Home » আন্তর্জাতিক » আমেরিকান সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দুঃখদায়ক ইতিহাস (পর্ব – ১)

আমেরিকান সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দুঃখদায়ক ইতিহাস (পর্ব – ১)

নিকোলাস জে এস ড্যাভিস, জেড ম্যাগাজিন

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

no-war-1মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাটি দৃশ্যত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। গত ১৫ বছর ধরে এটা ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল একতরফা সামরিক শক্তি বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যাতে বোঝা যায় যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং ধক্ষংসকারী সামরিক বাহিনী আমেরিকানদের অন্য দেশের জনগণের চেয়ে বেশি নিরাপদ করেছে কিংবা আরো ভারসাম্যপূর্ণ সামরিক অবস্থান আমাদেরকে বিপদে অরক্ষিত করে রাখবে। অপেক্ষাকৃত ছোট সামরিক বাহিনী দিয়েও অনেক দেশ তাদের জনগণকে রক্ষার কাজটি আরো ভালোভাবে সামাল দিচ্ছে। তারা এই কাজটি করছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, আগ্রাসন এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের ফলে সৃষ্ট বৈরিতা এড়ানোর মাধ্যমে।

বর্তমানে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র প্রশ্নে সফল কূটনীতি প্রমাণ করেছে যে সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় কূটনীতি অবৈধ হুমকি কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার দাবি করছে, তার শক্তি প্রয়োগের হুমকির কারণেই সিরিয়ায় কূটনীতি সফল হয়েছে। এই দাবি সত্য নয়। ঘটনাটি তখনই ঘটেছে যখন আমেরিকান গণতন্ত্রের ঘুমন্ত দৈত্যটি তার দীর্ঘ তন্দ্রা থেকে জেগেছে এবং আমাদের নেতাদের, যারা অনিচ্ছাভাবে ‘কূটনীতিকে শেষ অবলম্বন’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ঘোড়ায় রাখা আঙুলের ফাঁক দিয়ে উঁকিবুকি দিয়েছে। অনেক দিন পর আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কাক্সিক্ষত পথে কাজ করল। জনসাধারণ কংগ্রেসে তাদের প্রতিনিধিদের কাছে তাদের অভিমত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে এবং তারা শুনেছেন। আমরা আমাদের নেতাদেরকে তাদের নিজস্ব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কর্মফল এবং বিরাট কিছু করার প্রপাগান্ডামূলক বর্ণনা বিক্রির প্রয়াস (যা গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের প্রতি তাদের তাচ্ছিল্য প্রদর্শনের দুঃখজনক প্রতিফলন) থেকে রক্ষা করেছি।

আমাদের ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়ে আমেরিকানরা কখনোই বৈশ্বিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের স্বপ্ন দেখেনি। বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে আনুমানিক ১০ লাখ ফিলিপিনোর প্রাণহানিসংশ্লিষ্ট গণহত্যামূলক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত হওয়ার সময়ও আমেরিকান কূটনীতিকরা হেগ শান্তি সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠা করেছেন, যুদ্ধ ও সামরিকবাদের বিকল্প উদ্ভাবনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের আমেরিকান ধারণা খাপ খাওয়ানোর ঐকান্তিক আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আতঙ্কের প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সামাজিক আন্দোলন যুদ্ধ বিলুপ্তির দাবি জানায়। ১৯২৮ সালে মার্কিন সরকার তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক কেলগের নামানুসারে সম্পাদিত ‘কেলগব্রিয়ান্ড প্যাক্ট’ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এতে সাড়া দেয়। এতে প্রধান শক্তিগুলো ‘জাতীয় নীতির হাতিয়ার হিসেবে যুদ্ধ’কে নিন্দা জানানো হয়েছিল। এই চুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধে ব্যর্থ হলেও এর আইনি ভিত্তির জোরেই আগ্রাসনের অপরাধে নুরেমবার্গে জার্মান নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং এটি এখনো কার্যকর রয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ সনদ এবং গণহত্যা, নির্যাতন এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধবিরোধী কনভেনশনের মতো চুক্তিতে তার উপস্থিতি দেখা যায়। আর এসব চুক্তির আওতায় মার্কিন কর্মকর্তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর জার্মানি ও জাপানকে পরাজিত করাটা আমেরিকান সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ছিল না, বরং এটা ছিল মতাদর্শ নির্বিশেষে একটি জোটের সাফল্য। পারস্পরিক বিশ্বাস, প্রাণপ্রাচুর্যময় কূটনীতি এবং অভিন্ন অস্তিত্বগত হুমকির স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন এবং কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নও এই জোটে যোগ দিয়েছিল।

যুদ্ধের পর আমেরিকান, ব্রিটিশ ও সোভিয়েত নেতারা তাদের অভিন্ন স্বার্থের ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন, যা রুজভেল্টের ভাষায় ছিল ‘শান্তির স্থায়ী কাঠামো’। তারা এটা হাসিল করতে চেয়েছিলেন জাতিসংঘ এবং পরাশক্তির অব্যাহত কূটনীতির মাধ্যমে। জাতিসংঘ সনদের অন্যতম ধারা হলো হুমকি বা শক্তি প্রয়োগে নিষেধাজ্ঞা।

