Home » বিশেষ নিবন্ধ » অতীতের বামপন্থি নয় :: চাই নতুন বামপন্থা

অতীতের বামপন্থি নয় :: চাই নতুন বামপন্থা

আফসান চৌধুরী

communist-sign-21স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি প্রথম এগিয়ে আসেন তিনি ছিলেন একজন ছাত্রনেতা। তার নাম মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী। মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর জন্মস্থান সিলেট। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রশক্তি করতেন। কমিউনিষ্ট পার্টি থেকে তাকে বলা হয়, তুমি মুসলিম লীগের ভেতরে গিয়ে কাজ কর। সে সময়ে অর্থাৎ চল্লিশের দশকে স্ট্র্যাটিজিই ছিল মুসলিম লীগ অথবা কংগ্রেসসহ বিভিন্ন দলে গিয়ে কাজ করার। যারা এ চেষ্টাটি করেছিলেন তাদের নাম ছিল ইনার গ্রুপ। এ গ্রুপের নেতা ছিলেন মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী। সুতরাং এটা বলা যেতেই পারে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের পরিকল্পনা করার পিছনে বামদের প্রবল প্রভাব ছিল। ১৯৪৭ সালের পরে ১৯৪৮ সালে মোহাম্মাদ তোয়াহা একটি লেখাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিষয়ে নিয়ে লিখেছিলেন লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের সূত্র উল্লেখ করে। পাকিস্তানীরা বামপন্থিদের ভীষণ ভয় পেত। কমিউনিষ্টরা যতটা না সবল, পাকিস্তানীরা তাদের তারচেয়েও বেশি শক্তিশালী মনে করত। এর কারণ হলো, আর্দশিক শক্তিকে পাকিস্তানীরা ভয় পেত।

কলকাতায় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টি কনফারেন্স ১৯৫৬ সালে বামপন্থিরাই বলে, এ দেশ স্বাধীন হতে বাধ্য। ইতিহাসের দিক থেকে বামপন্থিরা কখনো পিছিয়ে ছিল না। কিন্তু বিশ্লেষণের বিষয়, কখন স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনটা বামপন্থিদের হাতছাড়া হলো এবং কেন? হাতছাড়া হলো ১৯৫৭ সালে যখন আওয়ামী লীগ ভাঙে। আন্তর্জাতিক বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নের পরামর্শে বামপন্থিরা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে চলে যায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে। ভাসানীর নেতৃত্বে তারপর বামপন্থিদের অবস্থা আর ভালো হয়নি কোনদিন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ মার্কিনপন্থি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হোসেন শহীদ সোহরার্য়াদীর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, অতত্রব বাংলাদেশ আন্দোলনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট থেকে বামপন্থিদের অবস্থানটা কী হবে এটাই ছিল প্রধান বিষয়। সেটা হবে সমাজতন্ত্রের পক্ষে। সমাজতন্ত্রের শক্তি আওয়ামী লীগ নয়, অতত্রব আমরা সেখানে থাকব না। এর ফলাফল হলো, মূল ধারার রাজনীতিতে বামপন্থিরা আর উপস্থিত থাকল না। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত মার্শাল ’ল ছিল। সে সময়ে কারোই কোনো উলেল্লখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ভাসানী সমর্থন করেছিল আইয়ুব খানকে। সমাজতন্ত্রী চায়নার অনুরোধে সেটি করেছিলেন তিনি। সেখান থেকে অর্থাৎ ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সোভিয়েতপন্থি সবল কমিউনিষ্ট পার্টিও ছিল না। এদেশে ততদিনে চীনপন্থি বাম পুরোপুরি বিভক্ত হতে শুরু করেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানে বামপন্থিরা কোন দিনই শক্তি হিসেবে দাড়াতে পারেনি। ১৯৬৫ সালে মওলানা ভাসানি রাজনীতির মূলধারায় ফিরে এসে আইয়ুব খানের বিরোধীতা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। সে সময়ে ভাসানী আইয়ুব খানের বিরোধীতা করেন এবং ফাতেমা জিন্নাহ যিনি সর্বদলীয় বিরোধী দলীয় প্রার্থী ছিলেন, তাকে সমর্থন করেন। সে সময়ে ন্যাপ কিন্তু রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল না। ১৯৬৫ সালে যুদ্ধ এবং ১৯৬৬ সালে ছয় দফা উত্থাপিত হলো। ছয় দফার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কেউ ছিল না আওয়ামী লীগ ছাড়া।

