Home » রাজনীতি » সরকারের বৈধতা :: জনগণ নয় বিদেশী সনদের প্রত্যাশা

সরকারের বৈধতা :: জনগণ নয় বিদেশী সনদের প্রত্যাশা

ইকতেদার আহমেদ

globeযে কোন দেশের জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে তা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে সকল মহল দ্বারা স্বীকৃত হয়। একটি নির্বাচন শুধুমাত্র অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলেই তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ নির্বাচন বলা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বিীতাপূর্ণ নির্বাচন হতে হলে আবশ্যিকভাবে সাধারণ জনগণের ভোটে বিজয়ী হতে পারবে এমন সকল দলের অংশগ্রহণ জরুরী। তাছাড়া প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃত দলটি অংশগ্রহণ করছে কিনা এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া না গেলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নয়।

উন্নতঅনুন্নত নির্বিশেষে সকল রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন দল অবৈধ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার প্রয়াস নেয়। আর এ ধরণের প্রয়াস অনুন্নত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যতটা না দেখা যায় সে নিরীখে উন্নত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ততটা নয়। পৃথিবীর শক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কিভাবে জর্জ ডব্লিউ বুশকে জয়ী করানো হয়েছিল সে বিষয়টি এখনও বিশ্বের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের বিস্তৃতিতে যায়নি। কথিত আছে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে ৪৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী আল গোরের কাছে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশ পপুলার ভোটে পরাজিত হলেও দেখা গেল বুশের ভাই জেব বুশ ফ্লোরিডার গভর্নর হওয়ার সুবাদে সে অঙ্গরাজ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ের মাধ্যমে প্রদত্ত ভোট অবৈধভাবে হেরফের করে ইলেকট্রোরাল কলেজের ২৫টি ভোট রিপাবলিকানদের অনুকূলে নিয়ে আসতে সমর্থ হন। এ কারসাজির ফলে ইলেকট্রোরাল কলেজের ৫ ভোটের স্বল্প ব্যবধানে আল গোর পরাজিত হন। তাঁর ইলেকট্রোরাল কলেজের ভোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৬ এবং বুশের ২৭১। ফ্লোরিডার ইলেকট্রোরাল কলেজের ২৫টি ভোট আল গোরের অনুকূলে গেলে তাঁর ইলেকট্রোরাল ভোট সংখ্যা হতো ২৯১। অপরদিকে বুশের ইলেকট্রোরাল ভোট সংখ্যা হতো ২৪৬। সে সময় ফেডারেল বিচারকদের বেশীরভাগ রিপাবলিকানদের আনুকূল্যে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় বিচার বিভাগের দ্বারস্ত হয়েও আল গোর সুবিচার প্রাপ্তিতে ব্যর্থ হন।

ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় শক্তিধর রাষ্ট্রটির মুল প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিবর্তিত রূপ রাশিয়ায় গত ২০১২তে যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে পুতিনকে বিজয়ী করার জন্য ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়েছিল এমন অভিযোগ খোদ রাশিয়ার জনগণের মধ্য থেকে রয়েছে। নির্বাচনে পুতিনকে প্রায় ৬৪ শতাংশ ভোট প্রাপ্ত হয়ে নির্বাচিত দেখানো হয়। অপর প্রতিদ্বন্দ্বী চার প্রার্থীর কেউই এককভাবে ১৫ শতাংশের উধের্ক্ষ ভোটপ্রাপ্ত হননি। বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা সীমিতভাবে হলেও যতটুকু নির্বাচনটি পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন তাতে তাদের ভাষ্য অনুযায়ী এটি প্রকৃত নির্বাচন ছিল না। তাদের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনী বিধিমালা লঙ্ঘনের ঘটনা দেশটির সর্বত্র ঘটেছে এবং সরকারী সম্পদের অপব্যবহার নিশ্চিত করেছিল যে নির্বাচন চূড়ান্ত বিজয়ী কে হবেন তা কখনও সন্দেহযুক্ত নয়।

শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ আন্তর্জাতিক মোড়লের ভূমিকায় অবর্তীর্ণ। তারা বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তাদের নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের বিবেচনায় অনুন্নত রাষ্ট্রসমূহ কথা বলার অধিকার রাখে না। এর অর্থ এই নয় যে, অনুন্নত রাষ্ট্রসমূহের নির্বাচনের ব্যাপারে তারা কথা বলবে না। উন্নত রাষ্ট্রসমূহ গণতন্ত্রের কথা বললেও তারা যে সবসময় গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেয় তা নয়। এখানে তাদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ীক স্বার্থ মুখ্য।

আমাদের সার্কভুক্ত রাষ্ট্র আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদদের মদদে পাতানো ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে হামিদ কারজাইকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। আবার মিশরে প্রকৃত গণতন্ত্রের অনুশীলনে ইসলামী ব্রাদারহুড বিজয়ী হয়ে মুরসী প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হলে মার্কিন ষড়যন্ত্রের কাছে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। মুরসীকে বলপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত পরবর্তী সেখানে রক্তপাত এখনও লেগে আছে এবং তাঁর দলের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সকলেই কারাবন্দী। তাই বিশ্বের উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে গণতন্ত্রের রূপ কি হবে তা সে সকল দেশের জনগণের ওপর নির্ভর না করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বহুলাংশে নির্ভর করে বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ মোড়ল রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আকাঙ্খার ওপর।

ভূরাজনতিক অবস্থানের কারণে বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মোড়লদের ভাবনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় স্বীয় স্বার্থ হাসিল হয় এমন সরকারকে ক্ষমতায় রাখা গেলে আঞ্চলিক প্রাধান্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সমগ্র অঞ্চলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজতর হবে।

বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি হলো এখানকার সরকার তাদের অনুকূলে থাকলে পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের সাথে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে নৌ, স্থল ও রেল ট্রানজিটের মাধ্যমে যোগাযোগ সহজতর হবে এবং যে কোন ধরণের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনে তেমন একটা শক্তি ক্ষয়ের প্রয়োজন দেখা দিবে না। তাছাড়া বৈধ ও অবৈধভাবে বিভিন্ন ধরণের ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে যে বাজার পেয়েছে এবং পর্যটন ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশীরা যে হারে ভারতমুখী তাতে ভারতের স্বার্থের অনুকূলের যে কোন সরকার তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রকৃত গণতন্ত্রের অনুশীলনে যদি এমন দল ক্ষমতাসীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে যে দল ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নয় সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক মোড়ল হিসেবে ভারত জনসমর্থনকে গৌণ বিবেচনায় নিজেদের অনুগত সরকারকে যে কোন ভাবেই হোক ক্ষমতাসীন রাখতে সচেষ্ট।

সম্প্রতি বাংলাদেশে যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এ নির্বাচনটি ভারত ও ভুটানের চারজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ছাড়া আন্তর্জাতিক কোন নির্বাচন পর্যবেক্ষক পর্যবেক্ষণ করেননি। ভারত ও ভুটানের এ চারজন পর্যবেক্ষকের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত ব্যয়ভার আমাদের নির্বাচন কমিশন বহন করেছিল যা ইতোপূর্বে এ দেশের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি। তাই ধরেই নেয়া যায় তাদের পর্যবেক্ষণের ভাষ্য সর্বতভাবে যে দল ক্ষমতাসীন হলে ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সমুন্নত থাকবে সে দলের অনুকূলে হবে। এ চারজন পর্যবেক্ষকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন এ সত্যটিই প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আমাদের দেশের যে সকল নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা রয়েছে এ সংস্থাগুলোর মধ্যে যেটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সেটি হলো ‘ফেমা’। ফেমা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরবর্তী জাতির সামনে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছে তাতে দেখা যায় দশম সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ছিল ১০ শতাংশের কাছাকাছি। নির্বাচন পরবর্তী প্রধান বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ হতে যে সাংবাদিক সম্মেলন করা হয় তাতে দাবি করা হয়েছে ভোট প্রদানের হার ৫ শতাংশের অধিক ছিল না।

সমগ্র দেশবাসী অবহিত যে, দশম সংসদ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের জন্য উন্মুক্ত ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, অবশিষ্ট যে ১৪৭টি আসনে আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণ হয়েছিল তা দেশের সচেতন জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ করেছে। অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে সাধারণ মানুষ ভোটগ্রহণ পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকে বেলা দু’টা থেকে আড়াইটা অবধি খুব নগণ্য সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। এ নগণ্য সংখ্যক ভোটার কি করে এক থেকে দেড় ঘন্টার ব্যবধানে ৪০ ভাগের কাছাকাছি পৌঁছে গেল তাতে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠী হতবাক ও বিস্মিত। তাছাড়া বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৩ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে তারা নির্বাচিত না হওয়ায় তাদের নির্বাচিত হওয়া বিষয়টি সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী অনুযায়ী আইনসিদ্ধ হয়েছে কিনা এ বিষয়ে অনেকে সন্ধিহান।

বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইকোনোমিক ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন ও রাশিয়ার নিকট বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সে বিবেচনায় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই বাংলাদেশের দশম নির্বাচন পরবর্তী দেখা গেল ভারতের ন্যায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক প্রভাব এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে নবনির্বাচিত সরকারকে অভিনন্দন জানানোর ক্ষেত্রে সে দেশগুলোর অনেকে নিজস্বার্থের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেখা গেল আন্তর্জাতিকভাবে ভারত ও চীনের পররাষ্ট্রনীতি বিপরীতমুখী হলেও বাংলাদেশে এ ধরণের একটি বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর অভিনন্দন জানানোর ক্ষেত্রে চীনকে কোনভাবে দ্বিধাগ্রস্ত দেখা যায়নি। অভিনন্দন জানানোর সারিতে ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিত্র রাশিয়ার অবস্থান যে ভারতের চেয়ে ভিন্নতর হবে না এ বিষয়ে পূর্বেই ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। তবে অদ্যাবধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান প্রভৃতি রাষ্ট্রের নিকট হতে নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী দল অভিনন্দন পায়নি এবং অভিনন্দন যে পাওয়া যাবে এ বিষয়ে আশান্বিত হওয়ার মতো তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না।

স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আমরা যখন দেখতে পাচ্ছি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানুষের নিকট দশম সংসদ নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হয়েছে এমন বস্তুনিষ্ঠ স্বাক্ষ্যপ্রমাণ নেই তখন আমরা কেন জনমানুষের মতামতের উপেক্ষায় ও অবজ্ঞায় নির্বাচেনর সুষ্ঠুতা, নিরপেক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিদ্বন্দ্বীতা বিষয়ে পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রসমূহ হতে সনদ প্রাপ্তির অপেক্ষায় আছি? যে দেশ ও জাতি নিজ দেশের জনগণের সনদকে মূল্যায়িত না করে সনদের জন্য উন্নত রাষ্ট্রের পিছে ছুটে সে দেশ ও জাতির বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন নিজ দেশের জনমানুষের সনদই হলো প্রকৃত সনদ। আর বিদেশী যে কোন সনদ সাময়িক আত্মতৃপ্তির কারণ হলেও তা তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হওয়ায় পরিণামে যে শুভ নয়এ কথাটি ভাবলে হয়তো বিদেশী সনদ যোগাড়ের দৌড় আর দেখতে হবে না।।