Home » রাজনীতি » শাসক যখন বিশ্বাসহীন

শাসক যখন বিশ্বাসহীন

আমীর খসরু

political-cartoon-2বর্তমানে যে সরকারটি রয়েছে তার ভিত্তি একটি ভোটারবিহীন পরিহাসের নির্বাচন। কাজেই ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। জনপ্রতিনিধিত্বহীন এ সরকারটির বিষয়আশয় এ কারণে ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। এ সরকারের কথা এবং কাজকর্মেও কারো কোনো বিশ্বাস নেই। তারপরেও যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী বেতার এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে দেশবাসীকে জোর করে শোনানোর প্রচেষ্টাটি নিয়েছিলেন সেখানে সুশাসন নামক কথাটির উল্লেখ ছিল কয়েক দফায়।

জনগণের ভোটে ২০০৮ সালে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল তারাই ওই নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার দিয়েছিল তাতে ৫এর ২ দফায় ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন কঠোরভাবে বন্ধ’ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথমদিন থেকেই ওই সরকারটি তথাকথিত ক্রসফায়ারসহ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের নানা ধরন আবিষ্কার করে তা বাস্তবায়ন এমন মাত্রায় শুরু করে যে, এ নিয়ে তখন দেশীবিদেশী মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এমনকি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল এবং জেনেভায় এ সংক্রান্ত এক শুনানিতে ওই সরকারটিকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখিও হতে হয়েছিল। ওই শুনানিতে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন তথাকথিত ক্রসফায়ারসহ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে। তবে ওই শুনানি এবং ওয়াদার প্রভাব কোনোদিনই আর বাস্তবায়িত হয়নি। বরং নতুন এক ভয়ঙ্কর উপসর্গ এবং অপকৌশল তখন সরকার চালু করে যার নাম গুম। ক্রসফায়ারের চেয়েও গুম আতঙ্ক এমনভাবে জনজীবনকে আতঙ্কিত করে ফেলে যা অতীতে আর এ দেশটিতে দেখা যায়নি। এর কিছুকাল পরেই আবার নতুন এক ধরন দেশবাসী লক্ষ্য করলো। পুলিশকে দেখামাত্র গুলির বেআইনি কাজটিকে আইনি বৈধতা দেয়া হলো। আর এ সবই করা শুরু হলো প্রতিপক্ষকে বিনাশ এবং উৎখাতের লক্ষ্যে। স্বাধীনতার পরেই এই পর্যায়টি শুরু হয় প্রতিপক্ষকেই বিনাশের চেষ্টায়। এদেশে তথাকথিত ক্রসফায়ারে প্রথম শিকার সিরাজ সিকদার। আর নিখোঁজ বা ডিসএপিয়ারেন্স, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদী শাসকরা করেছে তাও কমবেশি শুরু হয় ওই সময়ই।

বর্তমানে যা চলছে তা ওই শাসনেরই অনুকরণ তবে আরও বেশি ভয়ঙ্করভাবেই। বিগত ৫ বছরে বিরোধী পক্ষ দমনে যে হত্যাযজ্ঞ চলেছিল, অনির্বাচিত সরকারটি তা চালু তো রেখেছেই বরং আরো ব্যাপক মাত্রায় শুরু করেছে ৫ জানুয়ারির কথিত নির্বাচনের আগে এবং পরে।

গত কয়েকদিনে তথাকথিত ক্রসফায়ার, গুম খুনের সঙ্গে নতুন নতুন সব ভয়ঙ্কর মানুষবিনাশী কর্মকাণ্ড দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে। এই কিছুকাল আগেও তথাকথিত ক্রসফায়ার কিংবা গুমের ঘটনাগুলো ঘটলে বোঝা যেতো কারা এটা করেছে। এখন এমন এক আততায়ী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে যাতে বোঝা গেলেও বলা যায় না যে কে এই হত্যাকাণ্ডগুলো করছে। এখন এটাও বোঝা যায় না কেমন করে কোথায় হারিয়ে গেল একটি বা আরো বেশি মানুষ, উধাও হয়ে গেল। আবার কয়েকদিন পরে নির্যাতনের চিহৃসহ মরদেহ পাওয়া গেল ভিন্ন কোনো এলাকায়। প্রায় প্রতিদিনই এমন ঘটনার খবর সংবাদপত্রে দেখা যাচ্ছে। বাস্তবে পরিস্থিতি আরো ভয়ঙ্কর এবং ভয়াবহ।

