Home » অর্থনীতি » পাটের প্রতি এই অবহেলা কেন?

পাটের প্রতি এই অবহেলা কেন?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

jute-goodsকৃষিজাত পণ্য, চিনি ও সারের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও তা কার্যকর হয়নি এখনো। ২০১০ সালে আইন প্রণয়নের পর চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে তা কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। জানুয়ারি পেরিয়ে ফেব্রুয়ারিতেও রাজধানীর চালের আড়ত বা দোকানে পাটের বস্তা চোখে পড়েনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল মালিকরা যে বস্তায় চাল সরবরাহ করবে আমাদের তাই নিতে হবে। মিল মালিকরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা তাদের কাছে পৌঁছেনি। অন্যদিকে বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে তাদের বস্তা বিক্রিতে দৃশ্যত ইতিবাচক সাড়া পড়েনি। নতুন চাহিদাও সৃষ্টি হয়নি। উল্লেখ্য, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক মোড়ক পরিহারপূর্বক পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে ২০১০ সালে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন পাস করে সরকার। ২০১২ সালে এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হবে তা সুস্পষ্ট না থাকায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০১৩ সালে এটি সংশোধন করে তা সুস্পষ্ট করা হয়। এরপর ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এটি কার্যকর করতে বলা হয়। এতে বলা হয়, খাদ্য অধিদফতর কর্তৃক ধান চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে শতভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বেসরকারি মালিকানাধীন রাইস মিল/চাতাল মালিক ও চালের দোকানদাররা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাজারজাত করার ক্ষেত্রে শতভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার করবেন। স্টকে যে প্লাস্টিকের বস্তা রয়েছে তা ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে। এছাড়া উৎপাদিত ও আমদানিকৃত সার ও চিনির ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পাটের বস্তা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।

রাজধানীর বিভিন্ন চালের আড়ত ও বাজারে গিয়ে দেখা যায়, চালের ক্ষেত্রে এখনো শতভাগ প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। চিনির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ব্যবসায়ীরা জানান, এটি মিল মালিক ও সরকারের বিষয়। মিল মালিকরা যে বস্তায় পণ্য সরবরাহ করবে তাই নিতে হবে ব্যবসায়ীদের। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের চালের আড়তের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পাটের বস্তা ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আড়তে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযান কিংবা নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

এদিকে মিল মালিকরা জানান, এটি কার্যকর করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। পাটের বস্তার দাম বেশি এবং সব জায়গায় পাওয়া যায় না। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কোনো নির্দেশনাও দেয়া হয়নি বলে জানালেন একাধিক মিল মালিক। বগুড়ার নাহিদ রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী বলেন, দেশের কোথাও এখনো চালের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার শুরু হয়নি। সরকার যে আইন করেছে তা আমরা লোকমুখে শুনেছি। যদিও আমাদের কাছে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবে এটি একটি ইতিবাচক আইন হলেও ব্যক্তিগতভাবে তা কার্যকর করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, সবাই প্লাস্টিক বস্তা ব্যবহার করলে আমি একা তো পাটের বস্তা ব্যবহার করে ব্যবসা করতে পারব না। কারণ, একটি প্লাস্টিকের বস্তার দাম ১৫ টাকা আর একটি পাটের বস্তার দাম প্রায় ৬০ টাকা। এক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর হয়ে একযোগে সারাদেশে কার্যকরের অভিযান চালাতে হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, এ আইন কার্যকর হলে দেশে পাটের বস্তার চাহিদা দাঁড়াবে ৫৫ কোটি বস্তা। সরকারি ও বেসরকারি পাটকলগুলো এ চাহিদা পূরণে সক্ষম বলে জানান বিজেএমসির সচিব। তিনি বলেন, শুধু খরচের বিষয় দেখলে হবে না। স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির বিষয় চিন্তা করলে পাটের বস্তা ব্যবহারে যে খরচ হবে তা মোটেই অতিরিক্ত নয়। তাছাড়া একটি প্লাস্টিকের বস্তা একবার আর পাটের বস্তা চার থেকে পাঁচবার ব্যবহার করা যায়। এ হিসেবে পাটের বস্তা ব্যবহার করাই সাশ্রয়ী বলে তিনি দাবি করেন।

পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোও অনীহা দেখাচ্ছে। পাটজাত ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন পাস হয়। কিন্তু সংস্থাগুলো বিভিন্ন অজুহাতে ওই আইন বাস্তবায়ন করছে না। খরচ বেড়ে যাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই আইন মানছে না। ফলে পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন শুরুতেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহার বিষয়ে সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকে নিয়ে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে চলতি অর্থবছরে খাদ্য অধিদফতর, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প কর্পোরেশনকে (বিএফএসআইসি) পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি খাতের খাদ্যশস্য, চিনি, সার ইত্যাদি পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পাটের ব্যাগের দাম বেশি, ব্যবহারে ভর্তুকি প্রয়োজন, পণ্যের ক্ষতির সম্ভাবনা, সময় মতো বিজেএমসি ব্যাগ সরবরাহ দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সরকারী সংস্থাগুলো পণ্যের মোড়ক হিসাবে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে অনীহা দেখাচ্ছে। পাশাপাশি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে এমন তথ্য দিয়ে বেসরকারী খাতগুলো পাটের ব্যাগ ব্যবহার থেকে বিরত রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতেই প্রতি বছরে ১১ কোটি পিস ব্যাগের প্রয়োজন। এর মধ্যে খাদ্য অধিদফতরে ৭ কোটি পিস, বিএডিসিতে আড়াই কোটি পিস, বিএফএসআইসিতে ২০ লাখ ৮০ হাজার পিস ও বিসিআইসিতে এক কোটি ৪০ লাখ পিস ব্যাগের প্রয়োজন হয়। খাদ্য ও চিনি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে বলা হয়, ২০০৪ সাল থেকে এই সংস্থা পাটের বস্তা ব্যবহার করে। কিন্তু পাটের ব্যাগের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বেসরকারী পর্যায়েও সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু পাশাপাশি ৫০ কেজির পিপি ব্যাগের দাম হচ্ছে ২৯ দশমিক ৩৫ টাকা এবং পাটের ব্যাগের দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা। চলতি বছরের চাহিদা অনুযায়ী পুরোটাই পিপি ব্যাগ কেনা হয়েছে।

খাদ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চাহিদা অনুযায়ী চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৫ লাখ পিস পাটের ব্যাগ ও ৯৪ লাখ পিস সিনথেটিক ব্যাগ ক্রয় করা হয়েছে। পুরো চাহিদা পূরণ করতে হলে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোশেনের পক্ষ থেকে বলা হয়, চাহিদার বিপরীতে এ বছর ইতোমধ্যে ৭৭ লাখ পিস পাটের ব্যাগ ও ৭৭ লাখ পিস সিনথেটিক ব্যাগ কেনা হয়েছে। তবে আগামীতে পাটের ব্যাগ কেনা হবে।

বিসিআইসি থেকে জানানো হয়, ১৯৯৫ সাল থেকে সার আমদানি শুরু হয়। ওই সময় থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। পাটের বস্তা ব্যবহার করা হলে সারের ক্ষতি হবে। সার জমাট হয়ে যাবে। এছাড়া ব্যাগ কেনার দরপত্র অনুযায়ী পিপি ব্যাগের দাম হচ্ছে ২১ দশমিক ৫০ টাকা ও পাটের ব্যাগের দাম হলো ৬৮ দশমিক ১৫ টাকা। পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ব্যাগের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে ভর্তুকি ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যাগের সরবরাহ বাড়াতে হবে। আরো বলা হয়, একাধিক দরপত্র দিয়ে পাটের ব্যাগ পাওয়া যায়নি।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারী সংস্থা খাদ্য অধিদফতর, বিএডিসি ও বিসিআইসিকে চলতি ২০১০১১ অর্থবছরের চাহিদা অনুযায়ী সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার কাছ থেকে পাটের ব্যাগ সংগ্রহ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আগামী চিনির মৌসুমে ব্যাগের চাহিদা পূরণ করতে খাদ্য ও চিনি শিল্প কর্পোরেশনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বেসরকারী খাতে খাদ্যশস্য চিনি, সার ইত্যাদিতে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে বছরের শুরুতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাটের ব্যাগের চাহিদা নিরূপণ করে। পরে ১০ শতাংশ মুনাফা ধরে পাটের ব্যাগ উৎপাদনের পর সরবরাহ করছে। এক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতায় স্থানীয় বাজারে পাটের চাহিদা তৈরি করা যাচ্ছে না।।