Home » প্রচ্ছদ কথা » ছাত্রলীগের গুন্ডামি শাসকশ্রেণীর গুন্ডামিরই অংশ

ছাত্রলীগের গুন্ডামি শাসকশ্রেণীর গুন্ডামিরই অংশ

মাহতাব উদ্দীন আহমেদ

coverবাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষত, কলেজ ও উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে শাসকশ্রেণীর ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর গুন্ডামি নতুন কিছু নয়। গত ২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নায্য দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলার পর নতুন করে আবার এই বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে।

যথারীতি এই ঘটনার পর সরকারের বিভিন্নজন বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। কিন্তু সব প্রতিক্রিয়ারই মূল সুর এক। পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে চিহ্নিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অস্ত্র হাতে গুলি করার ছবি প্রকাশের পরও যথারীতি সকল দোষ চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে আরেক ছাত্রসন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্রশিবিরের উপর। এভাবে পরিস্কার মিথ্যা অভিযোগ তুলে পরোক্ষভাবে যে শিবিরকেই শক্তিশালী করার করার রাস্তা প্রশস্ত করা হয় সেটা নিয়েও তাদের কোন মাথাব্যাথা নেই। কিন্তু সেটা অন্য প্রসঙ্গ। এখানে সেটা নিয়ে আলোচনার অবকাশ নেই। কিন্তু শিবিরের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করা সত্ত্বেও এ ঘটনায় যে ছাত্রলীগ জড়িত সেটা পুরোপুরি অস্বীকার করা সরকারের পক্ষেও সম্ভব হয় নি। ঘটনার পর পরই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, “আগে বিশ্বজিতের ঘটনায় আমাদের মাথা নিচু হয়ে গিয়েছিল, এখন এ ঘটনায় আমাদের নাক কান কাটা গেল।” অন্যদিকে নিত্যনতুন “বচনামৃত” উপহার দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ইস্যুতে নতুন আরেকটি “বচনামৃত” উপহার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমাদের ছেলেদের কি জীবন বাঁচাবার অধিকার নেই?” একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এরকম নির্লজ্জভাবে অস্ত্রবাজিকে সমর্থন করতে কেমন করে পারেন?

সরকারের কোন কোন নেতা ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরার কথা প্রচারমাধ্যমগুলোতে বলছেন। কিন্তু লাগাম টেনে ধরা আদৌ সম্ভব কি? লাগাম যে টেনে ধরা সম্ভব নয় সেটা সরকারের জ্যেষ্ঠ নেতারাই নাম না প্রকাশ করার শর্তে সংবাদ মাধ্যমের কাছে স্বীকার করছেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় এক নেতা এই ইস্যুতে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছেন, “আমি এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। আগে ছাত্রলীগের এসব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলে অনেকের বিরাগভাজন হয়েছি।”

cover 1অন্যদিকে ঘটনার পর একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী (এদের মধ্যে অনেকে আবার আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবি হিসেবেই পরিচিত) ঘটনার সমালোচনা করছেন। এদের সাথে যোগ দিয়েছেন কিছু টকশোজীবী, প্রগতিশীল দাবীদার এবং এনজিওজীবি। তাদের সমালোচনার ধরনগুলো এরকম: “ছাত্রলীগ গুন্ডা হয়ে গেছে”, “ছাত্রলীগ শোধরায়নি”, “প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগকে সামলান”, আমরা “দুঃখিত, উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ” ইত্যাদি। এই সুযোগে আবার অনেকেই রাজনীতির ঘাড়ে সব দোষ চাপানোর পুরনো খেলা খেলছেন। তারা এমনভাবে সমালোচনা করেছেন তাতে মনে হচ্ছে যেন সব দোষ কেবল ছাত্রলীগেরই। বিএনপির আমলে ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসী কার্যকলাপগুলোকেও তারা এভাবেই সমালোচনা করেন। এসব সমালোচনা জনগণের জন্য বিপজ্জনক। কারণ এসব সমালোচনা জনগণের চোখের সামনে থেকে আসল গুন্ডাদের আড়াল করে রাখে। তাদের এসব মতলবপূর্ণ সমালোচনা দ্বারা তারা প্রথমত, জনমনের বাষ্পটা বের করেন। দ্বিতীয়ত, এই জাতীয় ধারণা ছড়ানোর চেষ্টা করেন যে আসলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এসব ঘটনার জন্য কোন দায় নেই, সব দায় হলো ঐ ছাত্রলীগছাত্রদলশিবিরের ঐ সব গুন্ডাদের।

