Home » রাজনীতি » ক্ষমতার কেন্দ্রায়নের কারণেই খুনের মিছিল

ক্ষমতার কেন্দ্রায়নের কারণেই খুনের মিছিল

আবীর হাসান

murder-posterসিরিয়াল কিলার বা সিদ্ধহস্ত খুনি কিংবা খুনের নেশায় পাওয়াদের প্রথম খুন করাটাই হয় একটু কষ্টকর, পরের খুনগুলো তারা করতে থাকে অবলীলায়। না থাকে বিবেকের তাড়না, না থাকে অনভ্যাসের জড়তা। মনুষ্যের বড় আদালত যে বিবেক সেই বিবেক নামের আদালত উধাও হয়ে যায় কিংবা হয়ে পড়ে অকার্যকর।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে একজন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে বলে এক রিপোর্টে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ জানিয়েছে। পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত হিসেবে দেখা যায়, গত এক মাসে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন।

বাংলাদেশে সম্ভবত এখন এই সিরিয়াল কিলারদের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। না হলে এত খুন হচ্ছে কী করে? খুনখুনআর খুন। প্রতিদিনই খুনের খবর। এই খুনের খবরগুলো এখন আবার ভিন্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। কেবল জানাঅজানা লাশ পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত খুনি কিংবা সম্ভাব্য খুনিদের কোন খবর নেই। পুলিশ এখন লাশ উদ্ধারকারীর ভূমিকায় অন্ধ মুর্দা ফরাস মাত্র। কাগজেকলমে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডএনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারের সংখ্যা কমিয়ে দেখার জন্যই হয়তো লাশের সংখ্যা বেড়েছে। আর লাশ যা পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত কিংবা সন্দেহভাজনদের সংখ্যাটাই বেশি। এগুলো কি গুম খুন? অনেক ক্ষেত্রেই নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করছেন, র‌্যাব বা গোয়েন্দা পরিচয়ের লোকজন ভিকটিমদের তুলে নিয়ে যায়। তারপর দূরে কিংবা অদূরে পাওয়া যায় তাদের লাশ। এটা একটা কিলিং টেকনিক। আগে অর্থাৎ বছর দুয়েক ধরে এটা ব্যবহার করছে জানাঅজানা খুনিরা। তারা ধরা পড়েনি। আইন তাদের ব্যাপারে কার্যকর হয়নি। রাষ্ট্র থেকেছে নিশ্চুপ। এখন আর আইন এ সবের ব্যাপারে প্রয়োগেরই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না। রাষ্ট্র হয়ে গেছে নির্বিকার অথবা ইচ্ছাকৃত ভাবে অন্ধ। গত টার্মেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল নিজের দেশের মানুষ তা সে যেই হোক না রাজনৈতিক নেতাকর্মী বা পেশাজীবী কাউকেই নিরাপত্তা দেবে না এই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীই জানিয়েছিলেন এ কথা, সে সময় একটা ব্রুট মেজরিটির দাপট ছিল। আর এখন তো গঠিত হয়েছে গণতন্ত্র রহিত একটা এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা। এখন পরিস্থিতি নাজুক না হওয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। অবশ্য জনগণের দিক থেকেই নাজুক সরকার প্রধানের দিক থেকে নয়। এই সব কিলিং তার বিরোধীর সংখ্যা কমাচ্ছে।

গত কয়েক বছর ধরেই গণতন্ত্র না থাকার লক্ষণ পরিস্ফুট হচ্ছিল। এ সবের মাধ্যমে আর এখন যখন গণতন্ত্র নাই হয়ে গেছে তখন এ কথা না বলে পারা যায় না কেন্দ্রীয় ব্যক্তিটি চাচ্ছেন বলেই হচ্ছে এসব। ভবিষ্যতে এই সময়ের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন তার আসলটার কথাই লেখা হবে এবং চলতি কর্মকাণ্ডের বৈশিষ্ট বোঝানো হবে এই সব ঘটনার মাধ্যমেই।

যেমন বোঝানো হয় ভারতবর্ষের ইতিহাসে জরাসদ্ধ বা কংসের স্বজন বধের দুর্মতি এবং গণরাজ্য ধ্বংসের বর্ণনায়। গৌতম বুদ্ধের সময়ও সংঘরাষ্ট্র পতিত হয়েছিল একক ব্যক্তির, রাজা হয়ে ওঠার জবরদস্তিতে এবং মিথ্যার আশ্রয়ে অন্যায় শাসন প্রতিষ্ঠায়। ইউরোপেও তা যুগে যুগে হয়েছে ফরাসী রাজা শার্লেমান যিনি চলমান এই খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডার চালু করেছিলেন তিনি আপন ফরাসী পরিচয় বিসর্জন দিয়ে, রোমান পরিচয় গ্রহণ করেছিলেন নাম উপাধি পর্যন্ত পাল্টে। চার্চের সহায়তা এবং রোমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই নয় কেবল ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে।