এত বছরের রাজনীতিতে কোনো সময়েই বামপন্থিরা নিজেদের অবস্থানকে পরিস্কার করতে পারেনি। সে বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়, যে কারণে বামপন্থিরা রাজনৈতিক পরিসর হারিয়েছে সেটি হলো, তারা আন্তর্জাতিক বিষয়টি নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত সবসময়, জাতীয় নয় আন্তর্জাতিক বিষয়কে ভিত্তি করে তারা জাতীয় রাজনীতির বিষয়াবলী নির্বাচন করেছে। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ জাতীয় রাজনীতির মূল বিষয়, সেটি তারা ধরতে পারেনি। এর ফলে রাজনৈতিকভাবে বামপন্থিদের অবস্থান মানুষের কাছে দাঁড়ায়নি। ছয় দফা ঘোষণার সময়ও নানা কথা বলেছে বামপন্থিরা, কিন্তু তাদের কথায় মানুষের সমর্থন ছিল না। সে সময়ে মানুষের সমর্থন ছিল ছয় দফার প্রতি। আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করে বামপন্থিদের কোনো লাভ হয়নি। রাজনৈতিক পরিসরটা তারা হারিয়েছে বিরোধীতার রাজনীতি করতে গিয়ে। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের সময় বামপন্থিরা নেতৃত্বে ছিল বলে দাবি করা হয়। তারা নেতৃত্বে থাকুক বা না থাকুক ১৯৬৯ সালের মূল বিজয়টা কিন্তু ছাত্রলীগের তথা আওয়ামী লীগের। সেখানে ভাসানী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তারপরও শেখ মুজিবুর রহমান সামনে এসেছেন।

১৯৭০ সালের দিকেই ভাসানী বলে দিয়েছেন, আমরা নির্বাচনে অংশ নেব না। সে সময়ে এ ঘোষণা বামপন্থিরা সবাই খুশি হয়ে গেল যে, আমরা বুর্জোয়া রাষ্ট্রে নির্বাচন করব না। স্লোগান ছিল, আমরা করেছি পণ, হতে দেব না নির্বাচন। আমার কাছে মনে হয়েছে, ভাসানী ইচ্ছা করে শেখ মুজিবুর রহমানকে পুরো জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছেন। ভাসানী বা তার দল নির্বাচনে অংশ নিলে কিছুটা প্রতিযোগীতা হতে পারত। ভাসানী হয়তো চেয়েছেন শেখ মুজিবুর ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করুক।

এক্ষেত্রে একটি ঘটনার বর্ণনা দেয়া প্রয়োজন। বিবিসির সাংবাদিক আতাউস সামাদ একটি ঘটনা বলেছিলেন। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কাভার করছেন। এটি কাভার করার সময় শেখ মুজিবুর রহমান তাকে ডাকছেন, ‘সামাদ শোন কথা আছে’। সামাদ ভাই তার কাছে গেলে মুজিবুর রহমান সামাদ ভাইকে বলেন, হুজুরকে গিয়ে বল সময় এসেছে। সামাদ ভাই বললেন, আমি তো কিছু বুঝি না। এটা বললেই কি ভাসানী সবকিছু বুঝবেন। শেখ মুজিবুর বলেছিলেন, হ্যাঁ বুঝবেন। তুই গিয়ে বল। সামাদ ভাই সাইদুল হাসানের বাসায় গেলেন, সেখানে ভাসানী উঠেছিলেন। সাইদুল হাসান ছিলেন, ন্যাপের নেতা। সেখানে সিরাজুল হোসেন খানও ছিলেন। সামাদ ভাই ভাসানীকে গিয়ে বললেন, আমি কোর্ট থেকে এসেছি, সেখানে শেখ মুজিবুর রহমান আপনাকে কিছু কথা বলতে বলেছেন। ভাসানী জিজ্ঞাসা করলেন, মুজিব বলছে। সামাদ ভাই বললেন হ্যাঁ। তখন ভাসানী বাকিদের রুম থেকে চলে যেতে বললেন। তার পর তিনি সামাদ ভাইকে বললেন বল মুজিব কি বলেছে। সামাদ ভাই বললেন, তিনি বলেছেন, সময় হয়েছে। ভাসানী বলল, শেখ মুজিব এই কথা বলেছে। সামাদ ভাই বললেন হ্যাঁ, এখন। তিনি বলছেন, সিরাজকে ডাক এবং সংবাদ সম্মেলন আহ্বান কর। এর পর থেকে শুরু হলো, গণআন্দোলন। আমার মনে হয় ভাসানী এবং মুজিবুর রহমানের মধ্যে একটা সমঝোতা ছিল অনেকে এটা বলে। আমারও মনে হয় তাদের দুজনের মধ্যে অর্থাৎ ভাসানি আর মুজিবের মধ্যে একটি সমঝোতা ছিল। ভাসানি বুঝেছিলেন যে, নির্বাচনে কে জয়ী হবে আর কে পরাজিত হবে। আর শেখ মুজিবের প্রতি তার আস্থা ছিল যথেষ্ট। আর তিনি ছাড়া তখন আর কোন শক্তি ছিল না। ভাসানি তখন এও বুঝেছিলেন যে, জাতীয়তাবাদী শক্তি হল প্রধান শক্তি। কমিউনিষ্টরা সমাজতান্ত্রিক শক্তিকে জাতীয়তাবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। এটাই হয়েছে তাদের সবচেয়ে বড় ভুল। এ কারণে ১৯৪৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বামপন্থি শক্তি দাড়ায়নি। অবশ্য এটাও মনে রাখা দরকার সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্ব আওয়ামী লিগের ভেতরই বামপন্থিদের সবচেয়ে বড় আখড়া ছিল যদিও বনেদি বাম তাদের অবস্থান স্বীকারই করতে চান না।

