Home » প্রচ্ছদ কথা » আওয়ামী লীগের সঙ্কট কোথায়?

আওয়ামী লীগের সঙ্কট কোথায়?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

hasina-21যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় ক্ষতি হয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা, শয়ে শয়ে মানুষ নিহত হয়েছে গুলি খেয়ে, আগুনে পুড়ে, জবাই হয়ে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা হারিয়ে গিয়ে ঠেকবে ৫.৮ শতাংশে। সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বিনিযোগ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহনমূলক, গ্রহনযোগ্য নির্বাচন ছাড়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটবে না। কিন্তু তাতে কি! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো প্রায় প্রতিদিনই গনভবনের আঙিনার সবুজ গালিচায় পিঠা উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ কোন না কোন অনুষ্ঠান করে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে বাঙালীর চিরায়ত সংস্কৃতির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভালবাসা ও প্রীতি সম্পর্কে সন্দেহ থাকার কথা নয়। তবে, পাশাপাশি এমন প্রীতি ইতিহাসের সেই অবিস্মরণীয় প্রবচনটিও মনে করিয়ে দেয়, রোম যখন জ্বলছিল, নীরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। গত এক বছর জুড়ে ভয়াল সহিংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ আর প্রানহানির ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের এরকম সংস্কৃতিমনষ্কতা আগামী দিনগুলি সম্পর্কে জনগনের আশংকা দুর করতে না পারলেও রাষ্ট্র পরিচালকরা এই মূহুর্তে যে পরম নিশ্চিন্ত তা মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে। আসলে কি তাই! নাকি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে একটি ইতিবাচক চিত্রকল্প তৈরী করার প্রচেষ্টা, যাতে করে একটি একক নির্বাচনের অত্যন্ত নেগেটিভ ইমেজ থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসা যায়?

গণভবনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যখন রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত সেই গানের কলির সাথে গলা মেলাচ্ছিলেন, “পুরানো সেই দিনের কথা ভুলব কিরে হায়….” সত্যিই কি পুরানো দিনের কথা প্রধানমন্ত্রী মনে করতে পারছিলেন বা মনে করতে পারেন। হয়তো পারেন, হয়তো পারেন না, জনগন অন্ত:ত সেটি বোঝে না, জানে না। ধ্বংসযজ্ঞ কবলিত মৃত্যু উপত্যকায় ঘুরে দাঁড়ানোর যে প্রয়াসটি থাকে, জনগনকে উদ্বুদ্ধ করে লড়াইয়ে নামতে হয়, তা ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর আচরনের সাথে ঠিক সাযুজ্যপূর্ণ নয়। প্রায় ৬৬ বছরের প্রাচীন দল আওয়ামী লীগের উত্তরাধিকার হিসেবে, সবচেয়ে বড় কথা শেখ মুজিবের কন্যা হিসেবে, পুরানো সে সব দিনের কথা শেখ হাসিনা কতটা মনে রেখেছেন, কতটা ধরে রেখেছেন সেটি একটি মস্ত বড় প্রশ্ন হয়ে আগামীতে দলীয় আত্মজিজ্ঞাসায় চলে আসবে।

১৯৪৮ সালে মুসলিম লীগের স্বৈরতান্ত্রিক আচরনের বিরুদ্ধে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। অচিরেই মুসলিম শব্দটি ঝেড়ে ফেলে একটি অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম সাধারন নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরীক হিসেবে আওয়ামী লীগ অবস্থান পরিস্কার করে নেয়। গোল বাধে পশ্চিম ঘেঁষা, বিশেষ করে মার্কিনীদের প্রতি অনুরক্ত উর্দুভাষী আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী নেতা মাওলানা ভাসানীর সাথে। এশীয় অঞ্চলে মার্কিনীদের প্রভাব বলয় গড়ে ওঠা ও বিস্তারে সামরিক চুক্তি সিয়াটো, সেন্টো চুক্তিতে স্বাক্ষর ও সদস্য হওয়ার প্রশ্নে। ভাসানী এর তীব্র বিরোধীতা করলে দলের মধ্যে দু’টি ধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং পরিনামে আওয়ামী লীগের ভাঙ্গন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

