Home » মতামত » সীমাহীন দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ

সীমাহীন দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ

ফারুক আহমেদ

people-21সাধারণত এদেশের মানুষ নিজ নিজ জীবনজীবিকা নিয়ে যতো ভাবে ততোটা রাজনীতি নিয়ে ভাবে না। স্বাভাবিক কারণেই ভাবে না নির্বাচন নিয়েও। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। মানুষকে রাজনীতি আর নির্বাচন নিয়ে ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশ কোথায় যাচ্ছে, এ ভূখন্ডের মানুষের ভবিষ্যত কি এ নিয়েই তাদের মূল ভাবনা। আর এ নিয়েই বেশ কয়েকজনের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তারা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই বারই প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচনে ভোটদানের হার সর্বনিু হলেও শতভাগ ভোটারতো বটেই এমন কি যারা ভোটার নয় তারাও ভাবনা থেকে দুরে থাকতে পারেনি। রাজনীতি নিয়ে, সরকার গঠন নিয়ে, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তা থেকে সৃষ্ট আর্থসামাজিকসাংষ্কৃতিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তার দিক থেকে অবোধ শিশু এবং অপ্রকৃতস্থ মানুষ ছাড়া সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত বলে কোন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ এই পরিস্থিতিতে আসলে আক্রান্ত মানুষ এবং এর মধ্য থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ উভয়কেই এই পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। যে কোন পরিস্থিতি দ্বারা ব্যাপক অধিকাংশ মানুষ আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও যখন সে পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে তখন বুঝতে হবে সেই পরিস্থিতি দ্বারা সুবিধা প্রাপ্ত মানুষও আছেন। তবে এই ধরণের পরিস্থিতি, যার দ্বারা ব্যাপক অধিকাংশ মানুষ আক্রান্ত হন, তা বিরাজমান রেখে যারা সুবিধাপ্রাপ্ত হন তারা আর সাধারণের পর্যায়ে থাকেন না। বর্তমান পরিস্থিতি, এর কারণ এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে মানুষের ভাবনা কি তা নিয়ে কথা বলতে গেলে যা প্রতিফলিত হয় তা থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, সুবিধাপ্রাপ্তদের অবস্থান সাধারণ মানুষের কাতার থেকে অনেক দুরে।

একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন এমন একজন তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বললেনআমরা এক দম বন্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আছি। কোন কিছুই যেন স্বাভাবিক নয়। যা চিন্তা করা যায় না, বিশ্বাসও করা যায় না তাই ঘটে চলেছে।সব সময়ই এক অজানা আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। কি আর্থিক, কি সামাজিক কি জীবনের, কোন কিছুরই নিরাপত্তা বলে যেন কিছু নেই। তিনি বললেন, তাঁদের মধ্যবিত্ত স্বচ্ছ্বল পরিবার। বাজার সহ সংসারের সব দেখভালই তাঁর মা করেন বরাবরই। তাঁর মাকে তিনি কখনোই বিচলিত হতে দেখেননি এখন যেমন দেখছেন। হঠাৎ করেই যেন তাঁর মাকে মনে হচ্ছে অনেক বেশি চিন্তিত এবং অনেক বেশি হিসেবি। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন,তাঁর বাবা আওয়ামীলীগের সমর্থক। কিন্তু তিনি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খুবই চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন। যেসব কারণে তিনি আওয়ামীলীগকে সমর্থন করতেন বর্তমানে ঘটে চলা ঘটনাগুলো তাঁর সেসব চিন্তাগুলোকে ধাক্কা দিচ্ছে। তার মতে, আওয়ামী লীগ যা করছে ঠিক করছে না। এর শেষ নিয়ে তিনি অনিশ্চিত। এ থেকে উত্তরণের পথ জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে।কিভাবে সেটা সম্ভব জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই জনগণকে আন্দোলন করতে হবে।তাঁর মতে বিরোধীদল তথা বি.এন.পি তেমন গণ আন্দোলনের পথে নেই। তারা কখনোই জনগণকে সেভাবে আহ্বান করেনি। ক্ষমতাসীন দল যেরকম ক্ষমতায় যে কোন উপায়েই হোক থাকার জন্য প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভারতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে , তেমনই বিএনপিও জনগণের উপর আস্থা না রেখে যতটা সম্ভব গণআন্দোলনের পথ পরিহার করে বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থার সাথে দেনদরবারে বেশি মনোযোগী। তাঁর মতে এই সুযোগে দুর্বল সরকারের নিকট থেকে বিভিন্ন দেশ আমাদের জনগণের স্বার্থ বিরোধী চুক্তিগুলো স¤পন্ন করিয়ে নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি টিকফা চুক্তির কথা উল্লেখ করলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এমন একজনের মতে তরুণদের বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের যে অনিশ্চয়তা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে এমনটি আগে আর কখনোই দেখা যায়নি, বিশেষ করে তাঁর শিক্ষা জীবনের মধ্যে এমনটি তিনি দেখেননি। সরকার এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বললেন বর্তমান সরকার জোরজবরদস্তি করেই পাঁচ বছর পার করে দিতে পারবে। এর মধ্যদিয়ে দেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংষ্কৃতিক নৈরাজ্য যেমন দেখা দেবে তেমনই মানুষের জীবনেরও নিরাপত্তা বলে কিছু থাকবে না। এসব সত্ত্বেও বর্তমান সরকার পাঁচ বছর থাকতে পারবে এই কারণে যে, জনগণের প্রতি সরকারের যেমন কোন দায়ীত্ব নেই তেমনই বড় দল হিসেবে বিএনপিও গণআন্দোলনের কর্মসূচী নিয়ে এ পর্যন্ত জনগণের প্রতি কোন আহ্বান রাখেনি। তাই সরকার দায় নিয়ে নিজ থেকে যেমন যাবে না,তেমনই সরকারকে প্রতিহত করার মত কোন কর্মসূচী বিএনপির পক্ষেও দেওয়া সম্ভব হবে না। এ থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে তিনি মনে করেন যখনই হোক জনগণের আন্দোলনের মধ্যদিয়েই তা হতে হবে।