বামপন্থিরা শেখ মুজিবকে বুর্জোয়া শক্তি বলে গালি দেয়। অথচ শেখ মুজিব নিজে গেছেন কমিউনিষ্ট পার্টির কাছে। কমরেড খোকা রায়ের লেখা বই “আমার দেখা রাজনীতির তিন দশক” এ লিখেছেন, “১৯৬১ সালে শেখ মুজিব নিজে বামপন্থিদের কাছে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘এই পশ্চিমাদের সঙ্গে কিছু হবে না, আমাদের দেশ স্বাধীন করতে হবে’। তখন বামপন্থিরা বলেছিল, আপনি না সোহরাওয়ার্দীর লোক? আর সে তো পাকিস্তানের পক্ষে। তখন মুজিব বলেছিল, ‘সোহরায়ার্দী তার স্থানে আর আমি আমার স্থানে। আমি এসব বুঝি না, আমাকে দেশ স্বাধীন করতে হবে’। তখন বাম নেতারা বলেছিলেন, আমাদের মস্কোকে জিজ্ঞেস করতে হবে আর তখন মস্কো জবাব দিয়েছিল যে, আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে থাকব এবং এসব স্বাধীনতার আন্দোলনের মধ্যে যাব না। আমরা গঠনমূলক রাজনীতির মধ্য দিয়ে যাব অন্যকিছুর সঙ্গে যুক্ত হব না। তখন শেখ মুজিবুর রহমান বন্ধু মোয়াজ্জেম চৌধুরীকে বলেছিলেন, ‘তুমি আমার ভারত যাওয়ার ব্যবস্থা কর, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলব’। অবশ্য সেই যাত্রায় কোন লাভ হয়নি।”

পাকিস্তানের পক্ষের দলে থেকেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা নিয়ে চিন্তায় কোনো অসুবিধা ছিল না। সে দিক থেকে স্বাধীনতার মহানায়ক হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। মনে রাখতে হবে, তিনি কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। সেই শেখ মুজিবুর রহমানেরই যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন করতে অসুবিধা না হয়, তাহলে এ দলে থেকে আন্দোলনের মধ্যে থাকতে বামপন্থিদের কি এমন অসুবিধা হতো? বামপন্থিরা বারবার আন্তর্জাতিক মেরুকরণের কাছে হাত পেতেছে। তাদের দ্বন্দ্ব ছিল অনেক আগে থেকেই। এ কারনে চীনপন্থি আর সেভিয়েতপন্থি কমিউনিষ্টরা আলাদা হয়ে যায় ১৯৬১ সালে। আন্তর্জাতিক নির্ভরতা এবং এ সম্পর্কিত ভাবনা সবসময় তাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন বাংলাদেশের কমিউনিষ্টরাও রাশিয়া আর চীনপন্থিতে ভাগ হয়ে গেল। এতে সমাজতন্ত্রের শক্তি আরো কমে গেল।

