Home » অর্থনীতি » সঙ্কটের মুখে পোল্ট্রি, চা এবং হিমায়িত খাদ্য শিল্প

সঙ্কটের মুখে পোল্ট্রি, চা এবং হিমায়িত খাদ্য শিল্প

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

poultryহরতালঅবরোধে গত ৩ মাসে পোল্ট্রিশিল্পে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সহিংসতা অব্যাহত থাকলে পোল্ট্রিশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে বলে জানান পোল্ট্রিশিল্প সংগঠনের নেতারা। এ শিল্প রক্ষায় বিরোধের অবসান করে ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানিয়েছেন তারা। বাংলাদেশ পোল্ট্রিশিল্প ইন্ডাষ্ট্রিজ কোঅর্ডিনেশন কমিটির আহবায়ক মশিউর রহমান বলেন, এ শিল্পে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ৩০ শতাংশ খামার এরইমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে আছে তারাও পথে বসার পথে। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) মহাসচিব সাইদুর রহমান বাবু বলেন, ‘৩৫ টাকা খরচ করে যে বাচ্চা উৎপাদন করা হয় তা গড়ে মাত্র ১৫২০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ১১০১২০ টাকায় এক কেজি ওজনের যে মুরগি উৎপাদন করে তা ৭০৮০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। বিগত ৩ মাসে ব্রয়লার বাচ্চায় প্রায় ১৬৪ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।’

বাংলাদেশ এগ প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহের আহমেদ বলেন, প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। হরতালঅবরোধের কারণে ডিম অবিক্রিত ও নষ্ট হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এতে ১৩ সপ্তাহে লোকসান হয়েছে প্রায় ২৬৬ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ ডিম গড়ে ৫ টাকা ধরে বিক্রি করায় প্রায় ৩৬৪ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তিন মাসে শুধু এ খাতে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় হিমায়িত পণ্য রফতানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে এক হাজার কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ মজুদ হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষি ও রফতানিমুখী এ খাতে ১৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন হিমায়িত খাদ্য রফতানিকারকরা। বর্তমান অবস্থায় ক্ষয়ক্ষতিসহ সার্বিক চিত্র নিয়ে বিএফএফইএর সহসভাপতি আমিন উল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সরবরাহ বন্ধ থাকায় রফতানির জন্য প্রস্তুত করা হিমায়িত খাদ্য জাহাজীকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন রফতানি আদেশ বাতিল হচ্ছে অন্যদিকে নতুন রফতানি আদেশ আসছে না। এর ফলে ১০ হাজার টন চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ গুদামে মজুদ হয়ে পড়ছে। এক হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের এ মাছ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, রফতানি মৌসুমে বাজার হারানোর কারণে মজুদ পণ্যে ৭৭ কোটি টাকা ইতিমধ্যে ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের বিভিন্ন এলাকার চাষিরা মাছ সরবরাহ করতে পারছে না। এতে পচনশীল এ পণ্য নিয়ে চরম দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে প্রক্রিয়াজাত কারখানাগুলোতেও কাঁচামাল সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতে এ খাতে বিভিন্ন ব্যাংকের এক হাজার ৭শ’ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে এ ঋণের উপর ৪০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুৎবিল, শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য খরচ দিতে ৬৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ সময়ে আয় না থাকলেও বিভিন্ন খরচ দিয়ে হিমায়িত রফতানি খাতে ১৮০ কোটি টাকার ক্ষতিতে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

পরিবহনের কারণে অবরোধ ও হরতালের সময় সিলেট থেকে কাঁচা বা প্রক্রিয়াজাত চা পাতা কোনটিই পাঠানো যায়নি চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে। অনেকের নিজস্ব ফ্যাক্টরি না থাকা ও গুদাম ভরে যাওয়ায় কয়েকটি বাগানে পাতা সংগ্রহও বন্ধ রাখা হয়। ফলে বাগানেই নষ্ট হয়েছে কাঁচা পাতা। কয়েকটি চা বাগানের ব্যবস্থাপকের সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। চা বাগান মালিকদের সংগঠন ‘চা সংসদ’ সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিভাগে ১৪৫টি চা বাগান রয়েছে। এই বাগানগুলোর মধ্যে ২০২৫ টি বাগানের নিজস্ব ফ্যাক্টরি (চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা) নেই। যেসব বাগানের ফ্যাক্টরি নেই সেগুলোর কাঁচা পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে যে বাগানগুলোর নিজস্ব কারখানা আছে তারাও নিজেদের প্রক্রিয়াজাতকৃত চা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে পাঠাতে না পারায় উৎপাদিত চা নষ্ট হতে বসেছে। গত ১৫২০ দিন ধরে নিলাম কেন্দ্রে চা পাঠাতে না পারায় সিলেটের চা বাগানগুলো শতকোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সিলেটের বিভিন্ন বাগান মালিকরা জানান, এই মৌসুমে সিলেটের প্রায় প্রতিটি বাগান থেকে সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি চালান চট্টগ্রামে নিলাম হাউজে পাঠানো হয়। কিন্তু গত তিন সপ্তাহে একটি চালানও চট্টগ্রামে পাঠানো যায়নি। ফলে বাগানভেদে হাজার থেকে লক্ষাধিক কেজি চায়ের মজুদ পড়ে রয়েছে। অনেক বাগানে পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের ধারণ ক্ষমতার চাইতে মজুদের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাগান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিবহন খাতে ১৩০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে রেমিটেন্সে। ২০১৩১৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাইডিসেম্বর) রেমিট্যান্স এসেছে ৬৭৭ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার। ২০১২১৩ অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৭৪০ কোটি ১৭ লাখ ডলার। উল্লেখিত সময়ে রেমিট্যান্স কমেছে ৬২ কোটি ৩২ লাখ মার্কিন ডলার।