Home » আন্তর্জাতিক » আম আদমি পার্টি কতোটা সফল হবে?

আম আদমি পার্টি কতোটা সফল হবে?

বিপিন শাহ

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

aapবটবৃক্ষের জীবন শুরু হয় পরজীবী হিসেবে। যে গাছ বা ভবনে বীজটি অঙ্কুরিত হয়, তাতে ফাটলের সৃষ্টি হয়ে বটবৃক্ষ বেড়ে ওঠতে থাকে। বটগাছ আবার ভারতের জাতীয় বৃক্ষও। প্রায় দুই বছর আগে ‘কৃষাণ’ ফার্মের শ্রমিক নেতা গান্ধীবাদী আনা হাজারে অবসর ভেঙে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন।

ক্ষমতাসীন ও বিরোধ শক্তিগুলো চতুর হাতে রাশ টেনে ধরলে কয়েক মাসের মধ্যেই আনার আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ে। আনার দুর্বল স্বাস্থ্যও গতিবেগ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়নি। আম আদমি পার্টির (এএপিআপ) নেতা হয়ে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশকারী অরবিন্দ কেজরিওয়াল তখন ছিলেন অপরিচিত আমলা। কোনো ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না। কিন্তু তবুও তিনি হয়ে পড়েছিলেন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বটবৃক্ষ।

যারা স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের অধীনে বাস করেন, তারা সবসময় মনে করেন, গণতান্ত্রিক সমাজে বসবাসের সুযোগ তারা মিস করছেন। তারা মনে করতে থাকেন, গণতান্ত্রিক সমাজে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবেন, জনগণের কাজ করবেএমন রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু থমকে যাওয়া অগ্রগতি, সিদ্ধান্তহীনতা, অন্তঃকোন্দল, যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা পাওয়ার চেষ্টা, সঙ্ঘবদ্ধভাবে মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং দুর্নীতি কেলেঙ্কারি, নির্বাচিত নেতাদের কোনো ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজে সম্পৃক্ত না হওয়ার ফলে স্থবির হয়ে পড়া অনুভূতি চাঙ্গা রাখতে তাদেরকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। ভারত, থাইল্যান্ড, তুরস্ক এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এ ধরনের অবস্থা ভোটারদের তাড়িত করে।

ভারতে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসতে থাকার প্রেক্ষাপটে ভোটাররা অনেকটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েন। চারটি রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অপ্রত্যাশিত জয় এবং দিল্লিতে আপের বিজয়ে তাদের ওই অবস্থাই প্রতিফলিত হয়েছে। নতুন নতুন শিরোনামে কেলেঙ্কারির খবর ফাঁস হয়ে থাকায় ভোটারদের হতাশা চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। যেন তারা নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে আগ্রহী ছিল। তবে তারা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ভুলে গিয়েছিল : ‘ইচ্ছার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।’ অপ্রমাণিত ও অনভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা ভোটারদের সংবেদনশীলতা উস্কে দিতে পারেন। তারা ঝাঁপ দেওয়ার পর তারা বুঝতে পারেন যে আগুন থেকে বেরিয়ে উত্তপ্ত কড়াইয়ে পড়েছেন।

অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আকস্মিকভাবে সাবেক মিত্র আনাকে ত্যাগ করা নিয়ে কেউ অবাক হননি। তারপর তিনি এমন এক আন্দোলন শুরু করেন, তার ফলে আপের আবির্ভাব ঘটে। কেজরিওয়াল ভারতের অন্যতম অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) থেকে মেকানিক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গ্রাজুয়েট হয়েছিলেন। তবে হঠাৎ করেই তিনি প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন বাদ দিয়ে ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিসে ঢুকে পড়েন। ক্যারিয়ারের এই মোড় পরিবর্তনের পেছনে কোন কারণ ছিল, তার পুরো কাহিনী আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, রাজস্ব বিভাগে চাকরি থেকেই তিনি দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পূর্ণকালীন রাজনীতিবিদ এবং অবশেষে ভারতের রাজধানী দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী বনে গেলেন।

