Home » আন্তর্জাতিক » ব্লাড ডায়মন্ড – যে গৃহযুদ্ধে মূল হোতাদের কোনোই ক্ষতি হয় না

ব্লাড ডায়মন্ড – যে গৃহযুদ্ধে মূল হোতাদের কোনোই ক্ষতি হয় না

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ফ্লোরা সরকার

siera-leon-warগবেষক সো ইউয়ুং জাংয়ের বিশ্লেষণের আগে সিয়ারা লিয়নের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জেনে নেয়া যাক। সিয়ারা লিয়নের আধুনিক ইতিহাস গড়ে উঠেছে ১৭৮৭ সাল থেকে, যখন ব্রিটিশ বাহিনী এখানে উপনিবেশ গড়া শুরু করে। তার আগে পর্তুগিজ বাহিনীর আগমন ঘটে ১৪৬২ সালে। ১৮০৮ এর মধ্যেই দেশটি সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অধীনে চলে আসে। ২০ এপ্রিল ১৯৬০ এ স্যার মিল্টন মারগাই (যাকে ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন সংবিধানের আওতায় প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রদান করা হয়) এর নেতৃত্বে চব্বিশ সদস্যের একটি দল লন্ডনের ল্যানসেসটার হলে সমবেত হন দেশটির স্বাধীনতাপ্রাপ্তির উদ্দেশ্য নিয়ে। একমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন নেতা সিয়াকা স্টিভেন ছাড়া আর সবাই স্বাধীনতার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর প্রদান করেন। সিয়াকার আপত্তি ছিলো দুটি . সিয়ারা লিয়ন এবং ব্রিটেনের মাঝে গোপন সামরিক চুক্তি করা হলো কেনো এবং ২. স্বাধীনতার আগে কোন সাধারণ নির্বাচন কেনো হবেনা। ২৭ এপ্রিল, ১৯৬১, স্বাধীন সিয়ারা লিয়নে স্যার মিল্টন মারগাইয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের মধ্যে দিয়ে দেশটির যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬২র মে মাসে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং মারগাইয়ের দল (SLPP- Sierra Leone Peoples Party) সংখ্যগরিষ্ঠতা অর্জন করে। মারগাইয়ের নেতৃত্বে দেশটি কিছুটা মসৃন পথে চলে গেলেও ১৯৬৪ সালে তার মৃত্যুর পর সংকট আরো ঘনিভূত হতে থাকে। বিভিন্ন উত্থানপতনের পর ১৯৬৮ থেকে সাইকা স্টিভেন্স এর নেতৃত্বে গঠিত এ.পি.সি. (All Peoples Congress) এর এক দলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৪ সালে স্টিভেন্স এ.পি.সি. দলকে দেশের একমাত্র স্বীকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে সংবিধানে যুক্ত করেন। স্বৈরতন্ত্রের উর্দ্ধমূখী যাত্রা আরো বেগবান হতে থাকে। দীর্ঘ সতর বছরের এক দলীয় শাসনের পর ১৯৮৫ সালে স্টিভেন্স পদত্যাগ করলে তার উত্তরসূরী হিসেবে নেতৃত্বে আসেন মেজর জেনারেল জোসেফ সাইদু মমোহ। অভ্যন্তরীণ এবং বহির্মূখী চাপে মমোহ ১৯৯০ এর অক্টোবরে স্টিভেন্স প্রণীত ১৯৭৪ এর একদলীয় শাসনব্যবস্থা তুলে নিয়ে বহুদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রণয়ন করেন, কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হন, কেননা মমোহ ছিলেন স্টিভেন্সের অনুগত শিষ্য এবং দেশটি তখন দুর্নীতির গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। আর ঠিক এই সময়েই বিদ্রোহী দল হিসেবে আর.ইউ. এফ. এর আবির্ভাব ঘটে। যার অন্যতম মদদ দাতা হিসেবে চার্লস্ টেলারকে অভিযুক্ত করা হয়। যেখান থেকে শুরু হয় গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ অভিযাত্রা।

