Home » অর্থনীতি » কুইক রেন্টাল :: এ পর্যন্ত ক্ষতি ৫০ হাজার কোটি টাকা (প্রথম পর্ব)

কুইক রেন্টাল :: এ পর্যন্ত ক্ষতি ৫০ হাজার কোটি টাকা (প্রথম পর্ব)

বি.ডি.রহমতউল্লাহ

load-shading-21ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বলতে সাধারণভাবে কি বুঝায়? এর আভিধানিক অর্থ খুব স্পষ্ট। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো আর সরকারের অধীনে থাকবে না। সরকার কোন ব্যক্তি ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুধু বিদ্যুৎ কিনবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মান কি রকম, দক্ষতা কি পরিমান, এমনকি জীবন মানচক্র কত বছরের তাও বিবেচ্য বিষয় নয়। সরকার তাকে বলে দিবে ১০০ মেঃ ওয়াট বিদ্যুৎ চাইব্যস শুধু ঐ একটিই সরকারের প্রদত্ত শর্ত। কিন্তু বাংলাদেশের “ভাগ্যবান” রেন্টাল ঠিকাদারদের স্বার্থে আছে হাজার সুবিধা।

ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সাথে সরলভাবে রেন্টকারের তুলনা করা চলে। হঠাৎ একজনের গাড়ী অচল হয়ে গেলে সহজতম ব্যবস্থা হলো রেন্টকারের শরনাপন্ন হওয়া। সে মুহুর্তে যে পদক্ষেপটি নেয়া হয় তাহলো রেন্টকারের জি ফোন করে দেয়া। কোম্পানীর নির্ধারিত দরে বেশ কতগুলো শর্তাধীনে একটি নির্দ্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়ার ভিত্তিতে গাড়ীটি ব্যবহার করা। স্বাভাবিক ভাবেই এ দর নিজের কেনা গাড়ী ব্যবহার করলে যে দর হয় তার থেকে অনেক অনেক বেশী হবে এবংতা যথেষ্ট যৈাক্তিক। কারণ অত্যন্ত আপতকালীন সময়ে এ জীবনকে চালু রাখে। মুলতঃ এ কারণেই আর্থিকভাবে একজন সক্ষম ব্যক্তি দীর্ঘকাল ভাড়া ভিত্তিক গাড়ী ব্যবহার করতে চাইবে না।

স্থায়ীভিত্তিতে ভাড়া ভিত্তিক গাড়ী ব্যবহার না করার পিছনে যে যুক্তিগুলি কাজ করে তাহলো

() এর পরিচালন দর (কিঃ মিঃ প্রতি ভাড়া) নিজের ক্রয়করা গাড়ী থেকে অনেক বেশী। হিসেব করে দেখানো যেতে পারে যে ১৫ লক্ষ টাকার একই মডেলের ১টি গাড়ী নিজে ক্রয় করে ব্যবহার করলে ১০ বছর ব্যবহার করলে ব্যয় হবে ৩০ লক্ষ টাকা। আর সেই একইমূল্যের একই মডেলের রেন্টাল গাড়ী ব্যবহার করলে ১০ বছরে ব্যয় দাঁড়াবে ১৫০ লক্ষ টাকা।