কিন্তু প্রশ্ন হলো গুন্ডামি কি শুধু এরাই করে? বর্তমানে শাসকশ্রেণী কি জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুন্ডামি চালাচ্ছে না? কয়েকদিন পর পরই গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের পেটানো হচ্ছে তাদের পাওনা মজুরী চাওয়ার অপরাধে। এমনকি নূন্যতম মজুরীটুকু পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে না। এটা কি গুন্ডামি নয়? মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নিয়ে যেভাবে সভা সমাবেশে নিষেধাজ্ঞানিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে সেটা কি গুন্ডামি নয়? যেভাবে দিনে দুপুরে হাইকোর্টে আইনজীবীদের পেটানো হচ্ছে সেটা কি গুন্ডামি নয়? অন্যদিকে ক্ষমতায় না থাকা শাসকশ্রেণীর অন্য অংশ গুন্ডামি চালাচ্ছে জনগনের উপর পেট্রোল বোমা মেরে। শহরগুলোতে গণপরিবহণের যে “চাঁদা” আদায় করা হচ্ছে সেটা গুন্ডামির থেকে কম কিসে? রামপালে প্রবল জনবিরোধিতা উপেক্ষা করে যেভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হল সেটা কি গুন্ডামি নয়? যেভাবে তাজরীনের মালিক গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াল সেটা কি গুন্ডামি নয়? কিংবা রূপপূর? শাসকশ্রেণীর “প্রভুরা” কি কম গুন্ডামি করছে? পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের আচরণ, কিংবা ভারতীয় সুজাতা সিংদের সফরের মতো বিষয়গুলো কূটনৈতিক মাস্তানির উদাহরণ নয়? মাগুড়ছড়া, টেংরাটিলায় হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস নষ্ট করার পরও নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালাচ্ছে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানী এটা কি গুন্ডামি নয়? বাংলাদেশের নদী বন্ধ করে মাঝখান দিয়ে রাস্তা বানিয়ে ফেলা হয়েছে ভারতের জন্য। এটা গুন্ডামি নয়? ভূমিদস্যু, মাদক ব্যবসায়ীদের কথা না হয় বাদই থাকল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটিতে যে ছাত্রলীগের এত সমালোচনা হচ্ছে সেই ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে তারা কি ছাত্রলীগের চেয়েও বড় গুন্ডা নয়? তাদের মদত দিয়েছে যে সরকার তারা কি করে এই হামলার দায় এড়াতে পারে? সরকারের মদত ছাড়া পুলিশ ছাত্রলীগ একযোগে আক্রমণ করে কিভাবে? উচ্চশিক্ষা খাতকে বাজারের উপর ছেড়ে দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের যে কৌশলপত্র বাস্তবায়ন করার চেষ্টা চলছে সেটা কি মস্ত বড় গুন্ডামি নয়? ঘটনার পর সরকার নিজে কি গুন্ডামি কম করছে? যেভাবে যাদের উপর হামলা হল সেই আন্দোলকারীদেরই হামলাকারী হিসেবে আসামী করে মামলা দেয়া হয়েছে সেটি কি গুন্ডামির থেকে কম কিছু?

