Home » অর্থনীতি » রাজনৈতিক অচলাবস্থা :: মাথায় হাত ব্যবসায়ীদের

রাজনৈতিক অচলাবস্থা :: মাথায় হাত ব্যবসায়ীদের

সারাদেশের চিত্র

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

people-11চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসাবাণিজ্য ও অর্থনীতি। বেচাকেনা না থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। লোকসানের মুখে অনেকেই দোকান পাট সাময়িকভাবে বন্ধ করে কিংবা কর্মচারীদের ছুটি দিয়েছিলেন। কেউবা একবেলাআধাবেলা দোকান খুলে কোনোমতে খরচ উঠাতে চাইতেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে এমন চিত্রই দেখা গেছে। বাংলাবাজার থেকে দেশের বই প্রকাশ ও ছাপাখানার সিংহভাগই প্রকাশিত হয়, ইসলামপুরে থান কাপড়ের অন্যতম বড় বাজার, বাবু বাজারে পাইকারি চালের বাজার, ধোলাইখালে মেলে গাড়ির পুরাতন যন্ত্রপাতি, আর গাড়ির নতুন নতুন সব যন্ত্রাংশ মেলে নর্থব্রুক হল রোডে। বছরের সব সময়ই এসব দোকানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। দেশবিদেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি ও খুচরা পণ্যসামগ্রী বিক্রি করা হয় এসব দোকান থেকে। কিন্তু দেশের অস্থিতির রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার ঠিক উল্টো দেখা গেছে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নির্বাচনকেন্দ্রীক পরিস্থিতির কারণে দিনের পর দিন হরতালঅবরোধে দোকানদারদের মাথায় হাত। বেচাকেনা বা পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় তাদের হতাশা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। দোকানের খরচ বা কর্মচারীদের বেতন ভাতা কিংবা আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয়ভার মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

নিজস্ব কারখানায় পর্দা ও সোফার কাপড় উৎপাদন করে ইসলামপুরের চায়না মার্কেটের শোরুম থেকে দেশ বিদেশে সরবরাহ করে থাকেন জাভেদ। তিনি জানান, অনেক দিন ধরেই দোকানে বেচাকেনা নেই। অবরোধের কারণে বাইরের জেলাগুলোর ক্রেতারা না আসায় ব্যবসায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। এছাড়া উৎপাদিত পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করতে না পারায় কারখানা বা গোডাউনে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। পাশাপাশি নতুন কাপড় উৎপাদনের কাঁচামালেরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ কারণে কর্মচারীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাবুবাজারের এক চালের আড়তদার জানান, দীর্ঘদিন ধরে হরতাল অবরোধ চলমান থাকার সময়ে দোকানে মজুদ থাকা চাল শেষ হয়ে যায়। দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল না করায় নতুন চাল আনা যাচ্ছে না এবং ঢাকার বাইরের ক্রেতারা মাল নিতে পারেননি। পাওনাদারদের কাছে বকেয়া টাকা চাইলেও এই মুহূর্তে দিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিচ্ছেন। কাজ কম থাকায় দোকানে কর্মরত চারজন কর্মচারীর মধ্যে দুই জনকে ছুটিও দেন তিনি। ধোলাইখালে গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশের দোকানী জামিল শেখ বলেন, পাশের মহল্লা কলতাবাজারে বাড়ি হওয়ায় হরতাল অবরোধে সাধারণত দোকান বন্ধ করতে হয়নি তাকে। কিন্তু বর্তমানে দোকান খুলে রাখলেও কাস্টমার না থাকায় বেচাকেনা হয়নি। তিনি জানান, এই ধোলাইখালে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শত শত মানুষ গাড়ির যন্ত্রাংশ ক্রয়বিক্রয় করতে আসেন। কিন্তু সাম্প্রতিক হরতাল অবরোধে সংহিসংতা বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো আর ক্রেতা বিক্রেতারা আসছেন না।

