Home » রাজনীতি » ছাত্রলীগ :: সরকারের ভয় তাড়ুয়া বাহিনী

ছাত্রলীগ :: সরকারের ভয় তাড়ুয়া বাহিনী

আবীর হাসান

ru-bclগত সোমবার সব জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল ‘ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় আহত শতাধিক শিক্ষার্থী।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারির ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়েই এমন শিরোনাম ব্যবহার করেছে পত্রিকাগুলো। না, ব্যাকরণগত কোনো ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণে এই উদ্ধৃতি দেয়া হচ্ছে না। প্রশ্ন উঠেছে, চেতনা এবং ধারণা নিয়ে। ছাত্রলীগ এবং শিক্ষার্থী দুটি বিষয় আলাদা হয়ে গেছে এখন। যেমন এর আগে হয়েছে পুলিশ এবং মানুষ বিষয়ে। এ দেশে সাধারণ মানুষ এবং পুলিশ উভয়েই জানে তারা ধারণা ও চেতনাগত ভাবে আলাদা গোষ্ঠীগত ভাবেই। এখন দেখা যাচ্ছে, ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে একইভাবে। শুধু তাই নয়, ছাত্রলীগ এখন একটা নিছক বিশেষ্য শিক্ষার্থী অর্থে যা বোঝায় তার ছিটেফোঁটাও তার মধ্যে নেই। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী বা ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছাত্রলীগ হচ্ছে ভিন্ন একটা গোষ্ঠী যারা কাজ করে সরকারের পেটোয়া বাহিনী হিসেবে। হরহামেশাই তারা পুলিশের সহযোগী বা সাহায্যকারী হয়ে যায় আর চড়াও হয় শিক্ষার্থী বা নিরীহ মানুষের ওপর। এদেশের মানুষ সহজেই অনেক কিছু ভুলে যায়, তবে নিশ্চয়ই বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার স্মৃতি এখনো কেউ ভোলেননি বলেই প্রত্যয় হয়। ওটিও আসলে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অতি সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, কুয়েট, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটে এমসি কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘটনাবলী একটু স্মৃতি হাতড়ালেই পাওয়া যাবে।

ছাত্রলীগ কী করছে? বিস্ময় নিয়ে এ প্রশ্ন করার আর অবকাশ নেই। সরকারী এই বাহিনী এখন যা করছে তা হচ্ছে আইন লঙ্ঘন। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারেও আওয়ামী লীগ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকার নিজেই পুলিশ এবং ছাত্রলীগ উভয়কে দিয়েই আইন লঙ্ঘন করাচ্ছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আর সরকার কর্তৃক রাষ্ট্র পরিচালনা এক জিনিস নয়। এটাই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বিস্মৃত হয়েছেন কিংবা খুব ঠান্ডা মাথায় তারা যে কোনো ধরনের প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে দমন পীড়ন চালাচ্ছেন। আর সেটাকে দেখাতে চাচ্ছেন আইন প্রয়োগ এবং প্রচলিত আইন রক্ষার কার্যক্রম হিসাবে। সাম্প্রতিককালে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এমন কী সংসদীয় দলের পদাধিকারীরা পর্যন্ত এই আস্ফালন করছেন যে, প্রতিবাদকারীদের কীভাবে শিক্ষা দিতে হয় তা তারা জানেন। কেবল আস্ফালন নয়, সরকারের মধু চন্দ্রিমার সময়টা না কাটতেই কাজটা তারা শুরু করে দিয়েছেন, যার ফলে দেখা যাচ্ছে পুলিশ এবং ছাত্রলীগ উভয়েই মারমুখী। তারা দেশের আইন গণতন্ত্রের নিয়মনীতি কিছুই মানছে না অবলীলায় আইন লঙ্ঘন করছে এবং সশস্ত্র আক্রমণ চালাচ্ছে যে কোন অন্যায়ের প্রতিবাদকারীদের ওপর।

অথচ প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার এবং উদার গণতান্ত্রিক রীতিনীতি তো এ ধরনের কার্যক্রমকে কোনভাবেই সমর্থন করে না। কঠোর নীতি প্রয়োগ এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের কঠোরতার একটা সীমা নিশ্চয়ই আছে এবং এ সরকারের কুশীলবরা তা বিলক্ষণ জানেন। তারা এও জানেন যে, কঠোরতার নামে দমন নীতি চালানো যায় না। অবশ্যই সরকার নিজেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। অধিকন্তু কোন প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ছাত্রলীগ ধরনের বাহিনী পালতে পারে না।