১৯৭১ সালে এসে দেখা গেল, সমাজতন্ত্রের কোনো অবস্থানই নেই। সেখানে সমাজতন্ত্রের কোনো ভূমিকাই নেই। রাশিয়ানরা বা তাদের দল সিপিবিকে একটি আলাদা ক্যাম্প করে দিল ভারতে। কারণ আওয়ামী লীগ সিপিবি’র লোকদের ট্রেনিংয়ের সুযোগ দিত না। আর চীনা কমিউনিষ্টদের প্রায় কোনো কিছুই ছিল না, দু’একটা স্থানীয় ঘাঁটি ছাড়া। ঐ সময়ে সমাজতান্ত্রিক শক্তির যে ক্ষয় হয়েছে সেখান থেকে তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। সিরাজ শিকদার বরিশালে পেয়ারা বাগানে আন্দোলন শুরু করেন, স্বাধীনভাবে কিন্তু সেখানে তিনি টিকেছিলেন মাত্র কয়েক মাস। তারপর পাকিস্তানীরা সেখানে দিয়ে পেয়ারা গাছ কেটে শেষ করে দিয়েছে। সিরাজ সিকদার ছিলেন চরম মাওপন্থি। মাও যা বলেছে, সেটিই করতে হবে। ফলে তার আন্দোলনও টেকেনি। ফলে বামপন্থা ক্ষয় হতে হতে একটা পর্যায় এসে ১৯৭২ সালে একটি প্রতীকি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। অন্য কেউ নয়, তারা শেষ হয়ে গেছে নিজেদের কারণে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর চীনপন্থি বামরা যেভাবে জিয়াউর রহমানকে সমর্থন করল, তাতে কি লাভ হয়েছে? এতে বড়জোর বাইরে থাকা ন্যাপের লোকেরা বিএনপিতে ঢুকেছে। তারা সেখানে ঢুকে জামাতকে আটকাতে পেরেছে? পারেনি। আমাদের বামদের ইতিহাস অত্যন্ত দুঃখজনক ও দুর্বল। তারা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে পারে না, সংগঠনও টিকাতে পারেনা।

প্রধান বিষয়টি হল, জাতীয় প্রশ্নটি কি? আমার তো জাতীয়তা বোধ আছে। আমাকে মারলেও আমি বাঙালি। মারলেও আমি মুসলমান অথবা হিন্দু। প্রতিটি জনগণের স্বতন্ত্র কিছু ভাবনচিন্তা আছে। সেটির প্রতিফলন বামপন্থি রাজনীতির কোথাও নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় বামপন্থি নেতা হচ্ছেন আনু মুহাম্মদ। অন্যরা না। সিপিবি, বাসদ কোনো দল নয়। আনু মুহাম্মদ জনপ্রিয় কেন? সে কোন দল করে, তাও তো কেউ জানে না। জনমানুষের কাছে বামপন্থি নেতা হচ্ছে আনু মুহাম্মদ। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল এবং সেখান থেকে বের হয়ে এসেছিল। ফলে জনগণ তাকেও সেভাবে বামপন্থি নেতা হিসেবে মনে করে না। ১৯৭২৭৩ সালে গুলি করে দুইজন মানুষকে মেরে ফেলা হলে সিপিবি আওয়ামীলীগের বিরোধীতা করেছিল। কিন্তু হেড কোয়ার্টার থেকে বলা হয়েছিল, না তোমরা বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলবে এবং তোমরা বন্ধু হয়ে যাও। তখন তারা বন্ধু হয়ে যায়। বামপন্থিরা যদি এত পরনির্ভরশীল হয়, তাহলে নিজ অবস্থান আর থাকে না। আমরা বলি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীলতাই আমাদের প্রধান শত্রু। তবে বামপন্থিরা নিজের দেশের কথা চিন্তা না করে আন্তর্জাতিক বিষয়কে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টিকে কী বলব? তারা আন্তর্জাতিক মহলের উপর নির্ভর করে থাকে। কিন্তু আনু মুহাম্মদ কেন এত জনপ্রিয়? কারণ তিনি দেশের তেলগ্যাসবিদ্যুৎবন্দর রক্ষা করতে চাইছেন। জাতীয়তাবাদী প্রশ্নে আনু মুহাম্মদ মানুষের কাছে জনপ্রিয়। মানুষ ভাবে, এই একটা লোক আছে যিনি আমাদের স্বার্থ রক্ষা করছেন। তাহলে কী বামপন্থিদের বোঝা উচিত নয়, আমাদের পথটা কোন দিকে। আনুর সঙ্গে আমার ভিন্ন মত থাকতে পারে কিন্তু তিনি তো দেখিয়ে দিচ্ছেন, মানুষের কাছে পৌছানোর পথ কোনটি। মানুষের কাছে পৌছানোর বার্তা সব সময় জাতীয়তাবাদী বার্তা। আমাদের এখানে শ্রমিক আন্দোলন অত্যন্ত দূর্বল। কৃষক আন্দোলন বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না। বামপন্থার বড় সমস্যা হলো, জাতীয় প্রশ্ন নিয়ে তারা কোনো দিন জনগণের কাছে যায়নি। তাই তারা জনবিচ্ছিন্ন।

