Home » শিল্প-সংস্কৃতি » টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ :: দাসত্বের ভূত আজও তাড়া করে ফেরে

টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ :: দাসত্বের ভূত আজও তাড়া করে ফেরে

ফ্লোরা সরকার

Adobe Photoshop PDFঔপনিবেশিক শক্তির আধিপত্যবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিলো যারা উপনিবেশবাদের শিকার তাদের মানসিক জগত। উপনিবেশ শোষিত সমাজ কিভাবে,কোন্ দৃষ্টিতে নিজেদেরকে দেখে এবং জগতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে কোন সংস্কৃতির মাধ্যমে অবলোকন করে তার নিয়ন্ত্রণ নেয়াটাও ছিলো ঔপনিবেশিক শক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য। মানসিক নিয়ন্ত্রণকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কখনোই পরিপূর্ণ ও ফলপ্রসূ হয়না” কেনিয়ার বরেণ্য সাহিত্যিক ও লেখক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর “ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড”। ঠিক একইভাবে ১৬২০ থেকে ১৮৬৫ অর্থাৎ ২৪৫ বছরের দীর্ঘ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাসপ্রথা প্রচলিত সমাজে, যে সময়ের শেষ ৮৫ বছর এই সমাজ ব্রিটিশ উপনিবেশভুক্ত ছিলো, সবটা সময় জুড়ে দাসমালিক সম্পর্কে, মানুষকে বোঝানো হতো এই বলে যে, পৃথিবীর কিছু মানুষ দাস হয়ে জন্মায় কিছু মালিক হয়ে, কিছু উঁচু কিছু নিচু হয়ে। আর এভাবেই দাসদের শারীরিক ভাবে প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসিক ভাবেও প্রস্তুত করা হতো।