১৯৫৬ সালে কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে মাওলানা ভাসানী গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। ভাসানীর অত্যন্ত স্নেহভাজন সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য শেখ মুজিব থেকে যান আওয়ামী লীগের মূল ধারায়। এর পরের ইতিহাস, বিশেষ করে প্রাক মুক্তিযুদ্ধ পর্ব পর্যন্ত ইতিহাসের যেকোন নির্মোহ বিশ্লেষকের বিশ্লেষণ থাকবে যে, ষাটের দশকে পশ্চিমমুখীনতা সত্বেও আওয়ামী লীগ বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধারকবাহক হিসেবে জনগনের ইচ্ছের মুর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এ সময়ে স্বায়ত্বশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে আওয়ামী লীগ অগ্রনী ভূমিকা পালন করে জনগনের মুক্তির আকাঙ্খাকে ধারন করতে সমর্থ হয়। ১৯৬৬ সালের জুনে ৬ দফা প্রণয়ন ও ঘোষণার ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এটি বাঙালী মুক্তি সনদে পরিনত হয়ে উঠেছিল। পরিনামে ১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচনে দলটি পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, যা অচিরেই বাঙালীর সার্বিক মুক্তি আন্দোলনে পরিনত হয় এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

ইতিহাসের এই সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিকতা এ কারনে মনে করিয়ে দেয়া যে, পাকিস্তানী সামরিক স্বৈরাচার, শোষন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালীর জাতীয় ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সাফল্য অর্জনের মূলে ছিল গোটা বাঙালী জাতি তার পেছনে সমবেত হয়েছিল। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ জনগনের এই ইচ্ছাকে ধারন করতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শিক পটভূমি, চেতনা ও সংকল্প মুক্তিযুদ্ধকে অবধারিত করে তুলেছিলসেই মহৎ চেতনাকে সংগ্রামী জনতার মধ্যে সঞ্চারের কোন প্রচেষ্টাই ছিল না, এমনকি গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষেও কোন প্রচারণা ছিল না।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রলম্বিত হলে নেতৃত্ব বামপন্থিদের হাতে চলে যেতে পারে অথবা সচেতন মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে যুদ্ধ শেষে ক্ষমতা দখল করতে পারেএমন ধারনা তৎকালীন ভারত সরকারকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। যুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র সংগ্রামের বিকাশের পথে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে গণমুখী বাহিনী গড়ে তোলার বদলে ঔপনিবেশিক ধাঁচের বাহিনী গড়ে তোলা হয়, যাতে এটি সামগ্রিক গণযুদ্ধে পরিনত না হতে পারে। আন্তর্জাতিক কৌশল এবং ভূট্টো’র যড়যন্ত্রে অচিরেই ভারতীয় হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে, পরিনামে মুক্তিযুদ্ধ পরিনত হয় ভারতপাকিস্তান যুদ্ধে। মাত্র নয় মাসে স্বাধীন হওয়া দেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং দলের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ এবং একক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।

সুদীর্ঘ আন্দোলনসংগ্রামের ঐতিহ্যমন্ডিত দল আওয়ামী লীগ ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তার গণতান্ত্রিক চরিত্রটি ক্রমশ: হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। এর প্রথম বহি:প্রকাশ ঘটে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এই নির্বাচনে কারচুপি, জাল ভোট এবং ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ২৯২টি আসনে নির্বাচিত হয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানিকতা গড়ে ওঠার বিপরীতে কুঠারাঘাত করা হয়। এই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার বাসনায় সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী পাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামে একদলীয় শাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটি মুছে ফেলে। সে সময়েও পার্লামেন্টারি শাসন ব্যবস্থার নামে প্রথম সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা বহাল ছিল। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তারা দেশের ভবিতব্য নির্ধারন করে দিয়েছিল একদলীয় ব্যবস্থার দিকে। আর এটি করা হয়েছিল সেই ‘ব্রুট মেজোরিটি’র জোরেই।

