Home » বিশেষ নিবন্ধ » রানা প্লাজা দুর্ঘটনা :: সাহায্যের জন্যে শুধুই অপেক্ষা

রানা প্লাজা দুর্ঘটনা :: সাহায্যের জন্যে শুধুই অপেক্ষা

. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

protest-rana-plazaরানা প্লাজা ধ্বস পৃথিবীর শিল্প ইতিহাসের অন্যতম শোচনীয় এক দুর্ঘটনা যেখানে ১১৩৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, কয়েকশত শ্রমিক আহত হয়েছেন আর অনেকে এখনও নিখোজ রয়েছেন। দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরে সরকারের উচ্চপর্যায়, বিভিন্ন সরকারীবেসরকারী প্রতিষ্ঠান, উদ্ধারকর্মী, এবং সাহায্যকারী সকলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নিহত ও আহত শ্রমিকদের উদ্ধারে। এর ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্ধারকাজ মোটামুটি প্রত্যাশিত মাত্রায় শেষ করা গিয়েছিল। সেসময় বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারী সংগঠন বিভিন্ন আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মৃত শ্রমিকদের পরিবারের কল্যাণে, আহত শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োজনে, চিকিৎসার জন্য এবং এতিম শিশুদের জন্য। সেসব প্রতিশ্রুতির কিছু পুরনও হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরের এসব উদ্যোগে সাময়িক প্রতিকার হয়তো হয়েছে, কিন্তু শ্রমিকের প্রয়োজন তাতে মেটেনি।

দুর্ঘটনার শিকার মোট কতজন? গত প্রায় দশ মাস পরও পুরোপুরি জানা যায়নি মোট কতজন রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, কতজন আহত হয়েছেন অথবা কতজনের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো হিসেবে দুর্ঘটনার শিকার ৩৫৭২ জন, আবার কোনো কোনো হিসেবে এটা ৩৮৩৮ জন। দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার পেয়েছেন এমন শ্রমিকের সংখ্যা কোন হিসেবে ২৪৩৮ জন আবার কোন হিসেবে ২৫১৫ জন। ‘নিখোঁজ’ রয়েছেন এমন শ্রমিকের সংখ্যা প্রাথমিক হিসেবে ছিল ৩৩২, পরবর্তীতে স্থানীয় তদারককারী কর্তৃপক্ষ ২৬৭ জনের তথ্য দিয়েছেন। অন্যান্য হিসেবে এসংখ্যা আরও বেশি। সম্প্রতি এমন অজ্ঞাত ২০০ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে ডিএনএ পরীক্ষা এবং পরিচয় মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে। প্রশ্নহলো – “অজ্ঞাত” পরিচয়ে দাফন করা মৃত ব্যক্তিদের বাকী ৬৭ জন কারা?

শ্রমিকরা বিভিন্ন প্রকারের আঘাতে আহত হয়েছেন কারও অঙ্গ হানি হয়েছে, কেউ মেরুদণ্ডজনিত আঘাত এবং কেউবা মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। এসব আহত শ্রমিকদের প্রকারভেদে সংখ্যা জানা প্রয়োজন। সংখ্যাগত এ পার্থক্যের কারণে প্রকৃত দুর্ঘটনার শিকার অনেক শ্রমিক এবং তাদের পরিবার আইনগত সুবিধাদি থেকে, সরকারীবেসরকারী সাহায্য থেকে এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এর ফলে তাদের জীবনের গতিই হয়তো পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে সাহায্য সহযোগিতার যে উদ্যোগ চলছে সেসব উদ্যোগের বাস্তবায়নের জন্য শ্রমিকদের সংখ্যা জানা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উদ্যোগে জাতীয় ত্রিপক্ষীয় কমিটি এ তথ্যগত জটিলতা দূর করতে পারে।

প্রতিশ্রুত সাহায্য প্রদান পর্যাপ্তভাবে হয়নি: দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরে বিভিন্ন পক্ষ থেকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এসেছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু সাহায্য দেয়া হয়েছে। সরকারের ত্রান তহবিল হতে রানা প্লাজা সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৭৭ জন মৃত শ্রমিকের পরিবারকে মৃতদেহ সৎকারের জন্য ২০,০০০ টাকা, ,০১৬ জন পরিবারের সদস্যকে ১৩ লক্ষ টাকা করে প্রায় ১৪ কোটি দেয়া হয়েছে। অতি সম্প্রতি ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ১৩৭টি পরিবারকে প্রায় ৩ কোটি টাকা দেবার বিষয়টি চুড়ান্ত হয়েছে। শ্রমিকরা আইনগতভাবে ২৭৮৫ জন বেতন ও অন্যান্য ভাতাদি পেলেও এখনও অনেক শ্রমিকের পরিবার সুবিধা পাননি; বিশেষত যে সব শ্রমিক এখন নিখোজ রয়েছে তাদের পরিবার। এ ছাড়া বহু বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি সাহায্য প্রদান করেছে। এসব আশু পদক্ষেপ সাময়িক প্রয়োজন মেটালেও দীর্ঘমেয়াদী সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি। দীর্ঘ মেয়াদী সাহায্যের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে দুর্ঘটনার শিকার ৪০ জন শ্রমিক ও পরিবারকে ১০১৫ লক্ষ টাকার সঞ্চয় পত্র দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ অধিকাংশ শ্রমিকই এ সুবিধা এখনও বুঝে পাননি। দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সহায়তা না থাকার কারণে এসব শ্রমিক এবং তাদের পরিবার নিদারুণ জীবন পার করছে। শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেবার ক্ষেত্রে দেশী এবং বিদেশী উদ্যোগ এক পর্যায়ে থমকে আছে। আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইউরোপ ভিত্তিক চারটি খুচরা ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ৩২০ কোটি টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব সাহায্য বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা দরকার।

দেশী ও বিদেশী উদ্যোগে সাহায্য বিতরণের ক্ষেত্রে মৃত শ্রমিকদের উত্তরাধিকার নির্ধারণ এক জটিল বিষয়। এবিষয়ে শ্রম আইন এবং উত্তরাধিকার আইন বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের এবং তাদের পরিবারের জন্য সুবিধাজনক বিতরণ কাঠামো নির্ধারণ দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকার আইনগত বিষয়গুলো পরিষ্কার করে একটি বাজেট প্রকাশ করতে পারে।

শ্রমিকদের দৈনন্দিন খরচ নির্বাহ, আহত শ্রমিকের চিকিৎসা, অনাথএতিম বাচ্চাদের ভরনপোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মেটানো কোনভাবেই পুরোপুরি সম্ভব নয় যদি পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা না করা হয়। অনতিবিলম্বে সকল পক্ষের দীর্ঘমেয়াদী সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা উচিত।।

(লেখক অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক, সিপিডি)