এবারের অস্কার মনোনীত অন্যতম ছবি “টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ” এ দাসদের এই মানসিক প্রস্তুতির বেশকিছু দৃশ্য দেখা যায়। তিনটি দৃশ্যে ভিন্ন তিন মালিক বলেন তাকে ‘স্যার’ নামে সম্বোধন করতে, কেননা সে তাদের মাস্টার, আরেকজন বলেন শরীরের চামড়া তুলে নেয়া হবে তার কথা মতো কাজ না হলে, অন্যজন আইনের বই দেখিয়ে বলেন মালিকের কথা মতো কাজ না করলে সংখ্যাতীত সংখ্যায় চাবুকের ঘা দেবার আইনগত অধিকার তার আছে। ১৮০৫ সালে ব্রিটেনে আইনানুগ ভাবে দাসপ্রথা বন্ধ হলেও আইন বর্হিভূতভাবে তা চলে ১৯২০ সাল পর্যন্ত। হলিউড থেকে দাসব্যবস্থার ওপর ইতিহাসভিত্তিক ছবি নির্মাণের ইতিহাস নতুন নয়। গত ১৩ জানুয়ারি, ২০১৪, দ্য গার্ডিয়ানে কেলে ওকেরে এই বিষয়ে বলেন, ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’, ‘ম্যামি’, ‘আঙ্কল টম’ আবেগনির্ভর গতানুগতিক দাসপ্রথা ভিত্তিক ঐতিহাসিক ছবি। তার তুলনায় ‘লিঙ্কন’ এবং ‘ডিজ্যাঙ্গো আনচেইনড’ ছবিতে হলিউড দাসব্যবস্থার একটি বর্ণনামূলক আখ্যান নির্মানের দিকে মনোনিবেশ করে।’ আর তাই সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক স্টিভ ম্যাককুইনের “টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ” মুক্তি পাবার সঙ্গে সঙ্গে দাসব্যবস্থা, ঔপনিবেশিকতা আর সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহ দিকগুলো নিয়ে পুনর্বিবেচনা, পুনর্আলোচনা হতে শুরু করে। নিপুণ বানানে, নিখুঁত ব্যাকরণে নির্মিত ‘টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ’ শুধু অস্কার পাবার যোগ্যতাই অর্জন করেনি, সেই সঙ্গে ছবির গহীনে থাকা অনেক কথা আমাদের আবার প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ছবিটি সলোমন নরথুপ নামের একজন বর্ণ কালো মানুষের সত্যকাহিনী অবলম্বনে নির্মিত। সলোমন নরথুপ তার বই ‘টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ’ প্রকাশ করেন আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ঠিক আটবছর আগে ১৮৫৩ সালে। ছবিতে দেখা যায় কীভাবে ১৯৪১এর একটি দিনে স্ত্রীপুত্রকন্যা সমেত সুখী বেহালা বাদক সলোমন নরথুপ নামের স্বাধীন মানুষটি নিউইয়র্কের সারাটোগা শহর থেকে কৌশলে অপহৃত হয়ে ওয়াশিংটনে দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যায়। বিক্রি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নাম বদলে রাখা হয় প্যাট। প্রথম দিকে সলোমন তা স্বীকার করতে অস্বীকার করলে প্রচন্ড চাবুকের ঘায়ে তাকে এমন ভাবে রক্তাক্ত করা হয় যাতে বাকি জীবনে সে তার আত্মপরিচয় প্রকাশ না করে। তাকে শেখানো হয় সে জর্জিয়া থেকে পলায়নরত একজন দাসমাত্র। তাই ছবির অনেক পরে এক শ্বেতাঙ্গ মালিক যখন তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করে সে প্যাট বলেই তার পরিচয় দেয়। এমনকি সে যে পড়াশোনা জানা একজন স্বাধীন মানুষ তাও সে আর প্রকাশ করেনা, প্রকাশ করা যেন পাপ। একের পর এক মনিবের অধীনে সলোমন হাত বদল হতে থাকে। আমরা দেখতে পাই, সলোমনের সঙ্গে কীভাবে অন্যান্য দাসদের ট্রাকে, জাহাজে গাদাগাদি করে নিয়ে যাওয়া হয়। নারীপুরুষ দাসদের কীভাবে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে একত্রে গোসল করতে হয়। কীভাবে উলঙ্গ করে তাদের বিক্রি করা হয়। মায়ের শত আর্তচিৎকারেও সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করে বিক্রি করা হয় দুজনকে দুই মেরুতে। জাহাজে দাসদের নিয়ে যাবার সময় রাতে ঘুমন্ত এক নারীদাসকে ধর্ষণের জন্যে নিতে গেলে অন্য এক দাস বাঁধা দিতে গেলে তাকে খুন করা হয়। পরদিন যখন তার মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয় তখন একজন দাস বলে ওঠে – “ও অন্য সবার থেকে ভালো আছে। আমাদের থেকে ভালো আছে এখন।” অর্থাৎ দাসত্বের একমাত্র মুক্তি মৃত্যুতে, অন্যকিছুতে নয়।