ট্রুম্যান সোভিয়েতদের অবিশ্বাস করতেন, তিনি তাদের সঙ্গে কাজ করার রুজভেল্টের প্রতিশ্রুতি কখনো গ্রহণ করেননি। তিনি তার চিফ অব স্টাফ অ্যাডমিরাল লেহি, রাষ্ট্রদূত হ্যারিম্যান এবং নৌবাহিনীবিষয়ক মন্ত্রী ফরেস্টালের মতো যুদ্ধবাজ উপদেষ্টাদের খপ্পরে পড়ে যান। তিনি যুদ্ধপরবর্তী বিশ্বের গঠন প্রশ্নে আলোচনার প্রতিটি ধাপে রাশিয়ানদের কর্কশভাষায় নিন্দা করেন। চার্চিলের নিজের প্রয়োজন পূরণের ইউরোপজুড়ে ‘লৌহ যবনিকা’ ঘোষণা এবং আমেরিকার যুদ্ধকালীন মিত্রকে নাৎসি জার্মান ধাঁচের সম্ভাব্য আগ্রাসী শক্তি বিবেচনা করার কলুষিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন ট্রুম্যান।

কি কারণে মিসৌরির সাবেক সিনেটর রুজভেল্টের কূটনৈতিক সাফল্য উড়িয়ে দিতে সাহসী হয়েছিলেন? সবচেয়ে বড় কারণ বোমা। ১৯৪০এর দশকের শেষ দিকে পারমাণবিক অস্ত্রে মার্কিন মনোপলি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন আগ্রাসী মনোভাব এনে দেয়। তারা এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজস্ব পারমাণবিক সামর্থ্য অর্জনের আগেই আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক ধক্ষংসসাধন করতেও পিছপা ছিল না।

আমাদের সবার সৌভাগ্য যে ধীরস্থির মাথা তখনো ছিল এবং সে কারণে একটি পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। দ্য বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস এবং যুদ্ধকালীন মার্কিন ও ব্রিটিশ সামরিক নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণ চালানো হলে বিশ্ব সদ্য সমাপ্ত যুদ্ধে যে আতঙ্কের মধ্যে পড়েছিল, তার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে। মার্কিন সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আইজেনহাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই রাজনীতিতে যোগ দেন সেন্ট লুইয়ে একটি ভাষণের মাধ্যমে। তিনি যে অস্ত্রটি রাতারাতি কোটি কোটি মানুষকে ধক্ষংস করবে, এমন এক অস্ত্রের ওপর নিরাপত্তার ভার অর্পণ করা তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘যারা নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপকে আক্রমণাত্মক সামর্থ্যরে পরিভাষায় বিবেচনা করেন, তারা এর অর্থ বিকৃতি করে এবং যারা তাদের কথা শোনে, তাদের বিভ্রান্ত করে।’

অনেক আমেরিকান তাদের সরকারের ওই দাবি স্বীকার করে নেয় যে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা হামলার ফলে জাপানের সাথে যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত এবং আমেরিকানদের জীবন রক্ষা করেছে। তবে ‘ইউএস স্ট্র্যাটেজিক বোম্বিং সার্ভে’ তার প্রতিবেদনে জানায়, ‘পারমাণবিক বোমা না ফেলা হলেও, রাশিয়া যদি যুদ্ধে যোগদান না করত, এমনকি কোনো আক্রমণের পরিকল্পনা নাও করা হতো, তবুও জাপান আত্মসমর্পণ করত।’ বস্তুত, জাপানের প্রধান সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং তারা ইতোমধ্যেই শান্তির জন্য প্রার্থনা করছিল। যুদ্ধবিরতিতে প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিলো সম্রাট হিরোহিতোর শাসন অব্যাহত রাখা। মিত্র বাহিনী শেষ পর্যন্ত তা মেনেও নিয়েছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুভার থেকে শুরু করে ভবিষ্যত প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার এবং সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান জেনারেল কার্টার ক্লার্ক সবাই সর্বাত্মকভাবে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারকে বর্বর ও অপ্রয়োজনী হিসেবে বিরোধিতা করেছিলেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক অস্ত্রের মনোপলি যুদ্ধের পর দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকে বদলে দেয়। আমাদের নেতারা কখনোই এসব অস্ত্রের অসীম শক্তির সাথে সম্পৃক্ত অশুভ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেননি। যুদ্ধপরবর্তী তরল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে তারা ভ্রান্ত চরম ক্ষমতার গন্ধ পায়। সোভিয়েতদের সাথে সহযোগিতা আর আশু কর্তব্য বিবেচিত হয়নি, কারণ শেষ কথা হরো আমাদের বোমা আছে, তাদের নেই।

পূর্ব ইউরোপের বেশির ভাগ দেশকে রেড আর্মি ও কমিউনিস্ট প্রতিরোধ বাহিনী মুক্তি করা মাত্র তাদেরকে সোভিয়েত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কক্ষ পথে চালিত হওয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বিরত রাখতে পারেনি। আবার রাশিয়াও পাশ্চাত্য অধিকৃত ফ্রান্স, ইতালি বা গ্রিসে তাদের কমিউনিস্ট মিত্রদের ক্ষমতায় বসাতে পারেনি। কিন্তু তবুও মার্কিন পারমাণবিক মনোপলির কারণে ট্রুম্যান কঠোর অবস্থান গ্রহণে উৎসাহিত হন। ‘ট্রুম্যান ডকট্রিন’ দীর্ঘ মতাদর্শগত সংগ্রামে বিশ্বজুড়ে সামরিকভাবে সোভিয়েত প্রভাব প্রতিরোধের কথা বলা হয়।।