() গাড়ীর নিয়ন্ত্রন নিজের হাতে থাকে না।

() গাড়ীর মান নিজের স্বাধীন মতো নির্ধারণ করা যায় না।

() গাড়ীর রং বা মডেল কি হবে তাও ব্যবহারকারীর চাহিদা অনুযায়ী হবে না।

ভাড়াভিত্তিক গাড়ীর বিষয়টি বুঝা গেলো কিন্তু ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের বিষয়টি কিন্তু অতো সহজ নয়। জানা দরকার ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ধারনাটি কোত্থেকে এলো। এটা মার্কিনীদের আবিষ্কার। মার্কিনীদের ভিয়েতনাম যুদ্ধে, ইরাক ও আফগান যুদ্ধে তাদের আগ্রাসী আক্রমন পরিচালনা করার লক্ষ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে তখন সেসব ক্ষেত্রে যেহেতু কোন কার্য্যকরী সরকারী দপ্তর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, ছিল না কোন সরকার এবং প্রশাসন। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের উপাত্ত হিসেবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। কিন্তু কোন সাধারন কোম্পানী কিংবা ঠিকাদার এ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বিদ্যুৎ স্থাপনা বসাতে রাজী হলো না। তখনই মার্কিন দেশে কিছু কিছু বড় বড় কোম্পানী তাদেরই সাবসিডিয়ারী হিসেবে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানী গঠন করলো, যারা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বলা মাত্রই বসাতে সক্ষম। প্রাপ্ত প্রস্তাবের বিপরীতে প্যাকেজ হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ভাসিয়ে বিশ্বের যে কোন স্থানে সাধারনতঃ নদীর তীরে বসাতে সক্ষম। তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় সবকটি কোম্পানীই মার্কিন দেশে অবস্থিত। মার্কিনীরাই তাদেরই সৃষ্ট যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর প্রয়োজন হয়ে পড়ে তাই মার্কিন দেশের সৈন্যদের যুদ্ধ জয়ের স্বার্থেই এধরনের পাওয়ার রেন্টাল স্টেশন কোম্পানী স্থাপিত হয়েছে। পাওয়ার রেন্টাল ঐ কোম্পানীর মূল ব্যবসা নয়। এটির মূল ব্যবসা স্বাভাবিক ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন। মার্কিন রাষ্ট্রের যুদ্ধের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অধিক দরে ভাড়ার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের অবৈধ সুযোগ নেবার জনেই মার্কিন দেশেই এ ধরণের কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেহেতু সার্ক্ষিক বিবেচনায় এটি একটি ক্ষণস্থায়ী ব্যবসা এবং একমাত্র মার্কিনীরাই এ ধরণের বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সুযোগ সৃষ্টি করে সেক্ষেত্রে অন্য কোন দেশে কি এ ধরনের কোম্পানী সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ আছে? উত্তর হলো না। কারণ আর্থিক ভাবে এ ধরণের কোম্পানী স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ঐ সমস্ত এলাকা ছাড়া ১৯৮৮ সালে ফিলিপাইনে দূর্ণীতিবাজ মার্কোসের আমলে প্রচন্ড দূর্ণীতিতে যখন রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে, তখন ঐ দেশে ১ বছরের চুক্তিতে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয়। ঐ সমস্ত পাওয়ার রেন্টাল স্টেশনগুলো সবই মার্কিন দেশের ছিলো। আর এধরনের দূর্ণীতি সম্পৃক্ত পাওয়ার রেন্টাল স্টেশন আর একটি দেশ পাকিস্তানে দূর্নীতিবাজরা শুরু করতে চাইলেও সেদেশের বিচার বিভাগ তা বন্ধ করে দেয়। দায়মুক্তি বিলের জন্য আমরা তাও করতে পারব না। প্রায় একই সময়ে প্রয়োজনীয় বৃষ্টি না হওয়ার ফলে ক্ষরা জনিত কারণে জলবিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায় ফলে শ্রীলংকায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিলেও রাষ্ট্রীয় সার্ক্ষভৈামত্ব ও নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা পাওয়ার রেন্টাল স্টেশন স্থাপন করেনি। লোড ব্যবস্থাপনা, যস্ত্রপাতি ও এ্যাপলায়েন্সের দক্ষতা বৃদ্ধি, সিষ্টেম লস হ্রাস, পুরোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সংরক্ষণ করে সংকট সমাধান করেছে।

এখন বিবেচনা করে দেখা যাক ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কোথায় বসানো হয় বা হয়েছে। আমরা দেখলাম ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয় যেখানে

() যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান, () যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি নেই, নেই প্রশাসন, রাষ্ট্র যেখানে অকার্যকর, () দেশের সার্বভৌমত্ব প্রায় বিলিয়ে দেবার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র অপ্রচ্ছন্নভাবে পরদেশ কর্তৃক পরিচালিত হয়, () সীমাহীন সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার ক্ষমতা যে সরকারের নেই, () কোন সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রে দেশের সার্বভৌমত্বে কোন পরদেশের কাছে বিকিয়ে দেয়ার অবস্থা সৃষ্টি করা হয়। আমাদের বিবেচনা করতে হবে উপরের কোন কারণটি বাংলাদেশে বিরাজমান যার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ভাড়া ভিত্তিতে চলতে দেয়া হলো।