ইউয়ুং জাংয়ের মতে ব্রিটিশ উপনিবেশ সময়ে সিয়ারা লিয়নের রাজধানী ফ্রিটাউকে ক্রাউন কলোনি এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোকে সামন্ত রাজ্য গঠনের মধ্যে দিয়ে প্রথম সমস্যার সূত্রপাত শুরু করা হয়। কেননা, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র ফ্রিটাউনকে সরাসরি রাজতন্ত্রের অধীনে নিয়ে আসে এবং অঙ্গ বা সামন্ত গ্রাম ও শহরাঞ্চলগুলোকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে তার ওপর স্থানীয় প্রভাবশালীদের মোড়লিপনা প্রদান করে পরোক্ষ শাসন শুরু করে। ফলে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে গড়ে ওঠে স্বৈরতান্ত্রিক বিকেন্দ্রিকরণ।‘স্বৈরতান্ত্রিক’ এই অর্থে কেউ যদি একবার কোন একটা সামন্ত রাজ্যে মোড়লিপনা পেয়ে যেতো তা চলতো বংশ পরস্পরায় (অনেকটা আমাদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো)। ফলে একদিকে যেমন এই মোড়লিপনা পাবার জন্যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক হিংস্রতাকোন্দোল বৃদ্ধি পেতে থাকে অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। কারণ বংশনুক্রমিক এসব পদাধিকারীরা সম্পদের অপব্যবহার, ভূমি দখল, বলপ্রয়োগে কাজ আদায় এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের উপর সীমাহীন শাস্তি প্রয়োগ শুরু করে। অধিকন্তু এসব মোড়ল বা সর্বোচ্চ প্রধানের পদ পাবার অধিকার থেকে নারী, যুবক এবং দরিদ্রদের বঞ্চিত করা হয়। ধীরে ধীরে যুবক সম্প্রদায় উপনিবেশিক সময় থেকে ক্রমশ প্রান্তিক গোষ্ঠীতে পরিণত হতে থাকে। পরোক্ষ শাসনের এসব নেতিবাচক দিকগুলি ব্রিটিশ রাজতন্ত্র উপলব্ধি করতে সমর্থ না হওয়ায় উপনিবেশিক সরকার কর্তৃক নিয়োজিত সর্বোচ্চ প্রধানেরা উপনিবেশিক শাসকের অনুগত গোলামে পরিণত হতে থাকে। ফলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জনগণের মাঝে ক্ষোভ বা অসন্তুষ্ট আরো বৃদ্ধি পায়। কেননা দেশের বিরাট জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে এসব মোড়লেরা সরাসরি কেন্দ্রিয় সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হতে থাকে। ফলে দেশের শাসনব্যবস্থার অংশগ্রহণ থেকে জনগণ ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। এই কারণে একজন প্রাক্তন আর.ইউ.এফ. সদস্য বলেন – “এসব গোষ্ঠীপতি বা বংশপ্রধান ব্যবস্থা খুবই প্রাচীন একটি শাসনব্যবস্থা। ফলে স্বাধীনতা উত্তর কালে এসব প্রধানদের যতই মর্যাদাহানি ঘটতে থাকে ততই তারা হিংস্র হতে থাকে। এই সময়ে প্রধানদের সংখ্যা এতো বেশি বৃদ্ধি পায় যে তাদের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামতে থাকে। সরকারের অধীনে বিশেষত এ.পি.সি.-র অধীনে তখন গোটা রাষ্ট্র বিলুপ্তির দিকে যেতে থাকে।”

