Home » অর্থনীতি » বিদ্যুৎ নিয়ে ভাওতাবাজী :: টের পাওয়া যাবে গ্রীষ্মে

বিদ্যুৎ নিয়ে ভাওতাবাজী :: টের পাওয়া যাবে গ্রীষ্মে

বি.ডি.রহমতউল্লাহ্

load-shadingবিদ্যুৎ খাতে বিরাজমান আজকের সংকট কারিগরী কারণে নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা আর দূর্নীতির প্রচন্ড ছোবলে ক্ষতবিক্ষত। একই সাথে জ্বালানী তথা কয়লা ও গ্যাস খাতও সীমাহীন সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষন করলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, জ্বালানী নিরাপত্তা বলতে যা বুঝায় তা আজ স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত। যে জ্বালানী সরবরাহের কোন নিশ্চয়তা নেই, জ্বালানীর গুণ মানসম্মত নয়, জ্বালানী খাত আর্থিক ও কারিগরীভাবে স্বয়ম্ভর হয়ে উঠতে পারছে নাজ্বালানী খাতই নিরাপত্তাহীনতায় নিমজ্জিত এক বিধ্বস্ত খাত। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপাত্ত যেহেতু জ্বালানী সুতরাং নিরাপত্তাবিহীন এক বিধক্ষস্ত জ্বালানী সরবরাহের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটছে বিদ্যুৎ খাতেও। দেশের বিদ্যুৎ খাতও আজ নিরাপত্তাহীন, বিধক্ষস্ত এবং আকণ্ঠ সংকটে। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে গত প্রায় ২০ বছরের ইতিহাস ঘাটলে এবং প্রতিটি প্রকল্প ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিশ্লেষন করলে দেখা যায় যে সারা বিশ্বে তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বভূক্ত দেশগুলোতে যে সবদেশে সরকার প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে জনগনের কল্যানে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করতে পারে না বা চায় না, সেসব দেশে বিদুৎ, জ্বালানী, কৃষি, টেলিযোগাযোগ, নদী, বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌত অবকাঠামোগুলোতে প্রধানতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রভাবিত দেশগুলো, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ইত্যাদির মাধ্যমে জনস্বার্থবিরোধী প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এর ফলে ধনী দেশগুলো তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে প্রয়োজনীয় সম্পদ যেমনতেল, গ্যাস,খনিজ সম্পদ পাচার করে নিয়ে যায়তেমনি তাদের উৎপাদিত মালামাল, পরামর্শক এসব দেশে বিক্রি করার অবাধ বাজার সৃষ্টি করে। কাজেই আমরা দেখি এবং খুবই সঙ্গত কারনে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাত সমূহ বিশেষতঃ জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতের মতো প্রায় সকল প্রকল্প অধিকাংশ সময়ে আমাদের প্রয়োজনে বাস্তবায়িত হয় না। ধনী দেশ সমূহের বাণিজ্যের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে হয় বলেই এসব খাতে সংকট লেগেই থাকে। আজ এ আলোচনা আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এজন্যে যে সরকার সম্প্রতি লোড্শেড্ হ্রাস পাওয়ার ফলে বেশ জোরেশোরে মিথ্যার ফানুস উড়িয়ে চল্ছে এই বলে যে তাঁরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের সংকট সমাধান করে ফেলেছেন। বিষয়টি বুঝতে হলে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতের সংকট গুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। সরকার যে রেন্টালের মাধ্যমে পুরোনো উপকেন্দ্র বসিয়ে বিদ্যুৎ সংকট সমাধান করেছেন বলে চীৎকার করছে তা অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং এর মাধ্যমে তা শুধু নিজেদের অবৈধ পয়সা লুট করার সুযোগ ¯ৃষ্টি করে জাতির উপর একটি বিরাট বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আগামী গ্রীস্মকাল থেকেই এ পুরোনো উপকেন্দ্রগুলো ভেঙে পড়া শুরু করবে। এ অবৈধ লুটের ফলে ইতোমধ্যেই বিদ্যুতের মূল্যে ইউনিট প্রতি ২.৫০ থেকে বেড়ে ৬.৫০ টাকা হয়েছে।

এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের মুখে পড়লো। বিশেষজ্ঞরা বললেন অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে ও অল্প সময়ে এ সংকট সমাধান যোগ্য। কিন্তু অতীতে সরকারের ন্যয় এ সরকারও এ ধরনের তথাকথিত জটিল কারিগরী ও অর্থনির্ভর প্রকল্প নিংড়ে অর্থ কামাবার লোভ সম্বরন না করার ফলে ওপথে যায় নি। একই সিন্ডিকেটের অধীনে এরাও অবৈধ রেন্টাল মার্চেন্ট প্ল্যান্টসহ বিদেশ নির্ভর সব ধরণের গর্হিত প্রকল্প নির্মানে গেল এবং সমস্যাকে জিইয়ে রাখলো। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সৃষ্টি অব্দি সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অপরাধমূলক, সবচেয়ে কলংকজনক, সবচেয়ে দূর্ণীতিগ্রস্ত, সবচেয়ে বেপরোয়া, সবচেয়ে অনৈতিক, সবচেয়ে অস্বচ্ছ এবং সবচেয়ে জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিল অযাচিত (unsolicited) রেন্টাল বিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে। এরা এটার নাম দিয়েছে”কুইক রেন্টাল”।

বিদ্যুৎ খাতে এ ধরনের ব্যতয়গুলো ইচ্ছে করে ঘটানো হচ্ছে। কারণ নীতির বাইরে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে এ ধরনের জটিল কারিগরী খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দূর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ খাতে সংকট জিইয়ে রেখে দীর্ঘ কয়েক বছর এখাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে আজ বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা বুঝতে নীচের প্রতিবেদনটির দিকে নজর দিতে অনুরোধ করছি (ডিসেম্বর ২০১৩ ইং পর্যন্ত) :

 bd-1

এ সমস্যা সমাধানে আমরা সুষ্পষ্টভাবে নীচের পদক্ষেপসমূহ নিতে পারতাম:

() দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সাশ্রয় বৃদ্ধি ও পুরোনো পাওয়ার ষ্টেশনের দক্ষতা বৃদ্ধি করে ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ৩৫০০ মেঃওঃ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতো। এতে সর্বাধিক ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় হতো। এছাড়া সিষ্টেম লস্ ন্যুনতম আরো ৪% হ্রাস করলে বিলও বৃদ্ধি পেতো এবং ২০০ মেঃওঃ বিদ্যুৎ চাহিদা হ্রাস করা যেতো।

() এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করে ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ৬০০ মেঃওঃ বিদ্যুৎ চাহিদা হ্রাস করা যেতো।এতে সর্বাধিক ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হতো।

() দেশে চালিত সব বিদ্যুৎ মোটরে আধুনিক মোটর কন্ট্রোলার বসিয়ে এক বছরের মধ্যে ৭০০ মেঃওঃ বিদ্যুৎ চাহিদা হ্রাস করা যেতো। এতে সর্বাধিক ১০০০ কোটি টাকা ব্যয় হতো।

() বিদ্যুৎ লাইনের যথাযথ স্থানে ও শিল্পকারখানায় ক্যাপাসিটর স্থাপন করে এক বছরের মধ্যে ২৫০ মেঃওঃ বিদ্যুৎ চাহিদা হ্রাস করা যেতো। এতে সর্বাধিক ১০০০ কোটি টাকা ব্যয় হতো।

() শিল্পকলকারখানায় শিল্প মালিকদের নিজস্ব ব্যয় ও উদ্যোগে স্থাপিত ওদের ব্যাক্তিগত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অব্যবহ্যত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রনীত চুক্তির মাধ্যমে ক্রয় কওে সিষ্টেমে ব্যবহার করা যেতো। এতে প্রায় ১০০০ মেঃওঃ বিদ্যুৎ পাওয়া যেতো।

() নবায়নযোগ্য জ্বালানী যথা সূর্য্য, বায়ূ ও বায়োমাস ব্যবহার করে অত্যন্ত স্বল্প সময়ে ন্যুনতম ২৫০০ মেঃওঃ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতো। তাতে প্রাথমিক ব্যয় একটু বেশী হলেও জ্বালানীর কোন ব্যয় নেই বলে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এগুলি প্রকৃত অর্থেই সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব।

পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ সমস্যাকে জিইয়ে রেখে এরা এক ঢিলে বহু পাখী মারার কৌশল অবলম্বন করলো। বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের জন্য প্রাথমিক ফুয়েলের (গ্যাস, কয়লা, পানি) জরুরী প্রয়োজনীয়তার অহেতুক উছিলা তুলে তাঁরা এশিয়া এনার্জির কাছে ফুলবাড়ী কয়লাখনি হস্তান্তরের জন্য দিশেহারা হয়ে উঠলো। উদ্দেশ্য জনগণকে বোকা বানানো, যেন জনগণ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ রক্ষা করার আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করে যার ফলশ্রুতিতে দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে সরকারও অবৈধভাবে এশিয়া এনার্জির কাছে ফুলবাড়ী কয়লা খনি দিয়ে দিতে পারে। জনগণকে ফুলবাড়ীর ব্যাপারে যখোন বিভ্রান্ত করা গেল না, তখোন বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের জন্য সরকার হৈ চৈ শুরু করলো যে আমাদের গ্যাস তুলতে হবে। সাগরবক্ষে অনেক গ্যাস, এতো আমরা তুলতে পারবো না। বিদেশীদের দিয়ে দেই। ওরা কিছু নিবে, বাইরে বিক্রি করবে আর আমাদের কিছু দিবে এবং ঐ গ্যাস দিয়ে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবো। কি চমৎকার সমাধান। কিন্তু তাতেও জনগণ সায় দিচ্ছে না।

গ্যাস সংকট ও সমাধান

তার পরপরই সৃষ্টি করা হলো এক মহা গ্যাস সংকট। বলা যায় একেবারে কাঁচাহাতে সরকার কৃত্রিম উপায়ে গ্যাস সংকট সৃষ্টি করলো। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ হিসেব কষে দেখিয়ে দিল আসলে গ্যাসের কোন সংকটই নেই। দেশের স্বার্থে বিকিয়ে দিতে যা প্রয়োজন তা করতে কোন দ্বিধা নেই। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা আছে প্রায় ৩২৫ কোটি ঘনফুটের। ঘাটতি আছে প্রায় ৬৫/৭৫ কোটি ঘনফুটের। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় গেল ২০০৯ সালে ৪টি কূপের ওয়ার্কওভার এবং ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের ২টি উন্নয়ন কূপ খনন করে দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল অনেকটা ইচ্ছে করেই এক্ষেত্রেও সরকারের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ৫টি উন্নয়ন কূপ, ৪টি ওয়ার্কওভার কূপ এবং ৪টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে ২০১১ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে অন্ততঃ ১৩টি নতুন কূপ থেকে দৈনিক ৪৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অনেকটা ইচ্ছে করেই এক্ষেত্রেও সরকারের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। এ প্রসঙ্গে জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচুর গ্যাস আছে। সরকারের মধ্যকার জাতীয় স্বার্থবিরোধী একটা অংশের অপতৎপরতার ফলে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা যাচ্ছে না। তাই গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না প্রত্যাশামত। দেশবিরোধী এই চক্রটি এখন গ্যাসের কৃত্রিম সঙ্কট সৃস্টি করছে। যে কোনো মূল্যে তারা গ্যাস বিদেশে পাচার করার জন্য মুখিয়ে আছে।

কয়লা সংকট ও সমাধান

দেশে প্রাপ্তব্য গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে বিলম্ব ঘটানো হচ্ছে। আপাতত: জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যাসিফিকেশানের মাধ্যমে কয়লা ব্যবহার করে”কয়লা নির্ভর” এলাকা ভিত্তিক ছড়ানো উৎপাদনের মাধ্যমে আগামী ২০ মাস থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে প্রায় ৩০০০ মেঃওঃ (যা পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ১২ মাসের মধ্যে ৬০০০ মেঃ ওয়াটে উত্তীর্নযোগ্য সে সুযোগ রেখে) বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা। তবে এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কয়লা আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যাসিফিকেশানের মাধ্যমে উত্তোলন করে ব্যবহার করার কথা সামনে রেখে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে।

জনগণের কল্যাণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়ন

টেকসই জ্বালানী ব্যবহারের স্বার্থে এবং জ্বালানী নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রতিটি জ্বালানী ব্যবহার করে সম্ভাব্য কি পরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব,তাতে কত ব্যয় এবং সম্ভাব্য নির্মাণ সময়, জ্বালানীর মজুদ ও উক্ত জ্বালানী দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রাপ্তির ব্যপ্তিকালের একটি সংক্ষিপ্ত প্রুতবেদন সবাইর অবগতির জন্য উপরে বর্ণিত হলো। তাতে প্রনিধানযোগ্য একটিই শর্ত আর তা হলো যে সরকারকে অবশ্যই “জনগণের সরকার” হতে হবে। এ সংকটের কারণ যে রাজনৈতিক, কারিগরী কারণে নয়, এ কথা এখন খুবই স্পষ্ট। এ ধরনের সরকারগুলো জণগণের স্বার্থ শুধুমাত্র কমিশনের লোভে কত সহজে বিলিয়ে দেয়!!