Home » রাজনীতি » অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি

অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি

এম. জাকির হোসেন খান

political-cartoons-41ক্রেস্ট না। ক্যাশ চাই’। এদের রাজনীতির লক্ষ্যই হচ্ছে অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন। আর তা না দিয়ে অর্থহীন ক্রেস্ট দিলে ভোটারবিহীন তেলেসমাতির নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কী মন ভরতে পারে? আবার যেনতেন ব্যাপার নয়, সরকার দলীয় চিফ হুইপ বলে কথা। জনসমক্ষে দুর্নীতির এ ধরনের উদাত্ত আহবান বাংলাদেশেই সম্ভব। জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল না হয়ে বহি:শক্তির সমর্থনে রাবার ষ্ট্যাম্প সংসদে এমপি নির্বাচিত বলেই কেবল এ ধরনের লাগামহীন আচরণ করা সম্ভব। সর্বশেষ তথ্য মতে, ঋণখেলাপি হয়েও তার তথ্য গোপন করে আইন বহির্ভূতভাবে দলদাস নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণের দায়ে ক্ষমতাধর চিফ হুইপের সংসদ সদস্যপদ কেন বাতিল হবে না এ মর্মে হাইকোর্ট রুল জারি করেছে। বিগত সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের নগণ্য সম্পদ ক্ষমতা নামক আলাদীনের চেরাগের মাধ্যমে মাত্র ৫ বছরে শত শত গুণ বৃদ্ধির খবর নির্বাচনী হলফনামা নামক স্বঘোষিত আমলনামার মাধ্যমে জাতি প্রথম জানতে পারে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মন্ত্রীএমপিদেও এ আয় বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়, কারণ আমাদের জাতীয় আয় তো বেড়েছে। প্রশ্ন হলো ২০০৯ এর তুলনায় ২০১৩ সালে জাতীয় আয় কী কয়েকশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে? অবশ্যই নয়। তাহলে পাহাড়সম এ সম্পদের উৎস কোথায়? শুধু তাই নয়, ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পরই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এবং সংসদীয় দলের সভায় সকলকে সতর্ক করে দিয়ে অন্যায়ের ক্ষেত্রে শূণ্য সহনশীলতা প্রদর্শন এবং দুর্নীতিকে বরদাশত না করার ঘোষণা দেন। বাস্তবে এ হলো সহশীলতার উদাহরণ।

জাতির সাথে এ ধরনের প্রতারণাপূর্ণ অবস্থান এই প্রথম নয়। এক শ্রেণীর দলীয় বুদ্ধিজীবিদের ‘ফতোয়া’র মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে স্বৈরাচার দুর্নীতির এ মহোৎসব চালাচ্ছে, যার নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হয়েছে আরেক স্বৈরাচার। যে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শুরু এ যুগের দলদাস বুদ্ধিজীবীরা জাতিকে বুঝাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার জন্য গণতন্ত্রের চর্চা কিছু দিনের জন্য না হলেও ক্ষতি নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহত ব্যাংক কেলেংকারি হতে শুরু করে শেয়ার বাজার লুট, পদ্মা সেতু, রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র ভাড়া প্রদানে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বড় বড় দুর্নীতির মাধ্যমে শুধু সরকারি দলীয় রাজনীতিবিদরাই সুবিধা গ্রহণ করেনি এসব বিশিষ্ট আতেলরাও ছিটেফোটা সুবিধার বদৌলতে এসব অনিয়মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্তরালে জায়েজ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। কথায় বলে মাছের মাথায় পঁচন ধরলে সে মাছ নষ্ট হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। যে বুদ্ধিজীবিদের রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সঠিক পথে পরিচালিত করার কথা, তারা ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থে, কখনো বা প্রধানমন্ত্রীর ‘পিঠা দাওয়াতে’ সব অন্যায়কে ন্যায়ের সার্টিফিকেট দিতে সহায়তা করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর ১৫টি দুর্নীতির মামলা সহ সরকারি দলের নেতাদের মামলাগুলো ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ প্রত্যাহার করা হয় অথচ দুদকের চেয়ারম্যান এর মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ ছিলো না। শুধু তাই নয়, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত একজন মন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিতেও কুন্ঠাবোধ করেননি। এর মাধ্যমেই মন্ত্রীএমপিদের অবাধে দুর্নীতির লাইসেন্স বিগত সরকারের আমলেই দেয়া হয়। সাধারণ যেকোনো নাগরিকই বুঝেন, উপার্জিত অর্থ এবং সম্পদ যদি বৈধভাবেই অর্জিত হয়ে থাকে তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাধর মন্ত্রীএমপিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ না করে দুদককে ব্যবহার করে শুধুমাত্র বিরোধী দলের নেতাদের সম্পদের হিসাব নেয়ার কারণ কি? তারপরও জাতিকে বিভ্রান্ত করার জন্য আওয়ামী লীগ ২০০৮ এর দিনবদলের সনদ (প্যারা ২) এর নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করে যে, ‘‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে, ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশী শক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” নির্মম এক পরিহাস জাতির সাথে, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সাথে।

