Home » বিশেষ নিবন্ধ » আগেই পরাজিত একদলীয় শাসন (প্রথম পর্ব)

আগেই পরাজিত একদলীয় শাসন (প্রথম পর্ব)

তবুও দলকানা বুদ্ধিজীবীদের বিভ্রান্তিকর যুক্তি

হায়দার আকবর খান রনো

political-cartoons-25৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বলা ভালো, নির্বাচনের নামে এক নির্বাচনী তামাসা আমরা দেখলাম। ৫ জানুয়ারির আগেই ১৫৩ জন সরকার দলীয় প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষিত হয়েছেন। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশী আসনে কোন ভোটই হয়নি। অন্যভাবে বললে অর্ধেকের বেশি ভোটারের ভোট প্রদানের এবং তাদের পছন্দ মতো প্রতিনিধি নির্বাচনের কোনো সুযোগই ছিল না। অর্ধেকের কম আসনে নির্বাচন নামে কিছু একটা হয়েছে। টেলিভিশনের পর্দায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ভোট কেমন হচ্ছে তা দেখার সুযোগ হয়েছে। হায়! একি ভোট। ভোট কেন্দ্রগুলো ফাকা। কোন কোন কেন্দ্রে একটা ভোটও পড়েনি। কিন্তু সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন জানাচ্ছে যে, প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আসলে দুই একটি আসনে কিছুটা ভোটের লড়াই হয়েছে, তাও আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে। সেখানেও সাধারণ মানুষ ছিলেন নির্লিপ্ত। আওয়ামী লীগের দুই স্থানীয় নেতার মধ্যেও প্রতিযোগিতা ছিল, দলীয় কর্মীকে কে কতো ভোট কেন্দ্রে জমায়েত করতে পারে। যেমন হয়েছে ঢাকার একটি কেন্দ্রে যেখানে লীগের এক স্থানীয় নেতা হাজী সেলিম লীগের নৌকা মার্কা প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন। সেখানে একটু বেশি ভোট পড়লেও আমার বিবেচনায়, শতকরা ৯০টি আসনে ভোটের হার ছিল এত কম যে এটাকে আর নির্বাচন বলা যায় না।

তবু নির্বাচন কমিশন বহুগুণ বাড়িয়ে ভোটের হার দেখিয়েছে ৪০ শতাংশ। কোন কোন প্রভাবশালী দৈনিক বলেছে যে, এই নির্বাচনেও ভোট ডাকাতি হয়েছে। সব মিলিয়ে যা হয়েছে তাকে আর যাই হোক নির্বাচন বলা যায় না। তবু নির্বাচন হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা সকল আসন দখল করে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করেছে। একদলীয় শাসনের পরিণাম কিন্তু ভালো হয় না। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সাংবিধানিকভাবেই একদলীয় শাসনের প্রবর্তন করেছিলেন চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। বাকশাল ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থা কিন্তু টেকেনি। হ্যা, এ কথা সত্য যে, কিছু সংখ্যক পথবিচ্যুত ও দক্ষিণপন্থী সেনা অফিসারের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। একদলীয় ব্যবস্থার অবসান ঘটেছিল এক রক্তাক্ত ঘটনার মধ্যদিয়ে। এখানে দুটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত কোন এক ব্যক্তির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কেন গোটা ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়লো। প্রত্যেক মানুষেরই তো মৃত্যু হবে। এটি এক অনিবার্য সত্য। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাভাবিক মৃত্যু হওে কি ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়তো? একদলীয় ব্যবস্থা কিছু কিছু দেশে দীর্ঘকাল থাকলেও এই ধরনের গণতন্ত্রহীন শাসন ব্যবস্থা খুবই ভঙ্গুর হতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, যে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী তিনি সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বহু বছর নির্বাচিত হয়ে শাসন ব্যবস্থায় অধিষ্ঠিত থাকতে পারতেন। সম্ভবত আমরণ। যেমন ছিলেন ভারতের পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। কিন্তু বাকশাল ব্যবস্থা নিয়ে এমন পরীক্ষা ছিল খুবই ঝুকিপূর্ণ এবং ভুল। ভুলের মাসুল তাকে দিতে হয়েছে। ১৯৭৪৭৫ সালের দিকে সরকারের জনপ্রিয়তা নানা কারণে হ্রাস পেলেও আমার ধারণা যে, শেখ মুজিব বাকশাল ব্যবস্থার মধ্যে না গেলে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা পর্যন্ত কেউ করতে পারতো না।

