Home » অর্থনীতি » মূল্যহীন প্রতিশ্রুতি :: চালের দাম লাগামহীন

মূল্যহীন প্রতিশ্রুতি :: চালের দাম লাগামহীন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

economy-cartoons-21মোটা চালের দাম চড়ায় নাভিশ্বাস বাড়ছে প্রান্তিক ও নিম্নবিত্তের। এক দশকের ব্যবধানে চালের দাম এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে বেড়েছে ১৩১ শতাংশ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল মহাজোটের মূল দল আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের আগে কম দামে চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটার আকৃষ্ট করেছিল দলটি। নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথম অগ্রাধিকার ছিল ‘দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ’। কিন্তু পাঁচ বছরে পূরণ হয়নি প্রথম অগ্রাধিকার। দায়িত্ব নিয়ে নতুন সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুবিধা নিয়ে দ্রব্যমূল্য সামান্য কিছুটা কমিয়ে আনে। অবশ্য পরবর্তী পাঁচ বছরে পণ্যের মূল্য বেড়েছে ব্যাপক হারে। পাঁচ বছর আগে সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, সে সময় মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ২৭ টাকা। সেই চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৯৪০ টাকায়। মাঝে সব ধরনের চালের দাম আরও বাড়লেও চলতি বছরের শুরুর দিকে দর কিছুটা কমেছিল। কিন্তু দুই মাস ধরে চালের দাম আবার বাড়ছে। এই দফায় নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় দ্রব্যমূল্য কমেছে বলে দাবি করেছেন।

নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল : ‘দ্রব্যমূল্যের দুঃসহ চাপ প্রশমনের লক্ষ্যে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হবে। দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সময়মতো আমদানির সুবন্দোবস্ত, বাজার পর্যবেক্ষণসহ বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মজুতদারি ও মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে, চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে। “ভোক্তাদের স্বার্থে ভোগ্যপণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ” গড়ে তোলা হবে। সর্বোপরি সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য কমানো হবে ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ ইশতেহারে উল্লিখিত ‘মজুতদারি ও মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট’ ভেঙে দেওয়া ও ‘চাঁদাবাজি’ বন্ধ করার ক্ষেত্রে বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। বিশেষত চাঁদাবাজির বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। পথে পথে পণ্যবাহী ট্রাকে পুলিশের চাঁদাবাজি, পাইকারি বাজারে সমিতির নামে চাঁদাবাজি, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি কোনোটিই বাদ পড়েনি। অন্যদিকে মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ গত পাঁচ বছরে বারবার উঠেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও বিভিন্ন সময়ে মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ করেছেন। তবে কোনো সিন্ডিকেট চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি, ভেঙে দেওয়া তো দূরের কথা।

ক্ষমতা নেওয়ার বছর ২০০৯ সালে মূল্যস্ফীতি ছিল খানিকটা কম। ২০১০ ও ২০১১ সাল মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে কষ্ট বাড়িয়ে দেয় সীমিত আয়ের মানুষের। সে সময় মূল্যস্ফীতির হার বিপজ্জনকভাবে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০১২ সালের মাঝে এ চাপ কিছুটা কমলেও এখন আবার বাড়ছে। সরকারি হিসাবে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদকালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৫০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্য সূচক ছিল ২০৬ পয়েন্ট। গত বছরের জুনে মূল্যসূচক দাঁড়ায় ২৯১ পয়েন্টে। এ হিসাবে সাড়ে চার বছরের মূল্যস্ফীতি ৪১ দশমিক ২৬ শতাংশ। নতুন সূচকে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল্যসূচক বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। সবকিছু মিলিয়ে পাঁচ বছরে মূল্যবৃদ্ধির হার ৫০ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে দেড় গুণে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও খাদ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪০৫ অর্থবছরে মোটা চালের দাম ছিল ১৫ টাকা ৬১ পয়সা। ২০০৭০৮ অর্থবছর এ চালের দাম দাঁড়ায় ১৯ টাকা ৮৭ পয়সায়। কিন্তু পরের অর্থবছরই এক লাফে প্রায় ৯ টাকা বেড়ে এ চালের দাম দাঁড়ায় ২৮ টাকা ৪৪ পয়সায়। এরপর আবার এক বছর দর স্বাভাবিক থাকার পর ২০১০১১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ টাকা ৯৩ পয়সা, যা ছিল এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। পরের দুই অর্থবছর অবশ্য পড়তির দিকে ছিল দাম; কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৩ টাকা ২০ পয়সা ও ৩০ টাকায়। তবে চলতি অর্থবছর এর দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ৩৬৩৮ টাকায়।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও মোটা চালের দাম বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, গতকালও প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৩৪৩৬ টাকায়, এক মাস আগে যা ছিল ৩৩৩৫ টাকা। আর গত বছরের এ সময়ে দেশের বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ছিল ৩০৩২ টাকা। টিসিবির হিসাবেই এক বছরের ব্যবধানে এ চালের দাম বেড়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে টিসিবির তথ্যে প্রতি কেজি চালের দাম ৩৬ টাকা বলা হলেও খোলাবাজারে তা আরো ২ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

