েছিল। সরকার ভারতীয় নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করছে নাএমন ধারণার সৃষ্টি হলে অনেক ভোট হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা ছিল। আরো বড় ব্যাপার হলো, দেবযানী দলিত তথা অচ্ছ্যুৎ সম্প্রদায়ের সদস্য। ভারতের মোট ভোটারের মধ্যে তারা ১৫ শতাংশ। নির্বাচনী যুদ্ধে এই ভোট অনেক হিসাব পাল্টে দিতে পারে।

তবে বাস্তবে দেবযানীকাণ্ড শেষ হতে আরো অনেক সময় লাগবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করলেও তার পরিবার নিউ ইয়র্ক রেখে এসেছেন। তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে চাইবেন না। তার স্বামী ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক (কলেজের অধ্যাপক)। তার দুই সন্তান (বয়স ৭ ও ৪ বছর) সেখানকার স্কুলেই পড়াশোনা করে। যেহেতু আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ‘মুলতবি’ রয়ে গেছে, তাই তাকে আমেরিকা ফিরতে হলে তার পূর্ণ দায়মুক্তি সুরক্ষার প্রয়োজন হবে।

তবে এই ঘটনাটি অনেক বড় বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। অনেকের মতে, দেশ দুটি একে অপর সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, সেটাই অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করা হয়, আমেরিকা এখনো তার সত্যিকার অংশীদারকে প্রাপ্য মর্যাদা দিতে অনিচ্ছুক। আর আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ভারতীয় প্রতিক্রিয়ায় এটাই প্রকাশ করে দিচ্ছে যে, ভারত একদিকে অতি অল্পতেই নিজের মর্যাদা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং অন্যদিকে আমেরিকার বিচারব্যবস্থার এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গৃহকর্মীর কল্যাণ কামনার উদ্বেগের প্রতি বিরূপ। মনে হচ্ছে, দেশ দুটি অংশীদার নয়, তারা পরস্পরের কাছে অপরিচিত।।