Home » রাজনীতি » ক্লিন ইমেজের জন্য মিথ্যার বিস্তার

ক্লিন ইমেজের জন্য মিথ্যার বিস্তার

আবীর হাসান

mrs-cleanপ্রধানমন্ত্রী এখন সদলবলে এমন কিছু করতে চাচ্ছেন যাতে নির্বাচনের অনিয়মগুলো ঢেকে যায়। এমন কিছু ‘অসত্য উদাহরণ’ তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন, যাতে দেশীবিদেশী সমালোচকরা তাদের অর্থাৎ আওয়ামী লীগের আগের করা মিথ্যাগুলো ভুলে সাধুবাদ দিতে থাকে। কিন্তু অবস্থাটা এখন এমন যে, বারো হাত শাড়িতেও যেন কুলাচ্ছে না, মাথা ঢাকতে গেলে উদোম হয়ে যাচ্ছে, আর সেটা ঢাকতে গেলে খসে যাচ্ছে ঘোমটা। সাম্প্রতিককালে ছাত্রলীগ এই পশ্চাদেশ উদোম করার কান্ডটা ঘটিয়ে চলেছে বেশি পরিমাণে আর মাথার ঘোমটা ফেলার জন্য নতুন মন্ত্রীপ্রতিমন্ত্রী ও অন্যান্য নেতারা বেশ তরিৎকর্মা বলেই বোধ হচ্ছে।

মোদ্দা কথা, প্রধানমন্ত্রী একটা ক্লিন ইমেজ তৈরির জন্য নির্বাচনের পরপরই উঠে পড়ে গেলেছিলেন, যে জন্য ভারভারিক্কি একটা মন্ত্রিসভা এবার উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু স্নেহবশতঃই হোক অথবা জেদের বশবর্তী হয়েই হোক কিছু পুরনো মাকাল ফল তিনি রেখেছেন এবং নতুন করেও কিছু নিয়েছেন, যারা প্রতিদিন মিডিয়ায় বিষোদগার করে চলেছে। বিএনপি নির্বাচন করেনি, তারা বিরোধী দলেও নেই জোরালো আন্দোলনও তারা করছে না, তারপরও বিএনপি জামায়াতকেই বিরোধী দল বানিয়ে ক্রমাগত তেড়িয়া কথা বলে চলেছেন এই সব ‘অতি সচেতন’ নেতারা। তার সঙ্গে রয়েছে নিজেদের অকাজের সাফাই গাওয়াও। যেমন তারা বলেছেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রধারীদের সবাই ছাত্রলীগের সদস্য ছিল না, দেশে বিচার বহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বা ঘটছে না, নিখোঁজরা আসলে পালিয়ে গেছে, যে কটা লাশ পাওয়া গেছে পুলিশি অ্যাকশনে সেগুলো কিছুই না কয়েকটা অ্যাকসিডেন্ট মাত্র।’

দেশের সব মানুষই জানে এই কথাগুলো সত্য নয় সর্বৈব মিথ্যা। এই সব মিথ্যা দিয়ে ‘ক্লিন ইমেজ’ তৈরি করা যাচ্ছে না, সেটাও সবাই বুঝতে পারছে। কারণটা আর কিছুই না আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের এই পর্বের সরকারের কাজকর্ম শুরুই হয়েছে মিথ্যা দিয়ে। প্রথম মিথ্যা যেটা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেশীবিদেশী স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের বোঝানো হয়েছিল তা হলো – ‘এটা সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার নির্বাচন।’ ৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচনটা করার পর এখন বলা হচ্ছে, ৫ বছর ক্ষমতায় থাকবে এই সরকার, বহাল থাকবে এই সংসদও। যদিও নির্বাচনে অর্ধেক ভোটারও ভোট দিতে পারেনি, অর্ধেকের বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিল আর য্টেুকু নির্বাচন হয়েছিল তাতেও সব মিলিয়ে ৫ শতাংশের বেশি ভোটারও ভোট দেয়নি। অথচ সেই সংখ্যাকেই বলা হচ্ছে, ‘সন্তোষজনক’ এবং নির্বাচনও ‘বৈধ।’ এই সন্তোষজনক এবং বৈধ দুটো শব্দই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ক্ষেত্রে মিথ্যা। মিথ্যা আরও আছে, এরশাদের জাতীয় পার্টিকে গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে চালিয়ে দেয়া এবং তাদেরকে বিরোধী দলীয় আসনে বসানো। চালাকির আশ্রয় নিয়ে সরাসরি এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করা হয়নি করা হয়েছে তার স্ত্রী রওশন এরশাদকে। কিন্তু এটা তো ভুলে গেলে চলবে না যে, এরশাদ যখন স্বৈরাচারী শাসন চালিয়েছিলেন তখন তার ওই শাসন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান দোসর আর আনুষ্ঠানিক ফার্স্টলেডি ছিলেন ওই রওশন এরশাদ। তিনি নির্বিরোধী গৃহিণী ছিলেন না। এরশাদের অপকর্মের থলেদারি করেছেন।