বলা হয়ে থাকে, ‘সব রাজনীতিই স্থানীয়।’ এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, দিল্লির ভোটারেরা প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও আইআইটির এক মেধাবী গ্রাজুয়েটের নেতৃত্বাধীন দলকে নির্বাচিত করে নিজেদের এবং জাতিকে বিস্মিত করেছিল। ভারতের সুশাসনের প্রয়োজন এবং আপ নেতৃত্বের যোগ্যতা নির্ধারণ এবং দুর্নীতির কাদায় নিমজ্জিত আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

ভারতের আইআইটি আরো অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তি তৈরি করেছে। তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে দারুণ সফলতার পরিচয় দিচ্ছেন, অনেকে ভারতের শিল্প এলাকায়ও নতুন যুগের সৃষ্টি করছেন। এসব কাজে সফলতার জন্য অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন নেতৃত্বের পাশাপাশি উদ্ভাবনমুখী মানসিকতারও প্রয়োজন। কেজরিওয়াল লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলে তিনিই ভারতের রাজনীতিতে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত প্রথম সফল রাজনীতিবিদ। জনসাধারণ মনে করছে, তিনি যোগ্যতার সাথে নেতৃত্ব দিতে পারবেন এবং সুশাসনের মানদণ্ড স্থাপন করতে পারবেন।

তবে পার্টি এবং সরকার পরিচালনা নিয়ে তার ঘনিষ্ঠ এবং পরিচিত মহলের কাছ থেকে বিরোধিতার আভাস পাচ্ছেন। সংগঠন ও সরকার পরিচালনা করতে কার্যকর নেতৃত্বের জন্য নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। করপোরেট সংস্কৃতিতে বরখাস্ত করার যায় বলে সংগঠন তৈরি এবং কর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অনেক বেশি সহজ। ভারতে আমলাতন্ত্র এত বেশি শক্তিশালী এবং তাদের নির্বাচন এত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত যে মনে হতে পারে তাদের হাতেই প্রকৃত ক্ষমতা। আর নির্বাচিত মন্ত্রীদের মনে হতে পারে, তারা সাধারণভাবে অযোগ্য এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত আমলাতন্ত্রের হাতের পুতুল।

এ কারণেই সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির জাল ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হতে পেরেছে। মৌলিক প্রশ্ন জাগে, কেজরিওয়ালের মতো এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধা কি কামড় বসানোর জন্য সবসময় হা করে থাকা হাঙ্গরে পরিপূর্ণ দুর্নীতির সাগরকে প্রয়োজনীয় রূপান্তর করতে পারবেন? তিনি কি আনা হাজারের চেয়ে বেশি সফল হতে পারবেন?

গান্ধীর ‘অনশন’ করার গন্ধী থেকে আনা প্রতিটি পাতা সংগ্রহ করলেও দুর্নীতি দমন আইনে নানা ফাঁক থাকায় তিনি তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। জবাব হয়তো ওইসব মানুষের মধ্যে নিহিত রয়েছে, যারা এমন এক মানসম্পন্ন নেতাকে সমর্থন দেবেন যিনি বিলাসিতা ভোগ করেন না এবং আম আদমির (সাধারণ মানুষ) মতো জীবনযাপন করেন। জনসমর্থন পাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় গুণাবলীর কিছুটা কেজরিওয়াল প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু তার হাইতোলা সহকর্মীরা কি স্বতঃস্ফূতভাবে তা মেনে চলবেন?