রাষ্ট্র বিলোপের পেছনে জাং মূলত যেটাকে দায়ী করেন তা হলো “শ্যাডো স্টেট”। এই ধরণের রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে মূলত অবৈধভাবে খনিজ এবং প্রকৃতিপ্রদত্ত সম্পদকে বহিস্থ এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির দখলদারিত্বকে কেন্দ্র করে। যে রাষ্ট্রের পুঁজি কখনোই বানিজ্য পুঁজি থেকে শিল্প পুঁজিতে রূপান্তরিত হতে পারেনা। সাম্প্রতিক সময়ে অফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শ্যাডো স্টেট নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। এদের মাঝে উইলিয়াম রেনো অন্যতম। রেনোর শ্যাডো স্টেটের সংজ্ঞাকে আরো বর্ধিত রূপ দিয়ে সাউথ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দুজন অধ্যাপকলেখক নিকি ফুনকে এবং হুসেইন সলোমোন ২০০২ সালে একটি গবেষণা পত্রে এই ধরণের রাষ্ট্র উদ্ভবের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন উত্তরউপনিবেশ আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলি কোন লিখিত আইনকানুনের ধারে কাছে না যেয়ে এক ব্যক্তির শাসনে পরিচালিত হতে থাকে এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে দুর্বল করে দিয়ে এসব শাসক নিজের এবং তার দলের লোকদের নিয়ে বাজার দখল করতে থাকে। শ্যাডো স্টেটের উদ্ভবের পেছেনে তারা তিনটি কারণকে প্রধানত দায়ী করেন . দেশের বাইরের শক্তির উপর নির্ভরশীলতা, যে কারণে শাসকবৃন্দ দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রায়ই বিভ্রান্তিতে থাকেন ২. দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং ৩. দেশের সিভিল সোসাইটিকে উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করা। সেই মিল্টন মারগাই থেকে যে শ্যাডো স্টেটের যাত্রা শুরু হয়েছিলো তা স্টিভেনের সময়ে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। জাং বলেন স্টিভেন শুধু ক্ষমতার অপব্যবহারই করেননি, সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে যথাযথ ভাবে গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হন। দেশের সেনাবাহিনীকে তুষ্ট রাখার লক্ষ্যে স্টিভেন তাদের আর্থিক সুবিধাদি প্রদানে যত না যত্নশীল ছিলেন ততটা ছিলেন না দেশের সংকটকালে এই বাহিনীকে সুযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে। ফলে বিদ্রোহী দল (যে দলে বঞ্চিত প্রান্তিক যুবকগোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্য ছিলো) আর.ইউ.এফ. কর্তৃক আক্রমণ শুরু হলে এসব সেনাবাহিনী পেরে উঠতে পারেনা। এক প্রাক্তন আর.ইউ.এফ. সদস্য বলেন – “আমাদেরকে বলা হয়েছিলো এ.পি.সি. সরকারকে সরানোর জন্যে এই যুদ্ধ। যে সরকার এতকাল দেশের জনগণকে শোষণের মধ্যে দিয়ে ধনী হয়েছে, অর্থ পাচার করেছে ইউরোপে, নিজেরা থেকেছে বিলাসবহুলার মাঝে। লোভ এবং স্বার্থপরতাই প্রধানত এই গৃহযুদ্ধের পশ্চাতে দায়ী। দেশের যুবক সম্প্রদায়ের প্রতি এদের কোনো দৃষ্টি ছিলোনা। ন্যায় বিচার, ন্যায্য অধিকার পাবার লক্ষেই এই যুদ্ধ। ঘুষ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ।” এসব চিন্তাভাবনা থেকেই আর.ইউ.এফ. এর গঠন শুরু হয়, যার পরিণতিতে ঘটে দশ বছর ব্যাপী এক বিভৎস গৃহযুদ্ধ। তাই জাং তার প্রবন্ধের সমাপ্তি করছেন এই বলে – “সিয়ারা লিয়নের সমাজের অভ্যন্তরীণ সাংঘঠিক দুর্বলতা এবং বহিস্থ শক্তির প্রভাবের কারণে দেশটি ক্রমশ দুর্দশাগ্রস্ত হতে থাকে। হীরা একটি অন্যতম কারণ হলেও যুদ্ধের আগেই মানুষের মনে একটি যুদ্ধংদেহী মনোভাব বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠছিলো। বিশেষত দেশের প্রান্তিক যুবক সম্প্রদায়ের ভেতর এই ক্ষোভ আরো পুঞ্জিভূত হতে থাকে।”

