Home » রাজনীতি » বিএনপি মার্কা আন্দোলন দিয়ে কিছু হবে কি?

বিএনপি মার্কা আন্দোলন দিয়ে কিছু হবে কি?

হায়দার আকবর খান রনো

revolt-21এ কথা বলা যায় যে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সঙ্কট সমাধান না করে সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করছে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সঙ্কট স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সব সময়ই ছিল। সেই সঙ্কট এখন একটা নতুন মাত্রা লাভ করলো, যার ফলে সমাধানটিও জটিল হয়েছে।

কেন এই সঙ্কট? কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতায় যে শ্রেণী রয়েছে, সেই শ্রেণীর পক্ষে বুর্জোয়া গণতন্ত্র উপহার দেয়া সম্ভব নয়। কারণ এই বুর্জোয়া হচ্ছে মুৎসুদ্দি চরিত্রের যারা প্রধানত, লুটেরা চরিত্রের এবং উৎপাদনবিমুখ। শিল্প বুর্জোয়া রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলে যেভাবে গণতন্ত্র নিশ্চিত ও স্থায়ী রূপ নেয়, এখানে তা সম্ভব নয়। ১৯৭২ সালে উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর অনেকবার সরকার পরিবর্তন সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকার সত্ত্বেও, বেসামরিক ও সামরিক সরকার সকল ক্ষেত্রেই, একই শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছে। অবশ্য এখন আর তারা উদীয়মান নয়। ৪৩ বছরে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরাট স্ফীতি ঘটেছে। সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে তারা পুজি সঞ্চয় করেছে রাষ্ট্রায়াত্ব সম্পদকে বেপরোয়াভাবে লুটপাট করে। সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে তারা শিল্পের বিরাষ্ট্রীয়করণের দাবি তোলে। তারাই তখন প্রধানত দুই দলে ভাগ হয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। কিন্তু শ্রেণী স্বার্থে সবাই এক ছিল। বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া জোরে সোরে শুরু হয় আশির দশকে, যা নব্বইয়ের পুরো দশক জুড়ে অব্যাহত ছিল। এই সময় নব্য ধনীক শ্রেণী পানির দামে কারখানা কিনে নিলেও তারা শিল্পপতি হয়ে ওঠেননি। বরং রাষ্ট্রায়াত্ব কারখানার সম্পদকে বিক্রি করে এবং কারখানার মালিক হবার কারণে তারা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিয়ে সম্পদ বৃদ্ধি করেছে। আশির দশক থেকে বৈদেশিক ঋণ আসতে থাকে বর্ধিত হারে, যেটা এখন আবার বেশ কমে গেছে। বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ আত্মসাৎ করেও এই নব্য ধনীক শ্রেণী আরও ধনী হয়েছিল। এই সময়েই তারা বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির এজেন্সিগিরি, ঠিকাদারী, সরবরাহকারী ও ছোট পার্টনার হিসাবে বিদেশী কোম্পানির মুনাফার উচ্ছিষ্ট অংশ ভোগ করে এবং তাতেই তারা বেশ ধনী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে পুজি সঞ্চয়ের এই ছিল ইতিবৃত্ত।

বর্তমানে লুটপাটের ও মুৎসুদ্দিগিরির পাশাপাশি নিষ্ঠুর শ্রমিক নিষ্ফেষণের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে, প্রধানত. গার্মেন্টস শিল্পে যা আবার কোন মৌলিক শিল্প নয়, অনেকটা দর্জির দোকানের মতো। এরা এখনো খাটি বুর্জোয়া হয়ে ওঠেনি। সামন্ত মানসিকতা সম্পন্ন। এবং স্রেফ লুটপাটের দিকেই তাদের আকর্ষণ বেশী। এই কারণে কারখানায় কাজের পরিবেশ যেমন খারাপ ও শোষণের হার যেমন অতিরিক্ত, তেমনই রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রবণতাও খুব বেশী। এই কারণে দুটি জিনিস দেখা যায়। প্রথমত. শিল্প উৎপাদন যেটুকু আছে সেখানেও পরিপক্ক বুর্জোয়া ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। তাই রানা প্লাজা বা তাজরিনের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে।