আমলাতন্ত্রের শেকড় অনেক গভীরে

দিল্লি সরকারের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ইঙ্গিত দিচ্ছে, করপোরেট প্রতিষ্ঠান চালুর করার চেয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেক কঠিন। প্রধান সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা রয়েছে, তারা জনজীবনের আষ্টেপিষ্ঠে লেপ্টে থাকা দুর্নীতি দূর করার মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যেতে একপায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। রাজনীতিবিদ এবং আমলাতন্ত্রের মধ্যকার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং আঁতাত অনেক গভীরে বিস্তৃত। কেজরিওয়াল তার সমর্থকদের আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ইতস্তত করছেন বলে দেখা যাচ্ছে।

নয়া দিল্লির প্রবৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধিত পরিবহন অবকাঠামো সত্ত্বেও ভারতের রাজধানীটি খাবার পানি, বিদ্যুৎ এবং মৌলিক পণ্যসামগ্রীর প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। গান্ধীর স্মৃতিবিজরিত স্থানগুলোতে বিদেশীরা প্রবাহিত পানি দেখতে পান না। জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই উপাদানটি নগর সরকার সরবরাহ করতে পারছে না। দিল্লিবাসী এবং ভারতের জাতীয় ভাবমূর্তির জন্য এটা অবশ্যই লজ্জাজনক বিষয়।

সাধারণভাবে নগর সরকার পরিচালিত হয় মিউসিপ্যাল সংস্থার মতো। জাতির রাজধানীর মর্যাদার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার যৌথভাবে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করে, নগরীর পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বের অনেক রাজধানীতেই এমনটা দেখা যায়। ভারতের অন্য যেকোনো প্রধান নগরীতে মেয়র তার পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে নগরীটি পরিচালনা করেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লি সরকারকে ‘রাজ্যধরনের’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছে। এখানকার নির্বাহীকে মেয়র বলা হয় না, বরং ভারতের অন্যান্য রাজ্যপ্রধানের মতো মুখ্যমন্ত্রীর মতো উচ্চতর পদবিতে ভূষিত করা হয়। পুলিশ বাহিনীর ওপর কেজরিওয়ালের কর্তৃত্ব না থাকাটাকে এএপি অপমানজনক মনে করে। তারা এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন চায়। তারা মনে করে পুলিশ বাহিনীর ওপর তাদের কর্তৃত্ব সম্প্রসারিত হওয়া উচিত। পুলিশের ক্ষমতা খর্ব করার লক্ষ্যে আম আদমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিক্ষোভ আয়োজন করে। অল্প সময় পর তা প্রত্যাহার করা হয়।

একই ধরনের উচ্চপর্যায়ের আম আদমির ঘটনা ভারতীয় ভোটারদের উৎসাহশূন্য করে ফেলে। মনে হচ্ছে, দলের সদস্যরা চিন্তাভাবনা না করেই অনাকাক্সিক্ষত কাজগুলো করে ফেলছে। মনে হচ্ছে, দলের সদস্যরা স্বাধীনভাবে চলছে। তার দলের এক সিনিয়র সদস্যের এক মন্তব্য থেকেও তিনি দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রশান্ত ভূষণ নামের ওই সদস্য কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী থাকবে কি না তা নিয়ে গণভোট আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার এই মন্তব্য ছিল দিল্লির মুসলিম সংখ্যালঘুদের খুশি করার জন্য। কিন্তু এতে অন্য অনেকে ক্রুদ্ধও হয়। কাশ্মীরে গণভোট অচল বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিষয়টা আর এমনকি জাতিসংঘ বা পাকিস্তানের কণ্ঠেও সোচ্চার নয়।

এটা আবারো ভারতের ভোটারদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আম আদমি রাজনৈতিকভাবে অপরিণত। তারা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যেকোনো কিছু বলতে বা করতে পারে। অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক পরিণামদর্শিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু তাদের এখন এগুলোর অভাব রয়েছে। দিল্লির ভোটারেরা সম্ভবত জড়তায় ভুগছে। যে যেভাবে ভালো মনে করছে, নিজের মনে কাজ করে যাচ্ছে। উজ্জ্বল কোনো রত্নের দেখা মিলছে না। এমনকি খোদ অরবিন্দ কেজরিওয়ালও যোগ্যতার সাথে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না। এ কারণেই আম আদমির প্রতি উৎসাহে ভাটা পড়েছে।