অতীতের কথা আপাতত থাকুক। বাংলাদেশে এরপরেও কখনই সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়নি। নানা ঘটনার মধ্যদিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলেন। তিনিও নিহত হলেন আবারও সেনাবাহিনীর একাংশের হাতে। জিয়ার শাসনামলে একাধিকবার ক্যু’র প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল। প্রথম যে সফল সামরিক ক্যুটি হয়েছিল তাহলো সেনাপ্রধান এরশাদের নেতৃত্বে। এরশাদ শাসন করলেন ৯ বছর। জিয়া ও এরশাদের আমলে সেনাবাহিনী সরাসরি রাজনীতিকে পরিচালনা করতো। এইভাবে সেনাবাহিনী রাজনীতিতে অংশ নিতে শুরু করলো। ১৯৯১ এর পর থেকে সরাসরি সেনা শাসন না থাকলেও ১৯৯৬ সালে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান এবং ২০০৭০৮ সালে সেনা সমর্থিত এক অদ্ভূত ধরনের সরকার আমরা দেখেছি। অর্থাৎ গণতন্ত্রও এখানে মসৃণ পথে অগ্রসর হয়নি। তবু খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছিল। পালাবদল করে দুটি বুর্জোয়া দল ক্ষমতায় এসেছে। প্রত্যেকবারই জনগণ সরকারের কার্যকলাপে ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু দুই দলের বাইরে যায়নি। কারণ তেমন কোন শক্তিশালী তৃতীয় বিকল্প দৃশ্যমাণ হয়নি।

এবারও জনগণ সম্ভবত প্রস্তুত ছিল লীগ সরকারকে সরিয়ে দেবে। গত বছর চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও গাজীপুরের নির্বাচনের ফল থেকেই তা বোঝা যায়। সেটা আচ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ আগেই সংবিধানে ১৫তম সংশোধনী এনেছিলেন। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা উঠিয়ে দিলেন। প্রশাসনকে এমনভাবে সাজালেন যাতে নির্বাচনের সময় ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচনী ফলকে ইচ্ছা মতো প্রভাবিত করা যায়। শেষ পর্যন্ত সেই নির্বাচনই হলো। তার ইচ্ছা মতোই ফল পাওয়া গেছে। বিরোধী দলহীন, ভোটারবিহীন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবকটি আসন পেয়েছেন। অবিশ্বাস্য বিজয়। এই বিজয় নতুন আদলে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করলো। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে এই একদলীয় শাসনের আয়ু কতোদিন? গণকের মতো সবটা বলা না গেলেও এটুকু বলা যায় যে, পূর্ণ মেয়াদ বোধ হয় নবগঠিত সরকার পার করতে পারবেন না। ইতোমধ্যেই সরকারি দলের উচ্চপদস্থ নেতাদের কেউ কেউ নতুন নির্বাচনের কথা বলতে শুরু করেছেন।