দ্বিতীয়ত. পাশাপাশি এদের দরকার সরাসরি রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে। বুর্জোয়া দেশে বুর্জোয়ারা তো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পাবেই। কারণ রাষ্ট্র তো তাদেরই। কিন্তু না, বাংলাদেশের ধনীকরা চায় আরও বেশী। তারা চায় সরাসরি সরকারে অবস্থান করতে। ভারতীয় বা ইউরোপীয় বুর্জোয়ার সঙ্গে পার্থক্য এই খানে। পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত অথবা পরিপক্ক বুর্জোয়া রাষ্ট্রে বুর্জোয়ারা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে অপ্রত্যক্ষভাবে। তাদের প্রতিনিধি মারফত যারা হয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। ব্যবসায়ীরা নিজেরা মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হন না। এই প্রসঙ্গে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এঙ্গেলস বলেছিলেন যে, সম্পদ এখানে জোর খাটায় পরোক্ষভাবে কিন্তু আরও নিশ্চিতভাবে, একদিকে সরকারি কর্মচারীদের সরাসরি হাত করে (যার বিশুদ্ধ দৃষ্টান্ত হচ্ছে আমেরিকা), অপরদিকে সরকার ও ফটকাবাজদের সঙ্গে সহযোগিতা করে।” (পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি)

কিন্তু বাংলাদেশে যারা ব্যবসা করছেন, তারা নিজেরাই সংসদ সদস্য বা পারলে মন্ত্রী হতে চান। রাষ্ট্রীয় ওই পদটি সম্পদ বৃদ্ধির জন্য খুব প্রয়োজনীয়। এখানে তাই ব্যবসায়ীরা হয়েছেন রাজনীতিবিদ আর রাজনীতিবিদরা হয়েছেন ব্যবসায়ী। সেই রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি একটা ভিন্ন মাত্রায় ভয়াবহ রূপ লাভ করে। এই বার নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় আইনি বাধ্যতা অনুসারে আওয়ামী লীগের যে সকল প্রার্থী হলফনামায় সম্পদের বিবরণ দিয়েছে, তাতে অবাক করে দেয়া সব তথ্য পাওয়া গেছে। পাঁচ বছরের লীগ শাসনামলে আওয়ামী লীগের একেকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা ডেপুটি স্পিকারের সম্পদ ও আয়ের পরিমাণ বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। একটু স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ দুই একজনের সম্পদ বৃদ্ধির বিবরণ তুলে ধরছি। প্রতিমন্ত্রী মান্নান খানের সম্পদ বেড়েছে ১০,৯৯৭ শতাংশ, নূরেনূরআলম চৌধুরীর ৬,৪২৪ শতাংশ, মন্ত্রী হাসান মাহমুদের ৩৮৯২ শতাংশ, মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর ১৯৬৯ শতাংশ, . মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ১১৩৫ শতাংশ। ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর আয় বেড়েছে ৪৪৩৫ শতাংশ ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটাকে দুর্নীতি না বলে বলছেন এটা নাকি স্বাভাবিক। যেহেতু জাতীয় বেড়েছে, তাই সকলেরই আয় বেড়েছে। তিনি একবারও হিসাব করে দেখালেন না, জাতীয় আয় বৃদ্ধির সঙ্গে তার দলের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, নেতাউপনেতাদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি কতোটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নিশ্চিতভাবে এই হারে সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি জড়িত। নির্বাচন কমিশনের মতোই দুদকও আজ্ঞাবহ। তাই তারা কতোদূর তদন্ত করবেন, তা বলা যায় না। আসল কথা, বাংলাদেশের লুটেরা পুজিবাদী ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা সরাসরি দুর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় বানান। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেভাবে ক্ষমতার বদল হয় এখানে সেটা সহজে হবার নয়। ক্ষমতার সঙ্গে বিত্ত জড়িত আর এই বিত্তই হচ্ছে বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের বিকৃত পুজিবাদের ভিত্তি। তাই সকলেই চায় যেমন করে হোক ক্ষমতায় থাকতে হবে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সম্পদকে রক্ষা করার জন্যও সরকারে থাকাটা জরুরি। সেই জন্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরসহ স্বাভাবিক নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সংসদীয় গণতন্ত্র এখানে বার বার হোচট খাচ্ছে। আর তাই স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে একদলীয় স্বৈরশাসনের দিকে। ২০১৪ সালের কলঙ্কিত নির্বাচন তারই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