নতুন আরেক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে বিরোধী দলীয় বা পক্ষীয় কারো নামে মামলা হলে স্বল্পকালেই পাওয়া যাচ্ছে ওই রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মরদেহ। এভাবে শাসক ঘাতকের ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছে। বিরোধী দল, মত বা পক্ষকে বিনাশের জন্য এ কোনো নিত্যনতুন পদ্ধতি, এ কোন ভয়ঙ্কর কৌশল? বিরোধী পক্ষ দমনের এ কোন পৈশাচিক খেলা? এর পরিণতি নিশ্চয়ই ভয়াবহ হতে বাধ্য। কারণ অধিকার সার্বজনীন। আর অধিকার বলতে এমন কিছু শর্তাবলীকে বোঝায় যে শর্তাবলী পূরণ না হলে মানুষের পক্ষে প্রকৃত অর্থে মানুষ হিসেবে সে সমাজটিতে বসবাস করা সম্ভব তো নয়ই, বরং প্রচণ্ড মাত্রায় অসহনীয়।

বিরোধী দল, মত বা পক্ষকে বিনাশের জন্য এ কোনো নিত্যনতুন পদ্ধতি, এ কোন ভয়ঙ্কর কৌশল? বিরোধী পক্ষ দমনের এ কোন পৈশাচিক খেলা? এর পরিণতি নিশ্চয়ই ভয়াবহ হতে বাধ্য। কারণ অধিকার সার্বজনীন। আর অধিকার বলতে এমন কিছু শর্তাবলীকে বোঝায় যে শর্তাবলী পূরণ না হলে মানুষের পক্ষে প্রকৃত অর্থে মানুষ হিসেবে সে সমাজটিতে বসবাস করা সম্ভব তো নয়ই, বরং প্রচণ্ড মাত্রায় অসহনীয়।

৫ জানুয়ারি কথিত নির্বাচনের আগে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার নামে যৌথ বাহিনীর অভিযান ছিল মূলত বিরোধী পক্ষকে বিনাশ করার লক্ষ্যে। এ জীবন বিনাশী অভিযানে অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছে। এমনও ঘটনা ঘটেছে যাকে ওই বাহিনী ধরতে গেছে তাকে না পেয়ে তার নিজ আত্মীয়স্বজনকে পর্যন্ত ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে সম্পদ, জীবনের সম্বলটুকুও। এ প্রবণতা এখনো বিদ্যমান। আর আগেই বলা হয়েছে, বিরোধী মত বা পক্ষকে নির্মূল, বিনাশ করার প্রচেষ্টাই এর কারণ।

আর এটা করা হচ্ছে, ভীতির কারণে। আর ভীতিটি জন্ম নিয়েছে জনবিচ্ছিন্নতা থেকে। ৫ জানুয়ারির পরে আওয়ামী লীগ দল এবং সরকার হিসেবে এটা প্রকৃতার্থে টের পেয়েছে তারা যে কতোটা জনবিচ্ছিন্ন। জনবিচ্ছিন্নতার ভীতিটি যে আগেও ছিল না তা নয়। কিন্তু এমন মাত্রার জনবিচ্ছিন্নতার অবস্থাটি তাদের মনোজগতে ছিল না। এ কারণেই ৫ জানুয়ারির পর ভীতির চরম মাত্রায় পৌছে যাওয়া শাসক এখন ঘাতকে পরিণত হয়েছে। এটাই হয় ইতিহাস তাই বলে। শাসক মনে করে এভাবেই ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হয় এবং এই পথই দেবে সরকারের দীর্ঘায়ু। কিন্তু নির্মূল, বিনাশ আর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সত্যিকার ভাবেই যে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না সেই বোধটুকুও বিলুপ্ত প্রায়। এখন যা চলছে তা সেই বোধবুদ্ধিবিহীন অবস্থারই প্রতিফলন।।

১টি মন্তব্য