Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ব্লাড ডায়মন্ড – একটি নৃশংস গৃহযুদ্ধের ইতিবৃত্ত

ব্লাড ডায়মন্ড – একটি নৃশংস গৃহযুদ্ধের ইতিবৃত্ত

ফ্লোরা সরকার

blood-diamondপশ্চিম আফ্রিকার সিয়ারালিয়ন দেশটিতে কি ছিলো? জাতিগত বিদ্বেষ? উত্তরউপনিবেশ প্রভাবিত শাসনব্যবস্থা? সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা? নাকি পৃথিবীর সবথেকে বহুমূল্যবান রত্ন ‘হীরার খনি’ র অভিশাপ যে কারণে ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দেশটিতে সংঘঠিত হয় এই শতাব্দির অন্যতম ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ? যে যুদ্ধে প্রায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয় আর দশহাজারের উপর মানুষকে বরণ করতে হয় পঙ্গুত্ব? নিখোঁজ হয় ছয় থেকে আট হাজারের মতো শিশু? হাজার হাজার মানুষকে শরণার্থী হতে হয় গিনিয়া এবং লাইবেরিয়ায়? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাাদিক গ্রেগ ক্যাম্বেল ২০০১ সালে দেশটিতে গিয়ে সরেজমিনে বিষয়টি দেখার পর ২০০২ সালে প্রকাশ করেন তার অন্যতম বই “Blood Diamond – Tracing the deadly path of the world’s most precious stones”। যে বইটির উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে ২০০৬ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র – “ব্লাড ডায়মন্ড”।

ছবির কাহিনী সিয়ারা লিয়নের দশবছরের গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও হলিউডি বানিজ্যিক ধাঁচে নির্মিত এই ছবি যুদ্ধের বিস্তার এবং তার অন্তর্নিহিত কারণের চাইতে কর্পোরেট পৃথিবীর অবক্ষয়ের দিকে অধিক পরিমাণে দৃষ্টিপাত করে। ২০০৬ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রকাশনার সাক্ষাৎকারে ছবির পরিচালক এডওয়ার্ড উইক বলেন – “গত বছর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের হীরা আমদানি করেছে, যা পৃথিবীর অন্যান্য সব দেশের অর্ধেক আমদানির সমান। আমি লক্ষ্য করেছি উন্নয়নশীল দেশের সম্পদ শুধুমাত্র আমাদের বিলাসিতার জন্যে কীভাবে শোষিত হয়, কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর কোটি কোটি মুনাফা অর্জিত হয় এসব দেশের শ্রমিকের হাত দিয়ে যাদের মজুরী দৈনিক এক ডলারেরও নিচে।” যে কারণে সিয়ারা লিয়নের একজন হীরার খনির শ্রমিকের মুখে বলতে শোনা যায় – “আমরা হীরা উৎপাদন করি কিন্তু একটা সাইকেল কেনার ক্ষমতা আমাদের নেই। এই দেশের ভূমি আমাদের, সবকিছু আমাদের, তবু কিছুই যেন আমাদের না।”

ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে সলোমোন ভ্যান্ডি নামের এক জেলের জীবনকে আবর্তিত করে। যার স্ত্রী ছিলো, ছিলো দুই মেয়ে আর বারো বছরের একটি ছেলে। যে ছেলেকে নিয়ে সলোমোন গর্ব করতো, কেননা ছেলে তার বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু গৃহযুদ্ধ তার জীবনটাকে ওলটপালট করে দেয়। তার পরিবার তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেঁচে গেলেও ছেলে চলে যায় বিদ্রোহী দলে যোগ দিতে। মাছ ধরতে যেয়ে একটা হীরক খন্ড খুঁজে পাবার অপরাধে যার জীবন পাল্টে যায়। তাই সে বলে – “তুমি ভাবছো, আমি শয়তান, হ্যা তা ঠিক, কিন্তু আমি শয়তান এই কারণে যে আমাকে বসবাস করতে হয় নরকে। আমি এখান থেকে উদ্ধার পেতে চাই।” ছবির আরেক চরিত্র, ড্যানি আর্চার (লিওনার্দো ডিক্যাপরিও), আরেক আফ্রিকান কালোবাজারী এবং যার সঙ্গে সলোমোনের দেখা হয় কারাগারে। তাই সে যখন সলোমোনের হীরকখন্ডের খবর জানতে পারে আর্চার প্রলুব্ধ করে হীরাটি তার কাছে বিক্রি করে দেয়ার জন্যে। বিক্রির যে টাকা দিয়ে সলোমোন তার পরিবারের খোঁজ নিতে এবং তাদের রক্ষা করতে পারবে। ছবির আরেক চরিত্র ম্যাডি বোয়েন, আমেরিকার একজন নারী সাংবাদিক, যে এখানে এসেছে ‘ব্লাড ডায়মন্ড’ বা ‘জটিল রক্তাক্ত পাথর’ নামক এই বিষয়টির অন্ধকার দিক তুলে ধরতে, কীভাবে বছরের পর বছর সিয়ারা লিয়ন থেকে পৃথিবীর প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ হীরা চোরাপথে পৃথিবীর বিভিন্ন বাজারে চলে যায় তার ওপর প্রতিবেদন তৈরি করতে। আর্চার এবং বোয়েন দুজন দুজনের প্রতি আকৃষ্ট হয় কিন্তু ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে। বোয়েনের আদর্শ দৃষ্টিভঙ্গী জটিল এই পাথরের দুর্নীতির দিকটি উন্মোচিত করতে চায়, অন্যদিকে বিষন্ন আর্চার মনে করে যেহেতু বর্তমান সময়, সময়ের সেই কাল, যে কালে সবাই সবাইকে ব্যবহার করে বেঁচে থাকে, কাজেই ব্যবহারের এই পথই শ্রেষ্ঠ পথ। তার কাছে সিয়ারা লিয়নের এসব হত্যাযজ্ঞ এই দেশের খুব স্বাভাবিক একটা মামুলি ব্যাপার। এভাবেই এদেশের মানুষেরা বেঁচে থাকে। ছবির যে মুখ্য বার্তাটি দর্শককে দেয় তা হয় পৃথিবীর কোনো ভূখন্ডে কোনো মূল্যবান সম্পদ আবি®কৃত হলে, স্থানীয়রা সবার আগে তা থেকে বঞ্চিত হয়। আপাত নিরীহ এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দর্শকের মনোজগতে সিয়ারা লিয়নের মানুষদের জন্যে সমবেদনার উদ্রেক ঘটায়। বাহবা দেয় হলিউডের মতো জায়গায় এমন একটি মর্মস্পর্শি বিষয় নিয়ে ছবি নির্মাণের জন্যে। কিন্তু কীভাবে এই বঞ্চনার ইতিহাস গড়ে ওঠে তার কোন ইঙ্গিত আমরা ছবিটিতে পাইনা। কারণ এই বঞ্চনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লুন্ঠনের এক দীর্ঘ ইতিহাস। যে লুন্ঠনের ইতিহাস হলিউড বা তাদের মতো সাম্রাজ্যবাদী দেশের চলচ্চিত্রকারেরা উন্মোচন করতে চান না। কিন্তু তাইবলে তার ইতিহাসের অনুসন্ধান থেমে থাকেনা।

গত ২৫ অক্টোবর, ২০১২, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাক্তন ডিপ্লোম্যাট, শিক্ষক এবং গবেষক সো ইউয়ুং জাং, সিয়ারা লোনের এই নৃশংস গৃহযুদ্ধের কারণ এবং প্রধান বিদ্রোহী দল রেভলিউশনারি ইউনাইটেড ফ্রন্টের উত্থানের উপর চমৎকার একটি নিবিড় অনুসন্ধানী গবেষণাপত্র পেশ করেন, যা ইইন্টারন্যাশনাল রিলেশানসএর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। তার সেই অনুসন্ধানের কিছু দিক এখানে আমরা তুলে ধরবো।

