Home » বিশেষ নিবন্ধ » সুন্দরবন দখল

সুন্দরবন দখল

প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক

sundarbanসুন্দরবন এখন একটি প্রধান আলোচনার বিষয়; বলা হচ্ছে, বিশ্বের বৃহত্তম প্যারাবন (Mangrove Forest) সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র ধ্বংস হতে বসেছে। গঙ্গা নদীর মোহনায় সাগরবক্ষে পলি থেকে জাগা পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপে এই বনের অবস্থান। শুধু বাংলাদেশের দক্ষিণে নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাঞ্চল জুড়েও এর বিস্তার। এখানকার মাছ, গাছপালা, পশুপাখী অন্যদের থেকে আলাদা। তাই এই বনের গুরুত্ব অনেক। এই বন ধ্বংস হলে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। বিশেষ করে এই বনের অধিবাসী ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ যা বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক, তা’ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুসারে সুন্দরবনের আদি বিস্তৃতি ছিলো ১৬,৭০০ বর্গকিলোমিটার, যা’র বর্তমানে তিন ভাগের একভাগ অবশিষ্ট আছে। বাংলাদেশে সুন্দরবনের বর্তমান বিস্তৃতি (৪০% এলাকা ভারতে) প্রায় ৪,১১০ বর্গকিমি যার ১,৭০০ বর্গকিমি জলমহল। ইউনেস্কো ৭ ডিসেম্বর ১৯৯৭ জীববৈচিত্রের জন্য সুন্দরবনকে ‘ওয়ার্লড হেরিটেজ সাইট’ ঘোষণা করে। বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ৩০ আগস্ট ১৯৯৯ অপরিকল্পিত কার্যকলাপের কারণে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্টএর চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটার এলাকা ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (Ecologically Critical Area) ঘোষণা করে। ঐ ঘোষণার ফলে যেসব কাজ নিষিদ্ধ হয়েছে, তাহলো, ) প্রাকৃতিক বন ও গাছপালা কর্তন বা আহরণ, ) সকল প্রকাল শিকার ও বন্যপ্রাণী হত্যা, ) সকল প্রকার বন্যপ্রাণী ধরা ও সংগ্রহ, ) প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংস বা সৃষ্টিকারী সকল প্রকার কার্যকলাপ, ) ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট নষ্ট/পরিবর্তন করিতে পারে এমন সকল কাজ, ) মাটি, পানি, বায়ূ এবং শব্দ দূষণকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতিকারক যে কোন প্রকার কার্যাবলী। কিন্তু বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সাপমারী ও কাটাখালী মৌজায় প্রায় ৪০০০ একর জমির উপর যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে তা’ সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সীমানার মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে পড়ে, তাই ঐ আদেশ অনুযায়ী এই প্রকল্প অনুমোদন পাবার প্রশ্নই ওঠে না।

অতি সম্প্রতি সুন্দরবনকে নিয়ে আরও একটি বিষয় দেশব্যাপী জোরে শোরে প্রচারণা চলে, তা’হলো ‘একে ভোট দিয়ে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের একটি করুন’। বলাই বাহুল্য, এই প্রচারণার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, উন্নয়নের কথা বলে একে দখল করা। সুন্দরবনকে ভোট দিয়ে সপ্তাশ্চর্য করতে পারার গৌরবের বিষয়টিই ধরা যাক। আমরা ইতিমধ্যে কক্সবাজার সৈকতকেও সুন্দরবনের সাথে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য করার দৌড়ে শামিল করতে পেরেছি। এশিয়ার সপ্তাচর্য তো হয়েই আছে। এখন কক্সবাজার বীচ সারাবছর লোকে লোকারণ্য থাকে। ওখানকার হোটেলগুলি মহা ধূমের সাথে ব্যবসা করছে। জায়গা জমির দাম ধা ধা করে বেড়ে গেছে। অতি দ্রুত পাহাড়গুলি কেটে, সাগরের সৈকতকে দখল করে নতুন নতুন হোটেল নির্মিত হচ্ছে। অবশ্যই অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। এর ফলে কক্সবাজারে সেই শান্ত আদিম প্রকৃতি আর নেই। মনুষ্য পরিবেশের হৈ হট্টোগোল, পরিবেশ দূষণ বেড়েই চলছে। সুন্দরবনকে ঘিরে যে রকম প্রচারণা চলছে তা’তে সেখানেও যে কক্সবাজারের মত উন্নয়নের আগ্রাসন চলবে তা’ অবিশ্বাস করার কোন যুক্তি নেই। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন বিষয়টি তারই একটি লক্ষণ।

উন্নয়নের কথা বলেই বাংলাদেশ সরকার বাগেরহাট জেলার রামপালে এবং চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারায় ভারত থেকে আমদানী করা কয়লানির্ভর তাপবিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়, যার অর্থনৈতিক ও কারিগরী সম্ভাব্যতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিবেশগত অভিঘাত যাচাই যথাযথভাবে হয়েছে কিনা তা’নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাগেরহাট জেলায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বেলায় যেসকল বিষয়ে পূর্ব সমীক্ষা প্রয়োজন ছিলো, ) উত্তরবঙ্গের কয়লাক্ষেত্রের কাছে না করে বাগেরহাট বা চট্টগ্রামে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কিভাবে যুক্তিসঙ্গত হবে? ) বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য বাগেরহাট ও চট্টগ্রামের লোনা পানির দেশে কিভাবে লবণমুক্ত পানি সরবরাহ করা হবে? ) বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রকৃতপক্ষে কি পরিমাণ জমির প্রয়োজন হবে? ) ভারতীয় একটি সংস্থার সাথে যৌথ বিনিয়োগ না করে নিজস্ব জ্বালানীতে এবং নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা? ) প্রকল্পটি স্থানীয় ও আশে পাশের তথা মোহনা ও সুন্দরবনের মানব বসতি, ভূমি ও পরিবেশের উপর কি বিরূপ প্রতিক্রিয়া করতে পারে, ইত্যাদি। কিন্তু এসব না করে একটি প্রতারণামূলক পরিবেশ অভিঘাত সমীক্ষা করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের পরিবেশবাদীরা এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষার তাগিদে উদ্বুদ্ধ আন্দোলনকারীরা রামপালে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপনের বিরোধিতা করছে। কিন্তু সরকারী প্রচারণায় প্রকল্পটির পক্ষে নানা যুক্তি দেখানো হয়। সম্প্রতি একটি মানচিত্র দেখিয়ে সাবেক জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তৌফিক এলাহী বলেছিলেন, প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সুন্দরবনের তিনটি অভয়ারণ্য থেকে ৮০, ৭৫ এবং ৬৫ কিমি দূরে অবস্থিত। এই অভয়ারণ্য তিনটির মোট এলাকা ১৪০০ বর্গকিমি। এই প্রচারণা এটাই প্রচারণাই প্রমাণ করে, সুন্দরবনের বাকী এলাকা উন্নয়নের নানা অজুহাতে দখলের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।।

১টি মন্তব্য

  1. its a great weekly newspeppers
    sir amir khusru
    thank you so much