কেন এটা হচ্ছে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁঁজতে গেলে প্রথমেই যে উত্তরটা পাওয়া যাবে তা হচ্ছে, এ সরকার সার্বিক অর্থে কোন ভাবে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার নয়। ৫ জানুয়ারির তথাকথিত সংবিধান রক্ষার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে তার প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র বিসর্জন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এখন সেই ক্ষমতাকে উপদ্রবহীন রাখতে তাই কঠোরতার নামে স্বৈরাচারী দমন পীড়ন চালাতে গণতান্ত্রিক সভ্য নিয়মকেও বিসর্জন দিয়েছে। যতো রকমের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায় এতদিন তারা রেখে ঢেকে করেছে বা করা থেকে বিরত থেকেছে এখন তা তারা নির্দ্ধিধায় নির্বিকারচিত্তে করছে। যেমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্ধিত ফি আদায় বা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির আদলে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালুর অন্যায়গুলো করার চেষ্টা হচ্ছে। প্রতিবাদ হওয়াতে চলছে ছাত্রলীগ বাহিনী ও পুলিশি অ্যাকশন। আসলে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে, ছাত্রলীগের ভরসাতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকার গৃহীত অন্যায় সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন বলতেও আর প্রায় কিছুই নেই। ন্যূনতম যে নিয়ম এবং বিধান সেগুলোর বত্যয় ঘটানোর চেষ্টাও হচ্ছে সব জায়গায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এছাড়া বুয়েট, কুয়েট, শাহজালাল এসব জায়গাতেও ছাত্রলীগের পেশীও নয় অস্ত্রশক্তির জোরেই যা হবার নয় তাই করা হচ্ছে। আর এই বাহিনী যে কেবল শিক্ষাঙ্গনগুলোতেই সক্রিয় তা তো নয়। সর্বত্র অর্থাৎ যেখানে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থরক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে সেখানেই এদেরকে সক্রিয় করা। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলার নামে আইন লঙ্ঘন করে, আইনকে হাতে তুলে নিয়ে সরকারই প্রকৃতপক্ষে ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছে। আইন প্রয়োগকারী বহিনীগুলোও আইন হাতে তুলে নিচ্ছে আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে দলীয় সশস্ত্র অগ্রবাহিনী। ছাত্রলীগের ‘ছাত্র’ শব্দটি এখন নিছক এক প্রহসন প্রতারণা।

ইতিহাস বলছে এ রকম বাহিনী ছিল হিটলার, মুসলিনী ও ফ্রাঙ্কোর। আর এখনও আছে আসাদ এবং মুগাবের। কদিন আগেও ছিল মুরসির, গাদ্দাফির এবং সাদ্দামের।

ইতিহাসের ওই সব ‘মহা কীর্তিমানদের’ মতো বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও নিজেদের অবৈধ কৃতকর্মের জন্য ভয়ে কম্পমান। এখন ভয় তাড়াতে নিজেরাই আইন অমান্য করে ভয় দেখাচ্ছে জনগণকে। পুলিশকে তাদের মনে হচ্ছে অপর্যাপ্ত। কোথাও অন্যায়ের প্রতিবাদ হলেই সেখানে অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তারা। কারণ স্ফুলিঙ্গকেও মনে করছে দাবানল।

কেন বার বার একই কাজ করানো ছাত্রলীগকে দিয়ে। আর লাজলজ্জা বিসর্জন দেয়ার বিষয়টা যদিও অনেককে এখনো ভাবাচ্ছে কিন্তু সরল সত্যটা হলো, স্বৈরাচারের পরিণত হওয়া শাসক সব সময় সব দেশে একই কাজ করে নিজেদের তৈরি করা গোষ্ঠীর নিয়মে চলতে বাধ্য করে পুরো সমাজটাকেই। সরকার যে রাষ্ট্র পরিচালনা আর আইন রক্ষার দায়িত্ব প্রাপ্ত মাত্র এ কথা তারা ভুলে যায়। রাষ্ট্র যন্ত্রগুলোকে করে তোলে নিপীড়নমূলক এবং আইন রক্ষার বদলে আইন ভাঙাকেই সুবিধাজনক মনে করে। আইন হাতে তুলে নেয়াকেও কোন সমস্যা বলে মনে করে না। প্রজন্মকে বিনষ্ট করতেও বিবেক বাধা দেয় না তাদের। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এটাই করছে আর সমাজের ওপর কর্তৃত্ব করার অগ্রবাহিনী করে তোলা হয়েছে ছাত্রলীগকে,এটাই বাস্তবতা। বিচারের বানীর নিরবেনিভৃতে কাঁদারও সুযোগ নেই এখন। কান্নার আওয়াজও গুলির নিশানা হতে পারে। আর আইনের শাসন? সম্ভবত মৃত ধারণা এখন।।