জাং প্রথমেই যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেন তা হলো কী কারণে একটি দেশে গৃহযুদ্ধ সংঘঠিত হয়? জাং বলেন অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে অনেকের মনে করেন এসব যুদ্ধ প্রধানত আর্থিক মুনাফা বিশেষত অর্থলিপ্সা, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতা থেকে উদ্ভূত হয়। যেমন পি.কোলিয়ের, হফলার, জে.ডি.ফিয়ারন এর মতো গবেষকদের গবেষণা থেকে জাং তার কিছু নমুনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন এসব গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায় একটি দেশের কাঁচামাল রপ্তানি, বেকারত্ব, নিম্ন শিক্ষার হার, দুর্বল রাষ্টীয় সংগঠন ইত্যাদি বিষয় অর্থনৈতিক বৈষম্য ডেকে আনে যা শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। গৃহযুদ্ধের এসব কারণ আপাতদৃষ্টিতে সঠিক মনে হলেও জাংয়ের মতে অর্থলিপ্সা এবং গৃহযুদ্ধের মাঝে অনেকসময় কোন সরাসরি যোগাযোগ বা সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায়না। জাং বলেন অনেকে গৃহযুদ্ধের কারণ হিসেবে সমাজে বিদ্যমান অপরাধপ্রবনতাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে পি.লুজালা, এন.পি.গ্লেডিচ, .গ্লিমোর প্রভৃতি গবেষকদের মতে প্রাথমিক কাঁচামাল হিসেবে হীরা উত্তোলনের চেয়ে পরিণত হীরকখন্ড অর্থাৎ যে হীরাগুলো বাজারজাত করার জন্যে প্রস্তুত তার শোষণের সঙ্গে জাতিগত বিদ্বেষের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, যা গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। জাং এসব গবেষণালব্ধ ফলাফলের কোনটাকেই গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। তার মতে জাতিগত বিদ্বেষ নয় বরং হীরার খনির অসম মালিকানার বণ্টন এবং অসম লাইসেন্স প্রদান সিয়ারা লিয়নের গৃহযুদ্ধের অন্যতম একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কেননা যখন যে সরকার আসে সেই সরকার এসব খনির পূর্ণ সদ্বব্যবহার নিজের এবং নিজের দলের স্বার্থে কুক্ষিগত করে। ফলে একটি বিরাট জনগোষ্ঠি রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, অবৈধ ভাবে বন্টিত এসব সম্পদের কর উত্তোলনও সঠিক ভাবে করা হয়নি (কেননা, সরকারি দলের লোকেরা এর মালিকানায় থাকায় কর প্রদান থেকেও তারা বিরত থাকেন) ফলে রাজস্ব আয়ও যথাযথ ভাবে আদায় না হওয়ায় রাষ্ট্র ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। সরকারি ডায়মন্ড অফিসে সস্তায় হীরার বেচাকেনার সুযোগে চোরাচালান বৃদ্ধি পায়। এমনকি সরকারের এসব অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রধান যে বিদ্রোহী দল RUF (Revolutionary United Front) গঠিত হয়েছিলো সেই দলের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৯ এর মধ্যে তাদের অবৈধ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিলো দুই কোটি মার্কিন ডলার। যদিও বিদ্রোহীদের দাবি ছিলো অস্ত্র কেনার স্বার্থে এই অর্থের সমাগম। দাবি যাই থাকুন না কেনো, দেখা যায়, সরকারি এবং বিদ্রোহী দল, উভয়েই এসব বিশাল অংকের টাকার সমাগম ঘটিয়েছিলো প্রধানত অবৈধ উপায়ে, যা দেশটিকে ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আর বিপদাপন্ন করে তোলে। এবং এখান থেকেই জাংয়ের গবেষণা যেন আরো গভীরে যেতে থাকে। এসব অবৈধ সম্পদ উত্তোলনের একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জাং আরো গভীরে যেয়ে তুলে ধরেন। যাকে তিনি গৃহযুদ্ধপূর্ববর্তী কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ এই পূর্ববর্তী কারণগুলোর অনুসন্ধান ছাড়া কেনো এবং কীভাবে সিয়ারা লিয়নে একদিকে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠেছিলো অন্যদিকে তা থেকে বঞ্চিত ছিলো দেশের আপামোর জনগণ, যে বঞ্চনার শিকার দশ বছরের দীর্ঘ সেই গৃহযুদ্ধ, তা জানা সম্ভব নয়। তার সেই অনুসন্ধান পরবর্তী সংখ্যার জন্যে তুলে রাখা হলো।।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)