গনতন্ত্র চর্চার শেষ চিহ্নটি এভাবে মুছে দেয়ার ফলে দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ষড়যন্ত্রকারী নেতৃবৃন্দ, ঔপনিবেশিক ধাঁচের বেসামরিকসামরিক আমলাবৃন্দের সম্মিলনের ফলে ১৯৭৫’র ১৫ আগষ্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরতম ট্রাজেডি সংঘটিত হয়। ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষকরা মনে করেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতির অবশিষ্ট না থাকা, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা এবং ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার বাসনা এই ট্রাজেডির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে, যা কখনই সাধারন মানুষের কাম্য ছিল না। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারক এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবেই গণতন্ত্র বিচ্যুতির দায় পরিশোধ করেছিল একটি নিষ্ঠুরনির্মম ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে। এর পরিনামে নির্বাকনিথর জনগন সাক্ষী হয়ে থাকে ক্ষমতা দখলের নোংরা খেলায় ক্যুপাল্টা ক্যু, রক্তপাত, রাজনৈতিক নেতা, সেনা অফিসার, মুক্তিযোদ্ধাদের জঘন্য হত্যাকান্ডের। গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্খায় পৃথিবীর কোন জাতিকে এত রক্ত দিতে হয়েছে, এরকম উদাহরন বোধকরি আর নেই।

১৯৭৫ সালের এই হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পরিনাম হয়েছিল সুদুরপ্রসারী। গণতান্ত্রিক একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করা হলেও সামরিকবেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাতে রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করে। এ সময়ই রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। দেশের সর্ববৃহৎ দল আওয়ামী লীগ দল হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যেটি হয়েছিল ১৯৬৬ সালে প্রধান সকল নেতারা গ্রেফতার হয়ে জেলে আটক থাকার সময়। সে সময় সংগ্রামী এক নারী আমেনা বেগম আওয়ামী লীগের হাত ধরেছিলেন, তেমনটি ৭৫ পরবর্তীকালে ধরেছিলেন তাজউদ্দিনের স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দিন। কিন্তু অচিরেই দল দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসা হয় দলের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য।

১৯৮১ থেকে ২০০৮এর নির্বাচন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির একটি কালপর্ব ধরে নিলে আমরা দেখব, এ সময়কালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৮৩৯০ পর্বে বিএনপি ও বামদলগুলোর সাথে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, এরশাদের পতনের পরে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা পুনপ্রবর্তনে ভূমিকা রেখেছে, জাতীয় পার্টি, জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে তত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ মুজিব হত্যার বিচার সম্পন্ন করেছে। ২০০১ সালের তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে সে নির্বাচন স্থুল কারচুপি আখ্যা দিয়ে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিলেন শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে ১৯৯১৯৬ মেয়াদের মত সংসদ বর্জনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছিলেন। সুতরাং দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ এই পর্ব অতিক্রম করলেও দেশের রাজনীতিতে সুস্থ্য গণতান্ত্রিক রাজনীতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেনি।

২০০৮ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসীন হয় তিনচতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। সম্ভবত এই বিজয় দলটিকে পুনরায় স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। ফলে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মত একটি পরীক্ষিত বিষয়কে সংস্কার না করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করে দেয়। স্পষ্টত:ই এটি করা হয় জনগনের অভিপ্রায়ের বিপরীতে সূদুরপ্রসারী একটি লক্ষ্য নিয়ে। যাতে করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি না হয়। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা মেসেজটি পেয়ে যান প্রচলিত এই ফরম্যাটেও যদি বিএনপি অংশ নেয় তাহলেও তারা জিতে যাবে। সুতরাং রাজনীতির কূটচালে একের পর এক পাতানো ফাঁদে অপরিনামদর্শী বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আওয়ামী লীগকে একরকম ওয়াকওভার প্রদান করে। ফলে ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত একটি প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে ১৫৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এবং বাকি ১৪৭ টি আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মহড়ায় পূনর্বার আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসীন হয়েই একক কর্তৃত্বে শেখ হাসিনা দলের সিনিয়র নেতাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যেমন দুরে ঠেলে দিলেন, মন্ত্রীসভা গঠন করলেন আনাড়িঅনভিজ্ঞ রাজনীতিকদের নিয়ে, তেমনি হয়ে পড়লেন সাবেক ও বর্তমান আমলা নির্ভর। এর অবশ্যাম্ভাবী ফল হিসেবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সরকার তার নিজস্ব রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হবার বদলে প্রশাসন, পুলিশ এবং দমননীতি নির্ভর হয়ে পড়ে। ক্ষমতার বছর দুয়েকের মধ্যেই শেখ হাসিনা বুঝে গিয়েছিলেন, আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল। জনসমর্থন তাঁর থেকে ক্রমশঃ দুরে, বহুদুরে সরে যাচ্ছেসিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পরেই সম্ভবত: বিষয়টি তিনি সম্যক উপলব্দি করেন। এসময় তিনি জনসমর্থন ফিরে পাওয়ার বদলে একক নির্বাচনের দিকে এগিয়েছেনগনতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে সেখান থেকেই আওয়ামী লীগের বর্তমান অন্ধকার যাত্রাটি শুরু হয়।

