Home » রাজনীতি » দীর্ঘমেয়াদে সরকার চালানোর একগুয়েমী

দীর্ঘমেয়াদে সরকার চালানোর একগুয়েমী

আবীর হাসান

political-cartoons-22চাপ এখন একটা বহুল আলোচিত শব্দ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে। আওয়ামী লীগের নতুন সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতোটা চাপ সহ্য করতে পারবেন সেটাই বুঝতে চাচ্ছে জনসাধারণ। বেশি বোদ্ধা এবং বিশেষ বোদ্ধাদের কথা আলাদা আওয়ামী লীগের আওয়াম অর্থাৎ ‘জাতিও’ এখন শঙ্কায় আছে শেখ হাসিনার এবারের কৌশল কতোটা কাজে দেবে তা নিয়ে। বেশ বোঝা যাচ্ছে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার কলুষকলঙ্ক তিনি একটা ভারিক্কী সরকার গঠন করে তার কথিত ‘ডায়নামিক’ কার্যক্রম দিয়ে মোচন করতে চাচ্ছেন। আগের মন্ত্রীসভার ৩৫ সদস্যকে ছেটে ফেলাকে অনেকে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী কাজ বলে দেখাতে চাচ্ছেন। কিন্তু গোড়াতেই খানিকটা গলদ রয়ে গেল, ফার্স্ট চান্সে পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্রের মতো দুটো মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হতে না পারায়। এটা নিশ্চিত ভাবেই একটা বড় ধরনের ধাক্কাই বলা যায়। আর এটা শেখ হাসিনাকে করতে হয়েছে ওই বহুল আলোচিত চাপের জন্যই। দেশেবিদেশে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাওয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করা এবং নতুন করে নির্বাচন না দিয়ে ক্ষমতায় থাকার যৌক্তিকতা তুলে ধরা আর প্রধানত বিনিয়োগের গতি সচল করার কূটনীতি জানা একজন বিশ্বস্ত নিবেদিত প্রাণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে তার খুব প্রয়োজন একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। এক্ষেত্রে কানে তুলো আর পিঠে কুলো বাধা দীপু মনি মার্কা ‘শখের মন্ত্রী’ হলে আর চলবে কী করে?

আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এবার হতে হবে স্থির মস্তিস্ক বাচালতাহীন এবং আদতে নিষ্ঠুর। সঠিকভাবে আওয়ামী লীগের চরিত্র তাকে ধারণ করতে হবে আর সেই চরিত্রটার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রকাশ্যের চেয়ে গোপন কর্মকাণ্ড বেশি চালানো। এবার আবার কৌশল পরিবর্তনের ইরাদা আছে কেবল পুলিশর‌্যাব আর ফৌজদারী আইন প্রয়োগ করে আগের মতো নাড়াচাড়া করা যাবে না, সরকারের গণতান্ত্রিক নীতি অন্তত ওপর ওপর হলেও তুলে ধরতে হবে। সে জন্য এ মন্ত্রণালয়ে বেকুব কিংবা মেজাজ বিগড়ানো অথবা প্লেবয় মার্কা লোকে চলবে না, লাগবে অতি মানবীয় রহস্যময় কোন চরিত্র।

সাম্প্রতিককালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোন চাপকে তারা তোয়াক্কা করেন না। আসলে এটা বলা হচ্ছে চাপ আছে বলেই। নির্বাচনের পর পর প্রধানমন্ত্রী যে বলেছিলেন, ‘কোন রকম চাপ নেই’ সে অবস্থান থেকে তাদের সরে আসতে হয়েছে। কারণ চাপ আছে বলেই তাদেরকে বলতে হচ্ছে, ‘চাপকে তারা তোয়াক্কা করেন না।’ অবশ্য এই চাপের ব্যাপারেও একটি আওয়ামী বৈশিষ্ট্য আছে, সেটা হলো – ‘আওয়ামী লীগ যখন চাপ প্রয়োগ করে তখন দুর্দমনীয় শক্তি দেখিয়ে ব্রুটালি করে। আবার যখন চাপ অনুভব করে তখনও সেটা ব্রুটালি হালেই করে।’ কাজেই এখন পর্যন্ত এই প্রায় তিন সপ্তাহে আওয়ামী লীগের যে চাপের অনুভূতি হয়েছে সেটা একটা ‘হাফ ফিলিংস’। অর্থাৎ খানিকটা খানিকটা আচ করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।

