Home » রাজনীতি » সরকারের এই উদারতা কতোদিন স্থায়ী হবে?

সরকারের এই উদারতা কতোদিন স্থায়ী হবে?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

police-12বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ যে কোন ভাবেই হোক দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে এখন তৃপ্তির সাগরে ভাসছে। এক্ষেত্রে তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে যা যা করার দরকার ছিল সবকিছুই তারা সম্পন্ন করে তবেই ক্ষমতাসীন হয়েছে। বাংলাদেশের দশম সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭৭ জন। ভোট দিয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৩৫ হাজার ৯৪৪ জন। ভোট ও ভোটারের হিসেবে যা প্রায় ১৮ শতাংশের মত। ভোট দিতে পারেননি ৭ কোটি ৩০ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। সে হিসেবে মোট ভোটারের ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোটার দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সরকারী দল ১২৭ টি আসনে জিতেছে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই। বাকি ২৬ টি আসনে ভাগাভাগি করে নিয়েছে মহাজোটের শরিকরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেই। ফলে ১৫৩ টি আসনে ভোটারদের অংশ নেয়ার কোন সুযোগ ছিল না। ক্ষমতাসীনদের অসামান্য কৃতিত্ব এখানেই যে ৫১ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোট ছাড়াই জিতে গেছে, যে পরিমান আসনে জিতলে যে কোন দলই বাংলাদেশে সরকার গঠন করতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার দেখানো হয়েছে ৪০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এটি বিবেচনায় নিলে সরকারী দল তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেই পারে তারা প্রায় অর্ধেক সংখ্যক ভোটারের ভোটে নির্বাচিত হয়ে গেছে। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় ৯৬’র ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনকে ছাড়িয়ে আগামী ইতিহাসে সবচাইতে কালো নির্বাচন হিসেবে স্থান করে নিল সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন। এই নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার যেমন শক্তির প্রয়োগকে মূল নীতি হিসেবে গ্রহন করেছিল তেমনি প্রধান বিরোধী দল সহিংসতা সৃষ্টি করে নির্বাচন প্রতিরোধ করার প্রয়াস পেয়েছিল। দু’টি বিষয়ই ছিল সরাসরি জনগনের বিরুদ্ধে এবং এক্ষেত্রে জনগনই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বড় দুই রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী ও এরশাদকে কৌশলী পরিকল্পনায় হাসপাতালে ভর্তি করে নির্বাচন সমাপ্ত করেছে। নির্বাচনে রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে অরাজনৈতিক রাষ্ট্রীয় এজেন্সিগুলোর ওপরে সরকার সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল ছিল এবং তাদের তৎপরতাও ছিল সবচেয়ে বেশি।

দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারী দলের তৃপ্তি এখানেই যে, তারা পুনর্বার ক্ষমতাসীন হয়েছে এবং ভোটাররা এই নির্বাচন বর্জন করেছে বলে বিরোধী দল ধন্যবাদ জানিয়ে বেশ আত্মপ্রসাদ লাভ করছে। কিন্তু আগামী ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এই বিতর্কিত দশম সংসদ নির্বাচনে নৈতিকতার যে প্রশ্নটি দেশীয় গন্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তার জবাব তো ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয়পক্ষকেই দিতেই হবে। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে বলা হচ্ছে, এই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। অতীতেও এরকম যুক্তি অনুসরন করে জনগনের অভিপ্রায়ের বিপক্ষে সংবিধানে অনেক সংশোধনী আনা হয়েছিল, যদিও তার কিছু কিছু আদালত বাতিল করেছে। গণতন্ত্র, আইনআদালতের বাইরেও শুধুমাত্র শক্তি নির্ভর এরকম ভোটারবিহীন একটি নির্বাচন নৈতিক ও সামাজিক মানদন্ডে যে অগ্রহনযোগ্য এবং প্রহসনে পরিনত হল, সেই পথে নির্বাচনমুখী গনতন্ত্রের ধারাবাহিকতাটি কতদুর অগ্রসর হতে পারবে, সেই প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের অতীত ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এর অনেক প্রমান রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনায় সংবিধান, জাতীয় সংসদকে নিজেদের মত ব্যবহার করেও টিকে থাকা যায়নি। আর এক্ষেত্রে জনগনই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আপাতত: আওয়ামী লীগ ভোটযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জোরে সবকিছুই নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এই সাথে জঘন্য একটি নির্বাচনের কালিমা মুছে দিতে বেশ একটি গণতান্ত্রিক চেহারা ধারন করার চেষ্টা করছে। গত ৫ বছর বিরোধী দলকে রাস্তায় দাঁড়াতে না দেয়া, সভাসমিতি, মিছিলসমাবেশ করতে না দেয়ার যে কৌশল নেয়া হয়েছিল, নির্বাচনে বিজয়ের পরে ক্ষমতাসীনরা বেশ উদারতা দেখাচ্ছে বলে মনে হতে পারে। বিএনপিকে মিছিল করতে দেয়া হয়েছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতিও দেয়া হয়েছে। এসবের পেছনে মূল কারন হিসেবে যে বিষয়টি কাজ করছে সেটি হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সবসময় ভেবে এসেছে বিরোধী দল বিএনপি অগোছালো এবং শক্তিহীন। তারা আন্দোলন করতে পারে না। তারপরেও সরকার ভয় পেয়েছিল। বিএনপিসহ অংগসংগঠনের সকল পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে জেলে পুরে দিয়েছিল। এই আতংকে অন্যান্য নেতারাও আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। এরমধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সম্ভবত: এমত আস্থা অর্জন করেছে যে, বিএনপির পক্ষে এই মূহুর্তে জনগনকে সংগঠিত করে তাদের বিপক্ষে কোন আন্দোলন করতে বিএনপি সক্ষম নয়। সেইজন্যই এখন একটুআধটু উদারতা দেখানো যেতে পারে। কিছুটা নমনীয় হওয়া যেতে পারে। তাহলে অন্তত: মান রক্ষা হবে!

জনগনকে ভাবনায় অনুপস্থিত রেখে বৈকল্যবাদী এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে গত ২০ বছর ধরে। এর মধ্য দিয়ে মানুষ ও সমাজকে বিভাজিত করতে করতে মানুষকে বৈকল্যের শেষ সীমানায় পৌঁছে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। যেখানে জড়তা ছাড়া অগ্রগামীতার লক্ষণ থাকে না। এই রাজনীতির সংস্কৃতি তো অন্ধকারগামী। সমন্বয় নেই, ঐক্য নেই, সুশাসন নেই, আছে বন্দুকের নলকে উঁচিয়ে ধরে রাজনীতি সুপ্রতিষ্ঠা করা। তারপরেও আপাত বিরোধী দল বিহীন এই সংসদীয় ব্যবস্থায় চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাল্টে দেওয়ার জন্য যে কর্মসূচি জনগনের সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে বিএনপি তার অতীত ধারাবাহিকতা এখনও অব্যাহত রাখছে সবশেষ সমাবেশের কথাবার্তার মধ্যে সেটিই প্রতীয়মান হয়েছে। আগেও একাধিকবার বলা হয়েছে বিএনপি যদি তার এই ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে না আসতে পারে, তাহলে দল হিসেবে তার পরিনতি মুসলিম লীগের মত হতে পারে।

দশম সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ভারত ছাড়া বহির্বিশ্বের বড় কোন দেশের কোন সমর্থন মেলেনি। বিতর্কিত, একতরফা এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা। এই ভোটযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে অবশ্য প্রতিবেশি দেশের নিরঙ্কুশ সমর্থন পাওয়া গেছে।

আর এই সমর্থন নিয়ে জনগনের ওপর কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েমের পথে আওয়ামী লীগ হাঁটছে এবং ভবিষ্যতেও সে আশংকাটি থেকেই যাবে। পৃথিবীর যে কোন দেশে কর্তৃত্ববাদী, জনবিচ্ছিন্ন শাসকদের মনোজমিন নিজস্ব ভাবনায় সবসময়ই বিজয়ী বলে মনে করেছে। অন্তিমে যা কখনই জনগনের কল্যানে আসেনি। একটি উদার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টিতে এই মনোজমিন পরিবর্তন করা সবার আগে প্রয়োজন। নইলে শত্রুপক্ষকে দমন করার আপাত: বিজয়োল্লাস সহসাই দানবীয় চেহারায় আবির্ভূত হতে পারে। বাংলাদেশের হোঁচট খাওয়া নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা সেক্ষেত্রে একেবারেই অন্ধকার যাত্রায় ধাবিত হতে পারে।।