কলেজ পড়ুয়া একজন ছাত্র বললেন, সবচেয়ে পীড়াদায়ক ব্যাপার হলো দীর্ঘদিন ধরে সরকার কোন কিছুর দায় নিচ্ছে না। এ সরকারের বয়সতো মাত্র কয়েক দিন বলায় তিনি তা মানতে নারাজ। তাঁর মতে বর্তমান সরকার আওয়ামীলীগ তথা মহাজোটের বিগত পাঁচ বছরের সরকারের থেকে ভিন্ন কিছু নয়। এর থেকে উত্তরণের পথ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনই সবার মাঠে নামা উচিৎ এই সরকারের বিরূদ্ধে। সরকারের বিরূদ্ধে যারাই থাকবে তাদের সাথেই ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। আর একজন কলেজ পড়ুয়া ছাত্র। কট্টর জামাত বিরোধী। তাঁরা পারিবারিকভাবে দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে আসছেন। আওয়ামী লীগকে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবেই এ যাবৎকাল মনে করে আসছেন। বর্তমান সরকার গঠন এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগের বর্তমান অবস্থানের পক্ষে তাঁর কোন যুক্তি নেই। তিনি মনে করেন দ্রুতই সব দলের অংশগ্রহনে একটি নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামীলীগের তার রাজনৈতিক আস্থার জায়গায় ফিরে আসা উচিত হবে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের এক তরুণের সাথে কথা হলো। তিনি বললেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের রাজনীতির জন্য এক লাভজনক পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। তাঁদের উপর সাম্প্রতিক হামলাগুলোর প্রকৃতি দেখে তাঁরা কোন রাজনৈতিক দলের প্রতিই আস্থাশীল হতে পারছে না। তিনি মনে করেন সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ হচ্ছে তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে হচ্ছে। তাঁর মতে সাম্প্রদায়ীক কারণে এসব হামলা হলে তাঁরা সাধারণ মুসলমানের সাথে একসাথে বসবাস করতে পারতেন না। তিনি মনে করেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা তাঁদের সমস্যার সম্পূর্ণ না হলেও অধিকাংশেরই সমাধান করতে পারবে।

একজন গৃহিনী জানালেন, রাজনীতি নিয়ে তিনি কখনোই আগে ভাবতেন না। এখন তাঁকে প্রয়োজনেই রাজনীতি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। তিনি বললেন, সরকার যা করছে তা ঠিক করছে না।

সমাজের বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলে এমনটা মনে হয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক কোন পরিস্থিতি নয় এবং এভাবে থাকলে এ পরিস্থিতি যে আরো খারাপ হবে এবং এক সামাজিক নৈরাজ্যের দিকে যাবে। তাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে আরো বেশি হবেন এমন আশঙ্কা রয়েই গেছে। মানুষের সবচেয়ে আতঙ্ক এবং উদ্বেগের জায়গা হলো সরকারের দায়হীনতা। এরকম একটি সরকারের লোকেরা যখন পাঁচবছর ক্ষমতা ধরে রাখার কথা বলেন তখন মানুষ আতঙ্কিত হয়, মানুষের কাছে তা আষ্ফালন বলে মনে হয়। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষেত্রে মানুষ ভোটদানের মধ্যদিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সেই সরকারে অংশগ্রহন করে থাকেন। একথা যাঁদের ভোট বিরোধীদলে পড়ে তাঁদের ক্ষেত্রেও খাটে। কারণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিরোধীদলও সরকারের অংশ। সে দিক থেকে বর্তমান সরকারে মানুষের অংশগ্রহন নেই। সাধারণ মানুষ এই সরকারকে কোনভাবেই গণতান্ত্রিক মনে করছেন না। এই সরকারের পাঁচ বছর ক্ষমতা ধরে রাখার আষ্ফালন যেমন মানুষকে আতঙ্কিত করে, ঠিক একইভাবে জনগণের পক্ষের কোনরকমের কর্মসূচী ছাড়া শুধুমাত্র সরকার বিরোধী ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিদেশীদের সাথে দেনদরবার করে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিরোধীদলের তৎপরতাও মানুষকে তাদের প্রতি আস্থাশীল করে না। তাদের সবার সাথে কথা বলে মনে হয়েছে গন্তব্য,পথ সবই মানুষের জানা আছে কিন্তু পথে নামার বাহন এখনও জানা নেই।।