চালের দাম বাড়াকে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হিসেবেই দেখছেন অনেকে। আবার ভরা মৌসুমে দাম বাড়ার পেছনে মিল মালিকদের দায়ী করছেন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা। আর মিল মালিকরা বলছেন, উৎপাদন খরচ তো বেড়েছেই। সেই সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন খরচ। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতাও দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় সরকারের নজরদারির অভাব ও উদাসীনতাই দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে কৃষকরা ধানের উৎসাহজনক দাম পাচ্ছেন না।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মিল মালিকরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার ধানের দাম বেশি। বাজারে মোটা স্বর্ণা ধানের মণপ্রতি দাম ৮৩০৮৪০ টাকা, গত বছরের চেয়ে যা ১০০ টাকা বেশি। আবার জ্বালানি খরচ বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। সেই সঙ্গে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে চালের দাম। তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এ কারণে টানা হরতালঅবরোধে পাইকারি বাজারে চালের মজুদ কমেছে। তাতে ব্যবসায়িকভাবে মন্দ সময় পার করেছেন দেশের মিলাররা। এ অবস্থায় বাজার পুনরায় স্বাভাবিক হওয়া শুরু করলে দাম বাড়িয়ে মন্দা পুষিয়ে নিচ্ছেন তারা। এ অভিযোগ অস্বীকার করে কুষ্টিয়ার ভাণ্ডারি রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী জানান, সব মিলেই এখন চালের মজুদ প্রচুর। এ অবস্থায় সরবরাহ বাড়ানোয় মনোযোগ সবার। দাম বাড়িয়ে বিক্রি কমানোর অবস্থা বা সুযোগ তাদের নেই। বর্তমানে দাম যতটুকু বেড়েছে, তা বর্ধিত খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঢাকা শহরের নিম্নবিত্ত শ্রেণীসহ দেশের ৬০৭০ শতাংশ মানুষ মোটা চালের অন্যতম ক্রেতা। সহনীয় দামে তাদের কাছে চাল সরবরাহের জন্য খাদ্য অধিদফতরের উদ্যোগে চালু রয়েছে ওএমএস কার্যক্রম। বর্তমানে সীমিত আকারে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম এলাকায় চালু আছে এ কার্যক্রম। বাজারে ওএমএস কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় মোটা চালের দাম বাড়ছে বলেও জানা যাচ্ছে। ১৮দলীয় জোটের টানা অবরোধ কর্মসূচি স্থগিতের পর কমে এসেছে পণ্য পরিবহনের ব্যয়। কিন্তু তার পরও বাজারে চালের দাম কমেনি। যে কারণে নিম্ন আয়ের মানুষজনকে বাড়তি দামে চাল কিনতে এখনো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পাঁচ বছরে বিপুল হারে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সে হারে মানুষের আয় বাড়েনি। এক্ষেত্রে যারা ব্যবসাবাণিজ্য করেন তারা হয়তো তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হননি। কিন্তু নির্ধারিত আয়ের মানুষ চরম বেকায়দায় পড়েছে। আর্থিক খাতে চরম অব্যবস্থাপনার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, আগামী দিনে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নির্ভর করছে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলে দ্রব্যমূল্য বেড়েই যাবে।

পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে প্রতি কেজি চিকন চালের দাম ছিল ৩২ টাকা। তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরে মোটা চালের দাম বেড়ে হয় ৩২ টাকা। ওই সময় ভালো মানের চালের দাম ওঠে ৪৫ টাকায়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরই চালের দাম নেমে আসে ৩৬ টাকায়। বর্তমানে প্রতি কেজি ভালো মানের নাজিরশাইল চালের দাম ৫৮ থেকে ৬০ টাকা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিন ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি প্রতি কেজি মসুর ডাল বিক্রি হয়েছে ৯৮ টাকায়। দায়িত্ব নিয়েই সরকার ডালের দাম ৭০ টাকায় নামিয়ে আনে। বর্তমানে ভালো মানের দেশি মসুর ডালের কেজি ১২৫ টাকা। তত্ত্বাবধায়কের শেষ দিনে প্রতি লিটার উন্নতমানের সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৯৫ টাকায়। আর পামঅয়েল বিক্রি হয়েছে ৪৩ টাকা ৫০ পয়সায়। পাঁচ বছরে বোতলজাত সয়াবিনের দাম দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকায়। ওই সময় প্রতি হালি ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ছিল ২৪ টাকা। বর্তমানে ডিমের দাম ২৮ টাকা। যদিও এক পর্যায়ে ডিমের দাম উঠেছিল ৪২ টাকায়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাগ্রহণের দিন প্রতি কেজি আলুর দাম ছিল ১৮ থেকে ২২ টাকার মধ্যে। সরকারের মেয়াদকালে ওঠানামা করলেও বর্তমানে আলুর দাম একই রয়েছে।।