সম্প্রতি আমরা প্রধান দুই দলের সঙ্গে বামদের একটা সখ্যতা দেখতে পাচ্ছি। সেখানে যে বিষয়টি বেশি আশ্চর্যজনক তাহলো, জাসদের আওয়ামী লীগে যোগ দেবার ঘটনা। একটা সময় এই জাসদের লোকজন আওয়ামীলীগের লোকদের হত্যা করতে মরিয়া ছিল, তারা গণবাহিনী করেছে। অনেক আন্দোলন করেছে। আজ তারা সব আওয়ামী লীগে ঢুকেছে। এখন তারা সবচেয়ে গোড়া আওয়ামী লীগ বলেই মনে হচ্ছে। কেন হয়েছে? আমার মনে হয় না, সাধারণ মানুষের কাছে জাসদের লোকজন খুব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। একই কথা বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জনগণ মনে করে, তারা আদর্শ ত্যাগ করে মন্ত্রী হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গড়েছে। এ ধারণা কতটা সত্য, তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। আর একারণেই বাংলাদেশে আদর্শের জায়গা থেকে বামদের অনেক আগেই পতন ঘটেছে। তাদের আর কোনো আদর্শিক জায়গা নেই। কোনো রাজনৈতিক দল আর আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করে না। এটা সংকটও তৈরি করেছে। সামাজিক সংকট হলো, আমি কাউকে যে বলব, তুমি এ কাজটা কর অথবা করো না। কিসের ভিত্তিতে বলব। সেদিক থেকে মোল্লাদেরও একটি জায়গা আছে। কারণ তাদের একটি আর্দশিক জায়গা আছে। জনগণ তাদের এখনো বিশ্বাস করে, রাজনীতিবিদদের না।

এখানে নতুন মধ্যবিত্ত তৈরি হচ্ছে, এখানে একাধিক ধরণের মধ্যবিত্ত তৈরি হচ্ছে। আমাদের সময়ে যেটা ছিল না। আমরা এক বই পড়েছি, একই খাবার খেয়েছি। এখনকার মধ্যবিত্তের মধ্যে নানা শ্রেণী তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াবার সুবাদে এটি দেখেছি। একটি শ্রেণী হচ্ছে কিছুটা বড় লোক। তারা ৪০০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি অর্থের নাস্তা করে। বাংলাদেশের বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। দ্বিতীয় শ্রেণীতে আছে যারা পড়ালেখা করছে ব্যাংক বা বহুজাতিক কোম্পানিতে ভালো বেতনের চাকুরি লাভের জন্য। বাকী কোনো বিষয় তারা ভাবছে না। তৃতীয় শ্রেণী দেশ নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবে বাধ্য হয়ে। ঢাকার বাইর থেকে এ শ্রেণীর একটি বড় অংশ আসছে। তারা এখানে পড়তে আসছে এবং কেউ ভাবতে পারে না, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা কতটা কষ্ট করে পড়ালেখা করে। একটা মেয়ে আমাকে বলেছিল, বাবা দেয় পড়ার অর্থ। ভাই দেয় খাওয়ার অর্থ। আর হাত খরচের অর্থ আমি জোগাড় করি। একাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে এরকম, ভেতর থেকে এগুলো জানি। অনেকে আছেন যাদের বাবারা বিদেশে কাজ করছে। বাঙালির বড় বিষয় হলো, তারা ছেলেমেয়েদের সব সময় লেখাপড়া করিয়েছে। যাদের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে খারাপ তারা অনেক সিরিয়াসলি লেখা পড়া করছে। এরা সাংস্কৃতিক ভাবে কিছুটা রক্ষনশীল।