মোদ্দা কথা ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন করতেই এবং একক ব্যক্তির শাসক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা মধ্যযুগের আগে এবং মধ্য যুগেও হয়েছে, ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধবাদী যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন তাদের মধ্যে থেকেও একক শাসক ওঠে এসেছেন। বিশিষ্ট রাষ্ট্র বিজ্ঞানী জেমস মিল (১৭৭৩১৮৭৬) যাকে বলেছেন অ্যালিগর্কিকাল অর্থাৎ কতিপয়ের শাসন ব্যবস্থা থেকে একক ব্যক্তির দিকে ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন ঘটানো। এই প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলছেন রাজনীতি থেকে নীতিনৈতিকতার ভিত্তি রহিত করেই ওই সব ব্যক্তি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন এবং খুব ঠান্ডা মাথায় এবং নিখুত পরিকল্পনা মাফিক করা হয়ে থাকে যাতে প্রচুর শিরোচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছিল ইংল্যান্ডে। সে সময় জেমস মিল তার চিন্তার উপজীব্য পেয়েছিলেন একাধারে দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ জেরমী চেথামের। এই চেথামই গণতন্ত্রের সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানকারী অগ্রবর্র্তীদের অন্যতম। তিনিও ছিলেন গণতন্ত্রের নামে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধবাদী।

পরবর্তীকালে ইতালীয় দুই রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ রবার্তো লরেনজো এবং মসকো পেরেটাও গণতন্ত্র নিপাতকারী একক ব্যক্তিদের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছেন। মসকো পেরেটা অনেকটাই সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার লোক। তার মতে রাজনৈনতিক প্রতিপক্ষকে বিদেশীদের চেয়ে বেশি শত্রুভাবাপন্ন মনে করে এই ধরনের শাসকরা। এবং ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার আগে থেকে শেষ পর্যন্ত তারা দমন নীতিকেই প্রধান করে গেলেন এবং কোন কোন সময় এই কাজে শত্রু দেশের শক্তিশালী শাসকদের সঙ্গে মিত্রতা করতেও পিছপা হন না। পেরেটাও বলেছেন, গণতন্ত্রের মধ্যে যতোক্ষণ ওই এথিকাল ফাউন্ডেশন অর্থাৎ নৈতিক ভিত্তি থাকে ততোক্ষণই তা গণতন্ত্র।

স্বভাবতই এই এথিকাল ফাউন্ডেশন গড়ে ওঠে বহুর মতামতের ভিত্তিতে এবং বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনের মধ্যে যোগ্য লোক নিয়োগ ও তাদেরকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার সুযোগের মাধ্যমে। এ বিষয়টাই এখন বাংলাদেশে ধ্বংস হয়ে গেছে। এখানে এখন রাষ্ট্রের স্তম্ভ চতুষ্টয় এবং গণতান্ত্রিক কোন প্রতিষ্ঠানেই অন্য কোন ব্যক্তি পরিচালকের ভূমিকা নিতে পারে না। ফলে আইন প্রণয়ন রক্ষা এবং প্রয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোকেই আমরা কেবল দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তার কার্যকারিতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেমন চাওয়া হয় তেমনভাবে দেখতে পাচ্ছে না। কারণ আমজনতার চাওয়াকে এখন আওয়ামী লীগ নামের রাজনৈতিক দলটিও সেভাবে চাইতে পারছে না। দলটি এখন সংঘ শক্তি বা শেয়ারিংএর মতো কাজকর্মের ঊর্ধে উঠে গেছে। দলের বৈঠক যেগুলো হয় সেগুলোতে তথাকথিত উচ্চপর্যায় বা মধ্যম পর্যায়ের নেতারা কেবল দলীয় প্রধানের নির্দেশই পান। সরকারের ক্ষেত্রেও মন্ত্রণার বিষয়গুলো নিছক আনুষ্ঠানিক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটাই কেবল মাত্র আলোচ্য নির্দেশনার সূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কোন সেকেন্ড থটকে মূল্য দেয়া হয় না।

মূলত জাাতির মধ্যে থেকে একটি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে এখন বাংলাদেশে এবং গোষ্ঠীর যা ধর্ম ব্যক্তির ইচ্ছায় কর্ম, তাই করতে হচ্ছে। ব্যক্তিটি সদাচারে অভ্যস্ত, প্রতিভাবান, অসাধারণ মেধাবী ও জ্ঞানী এমনও নয়। ওই রকম দৈব আবির্ভাব ঘটেনি। যে কারণে প্রতিদিন আমাদেরকে শুনতে হয় খিস্তিখেউড় আর গিবত। এই জাতির সম্ভাবনা ছিল নবজীবনের পথে ধাবিত হওয়ার। কিন্তু গোষ্ঠী শাসনের যাতাকলে পড়ে যে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে স্বজাতি নিধনের তাতে বর্বরতার তিমিরে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কাই করতে হচ্ছে। রোমান মহাকবি ভার্জিল লিখেছিলেন তাকেই বিশ্বাস করো যে বিশ্বাস অর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখন কী করবে? তাদের সামনে যে বিশ্বাস অর্জনকারী বলতে কেউ নেই। আছে খুনের মতো জঘন্য কাজে প্রশ্রয় দানকারীরা।।