২০০৮ থেকে ২০১৪। অসাধারণ অনুকূল এক রাজনৈতিক পরিবেশ ও গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমুহ বিকশিত হওয়ার অপার সম্ভাবনা চরম প্রতিকূলে প্রবাহিত করে জনআকাঙ্খার সমাধি রচনা করার দায় প্রধানত: বর্তাবে আওয়ামী লীগের ওপর। এ কারনে জনসমর্থন নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার নীল নকশাটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যাবস্থা সংশোধন বা যুগোপযোগী করার বদলে বাতিল করে দিয়ে এমন অবস্থা তৈরী করা হয় যাতে বিরোধী দল নির্বাচনে না আসতে পারে। শেখ হাসিনা সফল হয়েছেন। বিরোধী দলবিহীন, প্রায় ভোটারবিহীন, প্রশ্নবিদ্ধ, সহিংসরক্তাক্ত একটি নির্বাচন করতেও সফলকাম হয়েছেন শুধুমাত্র সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে। নৈতিকতা, জনগন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়যদি বাদও দেয়া হয়, ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বা তার দল এর কি জবাব দেবেন! একথা তো বর্তমান কূশীলবদের অজানা থাকার কথা নয় যে, ইতিহাসের অনিবার্যতার কাছে ব্যাক্তি গোষ্ঠি কখনোই তার দায় এড়াতে পারেনি।

দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার যে নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার, এটি তাদের দলের কথাবার্তায় পরিস্কার হয়ে উঠতে শুরু করেছে। পাঁচ বছর, একদিনও কমবেশি নয়দলীয় নেতাদের মুখে এটি হরহামেশা শোনা যাচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, এসব কথার মধ্য দিয়ে দলীয় নেতাদের আস্থা খুঁজে ফিরতে হচ্ছে সারাক্ষণ। এরকম নৈতিকভাবে দুর্বল একটি সরকার স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠবে হিংস্র এবং ক্ষিপ্র। বিরোধীদের দমনপীড়নে সরকার আরো আগ্রাসী হয়ে উঠবে, ইতিমধ্যেই কালো পতাকা মিছিল করতে অনুমতি না দেয়া, ক্রসফায়ারে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী নিধনের মধ্য দিয়ে যে আশংকা বাস্তব হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আশংকা বাড়ছে দিনকে দিন, এর ফলে সরকার সহসাই জনরোষের মুখে পড়বে, দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্র সক্রিয় হয়ে উঠবে। আহতবিপর্যস্ত সরকার আরো নিপীড়ক হয়ে উঠবে, বাংলাদেশ হয়ে উঠবে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই আশংকার বিপরীতে ঘুরে দাঁড়ানোর মত কোন রাজনৈতিক চরিত্র যদি আওয়ামী লীগের মধ্যে অবশিষ্ট থেকে থাকে, তাহলেই জনগন ও দেশ ঘুরে দাঁড়াবে, অন্যথায় ইতিহাসের অনিবার্য পরিনতি এড়ানে যাবেনা।।