সব দেখে মনে হচ্ছে, নতুন একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হচ্ছে, এদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। এরা পুরনো ধাঁচের মানুষ। যে শ্রেণীটা ঢাকার বাইরে থেকে এসে কষ্ট করে পড়ালেখা করছে, তারা দেশ পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখবে বলেই আমার ধারণা। এরাই হয়তো একটা পর্যায়ে আমাদের অর্থনীতিকে সামনে নিয়ে যাবে। কারণ তাদের পরিসরটা এ দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রশ্ন হলো, এ মধ্যবিত্তের কাছে আমরা কি দিচ্ছি। কষ্ট করে হলেও এরা দেশে থাকবে, দেশকে টানবে। এর শ্রেণীর জন্য কিন্তু কোনো রাজনীতি নেই। রাজনীতিমুক্ত সমাজে অনাচার বেশি হয়। কারণ আমরা সবাই দায় এড়াতে চাই। কিন্তু আমি জানি না, এখনকার বামপন্থিরা কোন জায়গায় অবস্থান করে। এরা কি ফেসবুকের বাইরে কি খুব সবল? আমি বলব, আমাদের সময় এসেছে বামদের দিকে না তাকিয়ে বামপন্থার দিকে তাকানোর। এখনকার বামপন্থিদের একটি বড় অংশ সমাজতন্ত্রের বিষয়গুলো জানে না। মার্কসবাদের মধ্যে অনেক ভ্রান্তি রয়েছে। যারা এটি পড়ালেখা করেছে, তারা নিজেরাই এটি জানবে। মার্কস আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বলছে, এশিয়াটিক মোড অব প্রডাকশন। এর কোনো ভিত্তি নেই। মার্কসবাদ বলছে, প্রতিটি সংগ্রামের ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের। এটাও বর্তমানের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ সত্য নয়।

লেনিন ও মাওবাদেরও অনেক ভ্রান্তি আছে, এদের ব্যর্থতাও দৃশ্যমান। এসবকে বাদ দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে। এন্টি ডুয়েরিং বই পড়লে দেখা যাবে, ইউরোপের সমাজতন্ত্রের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। আমরা যদি বুঝতে পারি, ইউরোপের ইতিহাস আমাদের ইতিহাসের একটি অংশ কেবল। ইংরেজ উপনিবেশবাদের কল্যাণে এটা হয়েছে। এসব বিষয়কে সামনে রেখে জনগনের সামনে জাতীয়তাবাদী ভাবনাআবেগচিন্তা উপস্থিত করা গেলে তাদের পছন্দ হতে পারে। এখন এ মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষ ব্যাংকে চাকুরি আর বিদেশে যাওয়া ছাড়া তেমন কিছু চিন্তা করছে না। বড় লোক আর গরীবের ব্যবধানটা কিন্তু বাড়ছে আর বাড়ছে। এটাকে সামজতান্ত্রিক কোনো প্রশ্ন হিসেবে মানুষের সামনে আসছে না। বামপন্থিরা পারছেও না। কারণ এখানে তাদের না আছে সংগঠন, না সংস্কৃতি। এখানে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক শক্তিও তো নেই। এর বাইরে কে আছে? বামপন্থিরা কোথায়? বর্তমানে যারা দেশের বামপন্থি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে মানুষ তাদের বিশ্বাস করছে না। সবাই মিলে যদি তারা নতুন একটি পরিচিতি বা ধারণা উপস্থিত করতে পারে, তাহলে বামপন্থার একটি সম্ভাবনা থাকতে পারে। এর জন্য সমাজতন্ত্রের চর্চা প্রয়োজন। ৫০৬০ বছর ধরে মানুষ একই বিষয় শুনছে। তারা আর একই কথা শুনতে চায় না। আমাদেরকেও নিজস্ব উপযোগী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে নয়, দেশীয় উদ্ভুত ধারণা থেকে এ সংক্রান্ত কাজ এগিয়ে নিতে হবে।।

(লেখার বক্তব্য লেখকের একান্তই নিজস্ব। এ ব্যাপারে কোনো ভিন্নমত থাকলে তা লিখিত আকারে পাঠাতে পারেন আমাদের বুধবারএর ইমেইল (amaderbudhbar@gmail.com) ঠিকানায় সম্পাদক)