এই অশুভ প্রবণতাকে দূর করতে হলে বিএনপি মার্কা আন্দোলন দিয়ে হবে না। কারণ বিএনপিও একই লুটেরা ধনীক শ্রেণীর আরেক অংশ। আওয়ামী লীগবিএনপির বাইরে শক্তিশালী বিকল্প গড়ে তোলা দরকার। বাম ও উদারনৈতিক বুর্জোয়ার মিলিত জোট এমন রাজনৈতিক বিকল্প হতে পারে। অন্যথায় এখন নির্বাচনের নামে যে রাজনৈতিক খেলা চলছে, তাতে যে দল জিতবে সে সবটাই গ্রাস করবে। বিরোধী দল বলে কিছু থাকবে না। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় যে, শেখ হাসিনা স্বৈরশাসক এরশাদকে দূত বানিয়ে, তার লোকদের মন্ত্রী বানিয়ে যে অদ্ভূত বিরোধী দল প্রদর্শন করলেন, সেটাই প্রমাণ করে যে বিকৃত বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন রাজনীতিতে অদ্ভূত ঠেকলেও এটাই স্বাভাবিক। এই যে নির্বাচনী খেলা ও সংসদীয় সরকার আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, তাতে আসলে শেখ হাসিনা কতটুকু জিতেছেন তা এখনই বলা দূস্কর। তবে গণতন্ত্র যে পরাজিত হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।।

১টি মন্তব্য

  1. “আসল কথা, বাংলাদেশের লুটেরা পুজিবাদী ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা সরাসরি দুর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় বানান। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেভাবে ক্ষমতার বদল হয় এখানে সেটা সহজে হবার নয়। ক্ষমতার সঙ্গে বিত্ত জড়িত আর এই বিত্তই হচ্ছে বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের বিকৃত পুজিবাদের ভিত্তি। তাই সকলেই চায় যেমন করে হোক ক্ষমতায় থাকতে হবে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সম্পদকে রক্ষা করার জন্যও সরকারে থাকাটা জরুরি। সেই জন্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরসহ স্বাভাবিক নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সংসদীয় গণতন্ত্র এখানে বার বার হোচট খাচ্ছে। আর তাই স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে একদলীয় স্বৈরশাসনের দিকে। ২০১৪ সালের কলঙ্কিত নির্বাচন তারই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
    এই অশুভ প্রবণতাকে দূর করতে হলে বিএনপি মার্কা আন্দোলন দিয়ে হবে না। কারণ বিএনপিও একই লুটেরা ধনীক শ্রেণীর আরেক অংশ। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে শক্তিশালী বিকল্প গড়ে তোলা দরকার। বাম ও উদারনৈতিক বুর্জোয়ার মিলিত জোট এমন রাজনৈতিক বিকল্প হতে পারে। অন্যথায় এখন নির্বাচনের নামে যে রাজনৈতিক খেলা চলছে, তাতে যে দল জিতবে সে সবটাই গ্রাস করবে। বিরোধী দল বলে কিছু থাকবে না। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় যে, শেখ হাসিনা স্বৈরশাসক এরশাদকে দূত বানিয়ে, তার লোকদের মন্ত্রী বানিয়ে যে অদ্ভূত বিরোধী দল প্রদর্শন করলেন, সেটাই প্রমাণ করে যে বিকৃত বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন রাজনীতিতে অদ্ভূত ঠেকলেও এটাই স্বাভাবিক। এই যে নির্বাচনী খেলা ও সংসদীয় সরকার আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, তাতে আসলে শেখ হাসিনা কতটুকু জিতেছেন তা এখনই বলা দূস্কর। তবে গণতন্ত্র যে পরাজিত হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।”