এই যুদ্ধের একটি প্রামান্যচিত্রে এক কিশোর যোদ্ধাকে যখন একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন – “তুমি নিরীহ সাধারণ মানুষের হাত বা পা কেটে ফেলেছো কেনো?” কিশোর উত্তর দেয় – “হাত কেটেছি যাতে তারা আর কাজ না করতে পারে। আর পা কেটেছি যাতে তারা চলতে না পারে।” সাংবাদিকের প্রশ্ন – “কাজগুলো করে কি ভালো করেছো? তোমার খারাপ লাগেনি?” কিশোরের উত্তর – “তখন লাগেনি। এখন মনে হয় কাজটা ভালো হয়নি।” একজন খনি শ্রমিক যার দুটো হাত কনুই থেকে কেটে নেয়া হয়েছে তিনি বললেন – “আমি কি দোষ করেছিলাম যে বিদ্রোহী বাহিনী আমার হাত দুটো কেটে ফেললো? আমার দোষটা কোথায়? আমি তো একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলাম।” হ্যা, এসব যুদ্ধের মূল হোতা, যুদ্ধের ইন্ধনদাতা বা রাষ্ট্রপ্রধানদের কিছু হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে নারীপুরুষআবালবৃদ্ধবনিতা কেউ বাদ পড়েনা। সাধারণ মানুষের দুর্দশার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে এসব রাষ্ট্রব্যবস্থা। সিয়ারা লিয়নের গৃহযুদ্ধের পশ্চাতে শুধু উপনিবেশিক শাসক ব্রিটিশ রাজতন্ত্রকে দোষারোপ করলে হবেনা, আধুনিক উত্তরউপনিবেশবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে আরো অন্যান্য উপাদান। যেসব উপাদান এসব গৃহযুদ্ধকে তরান্বিত করতে আরো সহায়তা করে। এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ লাইরেরিয়ার গৃহযুদ্ধ, লাইবেরিয়ার স্বৈরশাসক চার্লস টেলর, যার মদতে আর.ইউ.এফ, বাহিনী গড়ে ওঠে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিলো সিয়ারা লিয়নে অবস্থিত নাইজেরিয়ার শান্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যে শান্তি বাহিনী ECOMOG (the Economic Community of West African States or ECOWAS Monitoring Group) এর বাহিনী গৃহযুদ্ধের বিভৎসতাকে আরো বাড়িয়ে তুলিয়েছিলো। আর তাইAction Against Hunger এর একজন সদস্য Silvic Brunel যথার্থই বলেছেন – “পৃথিবীতে সিয়েরা লিয়নের মতো দেশগুলি একটি ধুসর অবস্থানে থাকে। তারা সবাই “নো ম্যান্স ল্যান্ড” এর বাসিন্দা। এসব দেশে যে কেউ (দেশের বাইরের বা ভেতরের যেকোনো শক্তি) কসাইখানা স্থাপন করতে পারে, পারে জনগণকে ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করাতে।” আর তাই “ব্লাড ডায়মন্ড” ছবির গল্প শুধু অসমাপ্তই থাকেনা, সেই সঙ্গে আমরা দেখতে পাই ম্যাডি বোয়েনের মতো শেতাঙ্গ আদর্শ চরিত্রকে। যে আদর্শ চরিত্র শুধু হীরা পাচারের প্রতিবেদন তৈরি করতে চায় কিন্তু হীরার পেছনে গড়ে ওঠে রক্তাক্ত ইতিহাস রচনা করতে চায়না। কারণ সেই ইতিহাস রচনা করতে গেলে ম্যাডি বোয়েনের মতো আদর্শ চরিত্র গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে দর্শকের চোখে ধুলো দেয়া যাবেনা। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো এভাবেই সবার চোখে ভালো থাকতে।।