সে জন্য নাকি পরিকল্পনা প্রণয়ন চলছে। দেশে কাদেরকে কিভাবে সামলাতে হবে এবং বিদেশে কাদেরকে সামলাতে হবে তা মোটামুটি জানা গেছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা বুঝে গেছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটাকে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার স্মৃতি থেকে মুছে দিতে চাইলেও পারছেন না। আগামীতে পারবেন এমন ভরসা এবং মনোবল কোনোটাই তার নেই। থাকলে স্বরাষ্ট্র আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ে এমন দিশেহারা অবস্থা তার হতো না। মেসেজ যেটা তিনি পেয়েছেন তা ওই নির্বাচন নিয়েই। বেগম খালেদা জিয়া নতুন নির্বাচন চেয়েছেন তার মতো করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্ট এবং যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের অসারতা তুলে ধরে নতুন সর্বদলীয় অংশগ্রহণ সাপেক্ষ নির্বাচন চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তো আগেই তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ভারতরাশিয়াচীন যে ধরনের ইতিবাচক মনোভাব নিয়েছে অন্যরা তা নেয়নি। এখন একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে স্বাভাবিকভাবেই। শেষ তিন শক্তির মদদে নির্বাচন না দিয়ে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা স্বপ্নপূরণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাইলেও তা হওয়ার নয়। কারণ এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থটাই প্রধান শর্ত। বিশেষ করে রাশিয়া, চীনকে কতোটা ব্যবসা দেয়া হবে সেটাই এর মূল কথা। আর্থিক কেনাকাটার লেনদেন আছে বলেই ওদের এই মনোভাব। অবশ্য ভারতের বিষয়টা ভিন্ন। এখানে নানা ফ্যাক্টর বিদ্যমান। কিন্তু অন্যদের তো তা নয়। ইউরোপ, ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডায় আছে আমাদের বাজার। উন্নয়ন দিয়ে জনগণকে মুগ্ধ করে দিতে হলে টাকায় হবে না, ডলার লাগবে। ডলার আনতে হবে ব্যবসা করে আর সুবিধা আদায় করে। অথচ সবাই বলছে সুবিধাগুলো পর্যালোচনা করতে যাচ্ছে তারা অথবা করবে যদি না শেখ হাসিনার সরকার নতুন নির্বাচনের বিষয়টি পর্যালোচনায় না আনে। আর সেটা পর্যালোচনায় আনতে হলে বিএনপিকে রাজি করাতে হবে কিংবা সরকারকে রাজি হতে হবে বিএনপির প্রস্তাবে।

আসলে সত্যি বলতে কি, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করা এবং সরকার গঠন করার পর বিষয়টা উল্টে গেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন এই সাংবিধানিক সরকারকেই এখন রাজি হওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, নির্বাচনকালীন একটা অন্য রকম সরকারের কাছে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। এবং তা মেয়াদ শেষের আগে তো বটেই স্বল্পতম সময়ে। এখন অনেকে বলছেন, একটা জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠানের কথা কিন্তু সে সময়টা শেখ হাসিনা পার করে দিয়েছেন। এখন তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। এখন তার ভালমানুষী বা সদিচ্ছা কেবল কল্পনাই করা যায়।

আর প্রধানমন্ত্রীর অবস্থাটা এখন এমন হয়েছে যে, তার কাছে উদ্ভুত সমস্যার আর কোনো সমাধান নেই। তবে তার মানে এই নয় যে, তিনি সমস্যাটারই অন্য বা নতুন রূপ দিতে পারবেন না। এবং সেই কাজটাই এখন তিনি করছেন।