পণ্য উৎপাদনকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠানই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। তৈরি পণ্য জমে গেছে কারখানায়। অনেক প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল বন্দরগুলোতে পড়ে থাকলেও সেগুলো ছাড় করিয়ে আনা যায়নি। এসব কারণে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিনই কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিস্কুট, চানাচুর, স্ন্যাকস, মসলা, তরল দুধ, ফলের জ্যুস, প্যাকেটজাত চালসহ নানা ধরনের ভোগ্যপণ্য প্রস্তুত ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি কোম্পানির প্রতিনিধি জানান, প্রতিদিন পাঁচশর মতো ট্রাক আমাদের কারখানাগুলো থেকে সারা দেশে পণ্য নিয়ে যায়। কিন্তু অবরোধের কারণে কোনো ট্রাকই যেতে পারেনি। পরিবেশকেরাও দোকানে পণ্য দিতে পারেনি। ফলে আমাদের বিক্রিও কমে গেছে। সারা দেশে প্রতিদিন ছয় হাজার টন চিনি, ভোজ্যতেল, আটাময়দাসুজি, ডাল ও হাঁসমুরগির খাদ্য বাজারজাত করে থাকে সিটি গ্রুপ। এই গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, অবরোধে দেশের কোথাও পণ্য পৌঁছানো যায়নি। পরিবেশকেরাও আসতে পারেননি। আমাদের পাঁচ হাজার টন চিনি রফতানি হওয়ায় কথা। কিন্তু আমরা সেগুলোও জাহাজীকরণ করতে পারিনি সময়মতো।

মিল্ক ভিটা সাধারণত প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ লিটার তরল দুধ বাজারজাত করে। আর সমবায়ীদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে দুই লাখ ৪০ হাজার লিটার। কিন্তু অবরোধের কারণে ঢাকায় তাদের তরল দুধ সরবরাহ ও খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনা বন্ধ ছিল। মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘হিসাব করে দেখা গেছে, হরতালঅবরোধে প্রতিদিন খামারিদের গড়ে সোয়া কোটি, মিল্ক ভিটার নিজস্ব ৭৫ লাখ এবং পণ্য পরিবহন বাবদ ২৫ লাখ মিলিয়ে মোট সোয়া দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়।’

বিপদে আছেন ঢাকার বাইরের ব্যবসায়ীরাও। কুষ্টিয়া, নওগাঁ, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকায় চাল সরবরাহ হয়। অবরোধের সময় এসব এলাকার মিলমালিকেরা চালই সরবরাহ করতে পারেননি। কুষ্টিয়ার বড় অটো রাইস মিল রশিদ অ্যাগ্রোপ্রোডাক্টস লিমিটেডের মালিক জানান, তার মিল থেকে সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০ ট্রাক চাল পাঠানো হয়। প্রতি ট্রাকে চাল থাকে ১৫ টন। টানা অবরোধে একটি ট্রাকও মিল থেকে যায়নি।

রাজনৈতিক অস্থিরতা,হরতালঅবরোধ ও সহিংসতার প্রভাব পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে। প্রতিদিনই বাড়ছে এ খাতের ক্ষয়ক্ষতি। বাতিল হচ্ছে অর্ডার। গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পযন্ত ২০ টি কারখানার অর্ডার বাতিল অথবা মূল্য ছাড় দেওয়ার তথ্য জমা পড়েছিল বিজিএমইএতে। সপ্তাহের শেষভাগে এসে তা দাঁড়ায় ২৪ টি। কিন্তু বেশিরভাগ কারখানাই বিজিএমইএ’র কাছে এখনও অর্ডার বাতিলের তথ্য জমা দেয়নি বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে।

পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ডিসেম্বর মাসের ১২ দিনে আলোচিত কারখানাগুলোর এক কোটি ১৬ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্ডার বাতিল, মূল্য ছাড়, বিমানে পণ্য পরিবহণের জন্য বাড়তি মাশুল,জাহাজীকরণ বিলম্বজনিত ক্ষতি। সামগ্রিক অস্থিরতায় কারখানা মালিকেরা কাজের অর্ডার পাচ্ছেন না। এ সময়ের মধ্যে ২৪ টি কারখানার রফতানি আদেশ বাতিল হয়েছে। বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, এক সপ্তাহে ঢাকচট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে ৫ হাজারের বেশি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন করতে পারে। অবরোধের মধ্যে সেখানে ২ হাজার ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন করতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে কারখানাগুলোতে পণ্য আটকে থেকেছে। তবে ওই সময়ে পুলিশি নিরাপত্তায় কিছু পণ্য পরিবহন করলেও চাহিদার তুলনায় অনেক কম।।