Home » অর্থনীতি » আলু চাষ :: কৃষক বাঁচানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

আলু চাষ :: কৃষক বাঁচানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

ফারুক আহমেদ

potatoদৃশ্যগুলো পাল্টে যায়। পরিস্থিতি দৃশ্যগুলোকে পাল্টে দেয়। কৃষক যখন অক্লান্ত পরিশ্রম করে, তাঁর শেষ সম্পদটুকু বিনিয়োগ করে ফসল ফলান; যখন সেই ফসলের ক্ষেত ভরে ওঠে সবুজে, তখন তাঁর কাছে সেই রং শুধুই সবুজ নয়। সেই রং কখনো হিসেবের, কখনো বেঁচে থাকার আবার কখনো বা স্বপ্নের। এসবের রং কেমন তা চোখে দেখা যায় না। তা স্পর্শ করা যায় অনুভবে। সেই জন্য ঘন সবুজ ফসলের মাঠের রং কৃষকের কাছে শুধুই সবুজ নয়। কৃষক যখন তাঁর ফসলের মাঠের দিকে তাকায় তখন ফসলের ক্ষেত তাঁর সামনে নিয়ে আসে ঋণ শোধের, বেঁচে থাকবার জন্য খাদ্যবস্ত্র, থাকার জন্য আবাসটাকে একটু বাসযোগ্য করে তুলবার বার্তা। যখন ফসল ভাল হয়, বাম্পার ফলন হয় তখন ফসলের রং এর সাথে নিজের হিসেবের আর কল্পনার রং একাকার হয়ে তার মাঝে সৃষ্টি করে এক অনাবিল প্রশান্তি। কিন্তু সেই প্রশান্তিই বুক ফাটা কান্নায় রূপান্তরিত হয়ে যায় যখন তাঁর উৎপাদিত ফসলে তাঁর জীবনের কোন হিসেবই মেলে না। নিজের উৎপাদিত ফসলের রং তাঁর কাছে হয়ে ওঠে বিবর্ণ, বিরক্তিকর, দুর্বিসহ। দেশের হাজার হাজার আলুচাষীর বুক ফাটা কান্নার ভাষা এমনই সব সত্য জানান দিয়ে যাচ্ছে।

নাটোর,নওগাঁ, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নীলফামারী, রংপুরের বদরগঞ্জ, পঞ্চগড়, যশোর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ, লালমনিরহাট জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। এই বাম্পার ফলন আলু চাষীদের জীবনে কোন প্রশান্তি বা স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসেনি। এই বাম্পার ফলন ভারি হয়ে তাঁদেরই বুকের ওপর চেপে বসেছে। যখন বাম্পার ফলন হয় তখন সরকারের পক্ষ থেকে এমনভাবে প্রচার করা হয় যেন এর কৃতিত্ব সরকারেরই। কিন্তু প্রকৃতিতো আর এমনি এমনি কৃষকের ক্ষেতে বাম্পার ফলন ঢেলে দিয়ে যায় না। কৃষক তাঁর জীবনীশক্তি,বেঁচে থাকার পুঁজি সবকিছু ঢেলে দিয়ে নিয়ে আসেন ফসলের ফলন। সেই ফসলই তাঁর জীবনে অভিশাপ হয়ে আসে।এক সময় ভুমিদাশ ছিল। সেসব উঠে গিয়ে বহুদিন আগে। কিন্তু কৃষক কি স্বাধীন হয়েছে? স্বাধীন হলে সে বন্দি কেন সরকারের নীতির কাছে,কর্পোরেট স্বার্থের কাছে? কৃষক আজ এতটাই পরাধীন এবং পুঁজিহীন,জীবনীশক্তিহীন যে, প্রতিবাদের ভাষাও তাঁর হারিয়ে গেছে। এক কেজি মোটা চালের জন্য তাঁকে বিক্রি করতে হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ কেজি আলু। মাঠ থেকে তুলে ভ্যানে করে বাজারে নিয়ে যেতে শ্রমের হিসেব করলে এবং তা দাম দিয়ে কিনলে তাঁর সেটুকুও থাকে না। কৃষক বেঁচে থাকে জমিতে তাঁর শ্রম ঢেলে দিয়ে এবং তার কোনরকমে হিসেবে না গিয়ে। কৃষক ফসলের খরচ হিসেবে সব সময়ই তার নিজের শ্রমকে বাইরে রেখে হিসেব করেন। একজন আলু চাষীর দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে সার, বীজ,কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরিসহ এক একর জমিতে আলু চাষ করতে তাঁর খরচ হয়েছে ৫৫,২০০ টাকা। এসব চাষীদের অধিকাংশই অন্যের জমি কর্জ নিয়ে তাঁরা চাষ করেন। চাষ করতে যাওয়ার আগেই জমির মালিকের টাকা শোধ করতে হয়। এই চাষিকে এক একর জমিতে আলু চাষ করার জন্য জমির মালিককে শোধ করতে হয়েছে ৮ হাজার টাকা। দেখা যাচ্ছে তাঁর মোট খরচ হয়েছে ৬৩ হাজার ২০০ টাকা। এর মধ্যে তাঁর নিজের শ্রমের কোন উল্লেখ নেই। আছে শুধু খরচের নগদ টাকার হিসেব। এই কৃষকের জমিতে আলু ফলেছে ৮ হাজার কেজি। বাম্পার ফলন। ১ টাকা ৮০ পয়সা কেজি দরে তিনি তাঁর উৎপাদিত আলু বিক্রয় করে পেয়েছেন ১৪ হাজার ৪০০ টাকা। এবার হিসেবটা পাঠকই করুন।