১৫তম সংশোধনী পাস করিয়েই শেখ হাসিনা নিজেকে খুব নিরাপদ মনে করেননি। সরকারি দল চেয়েছিল প্রধান বিরোধী দল যাতে নির্বাচনে না আসে। প্রধান বিরোধী দল সেই ফাদে পা দিয়েছিল। নির্বাচনে তারা যাননি। জয় হয়েছে শেখ হাসিনার ও তার দল এবং মোর্চার। কিন্তু এ জয় আসল জয় নয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই সরকারি দলের প্রথম পরাজয় হয়েছে, যখন তারা মহাজোটের বাইরে একটি কার্যকর দলকেও নির্বাচনে শরীক করতে পারেননি। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি বা তরিকত ফেডারেশনকে ধর্তব্যের মধ্যে না নেয়াই ভালো। তবু আসন ও মন্ত্রীত্ব ভাগবাটোয়ারায় তারা কিছু নগদ ফল পেয়েছে। ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা একবার বলেছিলেন, “আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছি, তাই নির্বাচনের দরকার হয়নি।” তিনি আরও বলেছেন, “বিএনপি আসলে তাদেরকেও আসন দিতাম।” কত আসন সেটা তিনি উল্লেখ করেননি। এবার তো বিএনপির জেতার পালা ছিল। তাদেরকে কি তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন দিতেন? বস্তুত নির্বাচনের মতো বিষয়কে এতো হালকা করে দেখানোর আসল অর্থ হলো, “আর গণতন্ত্র নয়, এখন থেকে আবার চালু হলো একদলীয় শাসন।”

শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের দ্বিতীয় পরাজয় হলো ১৪৭ আসনের নির্বাচনেও যথেষ্ট সংখ্যক ভোটার উপস্থিত করাতে ব্যর্থ। আরও বিপজ্জনক দৃশ্য হলো এই যে, এমন নির্বাচনের মধ্যেও আবার কারচুপি হয়েছে। সব মিলিয়ে যা হয়েছে তা একটা বড় ঐতিহাসিক তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবু যা হয়েছে সেটাকে যুক্তিসঙ্গত করতে অনেক বুদ্ধিজীবী ও কিছু সরকারদলীয় বামপন্থীরা নতুন নতুন তত্ত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানের সঙ্কটকে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেরবিপক্ষের দ্বন্দ্ব বলে দেখাচ্ছেন। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধকে রক্ষা করতে হলে গণতন্ত্রকে কিছুটা বাদ দিতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন এই অবস্থাকে বলেছেন, “গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব”।

জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব” কথাটি মাও সেতুং বলেছিলেন চীন বিপ্লব প্রসঙ্গে। বিপ্লব পরবর্তী চীনের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে তিনি এই ভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। এ দেশে ১৯৭১ সালে মহান সশস্ত্র যুদ্ধের পরপরই (যাকে জাতীয় বিপ্লবও বলা যায়) যদি সমাজতন্ত্র অভিমুখী সেই ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করা যেত, তাহলে সেই পরিপ্রেক্ষিতে হয়তো এমন কথার প্রাসঙ্গিকতা থাকতো। বর্তমান শাসক দলের না আছে সমাজতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার (যদিও সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বলা আছে), না আছে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ। অনেকে বলেন যে, মৌলবাদকে ঠেকানো বা যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য সাময়িকভাবে হলেও ফরমাল গণতন্ত্রকে পাশে সরিয়ে রাখতে হবে। বস্তুত গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে পরাস্ত করা যায় না। বরং আলজিরিয়া, তুরস্কসহ পৃথিবীর বহু দেশের অভিজ্ঞতা বলে যে, এতে মৌলবাদী শক্তি ভেতরে ভেতরে আরও শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পায়।

ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র উভয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্তম্ভ। যে চারটি স্তম্ভের উপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দাড়িয়ে আছে তার কোন একটিকে বাদ দিলে সুবিশাল প্রাসাদটি ভেঙ্গে যে সকল দলকানা বুদ্ধিজীবী এখনো এই সরকারের প্রতি সমর্থন করার জন্য নানা বিভ্রান্তিকর যুক্তি হাজির করছেন, তারা এটা বুঝতে পারছেন না যে, নবগঠিত সরকারের আইনগত বৈধতা ও বিদেশী রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকলেও লীগ সরকার ইতোমধ্যেই নৈতিক বল ও অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। আওয়ামী লীগের বড় পরাজয় সেখানেই হয়েছে।।

(চলবে…)

১টি মন্তব্য

  1. amaderbudhbar is excelllent newspappers
    thanks sir amir khusru
    from europe