মিশন অব্যাহত রাখা

মনে হচ্ছে, আম আদমি পার্টি দিল্লি নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন নয়, বরং তাদের চোখ ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের দিকে। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতিতে ভারতকে আবারো অর্থনৈতিক স্থবিরতার জোটবদ্ধ রাজনীতিতে ঠেলে দিতে পারে। কেজরিওয়াল এবং তার সহকর্মীরা নগর পরিচালনায় তাদের সময় ব্যয় করছেন না, তারা বরং এমন সব পণ্ডশ্রমে মেতে রয়েছেন, যেখানে তাদের নাক গলানোর প্রয়োজন নেই।

বিপরীতক্রমে, কেজরিওয়াল তার নিজের ভাবমূর্তি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন। তার দলের হতাশ ও বিমুখ কিছু সদস্য এখন আরেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করছেন। ওই মন্ত্রীর নাম সোমনাথ ভারতি। তার বিরুদ্ধে চার আফ্রিকান নারীকে আক্রমণ করা এবং তাদের প্রতি বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ভারতির বিরুদ্ধে আরো কিছু অভিযোগ রয়েছে। আক্রমণ করার অভিযোগের জবাবে ভারতি বলেছেন, তিনি দিল্লির মাদক ও যৌন চক্রকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার তার দায়িত্বটি পালন করছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, এএপি তার মূল মিশন থেকে সরে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোনিবেশন করেছে।

নয়া দিল্লিতে বিদ্যুতের হাহাকার বাড়ছে। কিন্তু অবকাঠামোগত স্বল্পতা এবং বিদ্যুৎ শিল্পের ওপর রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। দিল্লির পুরনো অংশে বিদ্যুতের তারগুলো বহুতল ভবনের ওপর দিয়ে, ঠাসাঠাসি রাস্তার ওপর দিয়ে চলে গেছে। মনে হচ্ছে, এগুলো কোনো কিছু প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। তারগুলো যেকোনো সময় এখানকার অধিবাসীদের জন্য বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। বিদ্যুৎ চোরও রয়েছে দেদার। বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত বিল্ডিং কোডও নেই। সবার কাছেই মনে হচ্ছে, নগরীর আম আদমি প্রশাসনের এসব দিকেই নজর দেওয়া উচিত ছিল। এখানেই তাদের আসল কাজ। কিন্তু সেটাকে এড়িয়ে তারা পৃথিবীর আদিমতম পেশার দিকে নজর দিয়েছে।

অনেকের মতে, এএপি ভারতীয় ধরনের আমেরিকান টি পার্টি। তাদের ধারণা, এই দলটি সরকারকে স্থবির করে দেওয়ার মতো যথেষ্ট বিষ ধারণ করে। স্থানীয় নির্বাচনে জয়ের পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর কেজরিওয়ালের প্রথম কাজ হতে পারত দিল্লিবাসীকে দেখিয়ে দেওয়া যে তিনি তার পূর্বসূরিদের চেয়ে ভালোভাবে শাসন করতে পারেন, ভোটারদের কাছে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে পারেন। এরপর তিনি জাতীয় পর্যায়ে আরো উচ্চাভিলাষী পথে পা বাড়াতে পারতেন।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে কেজরিওয়াল কিভাবে এএপি প্রার্থীদের বাছাই করেন, তা তেমন স্পষ্ট নয়। ভারতীয়রা নির্বাচনের খেলাটা ভালোই বোঝে। কোন দল জয়ী হতে পারে, তারা ভালোমতোই তা আন্দাজ করতে পারে। তাই তারা পুরনো দল ছেড়ে সম্ভাব্য জয়ীর পেছনে লাইন দিতে পারে বেশ দক্ষতার সাথে। তারা হতে পারে নয়া সুযোগসন্ধানী কিংবা অন্য কোনো প্রধান রাজনৈতিক দলে যোগদানকারী। এএপিও বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। কিংবা এমন এক ডামাডোলের সৃষ্টি হবে, যাতে কেজরিওয়ালের বিশ্বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়বে। এএপির বেশির ভাগ সদস্যের সরকার পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাদের খুব কম সদস্যেরই নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে।