বৃটিশদের শোষণশাসন এবং প্রান্তিকজনদের প্রতি অবহেলার সময় সৈয়দ মুজতবা আলীর আবিষ্কার সেই অবহেলিত এবং উপেক্ষিত পন্ডিত মশাই শিক্ষার্থীদের যে অংক কষতে দিয়েছিলেন সেই অংক আজও মেলেনি। বৃটিশরা গেছে, উপেক্ষিতরাই অস্ত্র ধরে পাকিস্তানিদের শোষণশাসনের নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করেছেন কিন্তু এখনও কি সে জবাব পাওয়া গেছে যে? স্বাধীন দেশে বহু উন্নয়নের গল্পের মাঝেও উপেক্ষিত প্রান্তিক জনদের যাঁদের শ্রমেঘামে উন্নয়নের চাকা ঘুরছে তাঁদের কান্নায়, বুকফাটা আর্তনাদে সেই না মেলা অংকের হিসাব বার বার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

আজকের দিনের স্যুটেডবুটেড পন্ডিতগণ প্রবৃদ্ধির হিসেব কষছেন। এই করতে গিয়ে গবেষণার পর গবেষণা করছেন। একজন আলু চাষির প্রবৃদ্ধি কিসে হয়? অনেকে বলেন বাংলাদেশের মত দেশে গণমানুষের যে অর্থনীতি তা হলো বাস্তব অর্থনীতি। এখানকার উপেক্ষিত এবং প্রান্তিক জনদের উৎপাদন বাস্তব,আলু,ধান, মাছ, পশু, হাঁসমুরগি, তৈরী নকসি কাঁথা, শীতল পাটি, হাঁড়িপাতিল, সৌখিন সামগ্রি, পোশাক সবকিছুই বাস্তব। এই প্রান্তিকজনদের কান্নাটাও বাস্তব। কিন্তু স্যুটেডবুটেড ভদ্রলোকেরা, যারা ক্রেডিট কার্ড পকেটে করে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ান, তাদের অর্থনীতি, বহু দেশ আছে যেখানে ক্রেডিড কার্ড অর্থনীতিই প্রধান, সেখানকার অর্থনীতি কি বাস্তব? আজকে অবাস্তবের কাছে বাস্তবের পরাজয়। এমনতো নয় যে আলুর উপযোগ শেষ হয়ে গিয়েছে। সেদিক দিয়ে এমনতো নয় যে আলুর অন্তর্নিহিত মূল্য আর নেই।

বর্তমান সরকার সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল এবং এখন বলছে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার চেয়েও অনেক বেশি করেছে। উন্নয়নতো বটেই। বাম্পার ফলনওতো উন্নয়ন। কিন্তু এ উন্নয়নে খোদ উন্নয়নের স্রষ্টার কি দশা? কৃষি ক্ষেত্রে সরকার কি এমন একটি নীতি দেখাতে পারবে যার ফলে কৃষকের লাভ হয়েছে? কতকগুলো রুটিন কাজ করে ঢেঁড়ি পিটিয়ে অবশ্য করণীয় দায়ীত্বগুলোকে পর্যন্ত আড়াল করা হয়। কৃষককে মারার ব্যবস্থা দুইভাবে করা হয়। একবার অস্বাভাবিকভাবে মূল্য বৃদ্ধি করে এবং পরবর্তীতে অস্বাভাবিকভাবে মূল্য কমানোর ব্যবস্থা করে। উভয় নীতিই কৃষকের জন্য হয়ে যায় করাত যেতেও কাটে আসতেও কাটে।

আজকে যে আলু চাষী আলুর দাম না পেয়ে হাহাকার করছেন, যার ঋণের টাকা শোধ হচ্ছে না, বেঁচে থাকবার অবলম্বন তাঁর শেষ হয়ে গেল তাঁরা কি অধিক পরিশ্রম করে অধিক ফসল ফলিয়ে অপরাধী হয়ে গেলেন? ঋণের টাকার দায়ে তাঁকে অপরাধীর মতই পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তাঁদের অপরাধ তাঁরা অধিক ফসল ফলিয়েছেন। এসব পলিয়ে বেড়ানো কৃষকের পক্ষ থেকে শাসক দলগুলোর বাঘা অর্থনীতিকের কাছে প্রশ্ন তুলতেই হবেঅধিক ফসল ফলালে কি দেশের প্রবৃদ্ধি কমে যায়? আর এই সব প্রান্তিকজনেরা কি অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেওয়ার অপরাধে অপরাধী হবেন?