এটি একটি সাবর্ক্ষজনীন সত্য যে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব যে কয়টি শাখা বা ভিত্তির উপর নির্ভর করে সেগুলো হলো – () সশস্ত্র বাহিনী, () আর্থিক ব্যবস্থাপনা, () বন্দর, () জ্বালানী ও বিদ্যুৎখাত। এগুলো এমন খাত যার যে কোন একটিকে ভাড়া দিলেই সে ভাড়াটে রাষ্ট্রকে যে কোন অবস্থায় জিম্মি করতে পারে। নাইজেরিয়া হলো এমনই একটি রাষ্ট্র যে দেশের জ্বালানী বিদেশীদের হাতে তুলে দেবার ফলে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব হারাবার পথে।

আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশে য্দ্বুাবস্থা বিরাজ করছে না, কোন আগ্রাসী শক্তি এদেশে যুদ্ধ চালাচ্ছে না, প্রশাসন বা রাষ্ট্র অকার্যকর নয়, সীমাহীন সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার ক্ষমতা সরকারের আছে। অথচ সমস্ত বৈধ ও সাশ্রয়ী পন্থা পরিহার করে গণবিরোধী, রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয়েছে। তাহলে কি ধরা যায়কোন সিন্ডিকেট দেশকে পদানত করার ষড়যন্ত্র করে দেশকে পদানত ও আর্থিকভাবে বিপর্যয় করতে চাচ্ছে? ধনী দেশ তথা বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ অনুসৃত সাম্রাজ্যবাদী নীতির আলোকে আমাদের মতো দেশকে পদানত রাখার এক অপকৌশল হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু এতো গেলো প্রভূদের নির্দেশনা। স্মরণ রাখতে হবে প্রভূদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে স্থানীয় লুন্ঠন কারীরা জনগনের উপর শোষনের পাথর চাপিয়ে দিয়ে অবৈধ লুন্ঠনে বখরার ভাগ বসাতে গিয়ে একা মহাপ্রলয় ঘটায়। বাংলাদেশে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে গিয়ে সে উদাহরণও সৃষ্টি করা হয়েছো।

ফিলিপাইনস্ ১৯৯০ সালে ভয়াবহ নিয়ন্ত্রনহীন বিদ্যুৎ সংকটের সময় এবং যুদ্ধকালীন সময়ে ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র যে বিশেষ অবস্থায় বসানো হয়েছিল প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যাদেশ দেবার সর্বাধিক ৩/৪ মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ ঐগুলি উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কার্যাদেশ দেবার ৩ বছর পার হলেও ন্যূনতম ১৮ মাসের আগে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্রই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেনি। যেহেতু এধরনের কার্য্যাদেশ দেশে বিদ্যুৎ না থাকার ক্ষতি থেকে অর্থনীতিকে বাচানোর জন্য সুতরাং কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে রেন্টাল অভিহিত করার সাথে উচ্চদর দেবার বিষয়টি তখোনই ন্যায্যতা পাবে যখন সে উৎপাদনকারী কার্যাদেশ পাবার সাথে সাথেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে।

এক্ষেত্রে এক অসম্ভব রকমের ব্যতয় ঘটানো হয়েছে। কার্যাদেশ দেবার ন্যূনতম ১৮ এবং সর্বাধিক ৩০ মাসেও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়নি। অথচ সাধারন নিয়মে টেন্ডার করে ১০০ মেঃ ওয়াট একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মান করতে সর্বাধিক ২০/২৪ মাস সময় লাগে। তাহলে এক্ষেত্রে এধরনের উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে রেন্টাল নামে অভিহিত করার একটি যুক্তিই ভেসে উঠে আর তাহলো অবৈধভাবে দর ৩/৪গুন বাড়িয়ে দিতেজনগনের রক্ত চুষে অবৈধ ব্যবসার জন্য।

আরো একটি লক্ষ করার বিষয় বাংলাদেশে অধিকাংশ রেন্টাল দলীয় লোক/সমর্থকদের দেয়া হয়েছে। যাদের কারোরই আইন অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত প্যাকেজ নির্মিত রেডিমেইড কোন রেন্টালতো ছিলই না, অধিকাংশের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের কথা বাদ দিলাম, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিষয়েও অভিজ্ঞতা নেই। তাহলে দীর্ঘদিন আমরা যে বলে আসছিলাম যে বিদ্যুৎ খাতের সংকটগুলোকে ইচ্ছে করে জিইয়ে রাখা হচ্ছে, অবৈধ মুনাফা লুন্ঠনের জন্য তা কি সত্যে পরিণত হয়নি।।