বিজেপি বুদ্ধিমত্তার সাথেই দিল্লির মতো স্থানীয় পর্যায়ের একটি স্থানে সরকার গঠন করতে রাজি হয়নি। তারা বরং জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ের দিতে মনোনিবেশন করেছে। ভারতে ‘জোট সরকার ফরমূলা’ গণতন্ত্রের ব্যর্থতা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সাপনেউলে সম্পর্কের মতো এটা অসম্ভব স্বপ্নে পর্যবেশিত হয়েছে।

বিলম্বিত স্বপ্ন

গত দুই দশকের কোয়ালিশন রাজনীতি প্রতিবেশি চীনের প্রবৃদ্ধি হারের সাথে পাল্লা দিতে অর্থনৈতিক সংস্কার এবং চাকরি সৃষ্টির ভারতীয় স্বপ্নকে ফিকে করে ফেলেছে। আঞ্চলিক অংশিদারদের কারণে অর্থনৈতিক সংস্কার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি হার খুব সামান্যই মুদ্রাস্ফীতির সাথে পাল্লা দিতে পারছে। প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে এ ধরনের স্থিতিবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। কারণ প্রয়োজনীয় বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, আবার দারিদ্র বিমোচনের জন্য চাকরিও বাড়ানো দরকার।

কেজরিওয়াল এবং তার দলের সামনে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং হাতের নাগালের মধ্যে প্রধান প্রধান খাবারের দাম নির্ধারণ বিশাল চ্যালেঞ্চ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এগুলো তাদের জন্য আবার সুযোগও। তিনি কি এসব প্রধান লক্ষ্য বাস্তবায়নে সফল হতে পারবেন? এটা একটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তার নিজ দলের সদস্যদের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বিবাদের প্রেক্ষাপটে প্রত্যেকে এগুলো নিয়ে ভাবছে। জাতীয় এজেন্ডার দিকে দৌড় শুরু করার আগে জাতিকে তার দেখাতে হচেব যে তিনি দিল্লির অধিবাসীদের অবস্থার উন্নতি করতে পারেন। হাঁটার আগে তাকে হামাগুড়ি দিতে হবে, আর দৌড়ানোর আগে তাকে হাঁটতে হবে।

ডিসেম্বরে তার দল দিল্লিতে যে ভোট পেয়েছে, তা আসলে কংগ্রেস দলের বিরুদ্ধে ‘না’ ভোট। দিল্লির মোটামুটি সংখ্যক মুসলিম জনসংখ্যার কারণে বিজেপি মাত্র দুটি আসন কম পেয়েছে। আইআইটি গ্রাজুয়েট হিসেবে কেজরিওয়ালের দিল্লির জনমিতিক হিসাবটা চট করে বুঝে নেওয়ার মতো বুদ্ধি আছে বলেই ধরা যায়।

আসলে যে বিষয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো তাকে দুর্নীতি দূর এবং অবকাঠামো উন্নয়ন বাদ দিয়ে ভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে নামা তার মনোনীত লোকজনকে নিয়ন্ত্রণের উপায় উদ্ভাবন করতে হবে। গত দুই দশকে কোয়ালিশন রাজনীতি আরো বেশি দুর্নীতির জন্ম দিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের সময় ভোট কেনার প্রথা জাতীয় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তানীতিতে প্রভাব ফেলছে।

অতি সাম্প্রতিক আদমশুমারি অনুযায়ী, এবার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে প্রায় ১৭ কোটি নতুন ভোটার। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই জনমিতিক পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের তরুণ ভোটারদের বিশাল ব্যাংক আম আদমি পার্টির ভাগ্য গড়তে কিংবা ভাঙতে পারে। নতুন ভোটারেরা নতুন ও পুরাতনসব প্রার্থীর দিকেই চোখ বুলাচ্ছে। কিছু প্রশ্ন করে তারা নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য কি না তা তারা পরখ করে দেখছে।।