জনগণের সাথে প্রতারণার এখানেই শেষ নয়। ভোটারবিহীন ১০ম সংসদ নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যাতে অনৈতিক সুবিধা নেয়া যায় সেজন্য দুদক আইন সংশোধন করে। ২০১৩ এর সর্বশেষ দুদক আইন সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ধরনের অসাংবিধানিক, বৈষম্যপূর্ণ এবং প্রতারণাপূর্ণ অবস্থান সম্পর্কে জনগণ অবহিত হয়। এর ফলে, দুদককে অকার্যকর ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করে দুদককে সার্বিকভাবে পঙ্গু করে সরকারের তল্পিবাহক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়। সর্বশেষ দুদক আইন ২০১৩ সংশোধনীটি সরকারের হঠাত গৃহীত কোনো পদক্ষেপের অংশ নয় বরং দুদককে অকার্যকর করে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সরকারের গৃহীত পূর্ব পরিকল্পনার অংশ। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে অনুষ্ঠিত হাস্যকর, প্রতারণাপূর্ণ এবং নাগরিকদের ভোটের অধিকার হরণ এবং গণতন্ত্র হত্যার ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দুতৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের অব্যবহিত পূর্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করে, ‘‘দুর্নীতি প্রতিরোধে, আইনি, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা আরও বাড়ানো হবে। ঘুষ, অনোপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশি শক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্র্নীতিদুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে”। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো অবস্থান নেয় সরকার।

ফলে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দুদকে নিযুক্ত চেয়ারম্যান এবং কমিশনাররা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ না নিয়ে ভবিষ্যতে আরো রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের লক্ষে নিজ নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক নেতাদের অুনসরণে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা উদ্বোধনে লিপ্ত। শুধু তাই নয়, সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও রেলের নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ‘কালো বিড়াল’ বলে পরিচিতকে দুদকের চার্জশীট থেকে বাদ দেয়া হয়। একইসাথে, ২০০৯২০১৩ সময়ে সংসদ সদস্যদের অস্বাভাবিক অর্থ উপার্জন সংক্রান্ত তথ্য বিক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ পেলেও দুদক সে সম্পর্কে অনুসন্ধান না করে উল্টো সরকারি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করতে সহায়তা করে। নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট হওয়ার নামে অথবা নির্বাচন কমিশনের সাথে সভার অজুহাতে দুদকের পক্ষ হতে নির্লজ্জভাবে ৯ম এবং ১০ম সংসদের সংসদের প্রায় শতাধিক সংসদ সদস্যদের হলফনামায় প্রার্থীদের দাখিলকৃত প্রশ্নবিদ্ধ অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের তথ্য যাচাই বা নির্ভরযোগ্য তদন্ত না করে মাত্র ৬জন প্রার্থীকে সম্পদের হিসাব দিতে বলে। অন্যদিকে, সরকারের যোগসাজশে দুদক ৭ বছর পর ২০১৪ এ ৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে। এসবই করা হচ্ছে সরকারের যোগসাজশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আন্দোলনকে দুর্বল করতে। প্রকারান্তরে দুদক এভাবেই দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে সহায়তা করছে।

দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে ক্ষমতাধরদের যোগসাজশে দায়িত্ব পালনে অবহেলায় দুদকের কর্মীরা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার কথা। বাস্তবে এ প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা অনুযায়ী বিরোধী রাজনীতিকদের সম্পদ খোঁজা এবং মামলার মাধ্যমে হয়রানির কাজে লিপ্ত। মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা উপার্জনকৃত অর্থের কর ফাঁকি দিলেও এনবিআর এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। তাছাড়াও, দুর্নীতি খোঁজার নামে দুদক এবং এনবিআর একই সম্পদ খোঁজার কাজ করলেও বাস্তবে সমন্বয় না থাকায় এর ফলাফল শূণ্য। দুদক ১৯৯২ সন হতে ২০১৩ পর্যন্ত ৩৪০টি মামলা দায়ের করলেও মাত্র ৬০টি মামলার বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র শর্সে দানার ভেতরে ভূত থাকার কারণেই দুদকের দায়েকৃত ৮০ ভাগের বেশি মামলায় দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তরা দুর্বল অভিযোগপ্রত্রের সুযোগে খালাস পেয়ে গেছে। দুদকের দায়ের করা ১৮৩টি মামলা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ, হাই কোর্ট এবং ঢাকার ১১টি বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন, যার আওতায় দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী ১৮৩ জনের (১২৩ জন রাজনীতিবিদ, ৪৫ জন সরকারি আমলা এবং ১৫ জন ব্যবসায়ী) বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাত এবং ঘুষের মাধ্যমে প্রায় ২৭ হাজার ৮৯ কোটি ২১ লাখ এবং ৩৯৯ টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের অভিযোগ করছে। তাছাড়াও, ঢাকার নিম্ন আদালতে দুদকের ৮৫৫টি মামলা বিচারাধীন থাকলেও ৩৫৮টি মামলা হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকায় তার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানা যায়।

এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, দুদকের দায়েরকৃত মামলার ভবিষ্যত অনিশ্চিত। কারণ, ইতিমধ্যে, সরকারের সরকার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করছে। তার বাস্তব প্রমাণ হলো, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সচিব মোশাররফ হোসেনকে ওএসডি হতে ফিরিয়ে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সদস্য হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ মুহুর্তে আশার কথা হলো, সরকারের দুদক আইন সংশোধনীর বিরুদ্ধে দেশের সচেতন নাগরিকদের যৌক্তিক অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে হাইকোর্ট আনিত সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে।

সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংবিধান বিরোধী ১০ম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের শত শত কোটি টাকা অপচয়ের মাধ্যমে দেশের স্বার্থের পক্ষে অবস্থানকারীদের স্বাধীনতা বিরোধী তকমা দিয়ে এবং জঙ্গিবাদের জুজু দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় এ লুটপাটের দায় শুধুমাত্র সরকারের কর্তা ব্যক্তি নয় নাগরিক সামজেরও একটি অংশের ওপর বর্তায়, যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে গণতন্ত্র হত্যা এবং অপ্রতিরোধ্য এ দুর্নীতির বিস্তারে সহায়তা করছে। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রের সংবিধানের ২০() অনুচ্ছেদে -‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুর্পাজিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবে না’সুস্পষ্টভাবে দিক নির্দেশনা থাকলেও তা লংঘন করে অবৈধ সংসদ নির্বাচনের নামে অবৈধ অর্থ জায়েজের অপচেষ্টা নির্বিঘ্নে চলছে।।