তুলা ক্ষেতে কাজ করতে করতে একজন দাসের যখন মৃত্যু হয়, তার শোককৃত্যানুষ্ঠানে অন্যান্য দাসেরা যখন শোকের গান গায়, সলোমনের অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠে বেঁচে থাকা দাস আর মৃত দাসের মাঝে যেন কোন ফারাক নেই। কিন্তু বেঁচে যাওয়াটাও যে একজন দাসের জন্যে কত বড় একটা পাওয়া তা আরেকটি দৃশ্যে পরিচালক ম্যাককুইন অত্যন্ত চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। যখন প্রথম কাজে যোগদানের সময় সলোমনের সঙ্গে একজন কার্পেন্টারের সঙ্গে বিবাধ বাঁধায় কার্পেন্টার তাকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করতে যায়, ঠিক সেই মুহূর্ত্তে মালিকের আগমনে সে রক্ষা পায়, কিন্তু ফাঁসির দড়ি থেকে মাটিতে সামান্য ছুঁয়ে যাওয়া তার পা দুটো দিয়ে কোনোরকমে সে নিঃশ্বাস নিয়ে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, কেননা তাকে তখনই সেখানে থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হয়না। এমনকি একজন কেউ এগিয়ে আসতে পর্যন্ত সাহস করেনা তার দড়িটা কেটে দেয়ার জন্যে। পরিচালক দীর্ঘ সময় ধরে দৃশ্যটি দর্শকের সামনে ধরে রাখেন। দর্শকের অস্বস্তি বাড়তে থাকে কিন্তু পরিচালক নির্বিকার। দাসপ্রথার অমানবিকতার প্রতি তীব্র ঘৃণার উদ্রেগ সৃষ্টিই যেন তার লক্ষ্য। শেষ পর্যন্ত অসুস্থ সলোমনকে মালিক ঘরে নিয়ে গেলে, সলোমন তাকে বার বার জানায় সে দাস ছিলোনা, সে একজন স্বাধীন মানুষ, তাকে মুক্তি দেয়া হোক। কিন্তু মালিক অপারগ। দাসের খাতায় একবার নাম লেখা হয়ে গেলে তা আর লঙ্ঘন করা যায়না। তাই মালিক বলে ওঠেন, তিনি শুধু এইটুকুই সলোমনের জন্যে করতে পারেন আর তা হলো এখান থেকে তাকে অন্য আর এক মালিকের কাছে হস্তান্তর করা। সলোমন বিছানায় পড়ে থাকে, সারাদিনের ক্লান্ত, অসুস্থ সলোমন তখনও জোরে নিঃস্বাস নিতে থাকে, এই নিঃশ্বাস বেঁচে থাকার নিঃশ্বাস নয়, বেঁচে যাবার পরিত্রান মাত্র। অর্থাৎ দাসদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই আছে শুধু ঘটনক্রমে বেঁচে যাবার পরিত্রান মাত্র। কিন্তু পরবর্তী যে মালিক, মি. এডউইন এপস, একজন ধর্ষকামী, রূঢ় ব্যক্তি যার হাতের চাবুক দাসদের পিঠে অজশ্র রক্ত না ঝরা পর্যন্ত বন্ধ হয়না। যার কাছে ‘দাস’ শব্দের অর্থ ব্যক্তিগত সম্পত্তি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই কর্মক্ষেত্রের কর্মরত আরেক কেনেডার এক শ্বেতাঙ্গ দাসের মাধ্যমে সলোমনের মুক্তি ঘটে, কিন্তু পেছনে পড়ে থাকে অগণিত দাসদের রক্তাত্ত কালো অধ্যায়। যে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সঙ্গে মিলে যায় পৃথিবীর আরো বহু দেশের ঔপনিবেশিকতা আর সাম্রজ্যবাদের অলিখিত দাসব্যবস্থার ইতিহাস।