তিনি একটি ব্যাপারেই এখন নিশ্চিত, তিনি এখনো ক্ষমতায় আছেন। টক শো স্টার বা ঝানু বোদ্ধারাও অনেকে আশ্চর্য বা বিস্মিত এই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ভিত্তি করে শেখ হাসিনার মতো মানুষ কি করে পঞ্চসালা পরিকল্পনা করেন। তাদের অনেকে এমন প্রশ্নও মাঝে মাঝে তোলেন যে প্রবীন বিচক্ষণ আওয়ামী লীগ নেতারা কি কোন বাস্তব সম্মত পরামর্শ দেন না? এ প্রশ্নের উত্তর সঠিক জানা নেই। তবে পুরনো মন্ত্রীনতুন মন্ত্রী অথবা মন্ত্রীত্বহীন বাক্সবাগীশরা যা বলেন তা মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। মূলত ব্যাপারটা উল্টো হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি অর্থাৎ কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়। এর একটা কারণও বোধ হয় আছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী এখন সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব এই নিয়ে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হলেন, তিনি কেন অন্য কম অভিজ্ঞদের মন্ত্রণা নেবেন।

এই মন্ত্রণা নেয়া নিয়ে মহাভারতে একটি সারগর্ভ আলোচনা আছে, হাস্তনাপুরের রাজা হয়ে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির প্রথমে কোন মন্ত্রী রাখেননি। নারদ মুনি তখন তাকে এসে বলেছিলেন, কম পক্ষে দুজন কিংবা বেশি হলে তিনজনের মন্ত্রণা নিতে। অন্যপক্ষে কুরুকূলের নির্বাহী রাজা ধৃতরাষ্টের মন্ত্রী ছিলেন তিনজন। সর্বনাশা পাশা খেলতে যাওয়ার সময় পান্ডব প্রধান যুধিষ্ঠির কারো মন্ত্রণা নেননি আর কুরুপক্ষ তিন মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আরও মন্ত্রণা কানে তোলেননি। ফলে সর্বনাশ দুপক্ষই ডেকে এনেছিল, হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ।

এদেশেও এখন মন্ত্রী এবং মন্ত্রণার ব্যাপারটা সমস্যা তৈরি করেছে। সাধারণত দলের অথবা দেশের প্রজ্ঞাবানদের পরামর্শ নেয়ার জন্য মন্ত্রী করা হয়। কিন্তু এ দেশে অবস্থাটা ভিন্ন, এখন অন্য কৃতকর্মের পুরস্কার হিসেবে মন্ত্রী করা হয়। অন্যপক্ষে বড় রাজনৈতিক দলেও মন্ত্রণাদাতা বা পরামর্শক থাকে। কিন্তু সেটাও সিলেকশন হয় যোগ্যতার চাইতে অন্য পছন্দের মানদন্ডে। এই নতুন সরকার গঠনের আগে ও পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রীর পরামর্শকদের সম্পর্কে বলেছিলেন যারা তাকে জামায়াতকে সঙ্গে রাখা ও তাদের জন্য নির্বাচন বর্জনের পরামর্শ দিয়েছিল তারা ঠিক কাজটি করেনি। আর এটা না বুঝতে পেরে বিএনপি নেত্রী একূল ও কূল দু’কূল হারিয়েছেন।

কূল হারানোর বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে সংশয়, সন্দেহ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এক্ষেত্রে বার্ট্রান্ড বাসেলের একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘জগতে সবচেয়ে গুরুতর সঙ্কটটি হলো একগুয়েরা তাদের নিজেদের বিষয়ে অতিমাত্রায় নিশ্চিত কিন্তু প্রজ্ঞাবানরা থাকেন সংশায়িত’। এখন প্রশ্ন হলো যারা দীর্ঘমেয়াদে সরকার চালানোর ব্যাপার একগুয়ে হয়ে উঠেছেন তারা কেন তাহলে চাপ প্রশমনের উপায় খুজছেন?