এখানে মনে পড়ছে বহু আগের এক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেইলির উক্তি। তিনি বলেছিলেন, ‘মিথ্যা তিন ধরনের – প্রথমত, তা মিথ্যা, দ্বিতীয়ত, জঘন্য মিথ্যা এবং তৃতীয়ত,তা পরিসংখ্যান।’ পাঠক লক্ষ্য করলে দেখবেন মিথ্যার এই চক্রটা অনেক আগেই প্রমাণ করেছে আওয়ামী লীগ এবং সেটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেই। জনগণকে, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে এবং বিদেশী স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকলকেই মিথ্যা বুঝিয়ে তফসিল ঘোষণা করিয়েছিল তারা। দ্বিতীয়ত. জঘন্য মিথ্যা দিয়ে আগের সরকার সংসদ না ভেঙেই নতুন সংসদ নির্বাচন করে সরকার পর্যন্ত গঠন করে ফেলেছিল। তৃতীয়ত. ক্রমাগত দিয়ে যাচ্ছিল মিথ্যা পরিসংখ্যান। এর মধ্যে যেমন ছিল উন্নয়নের মিথ্যা বয়ান তেমনি ছিল তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা সম্পর্কে গিবত এবং লাশের সংখ্যা কমানো। ওই সব গিবতে আর হিসাবে যে জনসাধারণ কনভিন্স হয়নি, তা বুঝতে পেরেই বিরোধী দল যাতে সংসদ নির্বাচনে আসতে না পারে সেই পরিস্থিতিই সৃষ্টি করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু সত্যি কথাটা বলেনি বলেছিল মিথ্যা কথা যে, ‘এটা নিয়মরক্ষার নির্বাচন মাত্র।’

এখন তারা যেহেতু ওই অবস্থানে নেই সেহেতু বলতেই হচ্ছে যে, তারা মিথ্যা কথা বলেছিল। আর এখন নতুন নতুন জঘন্য মিথ্যা তৈরি করছে কোন রকম লাজলজ্জার বালাই না রেখেই। সামনে আবার তারা পরিসংখ্যান নিয়ে উপস্থিত হবে। দেবে উন্নয়নের ফিরিস্তি আর লুকাবে লাশের সংখ্যা।

তবে সমস্যা এ দেশের মানুষের আরও আছে, যারা এই সরকারের মিথ্যাচার আর রাজনৈতিক অনিষ্ঠাচারের বিরোধীতা করছেন তারাও সত্যকে সামনে নিয়ে করছেন না। তারাও তাদের কৃত অসঙ্গত কাজগুলো নিয়ে মিথ্যা কথা বলছেন। উপস্থিত যে ঘটনাবলী সে সম্পর্কেও নিজেদের গা বাঁচিয়ে অর্ধসত্য তথ্য দিচ্ছেন। নিজেদের শক্তি সামর্থ নিয়ে সাম্যক ধারণা হয়তো তাদের নেই। সম্ভবত এটাও তারা জানেন না যে, মিথ্যাকে, অন্যায়কে আরও কিছু মিথ্যা দিয়ে ঠেকানো যায় না। তারা এটাও বিস্মৃত হয়েছেন যে, টেলিভিশনের ক্যামেরা আন্দোলনের মাধ্যম নয়। আন্দোলন সংগঠন হোক কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদই হোক, সেটা করতে হবে রাজপথেজনপদে। টেলিভিশনে তাদের যে আস্ফালন তা যে মিথ্যা সেটাও কিন্তু জনসাধারণের বোধগম্যতার বাইরে নয়।

কাজেই জনসাধারণকে একটা মিথ্যাশ্রয়ী শাসন ব্যবস্থাকে মেনে নিতে হচ্ছে। আপস করতে হচ্ছে চরম পরিস্থিতির সঙ্গে যার মধ্যে আছে ছাত্রলীগের অত্যাচার যা ক্যাম্পাস থেকে ছড়িয়েছে লোকালয় পর্যন্ত। আছে শৃঙ্খলাবাহিনীর গোপন কর্মকাণ্ডও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যার অন্যতম, সঙ্গে চলছে আরও নানা রকম অন্যায়। নতুন একটা বিধান করে সরকার আর তার ভিকটিম হয়ে যায় সাধারণ মানুষ। আর এসব তো ক্ষমতায় যারা আছেন তাদের সম্মতির বাইরে হচ্ছে না। ক্লিন ইমেজ তৈরির চেষ্টা থাকলেও সব রকম জননীপিড়নমূলক কাজই তারা হেবজ করেছেন। এমন সব কাজ তারা মাঝে মাঝে করে বসেন যা আমলাদেরও বিস্মিত করে। ধরুন সরকার সংসদ রেখে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়া কিংবা শত শত উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিফলক ডিজিটাল পদ্ধতিতে উন্মোচন করা, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে দু’ভাগে ভাগ করে নির্বাচন না দেয়া। এখন তো শুরু করা হয়েছে উপজেলা নির্বাচনের নামে আরেক তামাশা। বর্হিবিশ্বকে দেখাতে হবে যে ‘আমরা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করেছি।’ বাঃ বেশ। ধরনের একটা কমপ্লিমেন্ট যদি পাওয়া যায় তাহলে ইমেজ ক্লিন হবে আশা এটাই। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, পুরো বিষয়টাই দাড়িয়ে আছে শূন্য অর্থাৎ মিথ্যার ওপর। ৫ জানুয়ারির নির্বাচচনকে একমাত্র তুলনা করা যায় বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের সঙ্গে। ম্যারেজ হলে যেমন বৈধতা থাকে সন্তানের পরবর্তী প্রজন্মের, তেমনটা কিন্তু হচ্ছে না। এই ধরনের সমস্যা ক্লিন ইমেজ তৈরি করে না। খাদ থাকে খুঁত থাকে। আর সুচারু মিথ্যা ক্রমাগত মিথ্যাকে বাড়াতে থাকে, রাজনীতিতে আর প্রস্তাব, সংলাপ, ত্যাগ কিছুই থাকে না দন্ডই হয়ে ওঠে প্রধান যার প্রকোপে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তো বটেই, সাধারণ মানুষও আর টিকতে পারে না।।

১টি মন্তব্য

  1. what a nice online weekly for our bright motherland,
    long live amaderbudhbar
    long live bangladesh.