তাহলে খুব সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠে বর্তমানে শাসকশ্রেণীর প্রতিটি অংশ, এমনকি তাদের প্রভুরা পর্যন্ত বর্তমানে যেভাবে গুন্ডামির চর্চা করছে, তখন তাদের ছাত্রসংগঠনগুলো কি করে এই গুন্ডামি করা থেকে বিরত থাকবে? কেন বিরত থাকবে? বিরত থাকা আসলে সম্ভব নয়। ঠিক একারণেই আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব নয় ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরা। ছাত্রলীগছাত্রদল যে এখন সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে এটা এখন আর কোন তর্কের বিষয় নয়। আর ছাত্রশিবির তো শুরু থেকেই সন্ত্রাসী বাহিনী ছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বর্তমানে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল বা ছাত্রশিবিরে কারা যায়, কিভাবে যায়? বিভিন্ন কারণে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রাম থেকে, মফস্বল থেকে যখন শিক্ষার্থীরা যখন আসে তখন তারা দেখে হলগুলোতে প্রশাসন বলতে কিছুই নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্র তার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন রাখেনি। হলে সিট নিয়ে টানাটানি, সিট পেতে ছাত্রলীগদলশিবিরের নেতাদের কাছে ধরনা দিতে হবে। এরপর হলে উঠার পর ১ম বর্ষে নিয়মিত থাকতে হবে শোডাউনে নয়তো “বড়ভাইদের” হুমকিধামকিমারধোর। কখনো হল থেকে বের করে দেয়ার হুমকি। সাধারণত ২য় বর্ষ থেকে এই বাধ্যবাধকতামূলক অংশগ্রহণ থাকে না। কিন্তু এদের মধ্যে যারা গায়ে গতরে বড় সড়, কিছুটা সাহসী, তাদের “বড়ভাইরা” “টার্গেট” করেন। তাদেরকে উস্কে দেয়া হয় স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতে। সিনিয়র ছাত্রদের গায়ে হাত তুলতে, শিক্ষককে অসম্মান করতে, ইভ টিজিং করতে। তারা অচিরেই মারামারিতে জড়ায় তুচ্ছ সব বিষয় নিয়ে। সৃষ্টি করে নিজেদের শত্রু। তখন “বড়ভাইরা” তাদের “ব্যাকআপ” দেন। এর ডামাডোলে একপর্যায়ে এই নতুন ছেলেগুলো বাধ্য হয়ে পড়ে ছাত্রলীগদলশিবিরে স্থায়ীভাবে থাকতে। কারণ তারা ইতোমধ্যেই জেনে গেছে ক্যাম্পাসে অক্ষতদেহে থাকতে হলে তাদের এখন বড়ভাইদের “ব্যাকআপ” ছাড়া আর কোন গতি নেই। অনেকে তাই বের হতে চাইলেও বের হতে পারে না।

আরেকদল আছে যারা “বড়ভাইদের” রোদচশমা, মোটরসাইকেল আর ক্ষমতার মোহে আবিষ্ট থাকে। তারাও চায় বড়ভাইদের মতো তাদের ভাষায় “মাস্তি” করতে। তারা চায় তাদের ভাষায় “হ্যাডম” নিয়ে ক্যাম্পাসে চলতে। তারা নিজে থেকেই যোগ দেয় ছাত্রলীগদলশিবিরে। যোগ দেয়ার পর বড়ভাইদের মতো শুরু করে ইভটিজিং, মাদক নেয়া, মদ খাওয়া, ক্যান্টিনে ফাও খাওয়া, র‌্যাগ দেয়া। আরেক দল আছে যারা ভাল রেজাল্টধারী। এরা আবার এসব সংগঠনে যোগ দেয় ভবিষ্যতে শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেতে সুবিধা হবে বলে। আর এসব কিছুর ডামাডোলে সুযোগ বুঝে এদের হাতে তুলে দেয়া হয় প্রথমে গজারি লাঠি, হকিস্টিক, রড। পর্যায়ক্রমে রামদা পিস্তল, রিভলবার। কখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রয়োজনে, কখনো ক্যাম্পাসে আধিপত্য ধরে রাখার প্রয়োজনে, কখনো স্থানীয় এমপির প্রয়োজনে, কখনো বা নিজেদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের মীমাংসার প্রয়োজনে। তাতে খুন খারাবি হলে গেলেও কোন সমস্যা নেই প্রশাসন থেকে “ব্যাকআপ” ঠিকই পাওয়া যাবে। কলেজগুলোর চিত্র এর থেকে খুব একটা আলাদা কি?

লক্ষ করলে দেখা যাবে পুরো প্রক্রিয়াটির কোথাও আদর্শের কোন স্থান কার্যত নেই। থাকা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় ছাত্রলীগদলশিবিরের ছেলেরা দেখে যে তাদের পেছনে শাসকশ্রেণীর প্রকাশ্য সমর্থন আছে। তারা অনুভব করে যে তারা যে অন্যায়ই করুক না কেন তাদের গায়ে কেউ হাত দিবে না, কারণ তারা বুঝে ফেলে যে তাদেরও “প্রয়োজন” আছে। আর একই সাথে যখন তারা চারপাশে শাসকশ্রেণীর গুন্ডামিগুলো দেখে তখন তারা গুন্ডামি করবে না তো কারা করবে? তাদের এই গুন্ডামি তাই কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন কোন কিছু নয়। এই গুন্ডামি শাসকশ্রেণীর গুন্ডামিরই একটি প্রান্তিক অংশমাত্র।।