লেখকগবেষক ড..কে.এম. খায়রুল আলম তার “দীনবন্ধু মিত্রের সাহিত্যকর্ম” নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বইটিতে দীনবন্ধু মিত্রের “নীলদর্পণ” নাটকের আলোচনার প্রথম পরিচ্ছদে যশোরখুলনার ইতিহাস, দ্বিতীয় খন্ড থেকে কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন – “—কুঠিতে কুঠিতে কয়েদঘর ছিলো, চুক্তিভঙ্গ করিলে রাইয়তদিগের কুঠিতে ধরিয়া লইয়া নানা নবোদ্ভাাবিত কৌশলে পীড়ন করিবার পর, কয়েদ করিয়া রাখা হইত। কয়েদ করা লোকদিগের যাহাতে সন্ধান না মিলে, তজ্জন্য তাহাদিগকে নানা কঠিতে ঘুরাইয়া লইত। কোনো কোনো হতভাগ্য আবদ্ধের যে একেবারে সন্ধান হইত না। নীল বুনিতে না চাহিলে ক্রোধান্ধ কুঠয়ালেরা গুলি করিয়া খুন করিত, গ্রামকে গ্রাম উজাড় উৎসন্ন করিয়া নিত। নীলকর সাহেবদিগের মধ্যে এমনও দুর্বৃত্ত ছিল, যাহারা জোর করিয়া কৃষক কন্যাদিগকে ধরিয়া লাইয়া কুঠিতে আনিয়া অপমান করিত।” উদ্ধৃতিটি লক্ষ্য করলে ম্যাক কুইনের ছবির ইতিহাসের সঙ্গে খুব একটা অমিল খুঁজে পাওয়া যায়না। যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ( ১৭৯৩১৯৫৬) মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসক এই দেশের ভূমি ব্যবস্থার ওপর খবরদারী শুরু করেছিলো তার জন্যে এই শাসকদের অন্য কোনো দেশ থেকে দাস আমদানি করতে হয়নি ( উল্লেখ্য ব্রিটেন এবং আমেরিকায় আফ্রিকা থেকে দাস আমদানি করা হতো), যে দেশে তারা উপনিবেশ স্থাপন করেছে সেখানেই তারা আরো সহজলভ্য স্থানীয় দাস পেয়ে গেছে। উপনিবেশ আর সাম্রাজ্যবাদের মোড়কে যেসব দাসত্বের আরো ইতিহাস পাওয়া যাবে সোমালিয়া, জ্যামাইকা, কেনিয়া সহ আফ্রিকার আরো দেশে, লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে, পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা আরো দেশে। অ্যালেক্স হ্যালির “দ্য রুটস” এর কথা কেউ কখনো ভুলতে পারবে না, ভুলতে পারবেনা ‘কুনতাকিনতে’কে।

আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক দাসত্বের চিত্র আরো ভয়াবহ। চাবুকের বদলে ইলেকট্রিক শক, কুকুর লেলিয়ে দেয়া সহ আরো আধুনিক শাস্তির উদ্ভাবন ঘটেছে। তাছাড়া, পুঁজিতান্ত্রিক দাসত্ব ব্যবস্থায় কাউকে দাস বানাতে হয়না, সে নিজেই দাস হয়ে থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। কারণ এই দাসত্ব নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গ কথিত ‘মানসিক দাসত্ব’, এই দাসত্ব ধরেই নেয় নিজের যা কিছু আছে তা সবই মন্দ, পশ্চিম বা সাম্রজ্যবাদী রাষ্ট্রে যা আছে তা সবই ভালো। এই দাসত্ব তাই নিজের মতো করে শিখতে জানেনা, যা শেখানো হয় তাই তা শেখে। এই দাসত্ব একদিকে যেমন নিজ ভূখন্ড, প্রাকৃতিক সম্পদ অপরকে ছেড়ে দেয় তেমনি সেই ভূখন্ডের শিক্ষিত সম্প্রদায় নিজ ভূমি ছেড়ে দাস রূপে অন্যের ভূমিতে যেয়ে কাজ করতে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। এই মনোজাগতিক দাসত্ব যতদিন না ঘুচবে ততদিন পৃথিবীতে দাসপ্রথা আরো তীব্রতর হবে। হাফপোস্ট পত্রিকার ইউ টিউবের সাক্ষাৎকারে তাই নোয়াম চমস্কিকে বলতে শুনি – “বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা অতীতের সব থেকে উচ্চতম দাস ব্যবস্থায় অবস্থান করছে।” পরিচালক ম্যাক কুইনের “টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ” ছবিটি তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক ছবি হয়ে থাকেনা, বর্তমানকেও তা প্রাসঙ্গিক করে তোলে।।

১টি মন্তব্য

  1. Tomar ai likhati chomotkar lagllo,kintu ar rash ti akhono amader desh a roye gache ar jara ai ottachar koreche tadar jonno ata mone hoye rupkotha…London a k ka-k ja SIR bolle ami bolte parbo na,akane five years old ekti shishu 80 years old baktti-k naam dhore dake.
    Article ti pore khubi Koshtto lagache…onak shotto kotha jana hoye gache,amadar shonttan=daro jana dorkar.
    THANK YOU DEAR.